মানব রাজ্যত্বে মানুষ অসহায় হয়ে উঠেছে। সাথে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীও মানুষের অমানবিক অত্যাচারে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার উপক্রম। অনেক প্রাণী তাদের বংশ রক্ষায় কোনো প্রকার প্রটেকশন তৈরি করতে না পেরে চিরতরে হারিয়ে গেছে। মানুষ মানুষকে নির্মম অত্যাচার করেছে। এক জাতি অন্য জাতিকে নির্মূল করা জন্য তৈরি করেছে মানব হত্যার সরন্জাম। তারপর ঝাপিয়ে পড়েছে জাতিতে জাতিতে, ধর্মে ধর্মে, দেশে দেশে। আজ পৃথিবী যেন মানব পাপের কুণ্ডলিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, গাছ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, মাছ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, প্রাণীরা ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, মরুভূমি ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে। বায়ুমণ্ডল ফরিদায় করেছে প্রভুর কাছে। প্রভুর মানবের অত্যাচার থেকে আমাদের বাচান।

আজ সেই ফরিয়াদ কবুল হয়েছে। পৃথিবীতে প্রভু পাঠিয়েছে তার সেনাবাহিনী। সেই বাহিনির নাম ‘করোনা’। যার ভয়ে অত্যাচারি মানুষ গৃহবন্দি। তারা বের হতে পারছে না। নিজের সম্পর্ককে আজ অস্বীকার করছে। পিতার লাশকে গ্রহণ করছে না পুত্র-স্বজন। নিজেকে নিজে বিশ্বাস করছে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে তাদের জীবন।

কিন্তু আমরা এ পাপ থেকে মুক্ত হতে চাই। আমরা ফিরিয়ে দিতে চাই প্রাণের অধিকার। প্রকৃতির অধিকার। আমরা যার যার অবস্থান থেকে পাপ মুক্ত হবো। আমাদের পাপের পরিবর্তে পূণ্য করে প্রকৃতিকে বাচিয়ে রাখবো। আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তাদের সেবা করব। আমরা বন উজাড় করব না। আমরা পাহাড় কাটব না। আমরা সমুদ্রকে দুষিত করবো। আমরা হত্যার জন্য মারনাস্ত্র তৈরি না করে প্রকৃতির ভালোবাসার জন্য তৈরি করব নিরাপদ পৃথিবী।

পৃথিবীর প্রকৃতি ভালো থাকুক এই কামনা। করোনা সচেতনতায় সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখি ভালোবসার সম্পর্ক কাছি রাখি। করোনা সচেতনতা সংখ্যা ২০২০ : পর্ব-৫ প্রকাশ করা হলো :
আফসার নিজাম, সম্পাদক

সূ চি প ত্র

মানুষের রক্ষাকবচ :: গোলাম রসুল
একটা ‘কুন’ এর অপেক্ষা :: মাঈন উদ্দিন জাহেদ
বোধ :: ফেরদৌসী মাহমুদ
কবুল করো রাতের মোনাজাত :: তৌফিক জহুর
আইসোলেশান :: লুৎফুন নাহার রহমান
হাজি সাহেবের বদনাম হবে :: জিসান মেহবুব
দেখা হবে কিনা :: লায়লা ফাতেমা সুমী
পৃথিবীর গভীর অসুখ :: পিন্টু পোহান
একাকী :: শওকত ইমতিয়াজ
করোনার সূর্যাস্ত সময় :: নিরমিন শিমেল
করোনা তুমি কে? :: মো. মনিরুজ্জামান মনির
করোনাদিনের কাব্য-জয়তুন :: স্বপঞ্জয় চৌধুরী
অতিক্রম :: হরেকৃষ্ণ দে
মৃত্যু ভয় :: আবু রাইহান
শতাব্দীর ভয়ংকর নাম করোনা :: ফাহমিদা ইয়াসমিন
একলা সবাই :: গোপা ব্যানার্জী
আমিও আছি ঐ কফিনে :: কাজী রহিম শাহরিয়ার
স্তম্ভিত :: নাসরিন ইসলাম
মড়ক :: ফুয়াদ স্বনম
আমার শহর :: আবু জাফর খান

মানুষের রক্ষাকবচ
গোলাম রসুল

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেই বিশাল শূন্যতা
আর মনে পড়ে গেল যেদিন পৃথিবীতে একটাও মানুষ থাকবে না
তোমার অলস দৃষ্টিতে খসে পড়া একটি ধুমকেতু যে ভাবে হারিয়ে যায় দিগন্তের গায়
মেঘে মেঘে মানুষের দেহ রেখায় বজ্রপাত যেমন আমাদের একটি প্রচণ্ড যুদ্ধ

আলো জ্বলছে নিশ্চিহ্ন এর চূড়ায়
অন্ধ চোখে প্রেমের আবেদন
আর বিপুল শস্যক্ষেত্র
পৃথিবী তখন বালক ছিলো
মানুষের রক্ষাকবচ

তুমি ক্লান্ত হয়েছো পৃথিবীকে নিয়ে
আর আমি যতবার জীবনের কথা ভেবেছি আমার জিহ্বায় গজিয়ে উঠেছে বেদী
এখন অনেক রাত
আকাশ স্মরণ করছে আমাদের
প্রথম মানুষের সময় থেকে

