মানব রাজ্যত্বে মানুষ অসহায় হয়ে উঠেছে। সাথে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীও মানুষের অমানবিক অত্যাচারে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার উপক্রম। অনেক প্রাণী তাদের বংশ রক্ষায় কোনো প্রকার প্রটেকশন তৈরি করতে না পেরে চিরতরে হারিয়ে গেছে। মানুষ মানুষকে নির্মম অত্যাচার করেছে। এক জাতি অন্য জাতিকে নির্মূল করা জন্য তৈরি করেছে মানব হত্যার সরন্জাম। তারপর ঝাপিয়ে পড়েছে জাতিতে জাতিতে, ধর্মে ধর্মে, দেশে দেশে। আজ পৃথিবী যেন মানব পাপের কুণ্ডলিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, গাছ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, মাছ ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে, প্রাণীরা ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, মরুভূমি ফরিয়াদ করেছে প্রভুর কাছে। বায়ুমণ্ডল ফরিদায় করেছে প্রভুর কাছে। প্রভুর মানবের অত্যাচার থেকে আমাদের বাচান।

আজ সেই ফরিয়াদ কবুল হয়েছে। পৃথিবীতে প্রভু পাঠিয়েছে তার সেনাবাহিনী। সেই বাহিনির নাম ‘করোনা’। যার ভয়ে অত্যাচারি মানুষ গৃহবন্দি। তারা বের হতে পারছে না। নিজের সম্পর্ককে আজ অস্বীকার করছে। পিতার লাশকে গ্রহণ করছে না পুত্র-স্বজন। নিজেকে নিজে বিশ্বাস করছে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে তাদের জীবন।

কিন্তু আমরা এ পাপ থেকে মুক্ত হতে চাই। আমরা ফিরিয়ে দিতে চাই প্রাণের অধিকার। প্রকৃতির অধিকার। আমরা যার যার অবস্থান থেকে পাপ মুক্ত হবো। আমাদের পাপের পরিবর্তে পূণ্য করে প্রকৃতিকে বাচিয়ে রাখবো। আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তাদের সেবা করব। আমরা বন উজাড় করব না। আমরা পাহাড় কাটব না। আমরা সমুদ্রকে দুষিত করবো। আমরা হত্যার জন্য মারনাস্ত্র তৈরি না করে প্রকৃতির ভালোবাসার জন্য তৈরি করব নিরাপদ পৃথিবী।

পৃথিবীর প্রকৃতি ভালো থাকুক এই কামনা। করোনা সচেতনতায় সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখি ভালোবসার সম্পর্ক কাছি রাখি।
আফসার নিজাম, সম্পাদক

সূ চি প ত্র
মানুষ তুমিই বলো :: ফারুক নওয়াজ
এ দুর্যোগ মুছে দিতে সম্মিলিত এই আহ্বান :: তৈমুর খান
ভাইরাস :: প্রবীর চট্টোপাধ্যায়
থুতু :: আমিনুল ইসলাম
শাটডাউন :: নয়ন আহমেদ
করোনায় করো না :: আতিক হেলাল
এই করোনা’র বংশ :: উৎপলকান্তি বড়ুয়া
জীবন চলার গতি :: শেলীনা আকতার খানম
সঙ্গনিরোধ :: শুভ্রাশ্রী মাইতি
করোনা :: কাজী জহিরুল ইসলাম
পৃথিবী ২০২০ :: ফজলুল হক তুহিন
বিপণ্ণ কওম: আমার প্রার্থনা :: ফরিদ ভূঁইয়া
শ্বাসকষ্ট নয়, দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গী যত :: জেবুননেসা হেলেন
মানুষ তুমি :: হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
করোনা ভাই করোনা :: রাজকুমার খাটুয়া
করোনা মুক্তির গান :: মাহফুজুর রহমান আখন্দ
জীবাণুপুস্প :: শেলী নাজ
করোনাভাইরাস :: আসলাম প্রধান
ভাইরাসের নাম করোনা :: রানা জামান
আমি করোনা, আমাকে আর রাগাইওনা :: এমিলি ডিকিনসন্

