জীবনের চিত্ত-বৈভবের কিছু সুবর্ণ রেখা উপলদ্ধির নার্ভে কখনো কখনো ঝিলিক দিয়ে ওঠে আতাহারের। মনোরাজ্যের সূক্ষ্মতি সূক্ষ¥ অনুভূতিগুলি তার তৈরি হয়ে আছে অসংখ্য চিত্ত-বিত্তের সমাহারে। পদ্মসুশোভিত জলাশয়টির তীর ছুঁয়ে সুনসান দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ গালিচার এ স্থানটির সাথে তার পরিচয়ের দীর্ঘসূত্রতা বাঁধা পড়ে আছে কালের নিপুণ অভিক্ষেপে। কেমন যেন অন্তরের নিবিড় টান। শিরা-ধমনীর সুতোয় বাঁধা প্রচ্ছন্ন এক বন্ধন। এখানকার সবুজ গাছ-গাছালি, তরুলতা, রং-বেরংয়ের পাখ-পাখালি, সবকিছু তার আতœার আতœীয়, প্রাণপ্রতীম বন্ধুর মতো।
শীত শেষ হয়েছে। জলাশয়টির তটরেখা ধরে জেগে থাকা বৃক্ষরাজীতে শুরু হয়েছে নতুন রংয়ের মহড়া। ফাগুনের আহবানে পত্র-পুষ্পে সেজেছে চারিদিক। সুসজ্জিত ফুলগুলি নব বধূর রূপ ধারণ করে বসন্ত রাগে অনুরাগে মঞ্জুরিত হয়ে, চন্দন গন্ধে আমোদিত করে তুলেছে বিশ্বকুঞ্জ। শীতের ঝরাপাতার মর্মর ধ্বনি শেষ হয়েছে। বিচিত্র পাখ-পাখালির কোলাহল-কিচির-মিচিরে উৎসব মুখর হয়ে উঠেছে এ কুঞ্জবনটি। অদূরে পল্লীবাল্লার হাতেন কাকনের মতো ছোট্ট নদী। কখনো কখনো কাকনপ্রতীম এ নদীর কূল জুড়ে ঢেউ, বুক ভরা উচ্ছাস থাকলেও সোনাঝরা এই বিকেলে নেই তাতে তরঙ্গের সামান্যতম উছৃঙ্খলা। অস্তগামী রবির নিভে যাওয়া রোদের নরম ছোঁয়া লেগে লাজুকরাঙা কূল বধূটি হয়ে উঠেছে শান্তশ্রী এ নদীটি। জলাশয়ের ওপারের কদম গাছটি থেকে বাতাসে ভর করে ভেসে আসছে এক আশ্চর্য রকমের কোকিলের ডাক। দূরে কেয়া আর নিশিন্দাবন সবুজকে করেছে আরো সবুজ।
কত উজ্জল প্রভাত, রোদেলা দুপুর, আর চৈতালী হাওয়ায় হাওয়ায় রোমাঞ্চিত বিকেল তিতাস অদূরের এই জলাশয়টির তীরে সবুজ গালিচার উপর বসে তার লোপাকে সাথে নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে আতাহার। চোখে হাজারো জিজ্ঞাসার কাজল পড়ে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থেকেছে প্রাকৃতিক এ বলয়ের মাঝে লোপার মুখপানে। কিন্তু আজ চারদিকের লকডাউনের এ নিশ্চিদ্র বলয় ভেদ করে আসতেই তো তার দেরী হয়েছে সামান্য। লতিফুর নাহার লোপাকেও সে দেখছে না আশে পাশে কোথাও। কিছুটা নিভে গেলেও দিগন্ত রেখার শ্যামল প্রান্ত থেকে একেবারে মুছে যায়নি বিকেলের সোনাগলা রং। বরং এর পোচ্ছময় একটি রেখা সেই কাকনপ্রতীম নদীর তরঙ্গের সাথে কাত হয়ে মিশে যেন ঢেলে দিতে থাকলো রঙিন আলোর বিচ্ছুরণ নয় তাজা গলিত রক্তের ভিবমিশা। সমগ্র তিতাসের জল সদ্য জবাইকৃত পশুর রক্তের বিভৎস-কদাকার রং ধারণ করলো। চিটচিটে কালো আবরণ গায়ে মেখে গাঢ় তরল বিভিশিকাময় রক্তনদী ভলকে ভলকে এসে প্রবেশ করতে লাগল সংযুক্ত জলাশয়টিতেও। জলচর পাখিগুলিও কর্কশ কন্ঠে সকরুণ চিৎকার করতে করতে উড়ে গিয়ে নিস্তদ্ধ হয়ে গেল। একি ভংঙ্কর-বিভৎস রূপ ধারণ করেছে আজ তার প্রিয় তিতাস! শৈল সুষমায় ভরপুর শ্যামল প্রকৃতি! চারপাশে যে কেউ নেই তা-ও খেয়াল করার ফুসরত পাচ্ছে না আতাহার।
মুহূর্তের মধ্যে গাব ভেজানো পানির মতো তরল কৃষ্ণকায় বিষাদমাখা একটা অন্ধকার নেমে এলো আতাহারের দৃষ্টিসীমায়। এরপর অন্ধকারটি বিস্তৃত হতে হতে পরিণত হতে থাকলো পৃধিবীর মতো বলশালী দৈত্যাকৃতির একটি ভয়ঙ্কর শকুনে। যার বিকশিত-ভয়াল থাবার নিচে তখন আতাহারের ক্ষুদ্র এ দেহখানা। আর এর কুৎসিৎ-কদাকার ধারালো নখযুক্ত পা দুটি ঝুলে রইল তার চোখের সামনে। চিৎকার করতে গিয়ে বুঝতে পারল তার শ্বাসনালিতে চেপে ধরে রেখেছে অস্পষ্ট অথচ আজরাইলের হাতের মতো কাঁটাযুক্ত বলশালী দুটি হাত। নড়তে গিয়ে অনুভব করলো সারা দেহ প্যারালাইসিস করে দেওয়া হয়েছে অচেনা কোন জীবণু অস্ত্র ছড়িয়ে দিয়ে। আর উৎকর্ণ হয়ে যখন কোন কিছু শোনার চেষ্টা করল তখন কেবল সদ্য জবাইকৃত শত শত পশুর একসাথে দম বের হওয়ার সময়কার গুঁ-থ গুঁ-থ গু-রু-র গু-র শব্দগুলি এসে তার কানের ভেতর ঢুকে কর্কশ কোরাসে চিৎকার করতে থাকল। ভয়মিশ্রিত নির্লিপ্ত চোখে আতাহার দেখতে পেল তার পিছনে সবুজের উপর শত শত পশু নয়, মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের কাটা গলা দিয়ে গুঁ-থ গুঁ-থ গু-রু-র গু-র শব্দ করে ভলকে ভলকে বের হচ্ছে ছোপ ছোপ গাঢ় লালের উপর চিটচিটে কালো-কদাকার রক্তের ধারা। আর সেগুলি সবুজের উপর নালা সৃষ্টি করে গিয়ে মিশে যাচ্ছে ক্ষণকাল আগে রক্তাশয়ে পরিণত হওয়া সামনের জলাশয়টিতে। এমন একটিমাত্র ধারা দেখেছিল আতাহার উদয়পুরে। দেবী ভুবেনশ^রী মন্দির হতে ধারাটি মিশেছিল গোমতী নদীর জলে। যেখানে প্রতি চর্তুদশপদি রাতে হতো নরবলী।
আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে বলে গলাফাটিয়ে চিৎকার করে, পা দুটিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে উঠে পরে দিগি¦দিক দৌঁড়াতে লাগল আতাহার। তার পা দুটিতে তখনো শারাসির মতো পেছিয়ে ঝুলে আছে বিকটাকৃতির এক আজদাহ সাপ। দিগন্ত হতে ছুটে এলো গরম বাতাসের গর্জন। গ্যাস চেম্বার বিস্ফোরণের পর টগবগে জলন্ত সে বাতাস। আতাহারের সর্বাঙ্গে ফুসকুরি ফুটতে লাগলো। ছুটতে ছুটতে তার কন্ঠ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। একটু পানি, সামান্য একটু জল। কেউ কি আছো কোথাও, আমাকে সামান্য একটু জল পান করাবে? তেষ্টায় আমার বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে।
এত উতলা হচ্ছো কেন বন্ধু, জল তুমি কোথায় পাবে! জাননা তোমাদের পুরো পৃথিবীজুড়ে চলছে লকডাউন।
কে! কে! কথা বলছো? আমাকে ভয় দেখাচ্ছো কেন? ভয়ার্ত কাতর কন্ঠে অথচ চিৎকার করে উচ্চারণ করল আতাহার।
ভয় তোমাকে আমি দেখাচ্ছি না বন্ধু। ভয় পেয়ে তোমাদের আর কাজ নেই। কাঁধের উপর হাত রাখল ডাইনোসরের মতো বিকৃত-কুৎসিত-কদাকার বিভীষিকাময় প্রাণিটি। ভয়ঙ্কর পিরানহা মাছের মতো ধারালো আর সুচালো বিকৃত দাঁতের দুই পাটি উম্মুক্ত করে লম্বা জিহবাটিকে উল্টিয়ে নাকের কাছে নিয়ে খসখসে নাকি গলায় বলল, পানি তুমি পাবে না।
পানি পাব না! তেষ্টায় আমার বুকের ভেতর আগুন জ¦লছে। আমার তিতাস! মায়াবী সেই ছোট্ট নদী। এর স্বচ্ছ টলমলে সুপেয় জল! সুনীল আকাশের নীচে সবুজ প্রকৃতির পাশে তিতাসের জল যাবে কোথায়? আমার শ্যামল প্রকৃতি, ফুল-ফল, পাখির কুজন, বাতাসের গুঞ্জরণ, উন্মুক্ত দিগন্ত এসব কি শেষ হয়ে যাবে!
নৃশংস ক্রর হাসি হেসে বলতে থাকে আজব সেই প্রাণিটি- তোমাদের তিতাস এখন আর তিতাস নয়। তোমাদের সমুদ্র ও নদীগুলি ইতোমধ্যেই ভরে উঠেছে বিষাক্ত বজ্যে। বাতাসে কার্বনডাইক্্রাাইড ও শীশা। সুনীল আকাশে আকাশে জীবাণু অস্ত্র। তোমাদের পুরো এ পৃথিবীটাকে লকডাউন করা হয়েছে। সুবজও পুড়ে ছাই হয়ে যাবে ক্রমশ। ঘুমন্ত সব আগ্নেয়গিরি সচল হবে। উত্তপ্ত লাভার আস্তরণে ঢেকে যাবে তোমাদের এ সাধের পৃথিবী। তোমাদের দিন শেষ। তোমরা এবার বিদেয় নিবে। তোমাদের এ পৃথিবীতে এখন বাস করবো আমরা। বলে বত্রিশ পাটি বিকৃত-ভয়ঙ্কর দাঁত উন্মুচন করে আবারও ন্যাক্কারজনকভাবে ক্রুর হাসি হাসতে থাকে সেই প্রাণিটি।
বন্ধ কর তোমার নৃশংস-ক্রুর হাসি। তোমার এ বিকৃত-বিভৎস-কদাকার চেহারা আর আমি দেখতে পারতেছি না। তোমার কোন কথা আমি বিশ^াস করি না। বল তুমি কে? কেন আমাকে এমন ভয় দেখাচ্ছ-কষ্ট দিচ্ছ?
আমি তোমাকে ভয় দেখাচ্ছি না বন্ধু। আমি তোমার পর কেহ নয়। আমি যে তোমারই প্রতিরূপ-পেতাত্মা। বলে আস্তে আস্তে আজব সেই প্রাণিটি তার কদাকার বিকৃত চেহারাটায় পরিবর্তন আনতে শুরু করল। যদিও সম্পূর্ণ মনুষ্যাকৃতি তখনও তার মধ্যে দেখা গেল না। তবে চারপাশের গরম বাতাসের ঝড় কিছুটা কমে এলো। বিভীষিকাময় অন্ধকারটাও নেই। শুকিয়ে যাওয়া কন্ঠের তৃষ্ণাটাও ততটা প্রকট মনে হলো না। দেখতে দেখতে আজব প্রাণিটার অস্পষ্টতা কমে মনুষ্যকৃতি না হলেও মানুষের কার্বন কপিতে রূপান্তরিত হলো। প্রেতাতœাদের প্রকৃত কোন রূপ আতাহার কোন দিন দেখে নি। তাই কিঞ্চিত বিকৃত তার পাশের কালো এ আজব প্রাণিটাকে তার প্রেতাত্মা ধরে নিলো। সাহস সঞ্চয় করে অসহ্য অসহায় কন্ঠে বলল, তুমি আমাকে বন্ধু বন্ধু বলে সম্বোধন করছো। অথচ আমাকে প্রচন্ড রকম ভয় দেখাচ্ছো। তোমাদের মতো প্রেতাত্মারা কি ভয় দেখানো ছাড়া আর কোন কিছু করতে পার না?
