মানব রাজ্যত্বে মানুষ অসহায় হয়ে উঠেছে। সাথে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীও মানুষের অমানবিক অত্যাচারে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার উপক্রম। অনেক প্রাণী তাদের বংশ রক্ষায় কোনো প্রকার প্রটেকশন তৈরি করতে না পেরে চিরতরে হারিয়ে গেছে। মানুষ মানুষকে নির্মম অত্যাচার করেছে। এক জাতি অন্য জাতিকে নির্মূল করা জন্য তৈরি করেছে মানব হত্যার সরন্জাম। তারপর ঝাপিয়ে পড়েছে জাতিতে জাতিতে, ধর্মে ধর্মে, দেশে দেশে। আজ পৃথিবী যেন মানব পাপের কুণ্ডলিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, গাছ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, মাছ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, প্রাণীরা ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, মরুভূমি ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে। বায়ুমণ্ডল ফরিদায় করেছে প্রভুর কাছে। প্রভুর মানবের অত্যাচার থেকে আমাদের বাচান।

আজ সেই ফরিয়াদ কবুল হয়েছে। পৃথিবীতে প্রভু পাঠিয়েছে তার সেনাবাহিনী। সেই বাহিনির নাম ‘করোনা’। যার ভয়ে অত্যাচারি মানুষ গৃহবন্দি। তারা বের হতে পারছে না। নিজের সম্পর্ককে আজ অস্বীকার করছে। পিতার লাশকে গ্রহণ করছে না পুত্র-স্বজন। নিজেকে নিজে বিশ্বাস করছে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে তাদের জীবন।

কিন্তু আমরা এ পাপ থেকে মুক্ত হতে চাই। আমরা ফিরিয়ে দিতে চাই প্রাণের অধিকার। প্রকৃতির অধিকার। আমরা যার যার অবস্থান থেকে পাপ মুক্ত হবো। আমাদের পাপের পরিবর্তে পূণ্য করে প্রকৃতিকে বাচিয়ে রাখবো। আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তাদের সেবা করব। আমরা বন উজাড় করব না। আমরা পাহাড় কাটব না। আমরা সমুদ্রকে দুষিত করবো। আমরা হত্যার জন্য মারনাস্ত্র তৈরি না করে প্রকৃতির ভালোবাসার জন্য তৈরি করব নিরাপদ পৃথিবী।

পৃথিবীর প্রকৃতি ভালো থাকুক এই কামনা। করোনা সচেতনতায় সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখি ভালোবসার সম্পর্ক কাছি রাখি। করোনা সচেতনতা সংখ্যা ২০২০-৪ প্রকাশ করা হলো :
আফসার নিজাম, সম্পাদক

সূ চি প ত্র

সামনের দিনগুলো :: আমিনুল ইসলাম
বাঁচাও মোদের জান :: আবদুল হাই ইদ্রিছী
মানবমুক্তির এই যুদ্ধে :: এবিএম সোহেল রশিদ
আরোগ্য লাভের পথে :: স্মরণ মজুমদার
প্রান ভেসেছে জলে :: আল ইমরান মিশু সরকার
প্রার্থনা কিংবা সান্তনা :: কমল কুজুর
আমরা এখন একলা থাকি :: শফিকুল ইসলাম সোহাগ
ঘরবন্দি যেন লাশকাটা ঘরে :: আবু আফজাল সালেহ
দাও রহমের অমোঘ বারি :: আহমদ মঈনুদ্দীন
মনের জমিন বুনো :: আমিন আফসারী
করোনা আতংক :: আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন
আলোর স্নান :: বিকাশ চন্দ
মৃত্যুর মিছিল :: রফিক মজিদ
দিনযাপন :: শরিফ উল্যাহ
হায় আমার দেশ :: নাগসেন
করোনাকালের শেষে :: ফরিদা ইয়াসমিন সুমি
আমিও আছি ঐ কফিনে! :: কাজী রহিম শাহরিয়ার
মৃত্যুর মিছিল :: মেহেরুন ইসলাম
মুক্তির নিশ্বাস নিতে চায় মানুষ :: নূরূন নাহার পাপিয়া
ভালো নেই :: সুশান্ত হালদার