মানুষ তুমিই বলো
ফারুক নওয়াজ

তটিনী কাঁদছে মানুষ মানুষ বলে
বিহগবিহীন আকাশের মন ভারী..
নিঝুম শোকের কষ্ট বনাঞ্চলে
একাকীত্বের নিঃসীম মহামারী।

মেঠোপথ ফাঁকা, বুনোপথে নিঃসাড়া
নাও পড়ে আছে, শূন্যতা ঘাটজুড়ে
এই ভরাদিনে চুপচাপ চাষিপাড়া
হাহাকার ওঠে মাটির হৃদয় খুঁড়ে।

প্রকৃতি হঠাৎ কেন উদ্ধত হলো?
এ-র উত্তর মানুষ তুমিই বলো।

এ দুর্যোগ মুছে দিতে সম্মিলিত এই আহ্বান
তৈমুর খান

মৃত্যুর খবরগুলি আমাদের অন্ধকারে দীর্ঘশ্বাস ফেলে
কোথায় দাঁড়াব তবে?
এই সভ্যতাও এবার ধ্বংস হবে?
মানুষ আজ মানুষ হতে দূরে
প্রহরে প্রহরে মৃত্যুর ঘন্টা বাজে

তবুও রঙিন প্রাণ জাগে ঘরে ঘরে
শফথ নেয় বাঁচার অঙ্গীকারে
স্পর্শহীন স্বপ্নের ভিতরে
কোথাও এক সুখবর তার
নতুন সকালের অপেক্ষা করে।

এসো হে মুগ্ধতা, তবে সচকিত হই
পরিচ্ছন্ন প্রাত্যহিকের আলোকে
নিজেকে আবার পুনর্নির্মাণ করি ;
ছিন্ন সুর বেঁধে নিয়ে দারুণ দুঃসাহসে
দাঁড়াই এই জীবনের প্রগলভ বিশ্বাসে।

ভয়ের সীমানাগুলি ভয়ংকর নয়
বিজ্ঞান সত্যের জয় চেতনা ফিরে পেলে
আবার পলাশ ফোটে আমাদের উৎসবে
আবার গার্হস্থ্য জীবনে প্রদীপ্ত সভ্যতা
সচল হয়, সংগ্রামী এ মনস্বী আত্মার কাছে।

এ দুর্যোগ মুছে দিতে সম্মিলিত এই আহ্বান
দিকে দিকে দিগন্তের পথে উঠেছে আজান
ধৈর্য আর নিষ্ঠার কর্তব্য সমাপন হলে
ফিরে পাব আবার আবার এই নম্র যাপন
স্তব্ধ হবে কালের করাল কণ্ঠের গান।

ভাইরাস
প্রবীর চট্টোপাধ্যায়

তবু তো তুমি আছ চার দেওয়াল ঘেরা
উন্মুক্ত জানালায় দেখছ খোলা আকাশ
হয়তো হারিয়েছ অভ্যাস হটাৎ অতীতে ফেরা
তার কথা ভাবো যে ফেলছে দীর্ঘশ্বাস
অসংযম যাকে নিয়ে গেছে কবরে
অজ্ঞতায় গুরুত্ব পাইনি ভাইরাস
সরকারি কফিন ছেয়ে গেছে বিশ্ব খবরে।

থুতু
আমিনুল ইসলাম

আমার থুতু দিই। ওয়াক্ থু!
দেখুন- এ আমাদের হাল আমলের অভ্যাস,
আপনারা যারা বিদেশি, দয়া করে ভয় পাবেন না।
আমরা কিন্তু ভিনদেশি কাউকে থুতু দিই না।

আমরা আকাশে থুতু দিই,
আমরা বাতাসে থুতু দিই,
আমরা সমুদ্রগামী নদীর মুখে থুতু দিই।

সাপের থলিতে যেমন বিষ,
ঊর্ণ-অধরে যেমন লালা,
সতীনের বুকে যেমন ঈর্ষা,
আমাদের পেটে তেমনি থুতু।