ততক্ষণে কষ্টের সকরুণ হাসি হেসে উঠল প্রেতত্মাটি। হেসে বলল, এতক্ষণে একটি সত্য বাণী প্রক্ষেপণ করলে বন্ধু। তোমরা মানুষ। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। ভয়কে জয় করার সাহস এবং ক্ষমতা একমাত্র তোমরাই রাখ। তোমার সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমরা জয় করতে জানি না। আমরা কেবল ভয় দেখাতে জানি। ¯্রষ্টার সৃষ্টিকে তোমরা সম্পূর্ণ জয় করতে না পারলেও ইতোমধ্যেই অনেক কিছ্ইু তোমরা জয় করে নিয়েছো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তোমাদের সীমাবদ্ধতা এখন প্রকট। কোন নিকটতম বন্ধুর মতোই কথা বলতে শুরু করেছে প্রেতাত্মাটি। কিছুক্ষণ আগের ভয়ঙ্কর-বিভৎস অসহ্যকর পরিবেশটা এখন কিছুটা শান্ত হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিক রাতের পরিবেশে পরিণত হয়েছে চারপাশটা। কিন্তু কোন কোন সমস্যা নিয়ে তোমাদের মনুষ্য সমাজে এখনও এত কুসংস্কার ও অলৌকি ভাবনা কেন তা-কি বলতে পার আমার সাহসী বন্ধু?
অলৌকিক ভাব মানুষের মাঝে সর্বদাই বিরাজমান ছিল। সৃষ্টির প্রথম দিককার মানুষের অপরিণত মস্তিস্ক যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগগত কোন সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হতো, তখন তারা অলৌকিক ধ্যান-ধারনার আশ্রয় গ্রহণ করতো। কালক্রমে মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টি-ভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। অজানাকে জেনেছে। মানুষ অনেক কিছুকেই জয় করেছে। যেমন-আগের মানুষ রাতের মাঠে মিথেন গ্যাসের আগুনকে তোমাদের মতো প্রেতাত্মা বা ভূতের আলো মনে করে ভয় পেত। ডায়রিয়া-কলেরা ও হাম-বসন্তকে ওলা বিবি ও শীতলা দেবীর কর্মকান্ড মনে করত। এখন এ ডিজিট্যাল যুগের মানুষ আর সেই পর্যায়ে নেই। তবে স্রষ্টার সৃষ্টির বিশাল রহস্যের সবটুকু জ্ঞানার্জন করা তো তার সৃষ্টির পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কিছু কিছু জটিল সমস্যার সমাধান এখনো মানুষের দোরগোড়ায় আসেনি। তথাপি সমস্যার সমাধান তো জ্ঞানের ভিত্তিতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির পথেই করতে হবে।
প্রেতাত্মাটির সাথে আতাহার কথা বলে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু খুবই অপরিচিত বলে মনে হলো স্থানটিকে। গরম বাতাসযুক্ত ঝড়ের কবলে পড়ে কোথা থেকে উড়ে কোথায় এসে পড়েছে সে কথা তো এখনও জানে না আতাহার। তাই নিজের পরিচিত পরিবেশ খোঁজে পাওয়ার জন্য অসহায়-চঞ্চল হয়ে উঠলো সে।
উদ্বিগ্নতার উত্তাপ ছড়িয়ে কোন লাভ নেই বন্ধু। তুমি তোমার নিজস্ব পরিবেশে ফিরে যেতে চায়ছো, একথা আমি প্রেতাত্মা বলেই বুঝতে পারি। কিন্তু যেতে তো তুমি পারবে না। আমি আগেই বলেছি। তোমাদের পুরো পৃথিবীজুড়ে চলছে লকডাউন। কোথাও গিয়ে তুমি শান্তি খোঁজে পাবে না। তবে শুনো রাখ, ভয়ে যদি তোমার হৃদকম্পনে কোন সমস্যার সৃষ্টি না করতে পাড়ে তাহলে তুমি হয়তো কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়ার মতো আরো অনেক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে কিন্তু তা-ও তুমি জয় করতে পারবে। আমি তো একটু আগেই তোমায় বলেছি যে, আমরা কেবল তোমাদের ভয় দেখাতে পারি। আর তোমরা তা জয় করতে জানো।
অবশ্যই জানি। কন্ঠে অসহ্যের ক্ষিপ্রতা এনে বলল আতাহার। তোমার আর আমাকে ভয় দেখিয়ে কাজ নেই। তুমি দেখে নিও। বর্তমান বিশে^র যে চলমান সমস্যা-করোনা ভাইরাসের মহামারী রূপের প্রকোপ স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞানকে কাজিয়ে লাগিয়ে খুব শিঘ্রই আমাদের বিজ্ঞান জয় করে নিবে ইনশাআল্লাহ। আতাহারের ইনশাআল্লাহ শব্দটি উচ্চারণের সময় দেখা গেলো মানুষরূপী পেতাত্মাটি কিছুটা দূরে সরে গিয়ে একটু স্থান করে দিলো। কিন্তু হাল ছাড়লো না। বলল, বন্ধু তোমরা জয় করবে জানি। কিন্তু তার আগে তোমাদের খেসারতও কম দিতে হবে না। আমি চাইলেই তোমাকে এখন ছেড়ে দিতে পারি না। তোমার সাথে আমার খেলা যে সবেমাত্র শুরু। এ খেলায় তুমি সুন্দরের পিছনে হাতড়ে হাতড়ে ক্লান্ত হবে আর আমি তোমার সুন্দরগুলোকে কুৎসিৎ ও উগ্র-উৎকট দুর্গন্ধতার মোড়কে ঢেকে দিতে দিতে বিকৃত আনন্দের বন্যায় ভাসতে থাকব। বলে ক্রোদ্ধ হাসি হাসতে হাসতে প্রেতাত্মাটি আস্তে আস্তে নিজেকে পরিবর্তন করতে লাগল। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ওর অন্ধকার চেহারাটা ঘন কালো মেঘের মতো ছড়িয়ে পড়তে পড়তে ধারালো ও সুচালো নখ এবং বিশাল ডানাযুক্ত পৃথিবীর মতো বলশালী বিভৎস এক লম্বা গলার শকুনে পরিণত হলো।