সামনের দিনগুলো
আমিনুল ইসলাম

সামনের দিনগুলো
হয় যেন ভালো
সব ঘরে রয় যেন
মিঠা টক ঝালও।
রহমের আশা নিয়ে
শুধু চেয়ে থাকি
দূরু দূরু মন নিয়ে
আল্লাহকে ডাকি।

বাঁচাও মোদের জান
আবদুল হাই ইদ্রিছী

মা’বুদ তুমি দয়ার সাগর
তোমার দয়ার আশাতে ভর
একটু দিও ঠাই,
আমরা সবাই পাপি তাপি
না পাই যদি তোমার মাফি
যাবার জায়গা নাই।

দুনিয়াতে মহামারি
কোথায় বলো দেবো পাড়ি
নিঃস্ব এখন সব,
নেই ভেদাভেদ আমির ফকির
সবার দিকে করোনার তীর
তোমার লীলা রব।

কান্না দেখি জাহান জুড়ে
লাশের সারি হৃদয় পুড়ে
রহম করো দান,
হেদায়াতের বারিশ দিয়ে
ক্ষমা করে বুকে নিয়ে
বাঁচাও মোদের জান।

মানবমুক্তির এই যুদ্ধে
এবিএম সোহেল রশিদ

দীর্ঘদিন ধরে দরজাবিহীন গৃহবাস
চৈত্রে পোড়া বৃক্ষের মতো সবুজহীন
অকারণে বকবক, ভাঙে ডালপালা
ঝরাপাতার উড়াউড়ি বাড়ায় জ্বালা

ঝাঁঝালো রোদে ঝলসানো গৃহপ্রেম
বাতাসের ছোবলে ঘুমায় একাকী
সখী, পিরীতের এই মিনতি বোঝানো দায়
নিয়মের ডামাডোলে সম্পর্কগুলো অসহায়।

মধ্যরাতে কখনো যদি বাড়াই হাত
তফাতের ঘন্টা বাজাও সংগোপনে
তাই শুনে বসন্তকে করি পারাপার
পরাজিতের খাপে রাখি তলোয়ার।

অদৃশ্য মানব যুদ্ধ আর কতকাল চলবে
বিমূর্ত এই অচলায়তন কে বলো ভাঙবে
সৃষ্টির সেরা কেন দেয়াল বন্দী থাকবে
মহামারীর ফাঁদে মৃত্যুর তৈলচিত্র আঁকবে

বিজ্ঞান ও ধর্ম আজ স্পষ্টত মুখোমুখি
অন্ধদের মাঝে চলছে দর কষাকষি
অথচ একে অন্যের পরিপূরক! এভাবে যদি ভাবে
মানবমুক্তির যুদ্ধে সবাইকে নিশ্চয়ই পাশে পাবে