আমরা একলা দাঁড়ানো তালগাছের মাথায় থুতু দিই,
আমরা দাদুর মতো বটগাছের গোড়ায় থুতু দিই,
আমরা ফলভারে নত ধানগাছের কাতারে থুতু দিই,
আমরা ভাইয়ের উঠোনের সোনালি গম্বুজে থুতু দিই,
আমরা অভ্যাসবশত মাঝে মাঝে
আমাদের আত্মপ্রতিকৃতিতেও থুতু দিই।

আমরা হিংসায়-প্রতিহিংসায় থুতু দিই,
আমরা অক্ষম কাতরতায় থুতু দিই,
আমরা কারণে অকারণে থুতু দিই
আমরা সময়ে অসময়ে থুতু দিই।

আমাদের মাকড়সার মতো উদ্ভাবনী মন
আমরা ডানে-বামে, উর্ধ্বে-নিম্নে, সামনে-পেছনে
সবদিকে থুতু দিয়ে রচনা করেছি তন্তুজালের মতো নিষ্ঠীবনফাঁদ।
আর এই থুতুব্যুহ ভেদ করে এমন সাধ্য কার!

নয়ন আহমেদ
শাটডাউন

হ্যাঁ, যে ভয়ের জামা পরে আছ, তাকে স্থির হতে বলো।
হ্যাঁ, যে বিষণ্নতার বোতাম লাগাচ্ছে,
তাকে সূর্যমুখীর দিকে চোখ ফেরাতে বলো।
হ্যাঁ, মানুষকে বলো, পাড়ি দিয়ে যাও ধানখেতের দিকে।
যাও গমখেতের হৃৎপিণ্ডের দিকে।

শাটডাউন। অস্ত যাচ্ছে পুঁজিবাদ।
শাটডাউন। অস্ত যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ।
শাটডাউন। অস্ত যাচ্ছে ঘৃণা।
শাটডাউন। অস্ত যাচ্ছে পচা সভ্যতা।

ও মানুষ, যাও। নদীদের সাজপোশাক দ্যাখো।
যাও, শান্ত আমগাছটির নিচে, দয়ালু ছায়ায়।
যাও, মাটির সৌরভ মেখে মেখে পড়শীর বাড়ি।
যাও বিমুগ্ধ গন্তব্যে।

শাটডাউন। অস্ত যাচ্ছে যুদ্ধ, আগ্রাসন।
শাটডাউন। অস্ত যাচ্ছে জাত্যভিমান।

করোনায় করো না
আতিক হেলাল

হ্যান্ডশেক করো না
সবকিছু ধরো না
সব যানে চড়ো না
‘মাখামাখি’ গড়ো না
ফাঁদে যেন পড়ো না
আয়েশটা বড় না
ভালো থেকে সরো না
নীতি থেকে নড়ো না

সবখানে ঝুঁকি আজ,
নিরাপদ ঘরও না!

এই করোনা’র বংশ
উৎপলকান্তি বড়ুয়া

আমার ঘরে
আমি থাকি তোমার ঘরে তুমি,
যে যার ঘরে থেকে বাজাও আনন্দ ঝুমঝুমি।

ঘরে থেকেই
সঙ্গে নিয়ে আপন পরিজন,
চিন্তা বিহীন সারাটা দিন কাটাও সুখের ক্ষণ।

একান্ত কাজ-
কর্ম ছাড়া বাইরে যেয়ো নাকো,
বের হলেও মুখে তোমার মাক্সটা পরে রাখো।

বাদ দিয়ে দাও
লোকসমাগম মনকে করে থির,
এড়িয়ে চলো লোকারণ্য সব সমাবেশ ভীড়।

নয় হ্যান্ডশেক
কোলাকুলি হাত-বুকে, না ছুঁয়ে,
ঘন্টা বাদে সাবান দিয়েই হাত দুটো নাও ধুয়ে।

