ঈদুল ফিতর। ঈদ শব্দের উৎপত্তি আরবি ‘আউদ’ থেকে। যার অর্থ বারবার ফিরে আসা। মানে, যে আনন্দ ফিরে আসে বারংবার। আর ‘ফিতর’ মানে, ভেঙে ফেলা। ঈদুল ফিতরের মাধ্যমে দীর্ঘ এক মাস রোজা পালনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় বলে একে এ নামে অভিহিত করা হয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিন মুসলমানদের প্রতি নিয়ামাত হিসেবে ঈদ দান করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনা শরীফ হিজরতের পর প্রথম হিজরীতেই শুরু হয় ঈদ।
ঈদের দিন আনন্দ-খুশি প্রকাশ করা শাআয়িরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সা. ও ঈদের দিন আনন্দ-খুশি প্রকাশ করতেন। আয়িশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আমার কামরায় প্রবেশ করলেন। আমার সামনে তখন দুই বালিকা গান করছিলো, তারা গায়িকা ছিলো না, সেদিন শখ করে বুআসের দিন আনসারি সাহাবিরা যে কাওয়ালি করেছিলো, তা গাচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহ সা. বিছানায় শুয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখলেন। তখন আবু বকর রা. কামরায় প্রবেশ করে আমাকে ধমকাতে লাগলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূলের ঘরে শয়তানের বাঁশি! তখন রাসূলুল্লাহ সা. আব্বাজানের উদ্দেশে বললেন, হে আবু বকর, ওদেরকে গাইতে দাও। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উৎসবের দিন থাকে। এটা হলো আমাদের উৎসবের দিন। [বুখারি, মুসলিম]
ঈদ শব্দটা মনে আসতেই হৃদয় উল্লাসে মেতে ওঠে। ঈদ মানেই তো আনন্দের জোয়ার। ঈদ মানেই তো খুশির সঞ্চার। কিন্তু এবার এসেছে এক নিরানন্দ ঈদ। ঈদে নেমে এসেছে মহামারি করোনার আঁধার, যা ঈদের চিরায়ত সব আমেজকে ল-ভ- করে দিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের তা-বে বদলে গেছে এবারের ঈদের দৃশ্যপট, হারিয়ে গেছে ঈদের চিরচেনা আমেজ।
আমরা ২০২০ সালে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা কাটিয়েছি বিধ্বংসী করোনার আঁধারে। ভেবেছিলাম ২০২১ সালের আগে পৃথিবী থেকে এ মহামারি করোনা বিদায় নেবে। কিন্তু করোনা এখনো পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়নি। করোনা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে তার ধ্বংসযজ্ঞ।
করোনার ধ্বংসলীলার মাঝেই আমাদের মাঝে এসেছে আরেকটি ঈদুল ফিতর। অদৃশ্য শত্রু করোনার থাবায় কোটি মানুষ আজ কর্মহীন। দু’বেলা খাবারের সন্ধানে অগণিত মানুষ। এমন সময় ঈদ উৎসব শুধুই বিষণœতার এবং কষ্টের।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনের অংশ হিসেবে নতুন পোশাক কিনতে প্রতি বছরই বিপণীবিতান থেকে শুরু করে ফুটপাতে জমে উঠে ভিড়। বিত্তবান থেকে শুরু করে একেবারে দিনমজুর একটি হলেও নতুন পোশাক কেনেন। কিন্তু এবার ঈদের কেনাকাটা ক্রেতাশূন্যতায় ভুগছে।
ঈদকে উপলক্ষ করে প্রতি বছর কোটি মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যান পরিবারের সঙ্গে আনন্দ উদযাপনে। অধিক টাকায় টিকিট কিনে অসহনীয় যানজট পেরিয়ে প্রিয়জনের কাছে তাদের এ ছুটে যাওয়া এবার আর হচ্ছে না। কারণ করোনার সংক্রমণ এড়াতে দূরপাল্লার গণপরিবহন, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ।
এবারের ঈদের শুরুটাও হবে ভিন্নভাবে। দেশের কোনো ঈদগাহে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে না। মসজিদে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের জামাত করার পরামর্শ দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
প্রতিবছর ঈদের নামাজ শেষে ছোট-বড় সবাই একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করে, কোলাকুলি করে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একে অপরকে বুকে টেনে নেয়। কিন্তু এবারের ঈদে সেই চিরচেনা আমেজ থাকবে না। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়েছে, কেউ কারও সঙ্গে করমর্দন করতে পারবে না, কোলাকুলি করতে পারবে না, কেউ কাউকে বুকে টেনে নিতে পারবে না। কারণ একটাই কখন মহাশত্রু করোনা দেয় হানা!