আতাহার আলীর স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসতে লাগলো। তার চোখের সামনে নেমে এলো গাঢ়-কুৎসিৎ- কদাকার অন্ধকার। মনে হলো সে যেন তার মাঝে নেই। সহসা আচড়ে পড়ল আতাহার। ভ্রুকুটি হলো যে, একটা অপরিচিত জায়গা থেকে আরেকটা অপরিচিত জায়গায় ছিটকে এসে পড়েছে আতাহার। চারদিকে চোখ ঘোরাল, কোন কিছু চেনা যায় কি না বুঝতে চেষ্টা করল। দেখল কদাকার-বিভৎস শকুনটির জমাটবাঁধা ঘন মেঘের মতো কালো পাখা দুটি ঝঞ্জা-বিক্ষুদ্ধ রাতের আকাশে দিগন্তের সাথে মিশেতে মিশতে কিছুটা হালকা হয়ে গেল। আর তার কার্বন কপি প্রেতাত্মাটাকেও সে দেখতে পেল। প্রেতাত্মাটির চোখ দু‘টিতে আগুন জ¦লছে। শয়তানের চোখের মতো। তার কালো শরীরের আকৃতিটা ঠাহর করতে পারলেও কেবল আগুন দু‘টিই দৃশ্যমান হচ্ছিল। আতাহার পেতাত্মাটির উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল, তুমি এখান থেকে চলে যাও। তোমার পরিবর্তনশীল ভয়ঙ্কর সব রূপ আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
আমার তো কোন রূপ নেই বন্ধু। আমি প্রেতাত্মা। প্রেতাত্মাদের কোন স্বাভাবিক-সাধারণ রূপ থাকে না। পেতাত্মাদের কাজ চলে যাওয়া না। বরং বেঁচে থাকা মানুষের চারপাশে ঘুরঘুর করে ঘোরা। আর আমি যে তোমারই আত্মার এক কুৎসিৎ রূপ। তুমি দু‘চোখে সব সৌন্দর্য দেখ। পৃথিবীর সব সুষমামন্ডিত স্থান স্ব-শরীরে কিংবা কল্পনার মাধ্যমে তুমি ঘুরে বেড়াও। সেটা আমি সহ্য করতে পারি না। কারণ আমি কদাকার-কুৎসিৎ। সৌন্দর্য আমার দ‘চোখে সহ্য হয় না। কিন্তু এখানে, এ অপরিচিত স্থানে, এ অসময়ে তোমাকে আমি ফেলে যেতেও পারি না বন্ধু। তুমি চোখ খুলে দেখ, চারদিকে কত জমাটবাঁধা ঘন অন্ধকার। তুমি কিছুই দেখতে পাবে না। বলে আবার দাঁত কেলিয়ে ক্রোদ্ধ হাসি হাসতে থাকে প্রেতাত্মাটি।
তোমার এ পাশবিক ও হিংস্র হাসি বন্ধ কর। আমি তোমার সাথে আর এক মুহূর্তও অবস্থান করতে চাই না। তোমার শরীরের উৎকট দুর্গন্ধ আমার দম বন্ধ করে দিচ্ছে। আমি আমার পরিচিত পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে চাই, ফিরে যেতে চাই আমার আপনজনদের কাছে। আমার লোপার কাছে। শেষ বাক্যটি মুখ দিয়ে বক্তব্যের ধাক্কায় প্রকাশিত হয়ে পরায় সেই বিকৃত চেহারার প্রেতাত্মাটির কাছেও যেন সামান্য লজ্জা পায় আতাহার। নিজকে সামলে নিয়ে বলে, তুমি এখন দূর হও। আমার চোখে সৌন্দর্য নেমে আসুক। আমি এখন সৌন্দর্যের ময়ূরপঙ্খিতে চড়ে আমার পৃথিবী দেখতে চাই। প্রাণপণ চেষ্টায় আতাহার দেখতে চেষ্টা করল, এ নতুন স্থানটিতো নতুন না। তার দেখা পরিচিত সে স্থান। সে যেন স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে বেড়াতে এসেছে এ স্থানে। কালই রওয়ানা দিয়েছিল।
নাফের বুকে ভাসিয়েছিলো ‘কেয়ারী সিন্দাবাদ’। নীচে নাফের জল, বামে দিগন্ত জোড়া আরাকানের পাহাড়, ডানে টেকনাফের পাহাড়, শাহ পরীর দ্বীপ, আর উপরে সুনীল আকাশ। আতাহারের পাশে দাঁড়িয়ে লোপা। দেখতে দেখতে আরাকানের পর্বতগুলি ঘোলাটে হয়ে আসছিল। আর ডানে শাহ পরীর দ্বীপও পার হয়ে গেল।
সমুদ্রের ফেনিল জলে ঢেউয়ের বিশাল দাপাদাপি। তার মাঝে সেই মায়াদ্বীপের হাতছানি। অসংখ্য প্রবালের ছড়াছড়ি আর সারি সারি নারিকেল গাছ সমৃদ্ধ এ দ্বীপ।
মায়াদ্বীপের নগ্ন বালির ওপর শো শো গর্জনে আছড়ে পরছিল সমুদ্রের ঢেউ। আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মনমুগ্ধকর শব্দ কানে আসছিল আতাহারের।
রাতের আকাশে প্রিয়ার চোখের মতো মায়াবি চাঁদ। অসংখ্য নক্ষত্র মিলে আলো আঁধারির মাঝে ফুলের পসরা সাজিয়ে বসে আছে সমগ্র আকাশ জুড়ে। আর চন্দ্রদ্বীপ যেন সাজুগুজু হয়ে বসে আছে তাদেরই অপেক্ষায়। অনন্ত রুপসি মায়াবীনী দ্বিপ সেন্টমার্টিন। সকালের রোদে আলোকিত রুপালি দ্বীপ যেন পাহাড়ী কন্যার বিজু উৎসবের ঢঙয়ে নাচছে। আর আচড়ে পড়া ঢেউয়ের ফেনায়িত গুঙুর তার পায়। একি অপরূপ রূপ তন্বি তরুণী এ মায়াদ্বীপের। এমন একটি মুহূর্তও নেই যে তার রূপ থেকে মুখ ফেরানো যায়। দূর দিগন্ত থেকে ঢেউ এসে ধুয়ে দিচ্ছে দ্বীপের বীচ নামের পা। ঢেউয়ের ওপারে ঢেউ। তার ওপারে কালো প্রবালের উপর ঢেউয়ের নাচানাচি, বালক-বালিকাদের ঝিনুক কুড়ানোর দৃশ্য, রোদের ঝলমল আলোতে মনভোলানো সব দৃশ্য সত্যিই অপূর্ব।