পরিচ্ছন্ন চাই
থাকা, চাই- সুস্থ পরিবেশ,
এই করোনা’র বংশ নিপাত শিঘ্রী হবে শেষ।

জীবন চলার গতি
শেলীনা আকতার খানম

থেমে গেছে হাল জীবনের
এই ‘করোনা’র ডরে,
কেউ কারো তো মুখ দেখেনা
বেশ ক’টাদিন ধরে।

ভয়াল তো তার মরণ থাবা
প্রাণ করে দেয় শেষ,
তার চিন্তায় প্রায় মরিয়া
থমথমে আজ দেশ।

ভীড় সমাবেশ একদম নয়
সুস্থ থাকলে হলে,
এমন করে জীবন যাপন
কেমন করে চলে?

রাখবো তবে বিশ্বাস সব
নিয়ম নীতির প্রতি,
আঁধার ঘুচে সচল হবেই
জীবন চলার গতি।

সঙ্গনিরোধ
শুভ্রাশ্রী মাইতি

সঙ্গনিরোধ, সঙ্গনিরোধ- দারুণ দুঃসময়।
জীবন, মৃত্যু- দুইয়ের মাঝে প্রশ্ন জাগায় ভয়।
পায়ে পায়ে মৃত্যুমিছিল, আতংক শুনশান
আপন পরের ঘুচিয়ে প্রভেদ, মুখোশই রূপটান।
হাত রেখো না হাতের পরে, বার বার ধোও জলে
অট্টহাস্য শত্রু হাসে জন-জমায়েত পেলে।
আক্রমণে খুব গোপনে করছে সে ধরাশায়ী
মরছে মানুষ লাখে লাখে, নেই ওষুধ জীবনদায়ী।
দূরত্ব সেই রাখতে হবে বাঁচতে এমন দিনে
স্বাস্হ্যবিধি বেজায় দামী, চলতে হবে মেনে।
তোমার হেলায়, তোমার ভুলে আসবে দারুণ বিপদ
অপেক্ষাতে শত্রু আছে, ধূর্ত যেন শ্বাপদ।
দূরে থেকেই পাশে থাকো, সাহস রাখো মনে
সঙ্গনিরোধ হাতিয়ার হোক, জিতবো লড়াই ক্ষণে।

করোনা
কাজী জহিরুল ইসলাম

পুড়ছে না জ্বালানি সহস্র কোটি টন
পৃথিবীর অ্যাভেন্যুগুলোতে;
টন টন কাগজে হচ্ছে না ছাপা সভ্যতার অগ্রগতি;
ছত্রিশ হাজার গ্যালন জ্বালানি
পুড়িয়ে প্লেনের সিঁড়ি থেকে নামছে না পরিবেশবিদ
রিও ডি জেনেরিওর বিমানবন্দরে।

গরমে ঘামতে ঘামতেও
ট্রপিক্যাল দেশের ধনী লোকেরা
এসি বন্ধ করে খুলে দিয়েছে দখিনের জানালা;
পৃথিবীর আকাশে
মানুষ্য-নির্মিত কালো মেঘ নেই আজ এক ছোপ;
বাঁধাহীন বৃষ্টি, উড়ছে দূরন্ত মেঘ কচি বসন্তের, বন্যপ্রাণীরা পেয়েছে শিকারীর ভয়হীন অভয়ারণ্য;
স্বচ্ছ নীল আকাশ থেকে বহু বহুকাল পড়ে
ঝরে পড়ছে বিশুদ্ধ রোদের রেণু।

পৃথিবীর পরাশক্তিগুলো আত্মশুদ্ধির আয়নায়
দাঁড়িয়ে দেখছে নিজেদের কদর্য মুখ;
উদ্বৃত্ত খাবার নিয়ে তারা বুঝি এখনই ছুটে যাবে
দূর পাহাড়ের ভূখা মানুষের দেশে।
দাস-বাণিজ্যের গ্লানি
ফুটে উঠেছে শ্বেতাঙ্গ বণিকের দাম্ভিক চোয়ালে।

