‘কবি’ বা ’লেখক’ নাম শুনলেই মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। যিনি বাইরের জগতের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ বা আপন মনের ভাবনা-বেদনা বা কল্পনাকে অনুভূতি-স্নিগ্ধ ছন্দোবদ্ধ একটি অবয়ব দান করতে পারেন, তাকেই আমরা কবি নামে অভিহিত করি। আবার কেউ কেউ বলেন, যিনি জাগতিক বিষয় সম্পর্কিত বিষয়ের যথাযথ ও স্বাভাবিক চিত্রকল্প এঁকে দিতে পারেন, তিনিই যথার্থ কবি। অর্থাৎ কবিরা জগতের ভালো ও মন্দের যথাযথ চিত্র মানুষের মনের মাঝে সঠিকভাবে অঙ্কিত করে দেন। কবিদের কাজ কবিতা লেখা এবং মানুষকে আগামীদিনের স্বপ্ন দেখানো। কবিরা তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনাগুলোকে মনের মাধুরি মিশিয়ে তৈরি করেন নিত্য-নতুন কবিতা। কবিতাগুলো একত্রিত হয়ে রচিত হয় কবিতাগ্রন্থ বা মহাকাব্য বা কবিতাসমগ্র। কমরুদ্দিন আহমদ একজন কবি-নান্দনিক কবি। তিনি সুনিপুণ হাতে খেলা করেন শব্দ নিয়ে। শব্দের মালা দিয়ে তৈরি করেন একে একে সকল কবিতা। কবিতা যদিও চলমান যাপিত জীবনের প্রতিবিম্ব হিসেবে কবি জীবনের কিছু না কিছু প্রতিফলন থাকে। এই নিবন্ধে ব্যক্তিগত জীবনাচার আলোচনা নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় এবং তার অমর সৃষ্টি নিয়েই সকল আলোচনা কেন্দ্রিভুত থাকবে।

কবি ও সাংবাদিক কমরুদ্দিন আহমদ ১৯৬৫ সালের ৩১ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মাস্টার শামসুদ্দিন আহমদ এবং মাতার নাম দিলওয়ারা বেগম। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পেশাগতভাবে বাঁশখালী আলাওল ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনা এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। মিশুক প্রকৃতির এই কবি জীবন যাপন করেন অত্যন্ত সহজ-সরলভাবে। কবিপত্মী আরিফা সিদ্দিকাও একজন সফল কবি। দু’মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে শহুরে জীবন যাপন করলেও প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘শহর ছেড়েই যাবো’তে তার প্রতিষ্ঠিত ‘কাব্য নিলয়ে’ ফিরে যাওয়ার কথা দিয়েছেন কবি অকপটে।

একজন কবি কাল বা সময়ের প্রবক্তা। অসাধারণ নিষ্ঠাবান সাধক পুরুষরাই মুলতঃ কবিতার স্রোতস্বিনী সাগরে প্রতিনিয়ত সাঁতার কাটেন। একজন মানুষ বা সাধক যেমন নগর সভ্যতার বিকাশের ফলে উন্নততর চিন্তার মাধ্যমে ক্রমবিবর্তনের আবহে নিজেকে সঁপে দেয়, তেমনি একজন কবিও এই সময় প্রবাহে নিজেকেও অভিযোজিত করতে সক্ষম হন। পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় যেভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শকুনের ধারা বিশ্ব ভাবনায় বিষাক্ত নখর ফেলছে, একজন কবিও রক্ত-মাংসের মানুষ বিধায় তার হৃদয়ও প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং সাধারণের বিয়োগব্যথা কিংবা সুখানুভুতিগুলো কাব্যের পংক্তিতে সাজিয়ে তোলেন। কবি কমরুদ্দিন আহমদের প্রতিটি কবিতাগ্রন্থে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার গুণে ধরা সমাজ-প্রকৃতির স্বরূপ, নাগরিক ব্যস্ততা, মানবীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ, ভন্ডামীর মুখোশ উন্মোচন, ভরা যৌবনের শঙ্খের স্তুতি, প্রাণ-প্রকৃতির প্রবাহমান প্রতিচ্ছবি, দেশপ্রেম, মানুষের দু:খ-বিষাদের প্রতিচ্ছবি, বাঁশখালীর পানের বরজ, কালীপুরের চা বাগান, জলকদর খাল, নারী প্রেমের আবহ, বিশেষতঃ মালকা বানু-মনু মিয়ার দারুণ প্রেমের উপাখ্যান এবং পাহাড়ী ললনাদের নিয়ে তৈরি করেন এক একটি কবিতাগ্রন্থ। অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ, চাঁদাবাজি এবং সমাজের উচ্চস্তরের মানুষের ভন্ডামির বিরুদ্ধে কবির কলম নিরন্তর সক্রিয়। তাদের প্রতি ব্যঙ্গ ও শব্দবিষ ছোঁড়া তার স্বভাবজাত। তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন-
‘শব্দকলায় লুকিয়ে রাখি
গোখরো সাপের বিষ,
ভন্ডলোকের সঙ্গে আমার
দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।’ (গন্ধরাজের ঘ্রাণ)

