পাবে তুমি তারে

হেমন্তের কোন এক শুভ্র সকালে
পাকা ধানক্ষেতে ডানা মেলে ছুটে বেড়ানো বুনো শালিকের
দেখা পেয়ে
অভিভুত তুমি; কচুরিপানার আড়ালে
লুকিয়ে থাকা ডাহুকির সুরে
হঠাৎ করেই মোহিত হয়ে উঠবে ,
আর কলমিলতার পাতাগুলো
রবে ঝুঁকে পুকুর পাড়ে
যেন কিসের মৃদু আশ্বাসে
-মন্দ বিশ্বাসে।

হয়তো কাদা জলে দাঁড়িয়ে থাকা
সাদা বকের তুলতুলে নরম পালকে,
তুমি যদি এ অগ্রহায়ণের ঘ্রান খুঁজে
ফির,তবে আমার বিরহী সুর তোমায়
টেনে নিয়ে যাবে সেই মধুৎসবে;
ভালোবাসায় মাখামাখি করে সেথা
জড়িয়ে রবে ধানের শীষ
-মায়াভরে।

হয়তো ঈষৎ সাদা মেঘে ঢাকা আকাশ
ছড়ায়ে যাবে প্রেম, তুমি চাইলেই
মৃদু পরশে পড়বে ঝরে,
-তোমার কপালে;
আমার দেখা পাবে তুমি মেঘেদের বুনো রূপের আড়ালে।
সেদিন হয়তো আকাশ
নয় মাটিতেই রাখবে তুমি চোখ,
তবুও চোখাচোখি হোক,
অগ্রহায়ণের শীত শীত বাতাসে মুছে যাবে সমস্ত শোক।
আর তোমার আঁখি আমার আঁখিতে অশ্রু ঝরাক
যেমন কানাবগী ঝরায় পালক!
……………………………………………

আগন্তুক ও চাঁদ

তোমাদের চিত্রিত শহরে নিতান্ত
মলিন বিমর্ষ আগন্তুক এক
এসেছি পথ ভুলে, পরনের ছেঁড়া
পোশাক দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে
ভদ্র শহুরে যত!
ভেতরে জ্বলে পোড়া হৃদয়ের খবর
রাখবে এমন সাধ্যি কার,
বল?

তাই,
অন্ধকার আঁকড়ে ধরা আগন্তুক
যাচ্ছি ফিরে অবশেষে,
আমাদের ছোট গাঁয়ের শ্যামল ছায়ায় ।
যেখানে শাপলা ফোটে
বিলের জলে
গভীর মায়া জড়িয়ে রাখে তায়।
আর রাখালের বাঁশীর সুর
মুগ্ধ করে সকাল দুপুর ।
রাত্রি হলেই চাঁদের আলোয়
ভূবন ভরে যায় ,
তোমাদের শহুরে চাঁদ তো সে নয়;
ইট সিমেন্টের দেয়ালে নিতি
নিজেকে আড়াল করে রয়,
আঁধারের সোনার খাঁচায়।
……………………………………………

তক্ষকের ডাক

আজন্ম লালিত স্বপ্ন হৃদয়ে তবু প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির খাতায়
থেকে যায় অমিল
যোগ- বিয়োগের খেলায় অদ্ভুত কিছু সমীকরণ
সামনে এসে দাঁড়ায় বারংবার ।

দুখের সাগরে অবগাহন করে আটকে পড়ে রই
বেদনার বালুচরে বিশ্বাস – অবিশ্বাসের নিত্য দোলাচলে
হেসে কুটিকুটি ভাগ্যবিধাতা।
নিদারুণ নির্মমতায় মুছে দেন কপালের সুখলিখন যত!

কেবল যায় হারিয়ে না
দুখের তান, সুনামির পানির মতোই
বেড়ে চলে অবিরাম আর মনের ঘর উঠোন সব যায় ডুবে
সেই বিস্তৃত জলধারায়।
যতবার চাই পেছন পানে
সেই ছবি হৃদয়ের ক্যানভাসে আঁকা দেখি অবিরল , তেমনি
-অম্লান।

ভোর থেকে দুপুর, দুপুর থেকে রাত
প্রত্যহ একই সময়ের পুনরাবৃত্তি।
যেন ক্রুশবিদ্ধ যীশু খ্রিস্ট ঝুলে রয়েছেন বছরের পর বছর;
এক জায়গায়
সেই একই ভাবে। সবই জীবনের একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি,
বিবর্ণতার জাঁতাকলে পিষ্ট জীবন।
……………………………………………