কারাগারের দরোজা খুলে দেবে চীন,
নির্বিষ ধর্মযাজকেরা ফিরে পাবে নিরাপদ ধর্মশালা,
১২ লক্ষ শহিদের পরিবার ফিরে পাবে স্বাধীন তিব্বত,
আশৈশব নির্বাসিত বৃদ্ধ দালাইলামা
ফিরে আসবে মাতৃভূমির পবিত্র পাথরে।

ফারাও দ্বীপে আর উল্লাসে মেতে উঠবে না
নিষ্ঠুর ডলফিন-ঘাতকেরা;
দূরন্ত ষাঁড়ের দেহ খুঁচিয়ে হত্যা করে যে ম্যাটাডোর,
বীরত্বের বদলে আজ সে
নিজের কাপুরুষত্বের জন্য লজ্জায় ঢাকে মুখ
মাদ্রিদের অস্তগামী লাল সূর্যের নিচে।

প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা ভুলে যে স্বামী মেতেছিল পরকিয়ায়
ক্যারিয়ার-নেশায় সন্তানের মুখ বিস্মৃত যে নারীর
আজ তারা সকলেই ফিরেছে ঘরে,
উপাসনালয়ের চেয়ে পবিত্র যে পরিবার
সেখানেই তারা হয়েছে থিতু।

শত্রু-মিত্র ভুলে, সকলেই হাত তুলে
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় নতজানু,
“প্রত্যেকে মোরা পরের তরে” হয়ে উঠছে
পৃথিবীর প্রধান স্লোগান।
আকাশের পাখির দিকে, অরণ্যের পশুর দিকে, সমুদ্রের মাছের দিকে তাকিয়ে আজ
মানুষ উপলব্ধি করছে, ওরা আমাদেরই সহোদর।

প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হে মানুষ, দেখো,
যে পৃথিবীকে তুমি দিনের পর দিন বিষপ্রয়োগে
করেছ অসুস্থ
আজ সে একটু একটু করে সেরে উঠছে,
শুদ্ধ হচ্ছে, সুস্থ হয়ে উঠছে।

না, না, করোনা ঘাতক নয়, নয় কোনো অভিশপ্ত জীবাণু
প্রকৃতির তৈরি এক মহৌষধ এই করোনা ফুল
অসুস্থ পৃথিবীকে সুস্থ করে তোলার দাওয়াই।

পৃথিবী ২০২০
ফজলুল হক তুহিন

সূর্যের সংসারে বাঁচার আশ্রয় কেবল এই পৃথিবী নামের গ্রহ
অথচ আমারই পাপের পাথর পাহাড় হয়ে ছুঁয়েছে আকাশ
সমস্ত নির্মল বায়ু বিষময় করে নিশ্বাসের করেছি অযোগ্য
নদী সমুদ্রের ঢেউ, জলতরঙ্গের ধ্বনি দূষণে দূষণে জীবনের শত্রু
বির্স্তীণ জমিন বীজের বিপক্ষে
বিনাশের রসায়নে অঙ্কুরের অবসান
আমরা এখন ক্রমাগত মরণরেখার কাছাকাছি!

অগণন পণ্যভোগে ডুবতে ডুবতে আমি আজ
অনিশ্চিত অতল গহ্বরে নিমজ্জিত
বস্তুর ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আমি সেচ্ছায় গর্বিত বস্তুবন্দি
মানবিক সবকিছু এখন আমার কাছে আবর্জনা
আমি সজ্জিত বর্ণিল সভ্যতার উদ্ধত সন্তান
আমি তাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একাকী ফেনিল।

অদৃশ্য ঘাতক মানুষের ফুসফুসে- মরণের বিষযাত্রা
আমার আত্মায় ঘর বেঁধেছে আরব্য রজনীর ভূতের মতন
আমাদের শরীরে শহরে গাঁয়েগঞ্জে জনপদে সবখানে
ঘামের মতন লেপ্টে আছে ভয়ঙ্কর ভাইরাস-
বিক্ষত গ্লোবের বুকে বিষাক্ত দাঁতের মরণ কামড়
অনন্ত বাঁচার ইচ্ছা আজ তাই ডুকরে ডুকরে কাঁদে রাত্রিদিন
নূহের প্লাবনে যেনো নিঃসহায় নিরুপায়
লূতের শহরে আসন্ন মৃত্যুর অপূর্ব মহড়া !

