পৃথিবীটা এক বন্দি গ্রহের মতো হয়ে গেছে। ভয়ানক অন্ধকার ঘনিয়েছে অষ্টপ্রহরের জীবনে।
এপ্রিলের ১০ তারিখ। রাত ১০টা বাজে এখন। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়ার মিশনপাড়া এলাকার হাওলাদার ট্রেডার্সের সামনে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিকশাওয়ালা হাশেম। মুখে মাস্ক পরে আছে সে। পাতলা কাপড়ের কালো রঙের এই মাস্কটার দাম ১০ টাকা। ২০ টাকা দিয়ে ১০ দিন আগে দুইটা মাস্ক কিনেছিলো হাশেম। একটা মাস্ক সে ৩-৪ দিন করে পরে। তারপর সেটা ধুয়ে দিয়ে অন্যটা পরে। এইভাবে দুইটা মাস্ক পাল্টাপাল্টি করে পরে দিন কাটছে হাশেমের।
হাশেম দাঁড়িয়ে আছে। রাতের নীরব রাস্তা। আরও কয়েকটা রিকশা আছে কাছাকাছি। এরমধ্যে একটা রিকশা সামনে দিয়ে চলে গেলো। আর তখনই হাশেম দেখলো, একটা লোক এগিয়ে আসছে তার দিকে।
লোকটা একা নয়। তার সাথে তার বউ আর একটা ছোটো মেয়ে। এরা সবাই মাস্ক পরে আছে। পুরুষ মানুষ আর মহিলার সাথে ছোটো মেয়েটাও হাঁটছে আস্তে আস্তে। লোকটার দুই কাঁধে বিশাল বিশাল দুইটা ব্যাগ। বউ আর বাচ্চা নিয়ে লোকটা জোরে হাঁটতে পারছে না। তাছাড়া বিশালকার দুইটা ব্যাগ নিয়ে জোরে হাঁটার হিম্মত এখনকার খুব কম পুরুষেরই আছে।
হাশেম তাকিয়ে দেখছিলো ওদের হেঁটে আসা। ওরা হাঁটতে হাঁটতে রিকশার কাছে এসে দাঁড়ায়। কোনো কথা বলে না। বোধ হয় হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেছে।
কই যাবেন? হাশেম জিজ্ঞেস করে লোকটাকে।
লোকটা বলে, লঞ্চঘাটে। যাইবা?
কোন লঞ্চঘাট?
পোর্টের ঘাটে।
হুম, যাবো। উডেন।
কতো ভাড়া?
৩০ টাকা দিবেন।
লোকটা কী বলবে ভাবতে ভাবতে, বউটা বললো, ডাবল ভাড়া চাইতাছেন কেন?
ডাবল কই চাইলাম? রাইতের বেলা। আর লগডাউনে প্যাসেঞ্জার কম। দুইডা টাহা বেশি না পাইলে চলবো কেমনে ভাই?
