ঈদুল আযহা। আমাদের দেশের ভাষায় কুরবানি ঈদ। ঈদুল আযহার দিনের প্রধান আমল-কুরবানি। কুরবানি শা‘আইরে ইসলাম তথা ইসলামী নিদর্শনাবলীর অন্যতম। শরীয়তে কুরবানির যে পন্থা ও পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে তার মূলসূত্র ‘মিল্লাতে ইবরাহীমী’তে বিদ্যমান ছিল। কুরআন মাজীদ ও সহীহ হাদীস থেকে তা স্পষ্ট জানা যায়। এজন্য কুরবানিকে ‘সুন্নাতে ইবরাহীম’ নামে অভিহিত করা হয়।
কুরবানি শব্দের অর্থ উৎসর্গ, নৈকট্য অর্জন। শরীয়তের পরিভাষায় জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে জবেহ যোগ্য উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ছাগল বা ভেড়াকে মহান আল্লাহর অধিক সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে জবাই করাকে কুরবানি বলা হয়।
ঈদ আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশিত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহা’র আদেশ করা হয়েছে (অর্থাৎ, এ দিবসে কুরবানি করার আদেশ করা হয়েছে); এ দিবসকে আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। [মুসনাদে আহমাদ : ৬৫৭৫]
নবীজী প্রতি বছরই কুরবানি করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার দশ বছরের প্রতি বছরই কুরবানি করেছেন। [জামে তিরমিযী : ১৫০৭]
যে ব্যক্তির নিকট নেসাব পরিমাণ মাল বা সম্পদ থাকবে তার জন্য কুরবানি করা আবশ্যক। এ মাল বা সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। যে ব্যক্তি ১০ জিলহজ ফজর হতে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকবে, ওই ব্যক্তি কুরবানি আদায় করবে।

ইসলামি বিধান মতে সর্বমোট ছয় ধরনের পশু দিয়ে কুরবানি করা যায়। আর তাহলো- উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। এগুলো ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী দ্বারা কুরবানি করা শুদ্ধ নয়। যেমন, হরিণ, নীল গাই, বন্য ছাগল ও বন্যগরু ইত্যাদি।
উট হলে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। গরু ও মহিষ হলে কমপক্ষে দুই বছর বয়সী হতে হবে। ভেড়া, দুম্বা ও ছাগল হলে সর্বনিম্ন এক বছর বয়সী হতে হবে।

হজরত আবু যাহ্হাক উবায়দ ইবনে ফায়রূজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, আমি হজরত বারা রাদিআল্লাহু আনহুকে বললাম, যে সব পশুর কুরবানি করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন তা আমার নিকট বর্ণনা করুন।
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (খুতবা দিতে) দাঁড়ালেন আর আমার হাত তাঁর হাত অপেক্ষা ছোট। তিনি বললেন, চার প্রকার পশুর কুরবানি বৈধ নয়-
১. কানা পশু, যার কানা হওয়াটা সুস্পষ্ট;
২. রুগ্ন পশু, যার রোগ সুস্পষ্ট;
৩. খোঁড়া পশু, যার খোঁড়া হওয়া সুস্পষ্ট;
৪. দুর্বল পশু, যার হাঁড়ে মজ্জা নেই।
আমি বললাম, ‘আমি শিং ও দাঁতে ত্রুটি থাকাও পছন্দ করিনা। তিনি বললেন, তুমি যা অপছন্দ কর, তা ত্যাগ কর; কিন্তু অন্য লোকের জন্য তা হারাম করো না।’’ [নাসাঈ]

উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয় ও সাত ভাগে কুরবানি করা জায়েয। [সহীহ মুসলিম : ১৩১৮]

একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানি দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কুরবানি করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কুরবানি সহীহ হবে না। [সহীহ মুসলিম : ১৩১]

সাতজনে মিলে কুরবানি করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানিই সহীহ হবে না। [বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭]