আরোগ্য লাভের পথে
স্মরণ মজুমদার

‘জানো, মনে হয় কিছুদিন অন্ধকারে ডুবে যাওয়া ভালো-
বোঝালাম তাঁকে।
রুগ্ন এ পৃথিবীর পরিত্যাক্ত লাশগুলো গুম করে দিতে হবে সেই ফাঁকে!
তারপর
হয়তো বা আরো কিছু অসময়ে মৃত্যু ও লাশ,
আরো কিছু মানুষের আপ্রাণ চেষ্টা ও ব্যর্থ হাহুতাশ;
আরো কিছু জীর্ণ শীর্ণ হাভাতের ছোটাছুটি, ক্ষোভ,
আরো কিছু নির্দয় নিয়ম প্রহার, আরো কিছু পথ হাঁটা খিদে পেটে,
আরো কিছু নির্লজ্জ মানুষের লোভ;
আরো কিছু পড়ে থাকা জং-ধরা মারনাস্ত্র প্রতিযোগিতা,
আরো কিছু রংমশাল জ্বালানোর নির্বোধ বিলাসিতা,
আরো কিছু চোখে জল,
সবশেষে
আরো কিছু মানুষের মানুষিক বোধ জেগে গেলে,
তারপর সব ঠিক হবে…
এইসব অতিমারী চলে যাবে,
সুস্থ পৃথিবী আরোগ্য লাভের পর
নিজ কক্ষপথে চলে যাবে ফের সবকিছু ঠেলে।
যদিও জানি না ঠিক কবে!
তবু
সব ঠিক হবে। দেখো, সব ঠিক হবে।
-বলে তাকালাম তাঁর দুই চোখে।
‘হবে বুঝি?’ ফের আশা! চকচক করে ওঠে তাঁর দুই চোখ।
একদিন পৃথিবীকে ভালোবেসে শর্তহীন, হৃদয়ে পেয়েছে শোক;
তবু হিংসা ঘৃণা বলি দিয়ে বেঁচে যেতে হবে বলে আজো তাঁর নাম মধুমিতা।
‘হবেই তা! একদিন হবেই তা!
কতদিন ঝকঝকে পৃথিবীতে এমনটা আকাশ দেখিনি দিনে রাতে!
কতদিন হাতে হাত রেখে আলপথে চলিনি তোমার সাথে!
কতদিন ঘরের দেয়ালে নোনা ধরে গেছে, কতদিন জীবন যাপন আর হয়নি সরল!
কতদিন মিথ্যা বলেছি ইচ্ছে বা অনিচ্ছায়, সত্যের মত অবিকল!
ওইখানে কত ঘাসফুল প্রথম ফুটেছে, বেরিয়েছে সবুজ ঘাসের লোভে নিশ্চিন্তে হরিণীর দল!
আরো কিছু দূরে ওই দৃশ্যমান রডোডেনড্রন পাহাড়ের গায়ে,
আমরা হাঁটতে যাবো ঢালু পথ বেয়ে!
দেখো সে শুকনো নদীতে আজ স্ফটিক জল!
দেখো, বরফচূড়ায় আজ সকালের আগুন লেগেছে যেন,
যে আগুনে সেঁক নিলে পৃথিবীর রোগ সেরে যায়!
মরে যাওয়া নক্ষত্রেরা অন্ধকারে জেগেছে আবার সব আকাশের গায়ে,
আলো দিতে হবে সব মানুষেরে- এই তাঁর দায়।
এসো আজ হাতজোড় করে বলি- অন্ধকারে এ পৃথিবী ভবিষ্যতের সব অতিমারী থেকে
চিরতরে আরোগ্য পাক!’
বলেছে সে-
‘তবে তাই হোক! আরো কিছুদিন সব কৃত্রিম আলোহীন অন্ধকার থাক।’

প্রান ভেসেছে জলে
আল ইমরান মিশু সরকার

চোখ ভিজেছে মন কেঁদেছে
প্রান ভেসেছে জলে
তপ্ত ক্ষণে খড়ায় মেঘে
বৃষ্টি নাহি ঝরে
মানব মনের শূন্য কোঠায়
শূন্য নাহি ভরে

প্রার্থনা কিংবা সান্তনা
কমল কুজুর

দিনগুলি তেমনি রয়েছে
শুধু রাতগুলো হয়েছে দীর্ঘ
সন্ধ্যে হতেই শ্মশানের আঁধার যেন
গলা টিপে ধরে সমস্ত পৃথিবীর;
আর
কোন এক অজানা শঙ্কায়
ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতোই
খাবি খেতে থাকে অসহায় মানুষ-
-নিজ নিজ বন্দীশালায়।

লক্ষ কোটি টাকার তৈরি পরমাণু অস্ত্র
ড্রোন মাইন আরো কত কি-
সবই যে ব্যর্থতায় মুখ লুকায়
আজ কোথায় ইতালি যুক্তরাষ্ট্র স্পেন চিন
মহাপরাক্রমশালী রাষ্ট্র যত
সব আশা ছেড়ে
-করে হায় হায়।

বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ নেই, নেই প্রতিকার
মানুষ ম’রে অকাতরে
বাতাসে যেন বিষ ভাসে
এক দুই তিন-
এমনি করেই যেন আসে এগিয়ে মৃত্যুর দিন।

রোজ তবু সূর্য ওঠে
রাঙা কিরণে আঁধার দূরে যায় সরে
দূর্বল মানুষ স্বপ্ন খোঁজে,
বাঁচার স্বপ্ন, সুন্দর এক আগামীর স্বপ্ন
“এই পৃথিবী একদিন আমাদের হবে
হবে মানবতার জয়।”