একটা ‘কুন’ এর অপেক্ষা
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

লংঘন হয়ে গেছে যখন যত সীমালঙ্ঘনের সীমা,
যখন পৌঁছে গেছে সীমাহীন পিশাচের সীমায়,
বিজ্ঞানের ছদ্মাবরণে ভুলেগেলো যারা মানবিক ইতিহাসের পরিসীমা,
শুয়োরের দাঁতগুলো লুকিয়ে রেখে হেসেছিলো রাজনীতির ফাঁদে,
কেলাতে কেলাতে গাইলো তৃণমূল সংস্কৃতি গান,
শরীরের ভেতরে যে লুকানো হৃদয়,
তারো ভেতরে লুকিয়ে রেখে প্রতিহিংসার গান
যেভাবে গেয়েছিলো মানুষ কাশ্মীরে দিল্লীতে রেঙ্গুনে উহানে সানায়
পল্টনে শাহবাগে দোয়েল চত্বরে,
পিচঢালা রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিলো যখন বিশ্বজিৎ এর লাল টকটকে লৌহে,
মায়ের আর্তি তখন ছুঁয়েছিল প্রভুর আরশ,
বাবার আর্তনাদ তখন কেঁপে ছিলো সপ্ত আসমান।

দিল্লীর রাস্তায় রাস্তায় লাশ আর লাশে যখন বিকৃতির উৎসব জেগে ছিলো,
উহানের সরল বিশ্বাসী মানুষগুলো যখন বিস্মিত ছিলো
পৃথিবীর নীরব অভিনয়ে,
আবু ওয়াক্কাসের স্মৃতি জাগাতে জাগাতে কাঁদে তারা রাত্রির শেষ প্রহর।
সিজদার করুণ কান্নায় প্রথম আসমানে ওঠে শোকের মাতম।
সিরিয়ার ও ইয়েমেনের অভুক্ত শিশুরা যখন
উড়োজাহাজের শব্দে ত্রাণে মায়ায় ঘর থেকে বের হতো,
তাদের কান্না স্তব্ধ করে দিতো খুনী সালমানের বারুদের বহর,
তখন তখতের দাস আসাদের লোলুপ হিংসা কিংবা
মানুষের সংজ্ঞা তখন ভুলতে থাকা বিশ্ববাসী ঘুমিয়ে ছিলো।
তখন আর্তনাদ উঠেছিলো পৃথিবী প্রান্ত থেকে প্রান্তে।
তখন শুধু বিশ্বময় একটি ‘কুন’ এর অপেক্ষা ছিলো।

কৃষ্ণগহ্বরে চুয়ে পড়া তাপ,
মেরুতে গলতে থাকা বরফের টুকরো,
হাজার হাজার বছরের পুরনো জীবষ্ম
শুধু আর্তনাদ করে উঠেছিলো দলিতদের দু:খে,
নিপীরিতদের কষ্টের গোঙানী
উদ্বেল করেছিলো হাজার বছর আগে বরফে ঢাকা থাকা কতিপয় জীবাণু মন।
হাজার হাজার জীবাণু তখন জেগে উঠে হিমবাহের তলা থেকে।
ক্ষোধে দ্রোহে জিঘাংসায় নড়ে ওঠে তাদেরও বোধ।
ওরা শুনতে পাচ্ছে ইথারে ইথারে ভাসছে নাসিফা উমারের প্রার্থনা
‘অবরুদ্ধ করো …
অবরুদ্ধ করো…
পুরো পৃথিবী অবরুদ্ধ হোক
পুরো পৃথিবী কিছু সময় থেমে যাক, থেমে যাক…
অবরুদ্ধ হলে, থেমে গেলে
পৃথিবী নিপাট ভদ্র মানুষগুলো বুঝতো
এভাবে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা
মানুষগুলো বুঝতো মিডিয়াবাজি ও সত্য কত নির্মম।
ক্ষমতা কত হাস্যকর।
অহংকার কত ঠুনকো।
মানুষ কত বৈপরীত্যযুক্ত নাদান…’

ক্রমান্নয়ে ওরা আসছে থাকে
ওরা নেমে আসে বিজ্ঞানাগার থেকে
ওরা নেমে আসে উহানের মৎস্যনীর গ্রীবা থেকে,
ওরা নেমে আসে জলে স্থলে ইথারে
ওরা নেমে আসে মহাদেশ থেকে মহাদেশে
ওরা নেমে আসে রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে
ওরা নেমে আসে জেলায় জেলায় থানায় থানায়
প্রতিটা মহল্লায় মহল্লায়।
ওরা শুধু খুজঁছে প্রাণ-
যারা তাদের হাজার বছর আগে বিলুপ্ত করতে উদ্যত হয়েছিলো…
ভালো নয় মন্দ নয়, কালো নয় ধলো নয়, বোধ আছে, কী বোধায়,
কোনোটাই নয়।
শুধু দু’পায়া, চারপায়া জন্তুগুলো ওদের কব্জায় চায়।
যারা হুশ আছে বলে বেশী পরিচিত,
পল্টনে শাহবাগে দিল্লীতে কাশ্মীরে সিরিয়ায়
উহানে আরকানে আফগানে কিংবা সানায়
পথে প্রান্তে রক্তে ভেসে যাওয়া লোহিত উল্লাসে যারা পরিচিত,
এমন দু’পায়াদের টুটি ধরতে
এমন উদ্যত অহংকার চুর্ণ করতে
এমন বিস্মিত আকাশ পাতাল জয়ের লোভ মোথিত করতে…।