যদিও সরকার স্বাস্থ্যসুরক্ষা বিধি মেনে দোকান খোলার এবং ক্রেতাদের কেনাকাটা করার শর্ত বেঁধে দেয় এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেয়৷ কিন্তু বাস্তবে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কাউকে ওই সব নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করতে দেখা যাচ্ছে না।
ঈদুল ফিতর একাধারে একটি ইবাদত ও আনন্দোৎসব। দুটোর সম্মিলন। ঈদের দিনে রয়েছে কতিপয় সুনির্দিষ্ট ইবাদত। তন্মধ্যে ঈদের নামাজ, সদকাতুল ফিতর আদায়, খোতবা শ্রবণসহ আরো কতিপয় সুন্নত ও মুস্তাহাব কার্যাদি উল্লেখযোগ্য। ইবাদতের পাশাপাশি বিনোদন, উৎসবের মাধ্যমও এটি। এই উৎসব প্রমাণ করে ইসলাম ধর্ম ¯্রফে কোনো রসহীন জীবনব্যবস্থার নাম নয়। ইসলাম বিনোদনকে নিষিদ্ধ করে না; নিষিদ্ধ করে বিনোদনের নামে প্রচলিত সকল অশ্লীলতাকে। বরং বিনোদন প্রমোট করতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের ব্যবস্থা করেছেন।
করোনার মাঝেও ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে হবে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা মেনে।
ঈদকে আমরা যেভাবে পালন করতে পারি-
১. ঈদুল ফিতরের দিনে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত ও দায়িত্ব হলো সদকাতুল ফিতর আদায়। নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী প্রত্যেক স্বাধীন মুসলমানের সদকাতুল ফিতর প্রদান অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। সদকাতুল ফিতর অভাবী, নিঃস্ব মানুষের ঈদকে আরো আনন্দময় করে তুলে। এ সদকা নিজ হাতেও দিতে পারেন আবার গরিব ও অভাবী লোকদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে দেখা করার পরিবর্তে অনলাইন দাতব্য বা অনুদান বেছে নিতে পারেন। এই দিনগুলোতে প্রচুর লোকের সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে এবং অনেক সংস্থা (বেসরকারী এবং সরকারি উভয়ই) এই ধরনের লোকদের ত্রাণ তহবিল দিচ্ছে এবং যখনই প্রয়োজন তাদের সহায়তা করছে। আপনি এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে অনলাইনে অনুদান করতে পারেন।
২. ঈদের দিনের আনন্দ যেন আমাদেরকে ফজর নামাজ থেকে গাফেল করে না দেয়। রোজাদারের প্রকৃত আনন্দই হবে ঈদের দিনের ফজরের নামাজ জামাআতের সঙ্গে আদায় করার মাধ্যমে।
হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যদি তারা ইশা ও ফজর নামাজের মধ্যে কী আছে তা জানতো তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দু’টি নামাজের জামায়াতে উপস্থিত হতো। [বুখারি ও মুসলিম]
৩. ঈদের দিন সকালে ঈদের নামাজ আদায় করার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জনে গোসল করতে হবে। হজরত ইবনে ওমর রাদিয়ালাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি ঈদ-উল-ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন।
৪. ঈদের আনন্দকে উপভোগ করতে ঈদের জামাআতে যাওয়ার পূর্বে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতে হবে। হজরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি দুই ঈদের দিনে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন। [বায়হাকি]
৫. এ দিনে সব মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করতে গিয়ে একত্রিত হয়, তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত হলো আল্লাহর নিয়ামাত এবং তাঁর শুকরিয়া আদায় স্বরূপ নিজেকে সর্বোত্তম সাজে সজ্জিত করা। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা তার বান্দার উপর প্রদত্ত নিয়ামাতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন।’
৬. ঈদগাহে যাওয়া থেকে শুরু করে ঈদের নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবির দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের সহজ চান, কঠিন চান না, আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের যে হিদায়াত দিয়েছেন তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ কর (তাকবির) এবং যাতে তোমরা শোকর কর।’ [সূরা বাকারা আয়াত : ১৮৫]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদ-উল-ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন। ঈদের নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন। যখন ঈদের নামাজ শেষ হয়ে যেতো তখন আর তাকবির পাঠ করতেন না।