আমরা এখন একলা থাকি
শফিকুল ইসলাম সোহাগ

মানুষ মেলার মাতাল হাটে
এই ধরণীর অসীম তটে-ভাঙ্গা গড়ার প্লাবন ঘাটে
অধিক সুখের দিন যাপনে মিছে কথন,
মনের ব্যাকুল প্রবল পাঠে
ফাল্গুণে না কোকিল আসে
দাঁড় কাকেরা কাঁ কাঁ করে
খুব মছিবত ধরার কূলে-এই সময়ে
বাহির মূখি নাইবা হলাম হৃদ্ধতারই কুঞ্জবনে

আমরা এখন একলা থাকি

সৃষ্টি জগৎ দিগন্তরে-
মানবকূলের উপযোগের নিবাস ছিল
এখন মানুষ দহন করে- বিষাক্ত সব আগুন খেলায়
ছোবল মারে- অবলীলায়
সময় সময় ভার নিতে হয়-
মানব সৃষ্ট পাপের ফসল
উল্টো পথের চাকা ঘুরার যন্ত্রযুগে।

যাক কিছুদিন একলা থাকি

নিছক মনের বন্ধনাতে কল্পনারা হাই তুলে যাক
খামচে ধরে স্বপ্নগুলো- ভেঙ্গে দিয়ে সুখের কলস
দখল নিছে পঙ্গপালের বৈরাগীরা
জাত কূলমান ভাগি দিয়ে-পুঁজিবাদের পাচাটারা
ছিচকে চোরা গোয়ার্তুমী শাসন করে জাতিসংঘ
কি আসে যায় আর্তনাদের প্রলয়ঙ্করে
মরণাত্রের জীবানুটা ছড়িয়েছে বিশাল তরে

আজ সকলের হৃদয় নড়ে- আতকে উঠি সময় সময়
বিচ্ছিন্ন সব যোগাযোগের মাধ্যমগুলো
স্তব্ধ মনে বুঝ আসেনা- মেঘ জমে যায় চোখের কোণে

আর কটা দিন যাকনা চলে- ঘরেই থাকি

যাই করে যাই রোজ কামনা
রহমতেরই বৃষ্টি পড়ুক-এই ধরাতে।।

ঘরবন্দি যেন লাশকাটা ঘরে
আবু আফজাল সালেহ

ঘরবন্দি আমি, প্রিয়জনসহ
থমথমে চারিদিক; বুটের শব্দ-
যেন লাশকাটা ঘরে।
বিষন্নমনে, আশংকা চোখেমুখে
ফাঁসির আসামির মতো গম্ভীর;
দৃষ্টি আকাশের দিকেই।
পারস্পারিক বিশ্বাসগুলো ঠুনকো আজ-
কাঁচের গ্লাসের মতো।

করোনার দিনগুলো দীর্ঘায়িত খুব!

দাও রহমের অমোঘ বারি
আহমদ মঈনুদ্দীন

কভিড উনিশ হানা দিয়েছে
দেশ-দুনিয়া শেষ,
কবে নাগাদ শেষ হবে সে
কাটবে কবে রেষ।

ছোঁয়াছোঁয়িতে বাড়ায় ব্যধি
এমন সর্বনাশা,
‘কেউ কারো নয়’ বুঝিয়ে গেল
ভাঙলো ভালোবাসা।

করোনা নামের এই জীবাণু
জীবন করল বন্দি,
ঘুঁচলে বিপদ কেউ করো না
অন্যায় কোনো সন্ধি।

নিখুঁত জ্ঞানে শুদ্ধ মনে
গড়ো পরিচ্ছন্ন জীবন,
মানবতা আর কল্যাণে
ভরুক বিশ্ব ভুবন।

প্রভু তুমি ক্ষমা করো
নাও তুলে এ মহামারী,
বিশ্ব ভুবন মুক্ত করো
দাও রহমের অমোঘ বারি।

মনের জমিন বুনো
আমিন আফসারী

পরিষ্কারের নিয়ম জানো
লকডাউনের নিয়ম মানো
ঘরে থাকলে ভাল থাকবে-
এই কথাটি মান।।

এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি
বন্ধ কর আড্ডারঝুড়ি।
সঙরোধে থাকতে হবে-
এই কথাটি শোন।।

বিপদ আপদ মহামারী
আল্লাহ হল সেফাকারী।
ধৈর্য ধরে পনাহ্ চেয়ে-
রবে’র তাসবী গুন।।

হা-হুতাশে কী হবেরে?
গুজবে কী ফল হবেরে?
একা থেকে জিকির দিয়ে
মনের জমিন বুনো।।

করোনা আতংক
আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

মহামারী করোনার কথা শুনিয়া
আতংকিত হলো সারা দুনিয়া,
শক্তির বারুদ পাহারায় যারা,
তারাও হয়েছে দিশেহারা।

দিকনা ছুঁড়ে, ভাইরাসটা গুঁড়ে, দিকনা দূর করে,
যারা অসহায় মানবতাকে শেষ করতো ধরে ধরে?