এরপর পর্যায়ক্রমে তার চোখের সামনে এসে হাজির হতে থাকল চোখ ধাঁধাঁনো সৌন্দর্যের পসরা নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দবন, পার্বত্যাঞ্চলের সাজেক ভ্যালি, শুবলং ঝরনা, পাথারিয়া পাহাড়ের মাধকুন্ড জল প্রপাত আরো কত কি। চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল আতাহারের। কিন্তু এসব মনোরম দৃশ্যপটগুলি খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারল না তার চোখে। মুহূর্তের মধ্যেই তার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দু‘চোখে জ¦ালা ধরিয়ে সামনে এসে উপস্থিত হলো পৃথিবীর সমান বলশালী কদাকার সেই ভয়ঙ্কর শকুনটি।
শুবলং ঝরনা ও পাথারিয়া পাহাড়ের মাধকুন্ড জলপ্রপাত হতে গড়িয়ে যেন জল পতিত হচ্ছেনা। পতিত হচ্ছে সদ্য জবাইকৃত পশুর লালের উপর ছোপ ছোপ ঘন কালো রক্তধারা। দম চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তের গুঁ-উ-থ গুঁ-উ-থ গুঁ-রু-র গুঁ-রু-র শব্দটিও কানে এসে যন্ত্রণা দিচ্ছে। আর প্রেতাত্মাটি হাসছে তার দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে। ক্রোদ্ধ হাসিতে ফেটে পড়তে পড়তে বলল, ভয় পেলে চলবে কেন বন্ধু। তুমি না বলেছ, একদিন তোমাদের এ তমসা কেটে যাবে। আবার কল কল ধারায় বয়ে যাবে তোমাদের নদীগুলি, উপরে থাকবে সুনীল আকাশ, গাছে গাছে ফুল ফুটবে, পাখি ডাকবে। তাহলে ভয় পেয়ে কাজ নেই। ভয়কে জয় করেই না তোমাদের জীবন?
এবারও ক্ষিপ্রতার সাথে ঘুরে দাঁড়ায় আতাহার। চিৎকার করে অসহ্য-অধৈর্য কন্ঠে বলতে থাকে, সত্যিই তো বলেছি আমরা জয় করব। এ মহামারি থাকবে না আমাদের যৌন্দর্যের পৃথিবীতে। একদিন সত্যিই এ আঁধার দূর হবে। পৃথিবীতে দেখা দিবে আলোর রেখা। আবার কলকল ধারায় বয়ে যাবে আমাদের নদীগুলি, উপরে থাকবে সুনীল আকাশ, গাছে গাছে ফুল ফুটবে, পাখি ডাকবে – – – – –। আমাদের শান্তির পৃথিবীতে থাকবে না কোন হানাহানি, মারামারি, অন্যায় অত্যাচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ। এমন কি সাম্রাজ্যবাদ আর ধর্মীয় মৌলবাদের হিংস্র থাবায় আর ক্ষত-বিক্ষত হবে না সৌন্দর্য-সুষমায় সুষমান্বিত সেই পৃথিবী। মাড়ি আর মড়কে উজার হবে না আমাদের প্রিয় আর্থ নামের গ্রহটি। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি থাকবে প্রতিটি মানুষের।
তাহলে আমাকে এখন সহ্য করতে পারছ না কেন বন্ধু? আমি প্রেতাত্মা বলে? আমার রূপ কদাকার বলে? তুমি কি বুঝতে পারছ না তোমার মনোবলের কাছে ইতোমধ্যেই আমি আস্তে আস্তে হারতে বসেছি। তোমাকে আরো কিছু ভয়ঙ্কর-বিভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হবে বন্ধু।
না না নাহ। আমি আর কোন কদাকার দৃশ্যের মুখোমুখি হতে চাই না। আমি আকাশ দেখতে চাই। আকাশ! সুনীল আকাশ! তার নিচে শ্যামলে সবুজে ভরা পৃথিবী।
তার জন্যই তোমাকে পাড়ি দিতে হবে আরো কিছু ভয়ঙ্কর পথ। কেন বুঝতে পারছ না? সৌন্দর্য-সুষমায় ছাওয়া তোমাদের এ পুরো পৃথিবী এখন লকডাউন হয়ে আছে। রোগ-শোক, ব্যাধি, জরাগ্রস্থতা, অসুখ-বিসুখ, হাসি-কান্না নিয়েই তো তোমাদের পৃথিবীময় জীবন। আমাকে তুমি সহ্য করতে পারছনা তা আমি বুঝতে পারছি বন্ধু। আমি তোমাকে বন্ধু বন্ধু বলে সম্বোধন করলেও তুমি আমার উপর চড়াও হয়ে আছো। আমার উপস্থিতি তোমার কাছে দুশমনের মতো ঠেকছে।
সত্যিই তুমি আমাদের দুশমন। তুমি কারো বন্ধু হতে পার না। তুমি প্রেতাত্মা। বড় নির্মমতায় পূর্ণ তোমার চরিত্র। তুমি নিষ্ঠুর করোনা। তুমি আমাদের হৃদপিন্ড-ফুসফুসকে কুড়ে কুড়ে খেতে ভালবাসো। দোহায় তোমায় দুশমন, তুমি দূর হও। তুমি জাহান্নামে যাও। তোমার ভয়ঙ্কর থাবা থেকে আমরা মুক্তি চাই, মুক্তি চাই, আমরা বাঁচতে চাই, চাই শান্তি, পরম শান্তি। এতগুলো কথা ক্ষিপ্রতার সাথে টানা প্রকাশ করার পর হাঁপাতে থাকে আতাহার। হাঁপানির ভেতরও বির বির করতে থাকে আতাহর-দূর হ করোনা। আমরা তোর কুৎসিৎ মুখ দেখতে চাই না। আমরা চাই লকডাউনমুক্ত আমাদের শান্তির পৃথিবী, উপরে থাকবে সুনীল আকাশ, গাছে গাছে ফুল ফুটবে, পাখি ডাকবে, মানুষের কল কাকলিতে মুখরিত শহরগুলি কর্মময় হয়ে উঠবে।
