মিস্টার জহির উদ্দিন একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। ষাটোর্ধ্ব বয়সের জহির উদ্দিন এলাকার একজন সনামধন্য ব্যক্তিও বটে। পারিবারিক ভাবে যেমন সুনাম সুখ্যাতি আছে তার তেমনি আছে আর্থিক স্বচ্ছলতাও। এলাকার ধনী গরিব সবাই তার থেকে সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে আসছেন নিয়মিত। প্রতিনিয়তই। যেকোন প্রয়োজনে তার থেকে সাহায্য চেয়ে বিমুখ হয়ে কেউ ফিরে এসেছেন এমন খবর পাওয়া ভার। তাই গ্রামের সকলের প্রিয়জন, আপনজন তিনি।

গতকাল থেকে তিনি অসুস্থ। খুকখুক করে কাশছেন। গায়ে জ্বরও উঠেছে বেশ। সর্দিও আছে কিছুটা। তাই তার মনটা বেশ ভার। বিশ্বের প্রতিটি দেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন জনগণ! লাখ লাখ বনি আদম অসুস্থ হয়েছেন। কয়েক হাজার লোক মারাও গেছেন। এজন্য ভয় হচ্ছে নিজের। তিনিও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কিনা তার আশঙ্কা করছেন। বিছানায় একা একা শুয়ে বসে দিন কাটছে তার। বই পড়ে আর ইবাদতে সময় কাটানোর চেষ্টা করছেন তিনি। করোনার ভয়ে পাশে কেউ নাই। না স্ত্রী। না ছেলেমেয়ে। না নাতিপুতি। না এলাকার লোকজন। সবার মাঝেই করোনার আতঙ্ক! করোনার ভয়!

একসময়ে যিনি ছিলেন এলাকার সবার মধ্যমণি, প্রিয়জন, আপনজন! যার পাশে ছিলেন শতশত মানুষ। লোকজনের কোলাহলে মুখরিত ছিল যার বাড়ি। বাড়ির দহলিজ। পরিবারের সবাই থাকতো আশেপাশে। চতুর্দিকে। অথচ সেই জহির উদ্দিন আজ একা শুয়ে আছেন বিছানায়। খুব একাকীত্ব অনুভব করছেন মনে মনে। হৃদয়ে আকুতি ভরা কষ্ট! ভাবছিলেন অনেক কিছুই। এমন সময় একজন যুবক তার রুমে প্রবেশ করে সালাম জানালেন-
আসসালামু আলাইকুম।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
কেমন আছেন চাচা?
আলহামদুলিল্লাহ। কে তুমি বাবা? আমার এমন বিপদের সময় পাশে এসেছো!
আমি ডাঃ মাসুদ। আপনার ভাতিজা।
ডাঃ মাসুদুর রহমান আকন্দ। সনামধন্য একজন চিকিৎসক তিনি। বিশেষ করে দরিদ্র অসহায় লোকজনের পাশে সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করাই যার নেশা। এই সেবাই তাকে এলাকার প্রিয় মানুষে পরিনত করেছে।
ও তুমি ডাঃ মাসুদ?
জী চাচা। আমি মাসুদ।
তো কেমন আছো বাবা?
আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি।
আপনি কেমন আছেন চাচা?
ভালো আছি। জবাব দিলেন চাচা জহির উদ্দিন।
শুনলাম আপনি নাকি অসুস্থ। তাই খোঁজখবর নিতে এলাম।
হ বাবা ঠিকই শুনছো। আমি অসুস্থ। শরীরে খুব জ্বর। হালকা কাশিও আছে। তাই কেউ পাশে আসছে না। সবারই ভয় আমি করোনায় আক্রান্ত কি না! এখন কী করি বলো তো!
জী চাচা। এটা একটা সমস্যাই বটে। করোনা আতঙ্কে কাঁপছে দুনিয়া। দুনিয়ার সব মানুষ! তবে জ্বর আর কাশি হলেই যে করোনা হবে এমনটি ভাবার দরকার নাই।
তাহলে বুঝবো কেমনে আমি করোনায় আক্রান্ত নই।
অনেকগুলো লক্ষণ আছে করোনার। সেগুলোর সব লক্ষণ পাওয়া না গেলে খুব বেশি ভয় নাই চাচা।
তাহলে লক্ষণগুলো বল তো শুনি।
জী, বলছি। শুনুন মনোযোগ দিয়ে।
আপনার সর্দি আছে কিন্তু কাশি নাই, বুঝতে হবে করোনায় আক্রান্ত হননি।
তারপর।
সর্দি আছে, কাশিও আছে কিন্তু শুকনো কফ নাই, তাহলে করোনায় আক্রান্ত হননি আপনি।
এরপর।
সর্দি আছে, কাশি আছে, শুকনো কফও আছে কিন্তু জ্বর হয়নি তাহলেও ভয়ের তেমন কিছু নাই আপনার।
ও আচ্ছা! তারপর।
সর্দি আছে, কাশি আছে, শুকনো কফ আছে, জ্বরও আছে কিন্তু জ্বর নেমে গেছে তাহলেও করোনার আশঙ্কা কম।
বুঝলাম। তো আর কোন লক্ষণ আছে কি?