২৫ টাকা দিবো। লোকটা বললো।
বউটা তার কথা কেড়ে নিয়ে মাস্কের ভেতর থেকে বললো, ২০ টাকা দিমু। কিসের ২৫ টাকা।
এই হলো কিছু মেয়েদের স্বভাব। এরা কন্ট্রাক্ট হওয়ার পরও জিনিসের দাম কমাতে বলে। এইরকম অসৌজন্যতায় পুরুষদের জড়তা কাজ করলেও, মেয়েদের করে না।
ওরা উঠে বসে রিকশায়। রিকশা চালাতে থাকে হাশেম। মিশনপাড়ার রাস্তা থেকে বের হয়ে চাষাড়া মোড়ের দিকে না গিয়ে বিপরীত পাশের এইচ কে ব্যানার্জি রোডে ঢুকে রিকশা। বড় রাস্তা পার হয়ে ছোটো রাস্তায় ঢুকে যাওয়াটাই নিরাপদ। বড় রাস্তায় এখন আর খুব একটা চলে না রিকশা। পুলিশ ধরলে প্যাসেঞ্জার নামায়া দেয়। ভাড়াও আর পাওয়া যায় না। দিনের বেলায় বড় রাস্তার মতো এই এলাকার গলিগুলোও একরকম খালিই থাকে। লকডাউনের জন্য কোনো যানবাহন চলাচল করে না। নারায়ণগঞ্জ হচ্ছে এখন দেশের সবচেয়ে করোনা ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটা এলাকার মধ্যে একটা।
ওদেরকে লঞ্চঘাটে নামিয়ে দিয়ে হাশেম দাঁড়িয়ে আছে প্যাসেঞ্জারের আশায়। কিন্তু সহজে প্যাসেঞ্জার পাওয়া যায় না। অনেক রিকশা এখানে। সবাই এখানে এনে প্যাসেঞ্জার নামিয়েছে। নতুন প্যাসেঞ্জারের জন্যও দাঁড়িয়ে আছে সবাই।
এই লঞ্চঘাটে এখন শুধু মানুষ আসছে। এখান থেকে অন্য কোথাও যাওয়ার প্যাসেঞ্জার পাওয়া খুব কঠিন। এখানে কেউ আর আসে না এখন। নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে মানুষ পালাচ্ছে করোনার ভয়ে। অদৃশ্য একটা ভূত তাড়া করছে সবাইকে।
আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ভাগ্যগুণে দুইজন প্যাসেঞ্জার পায় হাশেম। তারা টানবাজার যাবে। প্যাসেঞ্জার নিয়ে টানবাজারের দিকে এগুতে থাকে সে। একসময় নিমতলা এলাকায় পৌঁছে যায়। প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দিয়ে গলির ভেতরেই দাঁড়িয়ে থাকে সে। মেইন রাস্তার দিকে গিয়ে দাঁড়ালে আবার পুলিশ ধরার আশঙ্কা আছে।
কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর হঠাৎ একটা ব্রিফকেস ট্রলি টানতে টানতে দ্রুত হেঁটে আসতে দেখে একটা ছেলেকে। সাথে একটা মেয়ে। এরা দুইজন সাদা রঙের দামি কেএন ৯৫ মাস্ক পরা। মেয়েটার হাতে একটা ছোটো ব্যাগ। মেয়েটাও ছেলেটার সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে এক মতো দৌঁড়ে আসছে। ছেলেটা দ্রুত এসে রিকশায় উঠে বসলো কিছু না জিজ্ঞেস করে। ব্রিফকেসটা তুলে রাখলো রিকশার পা রাখার জায়গায়। তারপর মেয়েটার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে মেয়েটার হাত ধরে রিকশায় তুলতে তুলতে রিকশাওয়ালাকে বললো, লঞ্চঘাট যাও। তাড়াতাড়ি যাও।
হাশেম জিজ্ঞেস করলো, কোন লঞ্চঘাট?
ছেলেটা রেগে গিয়ে বললো, কোন লঞ্চঘাট মানে? পোর্টের লঞ্চঘাটে।
হাশেম বলতে চাইছিলো, কোন লঞ্চঘাট তা না কইলে যাইমু কেমনে? কিন্তু ছেলেটার ধমক শুনে আর তা বলার সাহস হয় না ওর। শুধু ছোটো করে বলে, আচ্ছা যাইতাছি ভাই।
এদের প্রচণ্ড তাড়া। সম্ভবত ওদের কেউ তাড়া করছে।