তিনি বাঁশখালী বা চট্টগ্রাম নয় শুধু, পুরো বাংলা সাহিত্যকে তার প্রতিষ্ঠিত ‘কাব্যনিলয়ে’র সাথে একই ফ্রেমে বাধতে চান। কাব্যিক উপমা আর ছন্দের ঝংকারে কবি প্রাণের বাঁশখালীকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।
বাঁশখালী সম্পৃক্ত কিছু স্থান বিশেষের নাম এভাবে এসেছে কবিতায়ঃ
১। “কালীপুরের গাছে গাছে
মিষ্টি লিচু ঝুলে
বামের ছড়ায় জলকলমী
হাসে স্নিগ্ধ জলে।”
(বাঁশখালী সংগীত, হৃদয় শঙ্খ তীরে)
২। ‘শহর থেকে খানিক দূর/ রূপের রানী চাঁদপুর/মুখ দেখে তার লাগবে ঘোর/মনো বীণায় জাগবে সুর।’ (আমার গাঁয়ে, বিষাদের ভাষানে জলজ ঘাতক)
৩। ‘মলকা বানুর রূপে কাছে/শান্তি খুঁজে মনু এসে/উঁকি মারে পুরান স্মৃতি/ঘরে ঘরে হাওলা গীতি।’ (কী সুন্দর এই বাঁশখালী, গন্ধরাজের ঘ্রাণ)
৪। ‘পুঁইছড়ির ওই পাহাড় ফেলে/ধানি জমির কোলটা ঘেঁেষ/একটি মাচাং বাড়ি।’ (মুজিব ভাইয়ের মাচাং বাড়ি, গন্ধরাজের ঘ্রাণ)
৫। ‘শঙ্খ সেতুর মিলনে পরিণয় ঐতিহ্যে/আনোয়ারা-বাঁশখালী/মলকা মনু ফিরে আসে/প্রজন্মের স্বপ্ন জাদুঘরে।’ (ফিরতি টোন, সবুজ সুখের পুলক)