অম্লান

তোমার হাসি ছাড়াই কেটে যায়
বিবর্ণ দিনগুলি,
এক দুই তিন এমনি করে
অযুত বছর!
শহরের পথগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়
অবিরত বিমর্ষতায়,
দেয়ালেতে নোনা ধরে আবার
নূতন করে!
পথকলিদের উচ্ছিষ্ট কুড়োনের ব্যস্ততা বেড়ে যায়, আগের চেয়ে
প্রতিযোগিতাও হয় ভীষণ
পথকুক্কুরের সাথে!
ধীরে ধীরে বটগাছের বয়স বেড়ে যায়
ঢের, বাড়ে শুকনো ডাল,
পাতাও পড়ে ঝরে তেমনি করে
তোমার তরে!
হৃদয়ের আঙিনায় তবু বেজে যায়
তোমার নূপুরের সুর,
আগেরই মতোন রিনিঝিনি সুরে
তেমনি করে!
……………………………………………

দিগন্তের সীমানায়

তোমাদের ইট সিমেন্টের শহরে
প্রতিদিন কত শিশির কণা অনাদরে
শুকিয়ে যায়, কত স্বপ্নসাধ
ফুরিয়ে যায় অসময়ে,
খবর রেখেছে কি কেউ?

কালো ধোঁয়ায় ভরে থাকা
পিচঢালা পথ, রংধনুর সাত রং
ছাপিয়ে চলা মেঘেদের
দৃপ্ত শপথ কুয়াশার চাদরে
ঢেকে দেয়
-আকাশের গান।

পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার স্বপ্নগুলো
ক্রমশঃ আঁধারের থাবায়
যায় হারিয়ে, তোমাদের স্মিত হাসির আড়ালে
দেয় ডুব অসহায়
হংসশাবকের ন্যায়।

আকাশ হতে খসে পড়া নক্ষত্র
শুধু তোমাদের কথাই বলে যায়,
পুর্ণিমার চাঁদ কিংবা আঁধারে ঢাকা রাত
কেঁদেই কাটায় প্রতিটি ক্ষণ।

তোমাদের হাসি ধরে রাখতে
তক্ষকের কতো বিসর্জন!
ভুলে গিয়ে অনায়াসে বার বার
ফিরে আসে বিষণ্ণ মেঘ ঝরাতে
-বৃষ্টি আবার!
……………………………………………

পলাশ ফোটা ভোর

পৃথিবীর পথে পথে ছুটে বেড়ানো অবিরত, হাসি-কান্না
কিংবা সুখ-দুঃখ
নিরন্তর জীবনের অলিখিত কাব্য হয়ে
ফিরে ফিরে আসে
নক্ষত্রের আগুন জ্বলা রাতে।
আর যত আছে জীবনের লেনদেন
অসীম ভ্রাম্যময়তায়,
সব মুছে যায়
-মাটির ঘ্রানে।

মহাশূণ্যের ওপার হতে অনন্ত
জিজ্ঞাস্য হয়ে আসে ভেসে
সেই প্রশ্ন আবার,
আর কি জাগবে তুমি সেই
তৃষিত আলোর টানে?
শরীরে জলের গন্ধে হতাশ প্রাণের মতোই অন্ধ হয়েও খুঁজবে কি আর
-ভালোবাসার মানে।

নবমীর চাঁদের আলোয় খৈয়ামের বিমুগ্ধতায়, আদিম মদিরা হাতে
সিক্ত হয়ে যদি এসে দাঁড়াই
দুয়ারে তোমার-
ফেরাবে কি আবার?
সেই দুঃস্বপ্নের ভেতর !
……………………………………………

অসমাপ্ত কথন

যদি হাওয়ার ভেতর ধূলিকনা
বাঁধে আমার কবর,
তবে ওপারের আকাশ
নিরন্তর বাতাস-
ছুঁয়ে দিয়ো বন্ধুবর!
আমি তো নেমেছি পথেই,
ছেড়েছি প্রাসাদ
বেধেঁছি ছন্নছাড়া, নড়বড়ে
এক খুঁটিহীন ঘর।

যদিও সময় থামেনি
আমাদের মতো,
মিছে অভিমানে ভুল কতশত;
কাঁদিয়েছে অবিরত-
নিরন্তর বেদনায়।
দুটি পথে পৃথিবী এক হয় কোন
এক মানুষীর তরে,
জোনাকির মতন খেলা করে স্মৃতি দেবদারু ছায়ায়,
নিমের শাখায়।

সময়ের কোলে অসময়ে ঘুমিযে পড়ে
গিয়েছ চলে
কালের গহ্বরে;
পৃথিবীর দেয়াল ঘেঁষে আরেক পৃথিবী চুয়েঁ পড়া
বেদনার
আরেক সাগর।
……………………………………………

বৃষ্টিদিনের কদম ফুল

আমায় ছেড়ে যদি আকাশ কিনিস
তবে সে আকাশে শুধুই বৃষ্টি ঝরবে সারাক্ষণ,
ফলস্বরুপ অসময়ে বন্যায় মরবে ডুবে
-মানব সকল।
আমায় ছেড়ে যদি বৃষ্টি কিনিস
তাহলে সে বৃষ্টি যাবে থেকে অকারণে,
আর মরুভূমিতে হবে পরিণত
-সমস্ত চরাচর।
কিংবা আমায় ছেড়ে যদি যাস বহুদূরে
তবে ক্রমেই যাবে শুকিয়ে সবগুলো নদী,
মাঠে মাঠে কেঁদে ফিরবে রাখাল ফেলে সুর,
বাঁশী- সবই।
আমায় ছেড়ে যদি স্বপ্ন দেখিস কোন
সারা বিশ্ব তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাবিনা সান্তনা
হারাবে সব সুন্দর , অজানা
-মহাসাগরে যেন।
কি, যাবি ছেড়ে??
……………………………………………