কোথায় তাদের সেই মারণাস্ত্র
কোথায় পারমাণবিক আজ, কোথায় কারখানা- কে করছে মানা? সাজুক যুদ্ধ সাজ।

কোথায় ক্ষমতার ঝারিঝুরি, মসনদের সাহস?
কোথায় গেলো মখমলের বাহাদুরি- রঙিন পাপোশ।

কোথায় টাইটানিক আর সাবমেরিন,
কেন সকলের মাথা নত মুখ মলিন?

সবাই করছে হায় হায়,
করোনার কাছে অসায়।

ক্ষমা চাও তবে-
ক্ষমা করো প্রভূ বাঁচাও মিন শাররি মা খালাক,
স্রষ্টা ওগো তুমিই সৃষ্টি করেছো মিন আ’লাক।

আলোর স্নান
বিকাশ চন্দ

চিরকাল থাকে না এমন অসম্পৃক্ত অধুনা অন্ধ সকাল
শাপলা শালুক দোয়েল পাপিয়া বুলবুলি চাতক জানেনা
কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে অদৃশ্য ঘাতক কণা
কে কার আশ্রয় আদরে প্রাকৃতিক বলয়ে পার্থিব বিচারের ভার
ক্ষমতার সীমায় ঝরে ঝর্ণা নদী জল জোয়ার অবিনশ্বর
অথচ পাপ পূন্যের একই প্রার্থনা সময় ভাঙ্গে মরণ প্রহর।

দাঁড়িয়ে সুকুমারী কোঁচড়ে অনন্ত নীল পদ্ম মোহন মমতা
আনন্দ ময় চিরকাল যা কিছু জাগতিক সুন্দর অনুপম
এসো তবে নির্মিতির স্নেহ মায়া মানুষের উত্তরাধিকার
আকাশ মাটি জল সবুজ গাছে আর হরিৎ শস্য ঘাসের গালিচা
সমুজ্জ্বল হার্দিক অবয়ব জড়িয়ে ভাষাহীন মগ্ন ব্যথা আত্মপ্রেম
স্মৃতিময় পরিযায়ী জীবন সংসার জুড়ে ভাষাহীন নম্র প্রার্থনা।

এখনও মানব প্রাচীর সাত সমুদ্র পার সকল দিগ্বলয়
নৈঃশব্দের ভেতরে জেগে থাকে সকল অঙ্গীকার
সমস্ত প্রাণের অন্তর কথা আশ্চর্য আলোর ঐকতান
উচ্ছল সময়ের টান আগলে আছে সনির্বন্ধ বাহু
বরাভয় মুদ্রায় জাগে সকল প্রাণের সাম গান পৃথিবী কথা
মাটির গহ্বরে জ্বলে শ্মশান শর্বরী জানে উদার আলোর স্নান।

মৃত্যুর মিছিল
রফিক মজিদ

মৃত্যুর মিছিল গুনে গুনে
ক্লান্ত এখন-
প্রযুক্তির ধারক-বাহকরা।
আনবিক বোমার প্রবক্তারাও আজ
ছুঁচো হয়ে ভয়ে কাঁপছে।
বাতাসের গতিকে হার মানানো
শক্তিধররা আজ থেমে গেছে
অদৃশ্য করোনার গতির কাছে।
সদ্য ভূমিষ্ট শিশুর
বুকের হৃদপৃন্ডটা যেমন কাঁপে
তেমনি ভাবে কাঁপছে আজ
সৃস্টির স্রেষ্ট জীব
গোটা মানবজাতী।
গলাবাজি আর মোড়লীপনার
বিশ্ব নেতারা আজ-
ফুটপাতের বিকলঙ্গ ভিক্ষুকের ন্যায়
বসে আছে থালা হাতে।
তবুও থামছে না মৃত্যুর মিছিল
আদৌ থামবে কি না, কে জানে!
সবকিছু ঠিকঠাক হলেই তো
আবার মোড়লদের ছড়ি চলবে
দুর্বলের উপর।
আবার মৃত্যুর মিছিলের
রথ চালু হবে মধ্যপ্রাচ্যে
অথবা কোন স্বার্থের ময়দানে।
তাই এই মৃত্যুর মিছিল
চলছে, চলবে…