সভ্যতার সমরাস্ত্র, পুঁজির প্রতাপ, ভোগের বিলাসী সরঞ্জাম
প্রযুক্তির অহঙ্কার- সবই এখন বড্ড হাস্যকর অর্থহীন মূল্যহীন
মৃত্যুগন্ধময়
বিনাশের পথে ধাবমান এক করুণ কোরাস !

কবি জানে না সত্যিই কী হতে চলেছে আগামীর পৃথিবীতে
কতো প্রাণদীপ নিভে যাবে এই মহামারী মৃত্যুর মিছিলে
আসন্ন দুর্ভিক্ষ পথে প্রান্তরে সড়কে কতো সহস্র কবর রচনা করবে
তখন আমিও আর চিৎকার করে জ্বলে উঠতে পারবো না এই বলে-
“হে জড় সভ্যতা
মৃত-সভ্যতার দাস স্ফীতমেদ শোষক সমাজ।
মানুষের অভিশাপ নিয়ে যাও আজ।
তারপর আসিলে সময়
বিশ্বময়
তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিন্ডে পদাঘাত হানি
নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বার-প্রান্তে টানি;
আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও;
ধ্বংস হও
তুমি ধ্বংস হও।”

বিপণ্ণ কওম: আমার প্রার্থনা
ফরিদ ভূঁইয়া

দু’চোখের গমন আলোয় খেলে যায় সূর্য—স্বর্ণাভ বিকেল;
প্রহর পাঠের অপার আনন্দ খেলে না
খেলে না আমার ভেতর

সবদিক কালো করে আসছে ওইতো ওই
নিশ্বাসে নিশ্বাসে গুপ্ত ফাঁদ পেতে পেতে
মানবের যাবতীয় অনিষ্ট অশনি হয়ে ধেয়ে
আসছে আসছে…

হে অন্তর্যামী
সবুজের পত্রালি পাঠের দিয়েছ আমায়
তারুণ্য সময়…
আজাব গজব থেকে যতো ভুলেভালে
নসিহতের কায়েমি ছবক তবক থেকে
আমাকে যোজন দূরে
সটান বুকের ছাতি সামিয়ানা মেলে
নূর জ্বেলে দাঁড়াতে সাহস দাও

বিপণ্ণ কওম বুঝে নিক, খুঁজে পাক
মানবিকতার পথে আলোর উদয়।

শ্বাসকষ্ট নয়, দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গী যত
জেবুননেসা হেলেন

দীর্ঘশ্বাসে তুলোর মত ঝরে পড়ে
তুষারপাত।
ঝর্ণাধারার মতও একদিন ছিলেম দৈনন্দিন কপালের নীচের
দৃষ্টিকাঁচের বৃষ্টিপাতের ধারাপাত সঙ্গী আমি।
এখন আমি আকাশপাতাল আর ভাবি না।
ভাবতে শিখেছি নিসর্গ আমার সঙ্গীসাথী।
অক্ষরবন্দী এই যে ভার্চুয়াল কাগজগুলো,
হাসতে বললে হাসে যেমন, কাঁদতে বললে কাঁদে এখন।
তুমি আমার বন্ধু বলেই, সময় অসময় সঙে নিয়ে হাসি কাঁদি।
জীবন যুদ্ধের ভাগবাটোয়ারা কিছুটা হলেও
মিলেমিশে আড্ডা গানে সামিল সবে।
ভয়ভীতিটাও আপন মত…
সময় খরচ গেলো কত?
জানতে চাই না আমরা এখন।
চেতনায় বাঙালি বলেই একই রকম সবার ক্ষত।