মিডিয়ার রঙিন অক্ষরের ওদের যে যায় বলুক
রক্তের আর্তনাদ কেউ কখন থামাতে পারেনা
ভুলিয়ে দিতে পারবেনা ওদের পরিচয়।
ওরা সভ্যতার করে অভিনয়
ওদের চেহারার ভেতরে লুকিয়ে আছে
আরও একাধিক মুখ
মুখের পর মুখ,
পরতে পরতে ভাঁজে ভাঁজে খাজে খাজে নানা রূপ।
রঙের ভেতরে রঙ,
বিকট বিদঘুটে বিভৎস এক জন্তুময় অবয়ব…

বোধ
ফেরদৌসী মাহমুদ

বিকশিত আলোতেও নিজের মুখটাকে চিমনির কাছে মলিন মনে হলো,
গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে আরো কী কী নমুনা পেশ হবে শুধু তাঁর হাতে।
অদৃশ্য স্রোতের সাথে কতক্ষণ লড়াই চলবে
নাকি বোধের বোধগম্যতা কে জাগ্রত-আত্মার মোকাবেলায় ছেড়ে দিতে হবে, আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনে?
এ অচলায়তনতার গভীরে গিয়ে ভাবুন
আসলে কী কী করণীয় ঠিক এ সময়ে?
নাকি এখনও ঘোড়ার আগে গাড়ি এটে ভবিতব্যতায় আলোর মশাল জ্বালবে!
আর একের আগে অজস্র জিরো বসিয়ে
ব্যকুববোধে দাঁত বের করে কেলিয়ে হাসবে!
নির্বোধের যে কত ধরন
তালিকা ঘাটার সময় কী আছে?
বাপু! অত ভেবে আর কাজ নেই
নিজের তাগিদে সবার কথা ভাবো!
বোধের বিলি কেটে বাস্তবতায় ফিরে এসো
চোখ খোলার আগে-
চোখকে বোধের বাইফোকাল গ্লাস পড়াও
দেখবে চিক চিক করা মরুর উদর কী অনাবিল আনন্দের অনুভূতি নাচছে
তার মহিমা কতটা তীব্র
কে না জানে?

কবুল করো রাতের মোনাজাত
তৌফিক জহুর

জেনেছি ধর্মের জ্ঞানে সৃষ্টির প্রাণ আঠার হাজার
আমরা মানুষ জাতি পৃথিবীতে তাদেরই একজন
যাঁর জ্ঞান যতটুকু দেশে দেশে করে তোমার এবাদত
তুমি কি দরখাস্তের খিড়কি দুয়ার করেছো বন্ধ?

পৃথিবীতে আজ দলে দলে সবাই জপছে তোমার নাম
যে যেভাবে চিনেছে তোমায় সকালে ও সন্ধ্যায়
কবুল করোনি তুমি মানুষের কোনো হাহাকার
করেছো কবুল মানুষ ছাড়া সকল প্রাণীর ফরিয়াদ

সাগর করেছো আজ গোলাপি ডলফিনের হানিমুন
সাগরলতাও ছেয়ে গেছে সাগরের আঙিনায়
শান্তিতে ঘুরছে তোমার সৃষ্টি ক্যাঙারু সড়কে সড়কে
বেরিয়ে এসেছে হাতি গাড়িশূন্য রাজপথে

ধূসর আকাশ হয়েছে জামদানী নীল
পৃথিবীর বাতাস হয়ে গেছে বিষ বিহীন
গাছের পাতারা পেয়ে গেছে হারানো সবুজ
ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে ফুলের বাগান

একটা বিষয় জেনেছি তুমি তো দয়ার সাগর
আকাশ থেকে নামলে বৃষ্টি কে পারে ঠেকাতে
নেমে এসো নেমে এসো আলোর ঝরনা
মৃত্যুর মিছিল থেমে যাক মানুষের কান্না

তোমার সকল সৃষ্টির সাথে করেছি জুলুম
মাফ করে দাও একটা সুযোগ চায় মানবকূল
এ জীবনে আর হবে না ভুল করছি তওবা
মানুষ বিহীন পৃথিবী সাজিয়ে কি লাভ বলো!

হে বৃক্ষ হে পাহাড় হে সমুদ্র হে আকাশ হে বাতাস
তোমাদের তরিকায় আমাদের চেনাও নূরের পথ
শেষ রাতে বসে আছি করজোড়ে চোখে জল
আমাকে সাজিয়ে দাও তোমার কুদরতে।

আইসোলেশান
লুৎফুন নাহার রহমান

আমি আর মানবোনা এই আইসোলেশান
কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই
তোমার কাছে আসবো।
তখন অনেক রাত
তুমি ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শোবে
আচমকা টের পাবে
তোমার পাশেই আছি
ঘরময় আমার মিষ্টি সুবাস।
বিমোহিতের মতো চোখ মেলে দেখবে
ঠিক জড়িয়ে আছি
হৃৎপিন্ডের ধুকপুক।
এই নিষ্ঠুর আইসোলেশান
আমাদের দূরত্বকে করেছে
অসংখ্য আলোকবর্ষ সমান।
আমি ঠিক অতিক্রম করবো এই দূরত্ব
তোমার জানালার পর্দায়
দখিন হাওয়া হবো
লেখার কাগজে হবো
গুটিগুটি অক্ষরের শব্দমালা।
কেউ জানবে না কেউ দেখবে না।
খুব গোপনে ছুঁয়ে দেবো তোমার করতল
আলতো আদরে ঘুমপাড়ানি গান হবো
নিঝুম রাতের নীরবতায়।