দিনযাপন
শরিফ উল্যাহ

সবাই ঝকঝকে রোদে হেঁটে গেছি,
অনেক দূর-
কচিপাতা সবুজ ঘাস মাড়িয়ে,
শিশিরে পা ভিজিয়ে,
লতা-গুল্মের ঝোপঝাড় পেরিয়ে,
রসালের সুশীতল ছায়া অবগাহনে।

হঠাৎ বৈরী হাওয়া,
হাওয়ায় ভেসে পঙ্গপাল,
অদৃশ্য বিজানু চীন থেকে ইরান ইটালি,
ভারত বাংলাদেশেও,
অবশেষে বাড়ির পাশেও।
গজব আর গুজবের ঘোর-অন্ধকার।
লকডাউন,কোয়ারেন্টাইন,আইসোলেশন,
একাকিত্ব, গৃহবাস যেন গুহাবাস,
উসখুস মৃত্যুভয়ে দিনযাপন।।

হায় আমার দেশ
নাগসেন

সাত দিন ভাত নেই ঘরে।
এক কিলো আলু আর দু-কেজি চাল দিতে এসেছিলো বারো জন নেতা।
তারা ছবি তুলে নিয়ে গেছে, সে ছবির তলায় লাইক ৫৬৯ কমেন্ট ৮৪।
দুবেলার পর আমাদের যথারীতি উপবাসই চলছে।

হে করোনা দানব, তুমি এবার তো যাও।
খেতে পেলে হাত ও মুখ দুটোই ধুতাম। ভাত নেই।
কতোদিন আর হাত ধুয়ে ধুয়ে করা যায় দিনাতিপাত!
বেটিটার দিকে তাকাতেও পারি না।
তাকালেই ভাত চায় সে অবুঝ মেয়ে।

করোনাকালের শেষে
ফরিদা ইয়াসমিন সুমি

চলো না, এই করোনাকালে আমরা
দূ-রে সরে যাই,
পরস্পর থেকে অনেক অনেক দূরে।
যেতে যেতে অচেনা হয়ে যাই,
তারপর ধীরে ধীরে অজানা, অদেখা, অপরিচিত!
একে অপরের কাছে আগন্তুক হলে
নতুন করে প্রেমে পড়ার সম্ভাবনাকে
উড়িয়ে দেয়া যায় না, কী বলো!
সেই লোভেই নাহয় চলো,
আজ থেকে দূরে সরে যাই,
পরস্পর থেকে বহু বহু দূরে!
করোনাকালের শেষে
নতুন করে প্রেমে পড়ব,
শাশ্বত পৃথিবীর
চিরন্তন তোমারই!

আমিও আছি ঐ কফিনে!
কাজী রহিম শাহরিয়ার

ঐ তো, এগিয়ে আসছে সারি সারি কফিন
যেনো আমার দিকেই এগিয়ে আসছে…
হয়তো আমিও আছি ঐ কফিনে!

অদৃশ্য অসুখে পড়েছে পৃথিবী নামক এই গ্রহটি;
আদি সভ্যতার পীঠস্থান উহান থেকে
ধ্বংসের দিকে অভিযাত্রা করেছে সে…

কেয়ামতের নিদর্শন নিয়ে উপস্থিত করোনা’র কাল-
অগণিত অনিবার্য মৃত্যু
মানুষকে মানুষ থেকে করেছে পৃথক!

তোমার জন্য অপেক্ষায়, হে প্রিয়তম কফিন!

এক জ্যোতির্ময় আনন্দের প্রতীক্ষায় মগ্ন এই মন
নতুন জ্ঞানের মুখোমুখি হতে চায় সে;
ফিরে যেতে চায় মহাস্রষ্টার নিবিড় নিকটে
চায় চিরশান্তির অনন্ত উদ্যানে ফিরে যেতে!

তুমি এসো এক পবিত্রতম ক্ষণে-
পরম প্রিয়তমের সমীপে সিজদায় নতজানু আমি;

তোমার প্রতীক্ষায়, হে কফিন, হে অপরূপ মৃত্যু!