কিন্তু মুক্তি পায় না আতাহার। বিকৃত বেহায়ার মতোই আবারও দৃশ্যমান হয় প্রেতাত্মাটি। ক্রোদ্ধ হেসে বলে, ঠিক আছে বন্ধু তুমি যখন আমাকে করোনা বলেই ডেকেছ, তাহলে না হয় এখন থেকে তুমি আমাকে করোনা বন্ধু বলেই সম্বোধন করিও।
বন্ধু নয়, শুধুমাত্র করোনা। ক্লান্তি আর শ্রান্তির ভেতর ডুবতে ডুবতে কঠিন কন্ঠে উচ্চারণ করে আতাহার। সামান্য হলেও অপ্রস্তুত হতে দেখা যায় করোনা প্রেতাত্মাকে। কন্ঠস্বর একটু নামিয়ে নিয়ে বলে ঠিকা আছে বন্ধু নয়, কেবল করোনা বলেই সম্বোধন করো। প্রতিত্তরে আর কোন কথা বলেনা আতাহার। বেহায়া বেলাজা করোনার সাথে কোন কথা বলতে তার রুচিতে আর ধরে না। নিরুত্তাপ থেকে কেবল থুউ করে দলাপাকানো একমুখ ভর্তি থু থু উগড়ে দেয় সামনের দিকে। দিয়ে চোখ বন্ধ করে আতাহার। কিন্তু ঘুমাতে পারে না সে। পাশবিক করোনা তার নোংরা হাতে টেনে নিয়ে চলে কি সব অচেনা কুৎসিৎ পথে। চারধারে ঘন-কালো অন্ধকারের মধ্যে কেবল ধক্ধক্ করে জ¦লে আগুনের মতো দুটি ভয়ঙ্কর চোখ কারোনার। আর অদ্ভুদ রকমের কিছু মানুষের কালো কালো মাথা। তাদের পেটের কাছ থেকে শোনা গেল সদ্য জবাইকৃত পশুদের দম যাওয়াকালের সেই গোঙানোর গুঁ-উ-থ গুঁ-উ-থ গুঁ-রু-র গুঁ-রু-র শব্দ। অচেনা বাতাস ঢেউ খেলে যেতে লাগল জটপড়া চুলের সেই মাথাগুলির উপর দিয়ে। মেলানোর চেষ্টা করে আতাহার। তার চোখে ভেসে উঠে তিতাস পূববর্তী মাঠে সবুজ ধানের ক্ষেতে কেবল দেখেছে বাতাসের দোলায় দোলায়িত সবুজের ঢেউ। যার সাথে এ সব অদ্ভুদ মাথাদের দুলনের কোন মিল নেই। যে হাওয়ায় দুলছে অসংখ্য মানুষের কালো কালো মাথা, সে হাওয়ার সাথে সবুজ মাঠের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার কোন যোগাযোগ নেই। যে হাওয়ায় মাথাগুলি চঞ্চল-কম্পমান, সে হাওয়া দিগন্ত থেকে উঠে আসা সবুজ শস্য কাঁপানো সূক্ষ্ম অন্তরঙ্গ হাওয়া নয়। এ-হাওয়াকে সে চেনে না। আর এ মাথা দোলানো মানুষগুলিকেও সে আগে কোথায় দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। অচেনা নগরের কোন ভগ্ন সভ্যতার উপর বসে যেন ওরা গোঙাচ্ছে। আতাহারের মনের ভাব বুঝতে পেরে স্বশব্দে খস খস ও নাকি কন্ঠে কথা বলে উঠে করোনা। বুঝতে পারছি বন্ধু, তুমি ওদের চিনতে পারছ না। ওরা তোমাদের মতোই মানুষ ছিল কিছুদিন আগেও। আর এখন আমাদের মতো প্রেতাত্মা হওয়ার জন্য মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ওই মাথাগুলির মধ্যে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু কোন বাছ-বিচার নেই। শোষক-শোষিত সকল শ্রেণীর মানুষই আছে। ডাক্তারও আছে। প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণটাই হারাতে বসেছে। তোমাদের সভ্যতা এখন ধ্বংসের পথে। ইটের সভ্যতার উপর দেখছো না কেমন লাশের স্তুপ পড়তে দেখা যাচ্ছে। আর একটু সামনের দিকে তাকাও। ওটা তোমাদের বুড়িগঙ্গা নদী। যে নদীকে তোমরা বহু আগেই নষ্ট করে ফেলেছ। ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করেছ। তোমার লোভের থাবায় ওর শরীর বহু আগেই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
আতাহারের অনিচ্ছার চোখ গিয়ে পড়ল বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে। নদীতে সে পানি কখন দেখেছিল মনে করতে পারছে না। তবে দু‘তীরের অসংখ্য কলকারখানা থেকে নিসৃত বিষযুক্ত কালো বর্জ্যওে ঘন কালো তরল ধারা সে দেখেছে। কিন্তু এখন সে কি দেখছে। সে বর্জ্যরে মধ্যে স্থানে স্থানে ভেসে বেড়াচ্ছে জবাইকৃত গুরু-মহিষের পরিত্যক্ত ভুরি। ভুরিগুলির কাটা-ছেড়া অংশ দিয়ে বের হয়ে আসছে গোবরের দলা না। মৃত মানুষের ঘনকালো চুলযুক্ত মাথা। অসংখ্য মাথা। কোথা থেকে এলো এতসব মৃত মানুষের মাথা। দু‘একটি জাহাজকেও দিকশূন্যভাবে ভেসে থাকতে দেখল আতাহার। ওদের ছাতুপড়া দেওয়ালের বাইরে বা ভিতরে কোন মানুষ আছে বলে মনে হল না।