হাজি সাহেবের বদনাম হবে
জিসান মেহবুব

কে না বলেছিল
করোনার চেয়ে
আমরা শক্তিশালী,
হাজি সাহেবের
বদনাম হবে
নয়তো দিতাম গালি‍।

শালা কোথাকার
মহামারী নিয়ে
ফুটানি দেখাও কতো!
গজবের সাথে
মোকাবেলা চলে?
সেজদাতে হও নত‍।

লাশ গুনে গুনে
নাজেহাল হবে
যদি না রহম ঝরে,
প্রার্থনা হোক
সন্ধে-সকাল
বাংলায় ঘরে ঘরে‍।

দেখা হবে কিনা
লায়লা ফাতেমা সুমী

থেমে গেছে কোলাহল
সাতসকালে যন্ত্র দানবের ছোটা
কর্মক্ষেত্রে ঝুলছে তালা
অস্বস্তিতে দেয়ালে মাথা কোটা।

লাঠি হাতে আর বলছেনা মিস
থামনা পাজির দল
মনে পড়তেই ছুটছে চোখে
শ্রাবণ দিনের জল।

চায়ের দোকানে জমছে না আর
রাজনীতি নিয়ে ঝড়
রাস্তাঘাট সব ফাঁকা পড়ে
আটক নিজের ঘর।

পার্কে কিংবা মাঠে ঘাটে
বসছে না আজ কেউ
কপোত কপোতী গুনছে না ঐ
উদাসী নদীর ঢেউ।

প্রেম ফলগুলো নেতিয়ে পড়েছে
হকারেরা হয়েছে বেকার
মধ্যবিত্ত চক্ষু লজ্জায়
বিপদে বলো কে কার?

আমি শুধু নয়,বিশ্বে সবাই
হয়তো ভাবছে এমন
মহামারী হঠাৎ উধাও হলে
বলোতো হতো কেমন।

জানিনা আর দেখা হবে কিনা
সূর্য ডোবার ছবি
মরে পড়ে থাকি কে কখন কোথা
ফেলে রেখে ভবে সবি।

দেখা হয় না কতোদিন সব
প্রিয়জন প্রিয়মুখ
হতাশায় ভাঙ্গে অন্তর আর
হুহু করে ওঠে বুক।

শুভাশীষ শুধু বেঁচে থাক ওরা
দুনিয়াতে যতো লোক,
মহা দুর্যোগ চাই না কখনো
চাইনা বইতে শোক।

কোনটা যে কার শেষ কথা হবে
জানিনা সঠিক ক্ষণ
দৃঢ় প্রত্যয়ে সদা থাক জেগে
আত্মবিশ্বাসী মন।

পৃথিবীর গভীর অসুখ
পিন্টু পোহান

আপনি আবার ঘুমাতে চল্লেন?
-আমি আপনার বাবুর বাঁধা গোলাম নাকি,
জেগে থাকতে বললেই জেগে থাকতে হবে?
-আপনি সমাজ সচেতন!
-ছিলাম একসময়!
যখন কৃষকরা আত্মহত্যা করছিল আর আপনারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন! যখন অসমে উনিশ লক্ষ মানুষের পায়ের নিচে থেকে দেশ সরে গেল। দিকে দিকে ডিটেনশন ক‍্যাম্প তৈরি হল। গৌরী লঙ্কেশকে খুন করা হল।
-গৌরী লঙ্কেশ?
-চেনেন না? কালবুর্গীর নাম শুনেছেন?বুঝেছি! বাবু না ডাকলে যার ঘুমই ভাঙে না…
-না,না, আজ বাবু নয় পৃথিবীর এ মহাবিপদে…
-একটি ভাইরাস যদি দেহে ঢুকে যায় সেই ভয়ে!
তাহলে ঘরেই থাকুন। নইলে আমার মতো নিশ্চিন্তে ঘুমোন!
-তা কি হয়? পৃথিবীর কঠিন অসুখ!
আমাদেরও কর্তব্য থাকে কিছু!
-তাহলে আজই এসি-ফ্রিজ বর্জন করুন!
যুদ্ধাস্ত্রগুলো ফেলে দিন সাগরের জলে!
-তা কি হয়?
-বাবু বললেই হয়ে যাবে! কিন্তু বাবুরা বলবে না!
হিসেব মশাই! আপনাদের জাগা আর জেগে ওঠাটাও হিসেবের খেলা।
থাক! এবার আমায় যেতে দিন!
পৃথিবীর গভীর অসুখ জেগে উঠছে চারিদিকে!