তিতাস পাড়ের কবি আল মাহমুদ ‘তিতাস’কে নিয়ে এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলীকে নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। কবি কমরুদ্দিনের হৃদয়ও শঙ্খপাড়ের মানুষ ও কবি হিসেবে শঙ্খ তীরে বাধা। কবিতাগ্রন্থ ‘হৃদয় শঙ্খ তীরে’ তার জ্বলন্ত সাক্ষী। ইদানীং লিটল ম্যাগের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি শঙ্খ সম্পর্কে বলেন, ‘ শঙ্খনদী আমার হৃদয়ে বহমান নদী। শঙ্খনদীর তীরে চাঁদপুর গ্রামে আমার জন্ম ডেরা। বাড়ির পেছনে খুনিয়াপীরা খাল। দক্ষিণ দিক থেকে এ খাল উত্তরে শঙ্খনদীর সাথে মিশেছে। ওই খালে বান-ভাটিতে ছোটবেলায় মাছ ধরতাম। মাছ ধরতে ধরতে চলে আসতাম শঙ্খে। সেখানে সাঁতার কাটতাম, ঝাঁকি ও ঠেলা জালে মাছ ধরতাম। ডিঙি নৌকায় চড়ে বেড়াতাম। খুনিয়াপীরার মোহনার সাথেই চাঁদপুর চর। সেখানে জোয়ারের পানিতে ঠেলা জালে মাছ ধরতে বেশ আনন্দ লাগতো। আমার স্মৃতি বিজড়িত এ নদী বাংলাদেশের একটি বিশেষ নদী, যা বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।”
কবির অনেক সুখস্মৃতি বিজড়িত শঙ্খ নদীকে নিয়ে কতিপয় পংক্তি উল্লেখ করছিঃ
১। ‘শঙ্খ নদী, শঙ্খ নদী কোথায় তোমার ঘর
বুকের কাছে সবুজ ঘাসের মিনার করা চর।’
(ও কিশোরী পাহাড়িকা, হৃদয় শঙ্খ তীরে))
২। ‘শহর ছেড়েই যাবো নারীর কাছে/উজান ভাটির টানে শঙ্খের পাশে/চিল-শালিকের দেশে আমার জীবন/গ্রাম-বন কালুমাঝি অতি প্রিয়জন। (শহর ছেড়েই যাবো)
৩। ‘আমি দেখেছি চেয়ে/ভাটির টানে সমুদ্রের ঢেউ/শঙ্খসেতুর নিচে বালুচরে থির।’ (শিল্পের বীজ)
৪। ‘শঙ্খের শান্ত জলে সূর্য স্নাতক/চিক চিক আলোর ঝলকে জলপায়রার বুক/মনটানে তরঙ্গ ইশারা।’ (পৌষের ভোরে, শহর ছেড়েই যাবো)
৫। ‘শঙ্খের স্বচ্ছ জলরাশি ধুয়ে দেয়/ধর্ম, বর্ণ গৌর-কৃষ্ণ সকলের মুখ/এমন শান্ত নারী ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের তল।’ (পাহাড়ি পাথরের থান, বিষাদের ভাষানে জলজ ঘাতক)
৬। ‘শঙ্খনদী বান্দরবানের পাহাড়ী রাজকন্যা/বর্ষা ঋতু তোমার দেহে খরস্রোতা বন্যা।’ (শঙ্খসেতু, সবুজ সুখের পুলক)

কেন তিনি নন্দিত কবি? আমরা জানি, নন্দনতত্ত্ব দর্শনের একটি শাখা। যেখানে সৌন্দর্য্য, শিল্প, স্বাদ এবং সৌন্দর্য্য সৃষ্টি ও উপভোগ নিয়েই যার আলোচনা। অর্থাৎ নন্দনতত্ত্ব মানুষের সংবেদনশীলতা ও আবেগের মূল্য এবং অনুভূতিকে নিয়ে কাজ করে। কমরুদ্দিন আহমদের প্রকাশিতকবিতাগ্রন্থের প্রতিটিই নান্দনিকতাময়। তার এ পর্যন্ত প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থগুলো হলো: শহর ছেড়েই যাবো (২০০৬), সবুজ সুখের পুলক (২০০৭), বিষাদের ভাষানে জলজ ঘাতক (২০০৯), হৃদয় শঙ্খ তীরে (২০১৩), গন্ধরাজের ঘ্রাণ (২০১৭), বিলবোর্ডে শব্দনুপুর (২০১৯ এবং কাব্যনিলয় (২০২০)। তাঁর কবিতাগুলোর পরতে পরতে রয়েছে উত্তর আধুনিকতা ও নান্দনিকতার ছোঁয়া। কতিপয় পংক্তি তুলে ধরছি:
১। ‘শব্দ দেবী আমার কাছে
রহস্য এক নারী
বাংলাদেশের প্রকৃতি হয়
তারই সবুজ শাড়ী।’
(মায়ের ভাষা, সবুজ সুখের পুলক)
২। ‘নিখুঁত নারী শিল্পে পরিয়েছি/খয়েরি গাঁদার জামদানি শাড়ি/খুঁজে পাবে ঘাস ফড়িংয়ের গায়ে/খোপায় মাধবীর মেলা/হাতে শঙ্খের বালা আর জাপানি ঘড়ি।’ (হৃদয়ের জাদুঘর-শহর ছেড়েই যাবো)
৩। ‘তোমার জন্য অন্ধকার কবরের প্রশান্তি/কারো কাম্য নয়/প্রিয়তমা কবিতা সুন্দরী’। (নন্দনে বেঁচে থাকো, বিষাদের ভাষাণে জলজ ঘাতক, পৃষ্ঠা-২৯)
৪। ‘তাল পুকুরে নীলের কাছে হৃদয় আমার কাত/চাঁদের বুড়ি স্নানে যখন জোছনা ধোয়া রাত।’ (আমার গাঁয়ে, হৃদয় শঙ্খ তীরে)
৫। ‘পাতার গন্ধ কাঁধার গন্ধ আঠার গন্ধ এক নয়/ফুলের গন্ধ পাখির গন্ধ চুলের গন্ধ সব নয়/ পাটের গন্ধ পাঠার গন্ধ মুখের গন্ধ অসহ্য/প্রিয়তমের বুকের গন্ধ প্রেমের নমস্য।’(রূপের গন্ধ, সবুজ সুখের পুলক)
৬। ‘বহমান লুসাই ষোড়শীর রূপের বৈভবে/সমুদ্রের লীলুয়া বাতাস বলে/ জীবনের এক টুকরো শান্তি পতেঙ্গার তরমুজের লালে।’ (বৈশাখের লীলুয়া বাতাস, বিষাদের ভাষানে জলজ ঘাতক)