জমাটবাঁধা অন্ধকারের ভেতর চোখ খোলা রেখেও কোন কিছুই দেখা যায় না। তাই বন্ধ চোখে দেখার চেষ্টা করল আতাহার তার পরিচিত কোন কিছুকে দেখা যায় কি না? এ যে মেঘদের দেশ। খন্ড খন্ড শাদা মেঘ, ধোঁয়াস বর্ণের মেঘ, ছাই কালারের মেঘ, বারবার মেঘের পরিবর্তন লক্ষ করছে আতাহার। ছাই কালারের মেঘগুলিকে মনে হলো দিগন্ত বিস্তৃত উঁচু নিচু টিলা সমেত ফসলহীন মাঠ। শাদা মেঘগুলির উপর রোদ পড়লে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো নাচনাচি করছিল। কোথায় দেখেছিল মেঘের রাজ্যের এমন সুন্দর ও চমৎকার নয়নাভিরাম দৃশ্য! আতাহারের মনে হলো বিমানের জানালা দিয়ে তাকালে এমন সব দৃশ্য নজরে আসে। বিমানের কথা মনে আসতেই সে বুঝতে পারল তার অবস্থান এখন ভূমি থেকে অনেক উঁচুতে। তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন এক অচেনার উদ্দেশে ছুটে চলছে লম্বা গলার শকুনটি। আর নিচের দৃশ্যপটগুলিতেও পরিবর্তন লক্ষ করতে থাকল। শাদমেঘগুলি রূপান্তরিত হতে হতে মুহুর্তের মধ্যে মধ্যে পরিণত হল রক্ত সমুদ্রের ঢেউয়ে। ছাই রঙের মেঘগুলির ছোপ ছোপ লালের উপর চিটচিটে কালো রঙের চটবাঁধা রক্ত। জবাইকৃত পশুদের দম যাওয়াকালের সেই গোঙানোর গুঁ-উ-থ গুঁ-উ-থ গুঁ-রু-র গুঁ-রু-র শব্দটিও কানে আসতে লাগল। আর সেই সাথে তেজালো উৎকট দুর্গন্ধ। কোথা থেকে কোথা উড়িয়ে নিয়ে চলল শকুনটি তার উপর কোন নিয়ন্ত্রণ রইল না আতাহারের। একবার তার সামান্য দৃষ্টিগোচর হলো আগ্রার তাজমহলটা। কি কুৎসিত আকৃতিই না ধারণ করেছে শে^ত পাথরগুলি। তার আগে প্রেতপুরির মতো নিস্তব্দ দিল্লী। তাজমহলে অদূরে নদী তীরে মৃত লাশের মাংস নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে কাক আর কুকুর। আতাহারের মনে হল এ দৃশ্য যমুনার তীরে নয়, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। না এ ছবি বর্তমানের না। সেটা জয়নুলের আঁকা চুঁয়াত্তুরের দুর্ভিক্ষের ছবি।
এমন বিভৎস দৃশ্যের বর্ণনা অন্ধ কবি হোমারের ইলিয়াডেও আছে। মহারাজ এ্যাগামেমনন ও মহান একিলিসে কলহ এবং ট্রয়যুদ্ধের কারণে দেবরাজ জিয়াসের অভিপ্রায়ে পড়েথাকা মৃত অসংখ্য গ্রীক ও ট্রয়বীরের লাশ নিয়ে শকুন আর পথকুকুরের টানাটানি। জিয়াসপুত এ্যাপোলোর ইচ্ছায় মর্ত্যরে মনুষকে প্রপীড়িত করার জন্য নেমে আসে মহামারী। সেই সবতো পুরাণ কাহিনী। শকুনটি থেমে নেই। এর বিশাল থাবার নীচে পর্যাক্রমে দেখা গেল চীনের হুবেই প্রদেশের বিরান ভূমি, মাদ্রিদের স্তুপিকৃত লাভাপিয়েস, লন্ডনের উহানে সারি সারি লাশ। আহা! কখন আটলান্টিক পাড়ি দিল শকুনটি! ব্যস্ততম নিউইয়র্ক এখন নিস্তব্দ প্রেতপুরি। স্থানে স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে লাশভর্তি কফিন। ভয়ঙ্কর সব ইঁদুরগুলি কফিনের কাঠ কেটে করেছে বড় বড় ছিদ্র। ছিদ্রপথে লাফিয়ে লাফিয়ে ঢুকছে আর বের হচ্ছে। গ্লাসের ভেতর মাস্ক, গ্লাভস, পি পি ই পরিহিত ডাক্তারদের মনে হলো কাফন পরিহিত জীবন্ত লাশ। মহাশক্তিধর ট্রাম্প মহাশয়কে দেখা গেল না। নিশ্চয় আছে কোথাও মাথা হেট করে বসে।

করোনা এবার তার লক লকে জিহবা উল্টিয়ে নাকের উপর তুলল। চারিদিকে জমাটবাঁধা আর উৎকট গন্ধযুক্ত রক্ত ছিটাতে ছিটাতে বলল, সবই তোমার কাছে অপরিচিত ঠেকছে বন্ধু, তাইনা। কে কে মরেছে। আর কে কে মরবে তার হিসেব মিলাতে পারছ না বুঝি। আর দু‘পাশের সারি সারি বাড়ি-ঘর, পরিচিত পথ সবই অদ্ভুদভাবে অপরিচিত লাগছে। আরে বাবা পথের রেখা তো তোমাকেই খোঁজে নিতে হবে। ও যে আলোর পথ, আলোর পৃথিবী। যে পৃথিবীতে আবারও উপরে থাকবে সুনীল আকাশ- – – – – , মানুষের কল কাকলিতে মুখরিত শহরগুলি কর্মময় হয়ে উঠবে। আচ্ছা বন্ধু তুমি যে এমন সুন্দর করে তোমার পৃথিবীকে দেখ। তুমি কি কবিতা-টবিতা লেখ না কি? বলে তীব্র আগুনযুক্ত ধক্ধক্ েচোখ দুটি দিয়ে আতাহারের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি মেলে ধরে তাকাল করোনা। এবার আর স্থির থাকতে পারল না আতাহার। অপমানে-অসম্মানে একটা বিদ্রোহ-একটা ক্ষুরধার অভিমান ধাঁধাঁ করে জ¦লে উঠল তার সারা দেহময়। করোনার প্রতি একটা প্রতিহিংসার উজ্জ্বলতম রূপকথার দানবাকৃতি দেহ ধারণ করে থরো থরো করে কাঁপতে থাকল। সে আর কোন অচেনা অন্ধকারাচ্ছ গুহায় যেতে চায় না। যে গুহার ভেতর স্তুপিকৃত হয়ে আছে মৃত মানুষের মাংসের টিলা। এরূপ দুর্গন্ধযুক্ত ভাগাড় আর দেখতে চায় না আতাহার।