একাকী
শওকত ইমতিয়াজ

সত্যি কি একদিন সবার সামনে
একটি সাদা জিপ
কোলে তুলে নিয়ে আমায় নিয়ে যাবে এই শহরের ব্যস্তবাজার ঘেঁষা
রাস্তার পাশ দিয়ে
জনমানবহীন করোনা গাড়িতে।
প্রেম ও কামনায় যারা আমাকে চেয়েছিলো,
বন্ধুতায় যারা চেয়েছিলো
যারা আমার খোঁজ খবর নিতো
যারা আমায় দেখলেই বলতো, চা খাবি
আর যাদের চেহারায় আমায় প্রশ্রয়ের হাসি।
যাদের স্নেহ আমায় করে দে দুরন্ত ঘোড়সওয়ার।
তাদের উৎকন্ঠিত মুখও পাবনা।
পাবনা তাদের শেষ শ্রদ্ধ।
আমি একাকী চলে যাব।
কারও চোখের জলে ভিজবেনা আমার কফিন।
শুয়ে পড়বো একাকী।
যেমন একাকী এসেছি।

করোনার সূর্যাস্ত সময়
নিরমিন শিমেল

সুদীপা, আমায় একবার শুধু ছুঁয়ে দাও প্রিয়
তোমার উষ্ঞ পেলবতাটুকু প্রাণভরে অনুভব করি।
আমার চারদিকে করোনা আগ্রাসনের
ভয়ার্ত ঘেরাটোপ,
মাথার ভেতর নৈঃসর্গিক স্নায়ুকোষ
তপ্ত প্রদাহে ভার হয়ে আছে সারাক্ষণ ।
ভীষণ ইচ্ছে করছে
কাঁধের কাছে একটিবার হাত রাখো,
চুলের অরণ্যে পাঁচটি আঙুলের বিলি কেটে দাও।
চোখের পাতায় গভীর প্রশান্তি নেমে আসুক।

গলার কাছে করোনার কণ্টকিত কন্ঠহার
ক্যাকটাস কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
ঢোক গিলতেও ভীষণ অস্বস্তি ।

দেখতে দেখতে দশটি দিন পেরিয়ে যায়।
এ ঘরে এখন আর কেউ আসে না।
এই যে ছোট ঘরটি, লাগোয়া স্নানঘর, টয়লেট,
মুখ ধোয়ার বেসিন , আইসোলেশনের এই পরিমণ্ডলটুকু ভয়াল নির্জনতায় অন্ধকার কবর।
ছোট্ট টেবিলে ঢাকা দেয়া খাবার , ফল, জলের গ্লাস
নৈসর্গিক নিস্তব্ধতায় পড়ে থাকে।
এই নির্জন ঘরে নিভৃতে আমি একাকী
পড়ে আছি নিঃসঙ্গ। ।
কারো দেখা নেই।
এখানে ঘড়ির কাঁটা নির্বাক বিস্ময়ে
থমকে নিস্তব্ধ চেয়ে রয়।

গলার কাছে ব্যথাটা আরও তীব্রতর।
জরতপ্ত ললাট , থার্মোমিটারে পারদের উচ্চতা
একশ’চার ছাড়িয়ে যায়।
বুকের পাঁজর হাঁপরের মতো ওঠানামা করে।
বিন্দু বিন্দু শ্বাস নিতে খুব কষ্ট,
দমবন্ধ হয়ে আসতে চায়।
এই স্থবির সময়ে সুদীপা তুমি কাছে নেই।
প্রিয় মুখগুলি কাছে নেই।
কারো দেখা নেই।
নিঃসীম নির্জনতার নিমগ্ন আঁধারে
ধীরে ধীরে আমি ডুবে যেতে থাকি।
সুদীপা তোমার দেখা পেলাম না।
এই স্থবির সময়ের ক্রান্তিকালে
তুমি ভাল থেকো প্রিয়।

করোনা তুমি কে?
মো. মনিরুজ্জামান মনির

করোনা তুমি কে?
বুঝলাম তুমি মরণ ব্যাধি ভয়ংকর ভাইরাস।
নাম তোমার কোভিক-১৯ বুঝলাম।
তবে তুমি এতো নিষ্ঠুর কেন?
করোনা তুমি এতোটা পাষাণ কেন?
কিন্তু কেন হে করোনা ভাইরাস!
তুমি এতোটা ভয়ংকর বিভৎস হলে?
কেন তুমি বিশ্ব জুড়ে উন্মত্ততায় মেতেছো?
কিন্তু কেন?
কেন তুমি মানুষকেএক্কেবারে থামিয়ে দিলে?
কেন তুমি ক্ষমতাকে টেনে রাস্তায় নামালে?
আজ দেখছি-
তুমি অহংকারীর দর্প চূর্ণ করে দিয়েছো।
তুমি মিথ্যুক জন সেবককে চিহ্নিত করেই দিলে।
তুমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দান কারীকে হারিয়ে দিলে?
হারিয়ে দিলে-
বর্বরদের যারা ইতরামি করছিলো।
তুমি পথেই বসিয়ে দিলে গরীব মধ্যবিত্তদের!
কিন্তু কেন?
কেন তুমি সোনালি স্বপ্ন গুলো চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিলে?
খুন খারাবি ধর্ষণ রাহাজানিতে ছিল লিপ্ত তাদের
কেন তুমি মৃত্যুর মিছিলে স্লোগান দিলে এতোটা গর্জনে!
তোমার গর্জনে মানুষ ঘরের ভেতরে গেলো ঢুকে।
বনের হিংস্র জন্তু দখল করে নিল রাজপথ।
অবিশ্বাসীদের তুমি ভয় ধরিয়ে দিলে।
এ কিসের ইঙ্গিত দিতে এলে বিশ্বমাঝে?!
কিছুই জানিনা-
তবে এতোটুকু তোমার প্রতি অনুরোধ ছিল
তুমি বিগত পাঁচ মাস ধরে অনেক সংসার অথৈ সাগরে নিক্ষেপ করেছো।
এতিম করেছো অনেক শিশুদেরকে।
চিরতরেই বিধবা করেছো অনেক স্ত্রীকে।
অনেক স্বামীকে স্ত্রী বিয়োগান্তে মন ভেঙ্গেছ।
আর নয়।
প্রভু পরোয়ার দেগার এহেন ভর বিপদ ভাইরাস থেকে
আমাদের মুক্তি দাও।
তুমিতো মহান রহমানির রহিম।
আর নয়।

