হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরতেই চক্ষু চড়কগাছ! সেকি শাল মুড়ি দিয়ে থরথর কাঁপছে অনিক! শেষ পর্যন্ত কিনা সেই ভাইরাসটা নয় তো! একমাত্র ছেলে। সবেমাত্র উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। বেঁচে থাকা বলতে ওর জন্যই। কপালে চিন্তার ভাঁজ। কণ্ঠ আড়ষ্ট হয়ে মেঝেতে বসে পড়লেন জলিল বাবু। পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের কোটায় পড়েছেন। অফিসের ঝক্কি সেরে বাড়িতে যে একটুকু নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন তা আর জুটলোনা কপালে। যতসামান্য মাইনেতে সংসার ম্যানেজ করতে করতে জীবনটা তিতিবিরক্ত।
আজকে একটু আগেভাগেই অফিস থেকে বের হয়েছিলেন।করোনা ভাইরাসের জন্য অফিস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। একেতো দুঃশ্চিন্তা সামনের মাসে মাইনে হবে তো! বেসরকারি অফিসের আবার অজুহাতের শেষ নেই।
তনিমা বিবি ছেলের ঔষধটা হাতে নিয়ে বললেন-
“কই গো, আর কতদিন? তিন দিন হতে চলল। জ্বর কিছুতেই তো থামছে না। সঙ্গে প্রচন্ড ব্যথা আর শ্বাসকষ্ট। লক্ষণ ভালো ঠেকছে না। তুমি বরং ভালো হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করো।”

“হ্যাঁ সেটাই ভাবছি। এ-ই ঔষধগুলো খেয়ে তো কোনো উন্নতি দেখছি না। তাছাড়া দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। ড.অলোক বাবু বললেন হাসপাতালে গিয়ে ভালো ট্রিটমেন্ট করাতে”।

জলিল বাবু দুঃশ্চিন্তায় বুঝে উঠতে পারছেন না কি করবেন। একেতো হাতটান, তার ওপর করোনার আতঙ্ক মনটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।পাশের বাড়ির রহমান সাহেব বরাবরই উদার মনের মানুষ। মানুষের বিপদে আপদে সবসময় পাশে দাঁড়ান। শেষমেষ সকল সংকোচ দূরে ঠেলে রহমান সাহেবের কাছ হতে কিছু টাকা ধার নিয়ে ছেলেকে নিয়ে গেলেন শহরের জেএসএম হাসপাতালে। বেডে শয়ে শয়ে রোগী। কোনোরকমে একটা বেড পেয়ে ভাবলেন যাইহোক ছেলেকে তো এ্যাডমিট করানো গেছে। ট্রিটমেন্ট হলে নিশ্চয় অনিক সেরে উঠবে। সেই প্রত্যাশা বুকে নিয়ে রাতকে দিন করে পড়ে রইলেন। পাশাপাশি অন্যান্য রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের আলাপচারিতায় জানতে পারলেন অনিকের মতো সবার লক্ষ্মণ কমবেশি একই। এটাই নাকি মারণ ভাইরাস করোনা! আক্রান্ত ডাক্তার, নার্স।
আতঙ্কের কালো মেঘ ভেঙে পড়লো মাথার ওপর। পুরোনো বুকের যন্ত্রণাটা চেপে বসলো। তাহলে কি অনিক আর… এ কি ভাবছি আমি! না এ হতে পারে না!জীবনে তো অনেক লড়েছি। লড়াই করেই তো টিকে আছি এখনো। মনকে শক্ত করে বাঁচতে হবে। অনিক ঠিক সেরে উঠবে, ঠিক সেরে উঠবে।
তনিমা বিবি সারারাত ঘুমাতে পারেন না। ছেলের চিন্তায় সারাক্ষণ অশ্রুসিক্ত চোখ। জায় নমাজে বসে বসে খোদার কাছে আকুতি মিনতি-
“হে আল্লাহ তুমি রক্ষা করো, জীবনের একমাত্র সম্বল টুকু কেড়ে নিওনা… তুমিই বড়ো ডাক্তার, তুমি রহম করো, দয়া করো…”

প্রতিদিন মৃত্যু সংখ্যা বাড়তেই আছে। উৎকণ্ঠা আর ভয়ে ভয়ে প্রতিটি ভোর যায়, আসে। একদিন সকাল ৮টায় খবর এলো আজকে হাসপাতাল হতে পাঁচজন কে রিলিজ দেওয়া হবে। যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারদের মরণপণ চেষ্টায় তারা এখন সুস্থ।
জলিল বাবু আশায় বুক বেঁধে মনে মনে মহান রবের কাছে দোয়া করতে লাগলেন- “হে, মহান স্রষ্টা, রহমানের রহিম, পরম দয়ালু, তুমি আমার অনিককে সুস্থ করে দাও! …ঐ পাঁচজনের মধ্যে যেন বাবা অনিকও থাকে…”

বেলা ঠিক ২টার সময় হাসপাতালের মাইক হতে ঘোষণা ভেসে এলো- এখনই পাঁচজন সুস্থ রোগীকে (নাম ঘোষণা হলো) রিলিজ দেওয়া হচ্ছে। রোগীর আত্মীয়-স্বজন যারা আছেন তারা মেইন গেটের সম্মুখে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াবেন।অযথা জটলা করবেন না…” ঘোষণা শুনা মাত্র জলিল বাবু গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। অপেক্ষা করছেন। হ্যাঁ ঐ তো বেরিয়ে আসছে কয়েকজন… একজন… দুই জন…, তিনজন… দেরি আর সইছে না …; ঐ যে আরেকজন আসছে। আরে ঐ তো অনিক!
গেটের সম্মুখে আসতেই জলিল বাবু খুশি ধরে রাখতে পারলেন না। টপটপ করে চোখ হতে জল পড়তে লাগলো। অনিকের চোখ ও ছলছল। জলিল বাবু দুহাত
তুলে বলতে লাগলেন- “সকল প্রশংসা শুধু তোমার জন্যই। তুমি করুনার আধার। জীবন-মৃত্যুতো তোমারই হাতে। হে মোদের পরিত্রাতা, তোমার রহম হতে কখনো হতাশ করিওনা…”!