মানুষ তুমি
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

আলোর কাছে, ভালোর কাছে
যা সব ছিল তাড়িয়ে দিলে
চারপাশে সব ধ্বংস করে
বাঁচবে না কেউ সবাই মিলে।

গাছ মেরেছ, ভাত মেরেছ
তুলতে গিয়ে একশো তলা
বিরুদ্ধে কেউ বলতে গেলে
দু’হাত দিয়ে টিপছো গলা।

পাখির ডাকে ভোর তো কবে
হারিয়ে গেছে জীবন থেকে
চড়ুই শালিক ময়না টিয়া
হারিয়ে গেছে সবুজ থেকে।

এসব কথা ধ্বংস কথা
খুন করেছ- মানুষ তুমি
তোমার হাতের অস্ত্রাঘাতে
জন্মভূমি মৃত্যুভূমি।

যতই ভাবো পালিয়ে গিয়ে
বেঁচে যাব এ পাপ থেকে
বাঁচবে নাকো মানুষ তুমি
যতই তুমি রাখো ঢেকে।

আজ দেখছো করোনাকে
কাল আসবে অন্যকিছু
নিজের হাতে যা করেছো
ছাড়বে না পাপ তোমার পিছু।

যদিও পিঠ দেওয়ালেতে
তবুও কিছু সময় আছে
গাছ পাখিদের ভালোবাসো
আপন করে ডাকো কাছে।

করোনা ভাই করোনা
রাজকুমার খাটুয়া

করোনা ভাই করোনা !
বাড়ি এখন মহান ক্ষেত্র ঘর ছেড়ে ভাই নড়োনা
লকডাউনে ঘরেই থাকো ইচ্ছে হলেও তোড়োনা
করোনা ভাই করোনা !

করোনা ভাই করোনা !
ঘরে বসে বোর লাগছে? রবীন্দ্রনাথ পড়ো না,
তবুও যাবে মোড়ের মাথায়? একেবারে কোরোনা ,
করোনা ভাই করোনা !

করোনা ভাই করোনা,
লেখায় তোমার হাতটি ভালো? খাতা কলম ধরোনা৷
না লাগলে মন পরিবারের সাথেতে মন ভরোনা
করোনা ভাই করোনা!

করোনা ভাই করোনা!
ঠেকের আড্ডা ,ভোজবাজিতে একদম ভাই জুড়োনা
না মানলে তা মোড়ের মাথায় ছটকে ছটকে মরোনা!
করোনা ভাই করোনা!

করোনা মুক্তির গান
মাহফুজুর রহমান আখন্দ

আতঙ্ক নয় সতর্কতায় চলি
আল্লাহ তুমি রহম করো
সবাই মিলে বলি

মিছেমিছি হাট বাজারে
ঘুরবো নাকো আর
সাবান দিয়ে দুহাত ধোবো
থাকবো পরিস্কার
খেলার মাঠে যাবো নাকো
বাড়ির ভেতর খেলি

নিজের মতো পড়বো আমার বই
রাস্তা ঘাটে জটলা পেকে
করবো না হৈচৈ

রবের কাছে করবো দুআ
দুহাত তুলে তুলে
মহামারি দিয়ো নাকো
আমাদেরী ভুলে
তোমার চেয়ে কে আছে গো
বেশি শক্তিশালী।

জীবাণুপুস্প
শেলী নাজ

মহামারি লাগা শহরের মর্মমূলে জেগে আছি
ষড়যন্ত্রমূলক এ অমানিশা, আকাশজানালা
রুদ্ধ, তবু এলো উহানের পাখি, মৃত্যুবীজ ঠোঁটে
সাজি ভ’রে গেছে নৃমুণ্ডূতে, যেন শব উৎসব
গোরখোদকও ক্লান্ত, লাশ জমে শূন্য করপুটে