দেখা না গেলেও এখানে সবাইকে তাড়া করছে একটা অদৃশ্য আতঙ্ক।
লঞ্চঘাটের রাস্তায় ঢুকতে গিয়ে দেখা গেলো, রাস্তায় সুদীর্ঘ রিকশার সারি। একরকম জ্যামই লেগে গেছে বলা যায়।
নারায়ণগঞ্জ শহর এলাকার একটা বস্তিতে থাকে হাশেম। টিনের চালা ঘর। সাথে একটা কলপাড় ও টয়লেট আছে। আর রান্না করার জন্য ঘরের ভেতরেই একটা চুলা রাখার জায়গা আছে। তার বউ ও বাচ্চাও থাকে তার সাথে। সারারাত রিকশা চালিয়ে ভোর ৬টায় বস্তির ঘরে যায় হাশেম। রাত ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত ৮টা খেপের ভাড়া পেয়েছে ১৮০টাকা। তারপর রাত ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত মাত্র ৫টা খেপ পেয়েছে। সব মিলিয়ে আজকে সারারাতে মাত্র ২৫০টাকা পেয়েছে। গতকালও এরকম হয়েছিলো। কিন্তু তার আগের ৪-৫ দিন মাত্র ১০০টাকা করে ইনকাম হয়েছিলো। রিকশাটা ওর নিজের হওয়ায় রক্ষা হয়েছে। তা না হলে তো অর্ধেক টাকা গ্যারেজ মালিককে দিয়ে দিতে হতো।
সকাল হয়। ভাড়া নিতে আসে বস্তির ঘরের মালিকের লোকজন। প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে ভাড়া দিতে হয় তাদের। আজকে ১০ তারিখ হয়ে গেছে। তাছাড়া ভাড়া না দিলে হাতে যে টাকা আছে তা শেষ হয়ে গেলে তখন আবার টাকা জোগাড় করা যাবে না। কাঠের ছোটো সিন্দুকটা খুলে সে টাকা রাখার বাক্সটা বের করে। সেখানে মাত্র ৫ হাজার টাকা আছে। ২টা ১ হাজার টাকার নোট আর ৪টা ৫০০ টাকার নোট। আর বাকি টাকাগুলো ৫০ টাকা আর ১০০ টাকার নোট। টাকাগুলোর মধ্য থেকে ২টা ১ হাজার টাকা, ১টা ৫০০ আর ১টা ১০০ টাকার নোট মিলিয়ে ২ হাজার ৬০০ টাকা ঘর ভাড়া দিলো হাশেম। তার হাতে এখন আর ২ হাজার ৪০০ টাকা আছে। মাসের বাকি দিনগুলো রিকশা চালিয়ে দিনে ১৫০ টাকার বেশি ভাড়া পাওয়ার সম্ভবনা নাই। তাতে তো তাদের ৩ জন মানুষের দৈনিক খাওয়ার খরচ চালানোই মুশকিল। খাওয়ার খরচ চালিয়েই সব টাকা যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে পরের মাসে ঘরভাড়া দিবে কী করে? তাছাড়াও তো আরও খরচ আছে। বড় ছেলেটাকে রেখে এসেছে গ্রামের বাড়িতে। দাদা-দাদির কাছে থাকে। তাদেরকেও এই মাসে টাকা পাঠানো হয়নাই এখনো।
বউ একটা বাসায় দিনে একবেলা বুয়ার কাজ করতো। কিন্তু করোনার জন্য এখন কেউ আর কাজের মেয়ে রাখে না। বিদায় করে দিয়েছে।
এপ্রিলের ২১ তারিখ। হাশেমের হাতের জমানো টাকা কমতে কমতে একেবারে শেষ হয়ে গেলো আজ। লকডাউন আবার কড়াকড়িভাবে হচ্ছে। সারাদিন বা সারারাত রিকশা বেয়ে দেড়শ টাকাও ভাড়া পাওয়া যায় না এখন আর।
বাজার করা হয় না বেশ কয়েকদিন ধরে। শুধু চাল, আলু আর লবণ কিনে আনে সে। পেঁয়াজের দাম বাড়ছে অনেক। কাঁচামরিচ বা তেলও আর কিনতে ইচ্ছা করে না। ইচ্ছাকে দমন করাই তো ভালো। কারণ তেল ও মরিচের দামও তো ভালোই।
তরকারি রান্না হয়নাই আজকে। ভাতের মধ্যে আলু দেওয়া হয়েছে। তারপর সিদ্ধ আলু শুধু লবণ দিয়ে তেল ও মরিচ ছাড়া আলুভর্তা করে তাই খেতে বসে ওরা। নিজেরা আলু ও লবণ দিয়ে ভাত খেলেও শিশু বাচ্চা মেয়েটা ভাত খেতে চায় না। দুয়েকবার মুখে নিয়ে একটু পানি খায়। তারপর বলে, খামু না। ঘুমাইমু।