প্রাণঘাতী বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এ সময়ে ঘনিয়ে আসছে কুরবানির ঈদ। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী আগামী ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে এ কুরবানির ঈদ। এবারের কুরবানির রূপরেখা কেমন হবে? করোনায় কুরবানি করায় মানুষের করণীয় কী? করোনার সময়ে কুরবানি করবে কি করবে না, কুরবানি না করে অর্থ দান করার যায় কিনা, কুরবানির পশুর হাট বন্ধ থাকা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে চলছে অনেক জল্পনা-কল্পনা। চলছে আলোচনা।
কুরবানি ও অভাবগ্রস্তদের সহায়তা- এ দু’টি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ, দু’টি বিষয়েই মানুষের সম্পৃক্ত থাকা উচিত। কুরবানি ইসলামের একটি ওয়াজিব বিধান। যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব তাকে অবশ্যই কুরবানি দিতে হবে বা এই বিধান পালন করতেই হবে। কেউ যদি মনে করেন যে, ওয়াজিব কুরবানি বাদ দিয়ে সেই টাকাটা অভাবগ্রস্ত মানুষকে বা কোনো গরিবকে দান করবেন, সেটা মোটেও সঠিক হবে না এবং এটি ইসলামি হুকুম পরিপন্থী হবে বলে আলেমগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এ বিষয়ে খুব শতর্ক করা হয়েছে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে, ‘‘যার কুরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।” [মুস্তাদরাকে হাকেম : ৩৫১৯]
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, “অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামায পড়–ন এবং কুরবানি আদায় করুন।” [সূরা কাউসার : ০২]
যদি কারো উপর কুরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে এবং তিনি সেই ওয়াজিব কুরবানি আদায় না করে, টাকা অভাবগ্রস্তদের দান করেন বা গরিবদেরকে দিয়ে দেন, তবে সেই দানের দ্বারা কুরবানি করার দায়িত্ব পালিত হবে না। সে ইবাদাত তরককারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
করোনাকালে দেশের সব মুসলমানের কুরবানি বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ মানুষ এই করোনার মধ্যে অফিসে যাচ্ছেন, বাজারে যাচ্ছেন। তবে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যেহেতু মহামারি চলছে তাই কুরবানি দেওয়াসহ সব ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
কুরবানি হচ্ছে মনের তাকওয়া। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই কুরবানির পশু জবাই করতে হবে। কুরবানির মধ্যে যদি অন্য কোনো চিন্তা থাকে তবে সে কুরবানি আদায় হবে না। কুরবানি প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেন, “এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।” [সূরা হজ : ৩৭]
কুরবানি শুধু ভোগ বিলাস আর পেট পুরে গোশত খাওয়ার জন্য নয়, বিশাল পশু ক্রয় করে ফেইস বুকে ছবি দেয়ার জন্য নয়, নিজেকে সমাজের বড় দাতা হিসেবে পরিচিত করার জন্য নয়, এলাকায় সুনাম সুখ্যাতি অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার জন্য নয় বরং মহান রবের হুকুমের কাছে নিজের আমিত্ব, কর্তৃত্ব, গর্ব ও অহঙ্কার ভুলে গিয়ে জীবনের সকল কিছু তাঁর রাহে ব্যয় করার মাধ্যমে মনিবের সাথে গোলামের নিবীড় সম্পর্ক গড়ে তোলার অতি উত্তম উপকরণ মাত্র। কুরবানির মাধ্যমে প্রতিটি মুমেন মুসলমান নতুন করে উজ্জিবীত হয়ে এই শপথ নিবে যে, সকল প্রকার অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিজের জান-মাল আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেবে এতেই তার সফলতা!
কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে ‘‘আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কুরবানিসমূহ, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু সবই আল্লাহর জন্য, যিনি প্রতিপালক সমগ্র বিশ্বজাহানের।’’ [সূরা আনআম : ১৬৩]
কুরবানির পশু আল্লাহর নামে জবাই করতে হবে। ইহার ব্যাতিক্রম কোনো কিছু হলে কুরবানির পশুর গোশত খাওয়া যাবে না। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির বিধান দিয়েছি। তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুস্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে, তোমাদের ইলাহতো এক ইলাহ।’’ [সূরা হজ :৩৪]
ধর্মীয় গুরুত্ব ছাড়াও বাংলাদেশে কুরবানির একটি বড় অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে। বিশেষ করে ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধের পর এটার গুরুত্ব আরো বেড়েছে। দেশে কুরবানিকে সামনে রেখে গরু পালন এবং তা বিক্রির বিশাল একটি গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে আছে চামড়া শিল্প। কুরবানির সময়ই দেশের ৮০ ভাগ পশুর চামড়া পাওয়া যায়। তাই অনলাইনে হোক বা কঠোর স্বাস্থ্য নিরপত্তা নিশ্চিত করে হোক, কুরবানির পশুর হাট এবং কুরবানি সচল রাখতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
আমাদের করণীয় :
১. কুরবানি না করে এ টাকা দান করে দেয়া হলে কুরবানির আমল বা ইবাদত থেকে দায়মুক্তি হবে না। তাতে কুরবানির হক আদায় হবে না। তাই সর্বনিম্ন পরিমাণ অর্থ খরচ করে কুরবানির ওয়াজিব হুকুম আদায় করতে হবে। এর বাইরে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবগ্রস্ত বা গরিব মানুষকে সহযোগিতা করবে।

২. আমরা যারা কুরবানি দেই সবাই তো কুরবানির গোশত বা মাংস দান করি। এবার আমরা কুরবানির মাংস বা গোশত অভাবগ্রস্ত মানুষের মাঝে বেশি পরিমাণে দান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি’।

৩. বড় বড় শহরগুলোতে পশুর কোনো হাট না বসিয়ে অনলাইনে পশু কেনাবেচা করলে বড় বড় শহরের এসব ব্যস্ত জনপদ অনেকটাই নিরাপদ থাকবে। আর গ্রামাঞ্চলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পশুর হাট বসানো যায়। তবে সেখানে অবশ্যই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে কারো স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে না হয়। আর তাতে আশা করা যায়, মানুষ নিরাপদ থাকবে।

আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম উম্মাহকে করোনাকালীন এ সময়ে যথাযথভাবে কুরবানি করে তার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের তাওফিক দান করুন। আমীন।