করোনাদিনের কাব্য-জয়তুন
স্বপঞ্জয় চৌধুরী

জয়তুন শুনলাম দ্যাশে মড়ক ধরছে
জামতলির মোড়ে গেলাম
দারোগা বাবু কইল ঘরে থাহো
মজু সওদাগরের কাছে যাইয়া কাম চাইলাম
কইলো ঘরে থাহো
লাল ঠোঁট করা ওই ব্যাংক দিদির
কাছে পঞ্চাশটা টেহা চাইছিলাম
কইলো ঘরে থাহো
বাইচ্যা থাকলে অনেক খাইতে পারবা।
জয়তুন আমার ঘরডা কুনহানে
ইট্টু দেহাইয়া দে আমি ঘরে থাকুম
জয়তুনের মুখে জবাব নেই
আছে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে
দেখা বৃথা আস্ফালন।
হয়তো জয়তুন বলতে চায়-
ওই যে আসমান,
এই পিচঢালা পথের উপরে
আসা ঠাডাপড়া রোউদ,
নীল গাং ভাইংগা আসা
সর্বনাইস্যা ঢেউ,
এই দুনিয়ার যত গাছ গাছালি
বেবাগ তোমার ঘর বাজান।
তুমি আর রিফিলের লাইনে
তিন ফুট দূরে খাড়াইয়া খালি
হাতে ফিরা আইসোনা বাপজান
ঘরে থাহো,
বাঁচলে অনেক খাইতে পারবা
দ্যাশে মড়ক নামছে।
রাইতের আন্ধারে যহন কিলবিলাইয়া
মরা আলোগুলান জ্বলজ্বল করে
ওই ভাংগা ডাস্টবিনডার কাছে
তহন ওই হাভাইত্যা কুত্তার লগে
আমিও যাই খাওন খুঁজতে
তোমার কোনো চিন্তা নাই বাজান
ঘরে থাহো দ্যাশে মড়ক নামছে।

অতিক্রম
হরেকৃষ্ণ দে

দুর্দিনের কাঁটাঝোপ ঘিরেছে
দরজার প্রস্থানরত পায়ের পেশি,
একলা গানের কলি আজ কোমর আঁকড়ে দিয়েছে ঘরকুণো আলাপ৷

মারণ ঝড়ের ভাইরাস আগুন আজ নিত্য মৃত্যুর দাবায় সূর্য ডোবায়,
ছাদের ফুলের টবে মন খারাপের আলো,
খাঁচার টিয়ের উপবাসি ডানার মত কুলুপ আঁটা আনন্দের অপরাহ্ণ৷

নতুন আলুর বন্ড ছিঁড়তে থাকে দুঃসময় তিলকের কপাল,
দৈনিক সংসারের ক্যালেণ্ডার তারিখ কামড়ায়
পেটের দাঁতে, তবুও পরিযায়ী শ্রমিকের কথা ওড়ে
করোনার বিষাক্ত লড়াইয়ের লকডাউনে…

সেফ্টি রিং দায়িত্ব নেয় দূরত্বের সতর্ক সামাজিকতায়,
বন্দীঘর শরীর আটকায় পারস্পরিক সুস্থ বার্তায় আর মাস্কের প্রাচীর আটকে রাখে সাবধানী শৃঙ্খল ভাঙার স্বপ্ন৷

করমর্দন নয় আজ ভাইরাসের সচেতনায়-
হাত পাতো মুক্ত হোক তেইশ সেকেণ্ডের সফেন হ্যাণ্ডওয়াশের কঠোর লড়াই তিলক ঢেলে দিই,
অতিক্রম করি মহামারীর উহান দুর্গ,
আগামী আবার আসুক ফিরে নতুন সূর্য নিয়ে…

মৃত্যু ভয়
আবু রাইহান

হায়! সমস্ত ভালোবাসা আজ পরাজিত
আমাদের বিশ্বাসের জড়িয়েছে
অমোঘ মৃত্যু ভয়
কোন এক অজানা আশঙ্কায় স্তব্ধতা বিশ্বময়
নির্জনতায় প্রহর জাগে কেবল রাত্রি নিশাচর
পৃথিবী ঘুমালেও আতঙ্ক নিয়ে জেগে থাকে ঘর!

শতাব্দীর ভয়ংকর নাম করোনা
ফাহমিদা ইয়াসমিন

বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের নাম ভাইরাস- করোনা
শোনরে মুমিন ইমান আমল নিয়ে লড়োনা
ভয় পেয়েছে মৃত্যুর মিছিল এমন মহামারি
বিশ্ব মুসলিম স্রষ্টার নামে তসবিহ জপো তাড়াতাড়ি।

ডাক্তার বিজ্ঞানী বিশ্ব মোড়ল মৃত্যুর সংখ্যা কি কম!
ভয়াবহ করোনা ভাইরাস মানব জাতির মৃত্যুর যম
স্যানিটাইজার, মাস্ক ব্যবহার করো আপাতত
তবেই কেবল করোনা ভাইরাস হবে মাথা নত।

