জন্মলগ্ন থেকে প্রতিটি মানব মনে খেলাধুলার এক অদৃশ্য বীজ রোপিত থাকে। বিশেষ করে কৈশোর ও যৌবনে খেলাধুলার উন্মাদনা অধিকতর পরিলক্ষিত হয়। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে সকাল-বিকেল পাড়ার ছেলেমেয়েরা একত্রিত হয়ে হরেক কিসিমের খেলা খেলতে পারলেই যেন সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, ক্লান্তি, শরীর খারাপের নিরাময়। স্কুল, পড়াশোনা, মায়ের বকাবকি; সমস্ত কিছুর মাঝে একটু খেলার ফুরসত পাওয়াই ছিল যেন এক পরম প্রাপ্তি। কিন্তু কী জানি কী একটা আধুনিকতার ভূত এ প্রজন্মের মাথায় চেপে বসেছে যে, খেলাধুলার টান তাদের দেহ-মনে অনুভূতির ঝড় তোলে না। মাঠে-ঘাটে, উঠান, বাগান-বাড়িতে দাপিয়ে খেলে বেড়ানোর প্রতি প্রবল অনীহা। গ্রাম বাংলার চিরাচরিত বহু আঞ্চলিক খেলা ইতিমধ্যেই স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ দিনে দিনে ক্ষীণ হতে চলেছে। আসক্তি এবং আগ্রহ উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে কেবল ভার্চুয়াল খেলার অঙ্গনে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা জোটবদ্ধ হয়ে হৈ-হুল্লোড়, চেঁচামেচির যে প্রাকৃতিক সুখ, তা থেকে অনায়াসে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। এক অপার শারীরিক এবং মানসিক প্রশান্তিকে দূরে ঠেলে মুখ গুঁজে দিচ্ছে যান্ত্রিক খেলার দুনিয়ায়। যেখানে একটা স্মার্টফোন হলেই ব্যাস! হাতের মুঠোয় হরেক খেলার লিস্ট।

গ্রাম বাংলার খেলাগুলি আনন্দ ব্যতীত কিছু দিতে পারে না ঠিকই কিন্তু এই খেলার মাধ্যমে সাহায্যপরায়ণ, নৈতিকতা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও ভাতৃত্ববোধের জন্ম হয়। সর্বোপরি আত্মবিশ্বাস ও জোটবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা অর্জিত হয়।

দেহ ও মনের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মন ভালো না থাকলে তার প্রতিক্রিয়া দেহে পড়ে। আবার শরীর অসুস্থ হলে না মন খারাপ থাকে। সুতরাং উভয়েরই পরিচর্যা অত্যাবশ্যক। খেলাধুলার মাধ্যমে এক অনাবিল আনন্দের পাশাপাশি আমরা দেহ ও মনের পরিচর্যা করতে পারি।

এ প্রসঙ্গে একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শোনাই।’আমরা পাড়ার বেশকিছু সমবয়সি ছেলে অবসরে নির্দিষ্ট এক জায়গায় আড্ডা দিই। যেখানে সমাজ, রাজনীতি, খেলাধুলা, পড়াশোনা, মোদি, ট্রাম্প, ইমরান, কাশ্মীর সহ নানান বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ও সুস্থ তর্ক-বিতর্ক করে থাকি। কিন্তু সম্প্রতি সময়ে আড্ডার প্রায় প্রত্যেকটি ছেলে ‘পাবজি’ নামক এক মোবাইল গেমে প্রবল আসক্ত হয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক বিনোদনের মোহগ্রস্ত হয়ে অবিশ্রান্ত মোবাইলে মাথা গুঁজে বিড়বিড় করে আর গেমের চাপা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। পাপজিতে এমনই মশগুল থাকে যে, হাঁকডাক করলে সাড়া দেয় না। অনুভব করছি আড্ডার অমিতমৃয়তা ক্রমশ জৌলুস হারাচ্ছে, মধুর সম্পর্কে কেমন যেন ফাটল তৈরি হচ্ছে। আমি বেচারা গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাতে না পেরে একাকী হয়ে পড়েছি।’

অত্যন্ত হতাশার সুরে বলি, তরুণ ছেলে-মেয়েরা এখন উভয় সংকটে। খেলাধুলা সামাজিকীকরণের অন্যতম মাধ্যম হলেও মাঠ বা খেলযোগ্য জমির অভাবে খেলাধুলার সুযোগ এখন কম।

গ্রামবাংলার দিকে অধিক জমিজমা সম্পন্ন বিত্তশালী ব্যক্তিও এক টুকরো জায়গা খেলার জন্য ফেলে রাখেন না। মফস্সল শহরগুলোতে খেলার মাঠ দখল করে তৈরি হচ্ছে বাণিজ্যিক ভবন ও শিল্পকারখানা। কৈশোরের একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম মাঠগুলো ক্রমেই চলে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের খাঁচায়। মাঠ স্বল্পতার কারণে সমাজে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বসতবাড়ি। ফলে পতিত জমি ফাঁকা না থাকায় ইচ্ছে থাকলেও খেলাধুলা করতে পারছে না একালের ছেলেমেয়েরা। আজ যেখানে মাঠ কিছুদিন পর সেখানে মাথা তুলছে অট্টালিকা। কদিন আগে পর্যন্ত যেটা ছিল আম-লিচু-সবেদা-কাঠালের বাগান, আজ তা ইট-কাঠ-তারের বেড়া নিয়ে খাঁ খাঁ করছে। হিংসাত্মক মনোভাবের কারণে বাচ্চারা প্রতিবেশীর বড় উঠানে খেলতে পারার অধিকার হারিয়েছে। এমন ছবি কমবেশি সর্বত্রই। অপেক্ষাকৃত ধনী বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের মিশতে দেয় না গরিব প্রতিবেশীর সঙ্গে। সন্তান ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলের পড়ুয়া, মাসে মাসে মোটা টাকার ফিজ। কাঁড়ি কাঁড়ি বইপত্র; খেলাধুলার সময় কোথায়! এমন মানসিকতা থেকেও তথাকথিত বহু শিক্ষিত অভিভাবক তাদের সন্তানদের একঘরে করে রেখেছে আর খেলাধুলার মাধ্যম হিসাবে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে দামি ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার। এতে তাদের বাবা-মায়েরাও খুশি হয় তাদের সন্তানদের আধুনিক হওয়া দেখে।

ফলস্বরূপ তারা শারীরিক ও মানসিক দুটো ক্ষেত্রেই বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একটা সময় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারও তাদের কাছে একঘেয়ে ও বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। যার পরিণতি দাঁড়ায় ভয়ংকর।

খেলার মাঠ ক্রমান্বয়ে কমে আসার ফলে ছেলেমেয়েরা প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যা একটা সময় সীমানা অতিক্রম করে ফেলে। পিতা-মাতার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পর্নোগ্রাফি সহ নানা অশোভনীয়, অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। খেলাধুলা, ছবি আঁকা, কবিতা লেখার বয়সে অকল্পনীয় লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যায়। জাতির আগামী অগ্রগতি নির্ভর করে তরুণ প্রজন্মের উপর। আগামী দিনে তারা হয়ে উঠবে জাতির কর্ণধার। তাই নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীলতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।