আব্দুস সুবহানের শরীরটা কয়েকদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না। জ¦র জ¦র অনুভব করছেন। আজ হঠাৎ কাশির সাথে পেটের পীড়া ও দেখা দিয়েছে। মনে হচ্ছে কোন একটা অজানা শক্তি তার গলাটা চেপে ধরে আছে। আজকাল অসুখ বিসুখ তাকে খুব সহজে কাবু করে ফেলে। বয়স হয়েছে। কথায় বলে বাঘের বল বার বছর। মনে হচ্ছে এইতো কদিন আগের কথা; উসাইন বোল্টের মত দম ছিল তার। কুরআন তেলাওয়াতে তিনি ক্বারী আব্দুল বাসেতকে অনুসরন করতেন। মুসল্লিরা অনেকে তাকে বাংলার আব্দুল বাসেত বলতো।

মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানো আর যুদ্ধের মাঠে অতন্দ্র পাহারায় থাকা সমান কথা। তার উপর সংসারের কাজ, মক্তবে পড়ানো। টানা ৪৫ বছর ধরে করে চলছেন ক্লান্তিহীনভাবে। আজ অনেকদিন পর তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তার বললো- কোভিড-১৯ টেস্টটা করে নেন। ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক দুপুরের পর তিনি উপজেলা সদর হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা দিয়ে আসেন। ডাক্তার বলেছে রিপোর্ট আসতে চার-পাঁচ দিন লাগবে। সুবহান সাহেব মনে মনে হাসলেন সেই অতি পরিচিত ইংরেজি লাইনটি মনে পড়ে গেল, ‌The patient had died before the doctors came’ এর স্থানে doctors লাগিয়ে দিলে হয়ে যায়। হঠাৎ করে আবার মনটা খারাপ হয়ে যায় । ভাবে যদি রিপোর্ট পজেটিভ হয়। এটা এমনই পাড়া গ্রাম যেখানে অক্সিজেনের অভাবে ডাক্তার মারা যায়। চোখের সামনে ভেসে উঠে সিলেটের ডা: মঈনের জান্নাতি চেহারা। যে কিনা নিজের জীবনের পরোয়া না করে করোনা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল, সেই মুহুর্তে তার ভেন্টিলেটর দরকার তখন ভেন্টিলেটর পায়নি। আর আব্দুস সুবহান তো আল্লাহর এক নগন্য বান্দা। এক অজানা ভয় তাকে গ্রাস করে। অন্ধকারের কালো পর্দা তার চোখকে যেন ঢেকে দিয়ে যায়।

গভীর অন্ধকারে তিনি দেখতে থাকেন আব্দুল হাইয়ের লাশ। ময়মনসিংহের গৌরিপুরের মানুষ গ্রামের মাটিতে লাশ দাফন করতে দিচ্ছে না। স্ত্রী-পুত্র লাশ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গভীর রাত অবদি। কোন গ্রামে কবর দেয়া যাচ্ছে না। আব্দুল হাইয়ের জায়গায় নিজের লাশ কল্পনা করতে থাকেন তিনি। যদি তিনি মারা যান আদৌ তার লাশ কবর দেয়া হবে তো। ইসলাম বিদ্যেসীদের কথাগুলো তার কানে বাজতে থাকে। যেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে মাটিতে দাফন করা হলে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর কোন সম্ভাবনা নেই; সেখানে বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে মানুষের লাশ পুড়িয়ে ফেলতে চায়! কিছু তথা কথিত প্রগতিবাদীরা মনে করে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কিছু বিষোদগার করতে পারলে, কিছু লেখালেখির মাধ্যমে উস্কে দিতে পারলেই তাদের নাস্তিক জনম সার্থক। ওরা তুষ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুসলমানরা হয়ে যায় জঙ্গী, মৌলবাদী। এসব ভাবতে ভাবতে তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হতে যাচ্ছিল। এমন সময় তার মনে আসে সুরা তাগাবুনের ১১নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “কোন বিপদই আসতে পাওে না আল্লাহর হুকুম ছাড়া।” আয়াতটি তার শরীরে অ্যাজিথ্রোমাইসিন, ক্লোরোকুইনের চেয়ে ভালো এন্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে। একটু হালকা অনুভব করতে থাকেন তিনি। উঠে অজু করে কোরআন তেলাওয়াত করতে বসলেন এক একটি আয়াত পড়ার সাথে যখন অর্থ মনে আসতে থাকে এক স্বর্গীয় শান্তিতে ডুবে যান তিনি।