বাংলা সাহিত্যের উজ্বল নক্ষত্র কবি আল্ মাহমুদ বলেন, ‘আমার বিচারে কমরুদ্দিন আহমদ একজন প্রকৃত কবি, স্বপ্নদ্র্রষ্টা ও শব্দের নির্মাতা। আমি তাঁর কাব্য গদ্য এবং মানসিক পুলকের প্রশংসা করি।…সবচেয়ে বড় কথা হলো, কবি না হলে সমাজ-সংসার চলে বটে কিন্তু হৃদয়ের পুলক উদ্ভাসিত হয় না। কবি চাই ধ্বনিতরঙ্গ এবং শব্দের আনন্দের গুঞ্জন তোলার জন্য।’ কবিরা এমনই হয়। তার অসাধারণ প্রবন্ধগ্রন্থ ‘আধুনিক কবিতা : প্রাসঙ্গিক বিবেচনা’র প্রতিটি আলোচনাই নান্দনিকতায় ভরপুর। প্রাবন্ধিক হিসেবেও কলমের ডগায় দ্যুতি ছড়িয়েছেন সাফল্যের সাথে। কবি ও গদ্যকার কাজী সাইফুল হক বলেন, ‘অল্প পরিসরে গ্রন্থটির প্রতিটি আলোচনা কীর্তিমানের সমগ্রতাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। এক অর্থে নেয়াও যাবে। আর তা নান্দনিক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে কবি একজন সচেতন বিবেকী কন্ঠস্বর বলে প্রতিভাত হন আমাদের কাছে।’ ইতোমধ্যে দেশের প্রধান কবি আল মাহমুদ গবেষক হিসেবেও তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছে। ‘আল মাহমুদ : কবি ও কথাশিল্পী’ যার অনন্য কীর্তি। এইরূপ বিশিষ্টতা অর্জন কবি কমরুদ্দিন আহমদকে নাম একদিন সফলতার দ্বার প্রান্তে পৌঁছে এ আশা রাখি। তার অনেকগুলো অভিধা: কেউ বলেন বাউল কবি, কেউ বা সাহিত্যের ফেরিওয়ালা, কেউ কেউ বলেন প্রেম ও প্রকৃতির কবি। আমি বলি না, তিনি একজন নান্দনিক ও স্বভাবজাত কবি। তার সামগ্রিক রচনায় নান্দনিকতার অপূর্ব সমন্বয় বিদ্যমান। তাই তিনি একজন সার্থক নন্দন অভিযাত্রীও বটে। আমরা আশাবাদী ব্যক্ত করছি যে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একদিন কবি কমরুদ্দিন আহমদের নাম রচিত হবে আকাশের দীপ্যমান নক্ষত্র হিসেবে।

তথ্য কোষ :
১। সাহিত্য সন্দর্শন- শ্রীশচন্দ্র দাশ, বর্ণ বিচিত্রা, ঢাকা।
২। নন্দন অভিযাত্রী-কবি কমরুদ্দিন আহমদের ৫০ বছর পূর্তি স্মারক
৩। আধুনিক কবিতা : প্রাসঙ্গিক বিবেচনা-কমরুদ্দিন আহমদ
৪। আল মাহমুদ : কবি ও কথাশিল্পী- কমরুদ্দিন আহমদ