দলবদ্ধতা পরিহার করে সাবধানতা দরকার
এই যুদ্ধে লড়তে পারবে না কেবল একা সরকার
করোনা আজ বিশ্বজয়ী, মারছে চার ছক্কা
সৃষ্টিকর্তা মহান তুমি করো আমাদের রক্ষা।

একলা সবাই
গোপা ব্যানার্জী

তুমি চলে যেতেই পারো
প্রথম আলাপের সময়টা, মনে থেকে যাবে।

তুমি অভিমান করতেই পারো
কষ্টটা না হয় দু’জনে ভাগ কোরে নেবো ।

তুমি ভুলে যেতেই পারো
স্মৃতি গুলো মনের খাঁজে জ্বল জ্বল করবে ।

তুমি ঘৃণা করতেই পারো
একদিন ভালোবেসে ছিলে,কী করে ভুলবে ।

তুমি অচেনা হয়ে অন্য পথে যেতেই পারো
তোমার চেনা পায়ের শব্দ কানে বাজবে ।

তুমি অবহেলা করতেই পারো
অনুতপ্ত শব্দটা শুধু আমার অভিধানেই পাবে।

তুমি একলা ফেলে চলে যেতেই পারো
পেছনে তাকিয়ে দেখ অস্তিত্ব একলাই ।

তুমি আমাকে বুঝতে না’ই পারো
তোমার বোঝানোটা আমার ভীষন পছন্দের ।

তুমি ফিরে না’ই আসতে পারো
তুমি ফিরবে সেই অপেক্ষায় আমি থাকবো ।

আমিও আছি ঐ কফিনে
কাজী রহিম শাহরিয়ার

ঐ তো, এগিয়ে আসছে সারি সারি কফিন
আমার দিকেই যেনো এগিয়ে আসছে কফিনগুলো
হয়তো আমিও আছি ঐ কফিনে!

অদৃশ্য অসুখে পড়েছে পৃথিবী আজ
আদি সভ্যতার পাদপীঠ উহান থেকে ক্রমেই
ধ্বংসের দিকে অভিযাত্রা করেছে সে…

কেয়ামতের নিদর্শন নিয়ে এসেছে করোনা’র কাল-
অগণিত অনিবার্য মৃত্যু আজ
মানুষকে মানুষ থেকে করেছে পৃথক
আর প্রিয়জনকে করেছে পৃথক প্রিয়জন থেকে।

মৃত্যুর হিসাব নিয়ে হিমশিম মীরজাদী সাবরিনাও-
আজরাইল তাঁর সাথে কী কথা বলছে কানে কানে?

আমিও তোমার জন্য অপেক্ষায়, হে প্রিয়তম কফিন!

এক জ্যোতির্ময় আনন্দের প্রতীক্ষায় মগ্ন এই মন
নতুন জ্ঞানের মুখোমুখি হতে চায় সে;
ফিরে যেতে চায় মহাস্রষ্টার নিবিড় নিকটে
চায় চিরশান্তির অনন্ত উদ্যানে ফিরে যেতে!

তুমি এসো এক পবিত্রতম ক্ষণে-
পরম প্রিয়তমের সমীপে সিজদায় নতজানু আমি;

তোমার প্রতীক্ষায়, হে কফিন, হে অপরূপ মৃত্যু!

সাদা কাফনের প্রতীক্ষায় এই আমি
প্রতীক্ষায় প্রশান্ত এই মন…!

স্তম্ভিত
নাসরিন ইসলাম

নেই তো কোলাহল
নৈঃশব্দ্য’র পড়ছে ধুম
নিদ্রাদেবী আলতো করে,
তুলি আঁচড়ে এঁকে
দেয়না তো আজকাল
পিট পিট চোখের পাতায় চুম।

বেভুলা নুহ্য ভঙ্গুর পথিকের
বুকফাঁটা আর্তনাদ
বসূধা নিঃস্তব্ধ নিঝুম
শোকাভিভূত দিন-রাত।

পাখির কিচির-মিচির তান
অভয়ারন্য স্তম্ভিত নির্মোহ ধ্যান।

জনস্রোত শূন্য পদচারনা হীন
মুহ্যমান জনপদ নিভৃতে
বাজায় বেদনার বীন।
বিধ্বস্ত জগত প্রেতপুরীর ফাঁদে
মানব সভ্যতা
নীরবে নিঃশব্দে কাঁদে।

মড়ক
ফুয়াদ স্বনম

আড়মোড়া ভাঙার কালে আমার কেবল ঘুম আসে,
কেন প্রতিদিনই তারার মতো এক-দুটো মুখ খসে?

বানের মতোই ভালোবাসা খড়কুটোকেও টেনে নেয়,
আমাদের কি সাধ্যি রুখার, যাকে স্রষ্টার প্রেমে পায়?

হা-হাপিত্যেশ করছি সবে, কখন নিজের পালা আসে?
কার্ফু বসেছে ডালে ডালে, ফুলের ঘ্রাণে মড়ক ভাসে।

ঝুলছে তালা, পুড়ছে সকাল, উড়ছে কালো মেঘটা,
অকাতরে ঝরছে যে প্রাণ, যুঝছে সারা দেশটা।

বাস, ট্রাম যত আজ চাকাহীন, বগি হারিয়েছে ট্রেন,
পারদের ওঠানামা তুঙ্গে এখন, স্বপ্নে বাড়ছে প্রেম।

অছোঁয়ার এক সেনাপতি ঘিরে ভরসা সবারই গাঁথা,
সবই যাবে থেকে, রইবেনা শুধু কোনই স্বর্ণলতা।

পর্দা লাগাও, জানালা ভেড়াও, খিড়কি গুঁজো দুয়ারে,
বর্গী এলে বলে দিবো শুধু, খোকা-খুকু ঘরে শোয়ারে।।

আমার শহর
আবু জাফর খান

কতদূর এগোলো পৃথিবী
কতদূর সভ্যতা, মানুষইবা এগোলো কতটা!