৭. ঈদের নামাজ বড় মাঠে আদায় করতে হয়। যেহেতু সরকারি নির্দেশনা রয়েছে মাসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করার। তাই মাসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে।
৮. ঈদের নামাজ জামাআতে আদায়ের পর খুতবা বাধ্যতামূলক শুনতেই হবে এমন কথা নেই। তবে খুতবা শুনা সাওয়াবের কাজ। কারণ দুই খুতবায় আল্লাহর গুণগান, প্রশংসা, তাকবির পাঠ করা হয়। তা শ্রবণ করলে এবং পাঠ করলে অধিক সাওয়াব পাওয়া যায়।
হাদিসে এসেছে, হজরত আব্দুল্লাহ বিন সায়েব রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করলাম। যখন তিনি ঈদের নামাজ শেষ করলেন, তখন বললেন, আমরা এখন খুতবা দেব। যার ভাল লাগে সে যেন বসে আর যে চলে যেতে চায় সে যেতে পারে। [আবু দাউদ]
৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদ-উল- ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। কোনো কোনো বর্ণনা এসেছে তিনি বিজোড় সংখ্যায় খেঁজুর খেতেন। সুতরাং ঈদ-উল-ফিতরের দিনে নামাজ আদায় করতে যাওয়ার আগে খেজুর, মিষ্টান্ন বা খাবার গ্রহণ করে যেতে হবে।
১০. একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো, অভিবাদন করা মানুষের সুন্দর চরিত্রের একটি দিক। এতে খারাপ কিছু নেই; বরং এর মাধ্যমে একে অপরের জন্য কল্যাণ কামনা ও দু‘অ করা হয়। পরস্পরের মাঝে বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।
ঈদ উপলক্ষে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানানো শরিয়ত অনুমোদিত একটি বিষয়। বিভিন্ন বাক্য দ্বারা এ শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। যেমন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন সাক্ষাৎকালে একে অপরকে বলতেন, (তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম) অর্থ আল্লাহ তা‘আলা আমাদের ও আপনার ভালো কাজগুলো কবুল করুন। [ফাতহুল বারী শরহু সহীহিল বুখারী ৬/২৩৯, আসসুনানুল কুবরা লিলবাইহাকী, হাদীস ৬৫২১]
প্রতি বছরই আপনারা সুখে থাকুন ‘কুল্লা আমিন ওয়া আনতুম বিখাইর’ বলা যায়।
এ ধরনের সকল মার্জিত বাক্য দ্বারা শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। তবে তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম বাক্য দ্বারা শুভেচ্ছা বিনিময় করা উত্তম। এ সকল বাক্য দ্বারা সাক্ষাতে ও মোবাইলে ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করা।
১১. ঈদের দিনে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ খবর নেয়া উত্তম। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস, রাসূল (স.) বলেছেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। যে আল্লাহর সাথে শিরক করে তাকে ব্যতীত সে দিন সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় কিন্তু ঐ দু ভাইকে ক্ষমা করা হয় না যাদের মাঝে হিংসা ও দ্বন্ধ রয়েছে। তখন (ফেরেশতাদেরকে) বলা হয় এ দুজনকে অবকাশ দাও যেন তারা নিজেদের দ্বন্ধ-বিবাদ মিটিয়ে মিলে মিশে যায়! এ দুজনকে অবকাশ দাও যেন তারা নিজেদের দ্বন্ধ-বিবাদ মিটিয়ে মিলে মিশে যায়! এ দুজনকে অবকাশ দাও যেন তারা নিজেদের দ্বন্ধ-বিবাদ মিটিয়ে মিলে মিশে যায়।’ (তাহলে তাদেরও যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়)। [ মুসলিম : ৪৬৫২ ]
এবারের করোনার কারণে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে না গিয়েও আমরা মোবাইলের মাধ্যমে খোঁজ খবর নিতে পারি।
পবিত্র ঈদুল ফিতর সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সুখ শান্তি বয়ে নিয়ে আসুক। এবারের ঈদুল ফিতর আগের বছরগুলোর মতো নয়, আসুন আমরা এবার ঈদকে সতর্কতার সাথে আলাদা স্বাদে উদযাপন করি। সাধারণ সতর্কতা আপনাকে, আপনার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের মহামারি করোনা থেকে বাঁচাতে পারে এবং আমাদের সম্মিলিত সতর্কতা আসন্ন ঈদ উদযাপনকে পুরো দেশের জন্য আরও সুখী এবং নিরাপদ করে তুলতে পারে।