সশস্ত্র বাহিনী আজ নেমে গেছে যুদ্ধ পথে পথে
মুখোশে ঢেকেছি মুখ, বাতাসে সঙ্গীত প্রেতিনীর
ব্যার্থ হল পুরুতের শ্লোক, হাত ধুতে ধুতে ক্লান্ত
জীবাণুপুষ্পেই সাজিয়ে তুলছি মৃতের মন্দির

আমার দু’ঠোঁট বহুদিন সিল্ গালা করা, একা
মৃত চুমুগুলো ফের জন্মাবে সেখানে? হাত ধুয়ে
মুছে ফেলি পাপ, মাংসশিকারির রক্ত, স্পর্শ লোভে
জেগে থাকি মড়কের রাতে, যেন মরে গিয়ে বাঁচি
এসব জীবাণুপুস্প গুঁজে রাখি রুদ্ধ কবরীতে

আমি যদি নাও থাকি, থেকে যাবে বিশুদ্ধ পৃথিবী
সূর্যের দস্তানা পড়া ভোর জানি শোনাবে ভৈরবী!

করোনাভাইরাস
আসলাম প্রধান

করোনা কী মানুষের সৃষ্ট ভাইরাস ?
চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জিজ্ঞেস-তালাশ !
কে নির্মম, ছড়িয়েছে এ জীবাণু’টিকে ?
করেছে আতঙ্কগ্রস্ত মানবজাতিকে !
মুহূর্তে মূহূর্তে মৃত্যু- ভয় বিশ্বজুড়ে-
কী অশান্তি! সুখশান্তি খাচ্ছে কুঁড়ে কুঁড়ে!!
যে-দেশ, যে-জাতিগোষ্ঠী, যার আবিষ্কার
এ ঘাতক জৈব; তার হবে কী বিচার ?

‘আল্লা’র গজব’ যদি বলো চিন্তাশীল-
কোথায় রয়েছে তবে বাঁচার পাঁচিল ?
পালাবো কি-ক’রে তার রাজ্যসীমা ছাড়ি?
এ মহাবিপদে দেবো কোন গ্রহে পাড়ি ?
শক্তিশালী, রক্ষাকারী তিনি ছাড়া কে-সে?
বিপদে আশ্রয় নেব যার পাদদেশে!

ভাইরাসের নাম করোনা
রানা জামান

ভাইরাসের নাম করোনা
যদি কাউকে ধরে ফেলে
রোগীর দিকে সরো না

গৃহ থেকে নড়ো না
কেনাকাটায় বাইরে গেলে
কারো গায়ে পড়ো না

করমর্দনও করো না
বাঁচতে চাইলে আপাতত
যানবাহনে চড়ো না

নাকে চোখে ধরো না
আপন নিঃশ্বাস শত্রু এখন
হাতে হাঁচি ক্ষরো না

মিথ্যায় সম্পদ গড়ো না
মনে রেখো আল্লার চেয়ে
তুমি কিন্তু বড়ো না।

আমি করোনা, আমাকে আর রাগাইওনা
মূল: এমিলি ডিকিনসন্
ভাবানুবাদ: আনিস মুহম্মদ

আমি যে কেউ নই, ভালো করেই জানি,
তুমি কোন্ সোনার চাঁন পিতলা ঘুঘু ?
চোখের মাথা খেয়ে
পাগলা মহিষের মতো এত ছুটাছুটি করো না,
স্যুট বুট টাই পরে নাচানাচি করো না ভাঁড়ের মতো,
মনে রেখো,
কেউকেটা হওয়া মানে
ব্যাঙের মতো উদ্ভট লাফালাফি করে
লুটোপুটি খাওয়া কাদার ভেতর।
পতিত সময়ের পঙ্কিলে ডুবে
নর্দমায় গড়াগড়ি খেতে খেতে
নিজের নাম জাহির করে বলো কী লাভ!
আমি যে কেউ নই, ভালো করেই জানি,
তুমি কোন্ সোনার চাঁন পিতলা ঘুঘু ?

আমি করোনা, আমাকে আর রাগাইওনা।