এই আঁধার বরষায়

বহুদিন হয়ে গেল,
ঘরের কোণের সেই বুড়ো তক্ষকের গলার আওয়াজ শুনিনা ।
রাত বিরেতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে
আকূল হৃদয়ে চোখ মেলে চেয়ে থেকেও
দেখা পাইনা –
অবাক করা তারাগুলোর।

বরং অসময়ে পথকুক্কুরের ডাক ভেতরের শূণ্যতাকে
বাড়িয়ে দেয় কয়েক’শ গুণ। ভোরগুলো তাই
শুধুই আরেকটা ঘড়ির কাঁটার ফিরে আসা
ক্ষণেক পরিভ্রমণ শেষে।
গা থেকে রঙ হারানো পুরনো লাটিমের
মতোই বন বন করে ঘুরে চলেছি
দিনে রাতে।

কখনো জ্যোৎস্নার তীব্র আলোয় চোখে ধাঁ ধাঁ লাগে,
আবার কখনো অমাবশ্যার গাঢ় আঁধারে
যাই হারিয়ে ধীরে ধীরে।
নিয়তির অট্টোহাস্য মাঝে মধ্যেই
করে তোলে রিক্ত ভীষণ। কী এক
বোবা কান্নায় সাধের রংধনুগুলো পরিণত হয় তীক্ষ্ণ পাথরকণায়।
ক্ষত বিক্ষত ক্রমশঃ হৃদয়ের সবকটা দরজা,
উঠোন আর ঘর।

তবু দূর হতে ভেসে আসা
রাখালী বাঁশীর সুর,
আমায় করে আকূল।
সখী , ভোর হলো বলে!
এবার সব আঁধার হবে দূর…
……………………………………………

একটা কবিতা লিখব বলে

এক‌টি কবিতা লিখব বলে আজ হাতে নিয়েছি কলম আমার,
বসন্তের পাতাঝরা বিদায় বেলায়
সমস্ত প্রকৃতি নিমগ্ন যখন হলুদের বিষন্নতায়
তখন তোমায় নিয়ে,
হ্যাঁ হ্যাঁ শুধুই তোমায় নিয়ে
কবিতা লিখব বলে আমার এতো আয়োজন।
শুধুই এক‌টি কবিতা লিখব বলে!

কিন্তু যখন ছোট্ট শিশুর আর্তনাদে ঘুম ভেঙ্গে যায়
শকুনির দল সাধের মানবতাটাকে কুরে কুরে খায়
-নিষ্ঠুর বিভৎসতায়,
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নিরাপদ স্থান স্রষ্টার ঘর থেকে
যখন নিষ্পাপ শিশুর পচা গলা লাশ বেরোয়,
তখন কলমের সব কালি যেন হঠাৎ করেই
শেষ হয়ে যায়! আর
জমাট বাঁধা রক্তের স্রোতে কবিতাও হারিয়ে যায়।

সৌরকলঙ্ক বেয়ে নেমে আসে আঁধার
নিকষ কালো আঁধার,
ঢেকে দেয় সমস্ত চরাচর
যখন কিছু নারীলোলুপ হায়েনাদের লালসার শিকার হতে হয়
নিষ্পাপ শিশু পূজাকে,
ধর্ষকদের হিংস্র থাবায় যখন থেমে যায় তনুর
স্বাধীন পথচলা, তখন কবিতা লেখার খাতায় ভর করে শুধুই শূণ্যতা;
ফুল নদী প্রেম ভালোবাসা তো সেখানে নিছক বিলাসিতা ।

তবুও একটা কবিতা লিখতে চাই,
শুধুই একটা কবিতা তোমার জন্যে,
আমার প্রিয়ার জন্যে।
কিন্তু সারা বাংলা জুড়ে যখন ধর্ষণের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে,
আর সেই আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাই হয় নুসরাতের জীবন,
ক্রমাগত ধর্ষিত হতে থাকে আমাদের বিবেক আর মনুষ্যত্ববোধ ,
যখন আমার মা- বোনের আর্ত চীৎকারে ভারি হয়ে ওঠে বাংলার আকাশ,
তখন কলমটার ওজন মনে হয় কয়েক’শ মণ
তাই কবিতা লিখবার শক্তি পাইনা আর।
আমায় ক্ষমা কর, প্রেয়সী আমার।
হয়তো অন্য কোনো দিন, অন্য কোন ক্ষণে
রক্ষা করব আবদার তোমার। ।
আর তখন
একটা দারুণ প্রেমের কবিতা লিখব
তোমার জন্যে -শুধুই তোমার জন্যে।