ডাক্তার বলেছে, তার শরীরের লক্ষন সন্দেহ জনক তাই আপাতত মসজিদে যাওয়া ঠিক হবে না। বাসায় থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়। ফরজ নামাজে একা একা দাঁড়াচ্ছেন কেমন যেন খালি খালি লাগছে। তার চার বছরের ছোট নাতিটা দাদুর সাথে নামাজ পড়তে আসে কিন্তু তিনি নিষেধ করেন। বছর পাঁচেক আগে কিছুদিন একা একা নামাজ পড়েছিলেন। সেই ঘটনা মনে আসে। হঠাৎ করে কিছু মুসল্লি মসজিদে দলাদলি শুরু করে। তার দেয়া কিছু মাসয়ালার খুটিনাটি বের করতে থাকে। এদেরকে মদদ দেন কিছু স্বার্থান্বেষি আলেম। তারা বিভিন্ন ভাবে খোঁড়া, লেংড়া যুক্তি দিতে থাকেন হুজুর অমুক মাসয়ালায় এমন বলেছেন যেটা আসলে এমন হবে। এমন কিছু বিষয়ে বিতর্ক করছিলেন যেগুলো ফরজ, ওয়াজিব এর পর্যায় পড়ে না। এরই মধ্যে কেউ কেউ বলাবলি করছিলেন হুজুরের ছোট ছেলে একটি প্রভাবশালী ইসলামী ছাত্রী রাজনীতির সাথে জড়িত। যদিও পরবর্তীতে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহযোগিতা পাওয়ার জন্যই কেউ এমনটা রটিয়েছিল। এক পর্যায়ে হুজুর মসজিদে আসা ছেড়ে দেন এবং আল্লাহর দরবারে কাঁদতে থাকেন। তিনি জানতেন দুনিয়ার কারো কাছে সহযোগিতা চেয়ে লাভ হবে না। আমাদের দেশের হুজুরদের বিরুদ্ধে কথা বলার মত লোকের অভাব হয় না আর পক্ষে কথা বলার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। অদ্ভুতভাবে তিনি লক্ষ করলেন কতিপয় মুসল্লি আন্দোলন করে তাকে আবার মসজিদে ফিরিয়ে নিয়ে আসলো। যারা ভুল বুঝে তার সমালোচনা করেছিল তাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু যে সমস্ত আলেম ব্যক্তিস্বার্থে তার বিরোধিতা করেছিল তাদেরকে তিনি আজও মন থেকে ক্ষমা করতে পারেন নি।

দু’দিন ধরে কোয়ারেন্টাইনে আছেন আব্দুস সুবহান। বিকেলের দিকে তার কিছু মুসল্লি তাকে দেখতে আসে। সাথে একটা পাগল ও আসে। এই পাগলটা হুজুরের খুব ভক্ত। প্রথম যেদিন পাগলটা মসজিদের সামনে আসে সেদিন সে মার্কাটা কি পিতলা কলশ বলে স্লোগান দিচ্ছিল। ইমাম সাহেব তাকে কাছে ডাকলেন। তার পুরোনো পাঞ্জাবি, পাজামা দিলেন, পেট ভরে খেতে দিলেন। পাগলটি যাবার সময় বলল মার্কাটা কি ……….. তিনি বললেন না বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। পাগলটি প্রথম প্রথম খুব লাজুক ভাবে বলতে লাগলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তারপর ও তার মুখ দিয়ে আগের স্লোগানটা বেরিয়ে হুজুরকে দেখলে জিহ্বায় কামড় দিয়ে আবার বলা শুরু করতো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। দুদিন ধরে সে হুজুরকে মসজিদে না পেয়ে আজকে বাড়ি চলে এসেছে। হুজুর দুর থেকে কথা বলে সবাইকে বিদায় দিয়ে দিচ্ছেন। পাগলটা সবার মুখের দিকে চায় কি যেন বুঝতে পারে সে ইমাম সাহেবের কাছে যায় না।

লকডাউনের কারনে দীর্ঘদিন মক্তব বন্ধ। দুষ্টু মিষ্টি কচি কাচার দলের সাথে অনেকদিন দেখা হয় না। হুজুরের অসুস্থতার খবর শুনে তারা ছুটে আসে। পাড়ার মুরুব্বিরা হুজুরের বাড়ি যেতে নিষেধ করে। তারা ফিরে যায়।

নমুনা দিয়ে আসার আজ তৃতীয় দিন। কভিড-১৯ টেস্ট রেজাল্ট এখনো আসেনি। সারা গ্রামে প্রচার হয়ে গেছে ইমাম সাহেব করোনায় আক্তান্ত। ইসলাম বিদ্ধেসীরা ইনিয়ে বিনিয়ে ফেসবুকে ব্লগে যাচ্ছে তাই লিখে যাচ্ছে। ইমাম সাহেবের করোনা হওয়াটা তাদের জন্য একটা মজার টপিকে পরিনত হয়েছে। রাতের দিকে সুবহান সাহেবের বুকের ব্যাথাটা বাড়তে থাকে। শরীরের অসুস্থতা তাকে যতটা না কষ্ট দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে মানুষের মন্তব্য। মনে হচ্ছে প্রাণটা এক্ষুনি বেরিয়ে যাচ্ছে। ইমাম সাহেব মনে মনে কালিমা পড়ছেন আর এই ভেবে শান্তি পাচ্ছেন যে মহামারিতে মৃত্যু হলে শহীদের মর্যাদা পাওয়া যাবে।

দূর থেকে পাগলটার কন্ঠস্বর ভেসে আসে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।