অচেনা আকাশের নীচে, অচেনা ঘনকালো রাতে আতাহারের অন্তরে একটা অচেনা মন ধীরে ধীরে ক্ষীণ স্বরে কথা কয়ে উঠে। অস্পষ্ট তার আওয়াজ, তবু মনে হয় ঝরনার সেই রক্তধারার মতো জোড়ালো তার প্রবাহ। তার চারপাশে সব অচেনা আওয়াজ, সে আওয়াজ, মানুষের নয়, রাতের আঁধারে হিং¯্র জন্তুর করুন-ভীতিকর আর্তনাদ। সে জন্তুগুলো তাদের বিষাক্ত কন্টকাকীর্ণ নখ দিয়ে নির্মমভাবে আচড়কেটে আহত করার জন্য তেড়ে আছে আতাহারকে। আর সে আচড়কাটা রক্ত তারা তাদের বিষাক্ত জিহবাটিকে নাকের কাছে উল্টিয়ে নিয়ে নিয়ে চেটে চেটে পান করবে। এ দৃশ্য দেহে ক্রোদ্ধ হাসিতে ফেটে পড়বে নিষ্ঠুর করোনা।
বারবার হাঁপিয়ে উঠছে আতাহার। তার সমগ্র মন এখন স্তদ্ধ, এবং মনোস্তাপের ভারে নুয়ে পড়েছে অনুতপ্ত অপরাধীর মতো। সে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী। শক্তিশালীর কাছে তার এখন নতশীর। শক্তিশালীর অন্যায়ও যেহেতু ন্যায়, সেই ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখানো তার অপরাধ। দূরে সৎকারবিহীন মানুষের লাশের উপর শিয়াল-কুকুরের কামড়াকামড়ির শব্দ। ওগুলো যেন জন্তু নয়, মানুষেরই প্রতিরূপ। যে মানুষ করোনাঘটিত মহামারির সুযোগে নিজের আখের গোছাতে ব্যপৃত। দান-খয়রাতের চাল, খাদ্যবস্তু নিয়ে শেয়াল কুকুরের মতো টানাটানি করছে। অন্যায়ভাবে জমিয়ে পাষাণ স্তুপ গড়ে তুলছে। বাতাসে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে প্রান্তজুড়ে অন্ধকারের মতো বিশাল কালো ডানা ও পৃথিবীর মতো বলশালী লম্বা গলার শকুন। ধরালো নখ ও সুচালো ঠোঁটযুক্ত ঈগলের পৃথিবী কাঁপানো করুন ও নিষ্ঠুর চিৎকারের সুতীক্ষ্ম আওয়াজ যেন তার কানের ভেতর গরম শীশা হয়ে প্রবেশ করছে। বড় অসহনীয়, তক্ষ্ণ ও নির্মম সে আওয়াজ। আর লম্বা জিহবাযুক্ত প্রেতাত্মা করোনা তার মুখটিকে বিকট এক গুহার আকৃতিতে হা করে রেখেছে। সে গুহার সুড়ঙ্গ পথে বের হয়ে আসছে ধোঁয়া আর গরম বাস্প। যে বাস্প কুন্ডলির মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আতাহারের চারদিকে তৈরী করছে নির্মম কোয়ারেনটাইন।
দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছে তার সাধের সৌন্দর্য-সুষমামন্ডিত পৃথিবী, সুনীল আকাশ, গাছে গাছে ফোটে থাকা পুস্পমঞ্জুরি, গানের পাখি, বয়ে চলা নদীর কল কল ধারা। নজরের নিকটবর্তী হচ্ছে কেবল শ্মশানঘাটে, কবরস্থানে, সমাধিতে লাশের সারি। মন্দিরের পুরোহিত, মসজিদের ইমাম, চার্চ-পেগুডার ফাদার কেহই শনাক্ত করতে পারছে না তাদের স্ব স্ব ধর্মের ভিত্তিতে সৎকারের জন্য স্ব স্ব জাতি-গোত্রের লাশ। সকলেই আজ এ বিক্ষুদ্ধ অন্ধকার রাত্রিতে অসহায়-নিরুপায়। হীন ভাষায় কর্কশ কন্ঠে এখন কেউ কাউকে আর দুষারোপ করছে না। কে বড়, কে ক্ষুদ্র, কে সঠিক, কে বেঠিক তা নিয়ে কোন বাধানুবাদ করছে না। ফতোয়া ব্যবসায়ীদের ফতোয়ার বেসাতি গুটিয়ে ফেলেছে। জীবনের কারবারে সেগুলি টিক্কাখানের অচল পয়সা। মৌলবাদ, সাম্্রাজ্যবাদ, ক্ষমতাধর যুদ্ধবাজদের চোখেও এখন করুন বিষাদ নিস্পলক অসহায় দৃষ্টি। আর শোনা যেতে থাকল বেঁচে থাকা মানুষের যন্ত্রণাকাতর গোঙানি, ভয়ঙ্কর বিভৎস করুন আর্তনাদ। অথচ ধোঁয়ার কুন্ডলির বাইরে দাঁড়িয়ে নির্লজ্য বেহায়ার মতো ক্রোধের হাসি হাসছে প্রেতাত্মা করোনা।
বন্ধ কর তোমার নিষ্ঠুর নির্মম হাসি। তোমাকে আর দাঁত কেলিয়ে হাসতে হবে না। নিশ্চয় তমি¯্রার রাত ফুরিয়ে আসছে, সহসায় পূর্ব গগনে ফুটে উঠবে আলোর রেখা। সুনীল আকাশের নীচে পতপত করে উড়বে বিজয়ের পতাকা। আমাদের বিজ্ঞানের কাছে তোমার পরাজয় নিশ্চিত জেনো। আমরা জয় করবোই বলে চিৎকার দিয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াতে চায়লো আতাহার। তার ক্ষিপ্রতার কাছে ছিন্ন ভিন্ন ও বিছিন্ন হয়ে কেটে গেল ধোঁয়ার কুন্ডলি, দিগন্তের সমান অন্ধকারের পাখা ও পৃথিবীর মতো বলশালী ধারালো ও সুচালো কালো নখযুক্ত শকুন। ভয়ঙ্কর-বিভৎস ও কদাকার স্বপ্নের নিষ্ঠুর পথ পাড়ি দিয়ে ঘুম ভেঙে গেল আতাহারের। ততক্ষণে বাইরের আকাশে ফুটে উঠেছে আলোর রেখা। পূর্ব দিগন্ত উজ্জ্বল করে উদিত হচ্ছে লাল টুকটুকে একটি সুর্য। লকডাউনমুক্ত শান্তির পৃথিবী, উপরে সুনীল আকাশ, গাছে গাছে ফুটেছে পুষ্পমঞ্জুরি, পাখি ডাকছে, মানুষের কলকাকলিতে মুখরিত শহরগুলি কর্মময় হয়ে উঠছে। দুঃস্বপ্ন ভুলে তার লোপার হাতে হাত রেখে তাদের সাথে এগিয়ে চলছে আতাহারও।