খাওয়া শেষ করে বস্তির ঘরটার সামনে মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাশেম। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে না। কেমনে ঘুমাবে? খাওয়া দাওয়া ভালো হচ্ছে না। আড়াই বছরের শিশু তো আর শুধু মায়ের বুকের দুধের ওপর ভরসা করে বাঁচতে পারে না। কিন্তু কী খাওয়াবে বাচ্চাকে? হঠাৎ করে শুধু লবণ দিয়ে করা আলুভর্তা দিয়ে ভাত খেতে চায় না বাচ্চা মেয়েটা। এটা ওটা খেতে চায়। সে আগে দুয়েকটা ফল বা বিস্কুট আনতো ওর জন্য। কিন্তু এখন তো সেটা সম্ভব নয়। ক্ষুধার্ত মেয়েকে কাঁধে নিয়ে পিঠে থাবা দিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে হাশেম।
রাতের পৃথিবীটা খুব করুণ হয়ে আসে। আজকে দিনের বেলা রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলো হাশেম। রাত ৯টার সময় ঘরে ফিরে এসেছে। এখন রাত সাড়ে ১০টা বাজে। ঘুম আসে খুব তার। কিন্তু মেয়েটা তো ঘুমাচ্ছে না। বউ থালাবাসন ধুয়ে শেষ করেছে। ও বুঝতে পারে, মায়ের বুকের দুধ না পেলে ঘুমাবে না বাচ্চাটা। তাই মেয়েকে মায়ের কাছে দিয়ে সেও শুয়ে পড়ে। আর কতো? অনেক পরিশ্রম, বিফল পরিশ্রম আর দরিদ্রের খাওয়া এসবের পর ঘুমটা তো অন্তত ভালো হওয়া দরকার। কয়েকদিন পর হয়তো অনাহারে ঘুমও আসবে না।
সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে হাশেম। পান্তা ভাত লবণ দিয়ে খেয়ে বের হয় রিকশা নিয়ে। চাষাড়ার মোড়ের কাছে একটা গলিতে এসে দাঁড়ায় রিকশা নিয়ে।
আরেকজন বুড়ো রিকশাওয়ালা আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো। হাশেম তাকে বলে, কী খবর চাচা মিয়া?
বুড়ো রিকশাওয়ালা নিম্নস্বরে বলে, হ্যাঁ…
সম্ভবত হাশেমের কথা শুনতে পায়নাই। সে আবার আরও উচ্চস্বরে বলে, জিগাইতাছি কেমন আছেন চাচা?
আর কেমন থাকবো? বুড়ো রিকশাওয়ালা এবার উত্তর দেয়। তার উত্তরে আর গলার স্বরে একটা হতাশার স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। সে বলে, কীভাবে যে দিন যাইতাছে বুঝি না। একটা দিনও পেট ভরে খাইতে পারি না।
জমানো টাকা ছিলো না কিছু হাতে?
আমার হাতে তো জমানো টাহা কখনোই ছিলো না রে বাবা।
টাকা জমাননাই?
নারে বাবা। আমি তো বেশি ভাড়া টানতাম ফারি না।
রিকশা নিজের?
না বাবা। মালিকের রিকশা।
তাইলে কম ভাড়া টাইনা জমার টাকা দেইন কেমনে?
মালিক আমার আত্মীয়। এরজন্যে দৈনিক জমা কম।
ও আচ্ছা। এরজন্যে বাইচা গেছেন। ঘর ভাড়া কতো দেইন?
ঘর ভাড়া দেওন লাগে না আমার।
থাকেন কই আফনে?
আমার গেরামে থাকি। নদীর অইপাড়ে। রাইতে চইলা যাই বাড়িতে।
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ বুড়ো রিকশাওয়ালার সাথে কথা হয় হাশেমের। সে নিজের কথা বলে, আমারও একই অবস্থা চাচা। দিনে যা ভাড়া পাই তা চাউল আর আলু কিনতেই শেষ হইয়া যায়।
হাশেম দাঁড়িয়ে থাকে রিকশা নিয়ে। দরিদ্র রাতের করুণ পৃথিবী ঘুমায় অপরিমাণ যন্ত্রণা নিয়ে।