সাদা কাফনের প্রতীক্ষায় এই আমি
প্রতীক্ষায় প্রশান্ত এই মন…!

মৃত্যুর মিছিল
মেহেরুন ইসলাম

ধরণীর বুকে আজ আঁধারের চলাচল,
মৃত্যুর ছোবলে যেন থেমে গেছে কোলাহল।
নিস্তব্ধ নীরব এই পৃথিবীর চারিপাশ,
দৃষ্টির কোটর ছুঁয়ে দেখি সারি সারি লাশ।

স্নেহ,মায়া,ভালোবাসা ধোঁয়া ধোঁয়া মিছে আশা,
সুখের সীমানা বুঝি তছনছে ভাঙ্গা বাসা।
মৃত্যুর মিছিলে শুনি আর্তনাদ,হা-হুতাশ!
বাঁচা মরার সমরে বুকভরা দীর্ঘশ্বাস।

প্রাণের স্বজন মরে অপলক চেয়ে থাকা,
বাঁচার তাগিদে আজ নিজেরে সরায়ে রাখা।
এ কেমন মৃত্যু দৃশ্য! এ কেমন অত্যাচার!
প্রভু তুমি দয়া করো,তুলে নাও হাহাকার!

মুক্তির নিশ্বাস নিতে চায় মানুষ
নূরূন নাহার পাপিয়া

ব্যাস্ত নগরীর ঘুমকাতুরে মানুষেরা দীর্ঘ দিন একনাগাড়ে ঘুমিয়ে এখন আর ঘুমুতে চায় না,
এখন খোলা আকাশে মুক্ত বাতাসে উড়ে উড়ে যায় উড়তে চায়।
এ চাদ এখন আনন্দ দেয় না,
এই জোছনায় এখন প্রাণ জুড়ায় না,
রুপালী আলায় মানুষ আবেশে মাতাল হয় না।
মানুষ মুক্ত হতে চায়
বুক ভরে নিশ্বাস নিতে চায়, ঐ খোলা আকাশের নিচে,
এটাই একন স্বপ্ন বা চাওয়া একমাত্র।

ভালো নেই
সুশান্ত হালদার

ভালো নেই অনন্ত, ভালো নেই তরুলতা বৃক্ষ
আনন্দও লকডাউনে
শুধু সুখের বড়ি কিনে পাপিয়ার হয়েছে দিন সারা
বলাৎকারে মানুষ শুধুই নিয়েছে কেড়ে মহা-জাগতিক ছায়া

যদি ঘুম থেকে উঠে আর না দেখি জোনাক জ্বলা রাত্রির মহোৎসব
যদি রাত্রি শেষে ভোরের ডাকে ফিরে না আসে প্রাণ
যদি নিথর দেহে নিশ্বাসে আর না পাই তোমার অন্তর্বাসের ঘ্রাণ
তবে জেনে রেখো হিজল তমাল শাল সেগুনের বন
আত্মঘাতী মানুষই একদিন করবে তোমায় অবনত মস্তকে প্রণাম

ভালো নেই রঞ্জনা
ভালো নেই মহুয়া বনের অনাঘ্রাত মাধবীলতা
ভালো নেই পদ্মার জলে ভাসানের ঠিকানা
ভালো নেই শঠতার ঘরে ভালোবাসার রহিমা
ভালো নেই বৃদ্ধাশ্রমে রোগে শোকে আশাহত দীন-দুখিনী মা
ভালো নেই অন্ধ বিশ্বাসে সঁপে দেয়া ভালোবাসার প্রেমিকা
ভালো নেই প্রবাস জীবনের আশা নিরাশার দোলা
ভালো নেই মরমে তোমার অন্ধ-গলির কানামাছির খেলা
ভালো নেই টপ টু বটম রাজা থেকে প্রজা
ভালো নেই বসন্ত ছাড়াই ফোটেছিল যে জবা
ভালো নেই সোঁদামাটির গন্ধে ভরা রূপসী বাংলা

ভালো নেই অনন্ত, আনন্দময় জীবনের উচ্ছ্বসিত কবিতা
শুধু এখনও ভালো আছে…
ক্ষতবিক্ষত পাঁজরে নিভন্ত আগুনের প্রজ্জ্বলিত শিখা!