গোটা পৃথিবী আজ আমার শহর
হ্যামারস্টার থেকে পোয়ের্টো উইলিয়াম
ইউকন থেকে আলসেক নদী সমস্তই একটা ভূখণ্ড এখন;
যে নদী কদিন আগেও পূর্ণ ছিল গ্লেসিয়ারে
কী আশ্চর্য, সমস্ত হিমবাহ অদৃশ্য এখন!

কতদূর এগোলো সভ্যতা
প্রযুক্তির উদ্ভাবনইবা কতটা এগোলো!
এক অবিকার অদৃশ্য অণুজীব বলে যায়-
হে মানুষ, তোমার আত্মরম্ভিতা, অহম, তোমার দম্ভ-চিৎকার
কেবলই তোমার আত্মপ্রচার!

অগ্নি আজ মানুষের সহোদর
যত্রতত্র ছাই, স্ফুলিঙ্গ আর পোড়া গন্ধেরা ওড়ে,
শেষ বলা কথাটুকু ছাড়া বাদবাকি সমস্তই পোড়ে
পোড়ায় এক অযাচিত অদৃশ্য মারণাস্ত্র;
মানুষের শরীর কেবল আজ তার একার শরীর
মৃত্যুয় শায়িত দেহ মাথা রাখে না প্রেমিকার বুকে
প্রেমিকা কাঁদে! কান্নার শব্দ আসে না মৃতের কানে!

আমি আলসেক নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে-
ভুলে যাই আমার পুরোনো বাতিল কাঠামো,
ভুলে যাই মৃতদের নাম! সবই বাহুল্য! এখানে না থাকাটাই থাকা!
শূন্যই অস্তিত্ব! যেখানেই শোক-
সেখানেই বিস্তৃত গোর; যেখানেই সন্তাপ-
সেখানেই শ্মশান বিস্তৃত, আর ফালি ফালি অন্ধকার!

ব্যালিস্টিক মিসাইল মুখ ব্যাদান করে-
ঘাড় গুঁজে পড়ে আছে,
ভূমধ্যসাগরে রণতরির গতি শ্লথ
পরমাণু বোমায় দাম্ভিক হয়ে ওঠা আত্মরত মানুষগুলোর মুখে
লৌহ-কীলক,
উড়ে আসা মৌনগ্রস্ত মুখগুলো নৈঃশব্দ্যে ভরা
শব্দ নেই, কেবল নীরবতা
কিছু আহাজারি শুধু বাতাসে ভাসে!

জ্যাকসন স্কয়ারে একা দাঁড়িয়ে দেখি-
কোথাও কেউ নেই, শূন্য ক্যাথেড্রাল!
সেগুন পাতার ছায়ারঙা মেঘ
ছেয়ে ফেলে আকাশ, পুঞ্জ সেই মেঘের ভেতরে
আমার পিতা-পিতামহের মুখ,
চিলেকোঠা তুলোবীজের মতো অন্ধকার!

কতশত মানুষের বিষণ্ন চোখের মতো-
এক একটা সন্ধ্যা নামে, বৃষ্টিতে ভিজে যায়-
সেই আঁধার চোখের ঘর,
এক অলীক কড়িকাঠ থেকে নেমে আসা দড়ি
অল্প অল্প দোলে,
আমি স্থির তাকিয়ে থাকি পেন্ডুলামের মতো দোলা সেই দড়ির দিকে!

জানি আমি,
আবার বসন্ত নামবে আমার শহরে
আমার শহর মানে নরওয়ে থেকে চিলি-
আলসেক নদী থেকে মারে রিভার, সমস্তটাই
হরিৎ পাতার নতুন রঙে সেজে উঠবে ধরিত্রি
তুমি আমি আমরা- মেঘ-ছেঁড়া মন-ভালোর রোদ এসে পড়বে-
আমাদের হাসির ওপর,
ডুমুরপাতার আড়াল থেকে ডেকে উঠবে ঘুঘু
লন্ডন ব্রীজে আবার হাত ধরে হাঁটবে প্রেমিক-প্রেমিকারা
ভ্যানিসের জলে ভাসবে বর-বধূর প্রমোদতরি
ভ্যাটিকানের আকাশে দল বেঁধে উড়ে যাবে সাদা বকের ঝাঁক
সেন্ট লুইস ক্যাথেড্রাল মানুষে গমগম করবে
জ্যাকসন স্কয়ার ভরে উঠবে জনতার কল্লোলে;

আমি বুঝে উঠি-
এইসব ভেসে চলা কালো কালো মেঘের-
অদলবদল নিয়ে ধীরে ধীরে আবার তৈরি হবে একটা রঙিন ছবি,
আমার শহরের এইসমস্ত দৃশ্যের বাইরে, সমস্ত সুরের ঊর্ধ্বে
এক অলৌকিক তারাভরা আকাশের জন্য আমি আবার প্রস্তুত হই।