জী। আরও লক্ষণ আছে।
বল শুনি।
বলছি। আপনার সর্দি আছে, কাশি আছে, শুকনো কফ আছে, জ্বর আছে, জ্বর নামছেও না কিন্তু শ্বাসকষ্ট হয়নি তাহলেও করোনার আশঙ্কা অতো বেশি না।
তাহলে কী ভয়ের কিছু নাই আমার!
তেমন ভয় নাই। তবে মনে রাখবেন আপনার এইসব উপসর্গ নাই বলেই যে আপনার করোনা হয়নি বা করোনা হবে না তার কিন্তু আপনি নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। তাই হাত ধৌত করুন, সুস্থ থাকার সব ধরনের চেস্টা করুন। যেন করোনাভাইরাস আপনার শরীরে প্রবেশ করলেও আপনার শরীরের এন্টিবডিগুলো সেই ভাইরাসগুলো মেরে ফেলতে পারে।
ঠিক বলেছ বাবা। তাহলে তো আমাদের এতো ভয়ের কিছু নাই। একটু জ্বর কাশি হলেই যে খুব ভয় পাচ্ছি তা তো ঠিক নয়। এতো ভয়ের দরকার নাই। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কী বল তুমি?
জী চাচা। ঠিক বলেছেন। তবে আমরা হুজুগে বাঙালি তো। তাই যা শুনি তা নিয়েই নাচানাচি করি। চিলে কান নিয়েছে শুনেই নিজের কানে হাত না দিতেই দৌঁড়ানো শুরু করি চিলের পিছনে।
হ বাবা। তুমি ঠিকই কইছ। তো এমতবস্থায় আমাদের কী কী করা উচিত?
এসময় আতঙ্কিত না হয়ে জ্বর, ঠান্ডা ও কাশির ঔষধ সেবন করতে হবে নিয়মিত। স্বাস্থবিধি মেনে চলতে হবে সবসময়।
আমরা কি করোনা সেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করব?
না। এমতাবস্থায় করোনা সেবায় নিয়োজিত হটলাইনগুলোতে বারবার কল দিয়ে বিজি রেখে জরুরি সেবায় ব্যাঘাত ঘটানোর দরকার নাই।
রোগী নিয়ে টেনশন?
না, এতোটা ভয়ের কিছু নাই। নিয়মিত ঔষধ সেবনে রোগী সুস্থ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
এসময় আর কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার বলে মনে কর।
হ্যাঁ, কিছু সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে হবে। আমি বলছি, আপনি জেনে রাখুন।
আচ্ছা।
সুমাইয়া? ও সুমাইয়া?
জী। দাদা ভাই। আমাকে ডাকছেন?
হু। তোমাকে ডাকছি। এসো আমার পাশে। তোমার খাতাকলম নিয়ে এসো তো।
আচ্ছা। আসছি।
সুমাইয়া দাদার পাশে এসে বসে। ওর হাতে খাতা আর কলম।
দাদা সুমাইয়াকে ডাঃ মাসুদের পরামর্শগুলো লিখে নিতে বললেন।
সুমাইয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
জহির উদ্দিন সাহেব ডাঃ মাসুদকে তার দিকনির্দেশনা বলতে বললেন। ডাক্তার বলতে শুরু করলেন। সুমাইয়া সব নোট করল। ডাক্তার যা যা বলছিলেন-
চোখে হাত দেবেন না।
নাকে হাত দেবেন না।
মুখে হাত দেবেন না।
মানুষের ভিরে যাবেন না।
হাটবাজারে অযথা ঘোরাফেরা করবেন না।
হাতে হাত মেলাবেন না।
অন্য লোকজনের স্পর্শ সম্পুর্ণভাবে এড়িয়ে চলবেন।
ভ্রমণ করবেন না। একান্ত জরুরি না হলে ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করুন।
এসবের পাশাপাশি আরও যা যা করতে হবে সেগুলোও বলছি।
জী বলুন চাচা। আমি লিখছি, বলল সুমাইয়া।
হুম। বলছি। তুমি সব লিখে নিও মা।
জী। সব লিখছি চাচা।
ডাঃ মাসুদ এবার যেসব কাজ করতে হবে তার একটি তালিকা দিলেন। তালিকাটি হলো-
বাইরে থেকে এসে বিশ সেকেন্ড থেকে দের মিনিট পর্যন্ত সাবান দিয়ে আগে হাত ধুতে হবে। তারপর অন্যান্য কাজ করতে হবে।
নিয়মিত ভিটামিন সি জাতীয় খাবার যেমন কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, লেবু ইত্যাদি বেশি বেশি করে খেতে হবে।
পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। সম্ভব হলে বিশ থেকে তিরিশ মিনিট পরপর পানি পান করতে হবে।
নাক, মুখ, চোখ ঢেকে রাখতে হবে।
হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় নাক, মুখ ঢেকে রাখতে হবে।
এক টিস্যু একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না।
মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
বুঝতে পারলাম বাবা। এসব মেনে চলব।তবে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে সেটা বুঝতে পারব কেমনে?
বলছি শুনুন। মনে রাখবেন সর্দি আছে, কাশি আছে, শুকনো কফ আছে, জ্বর আছে কিন্তু জ্বর নামেনি, শ্বাসকষ্ট আছে এবং শরীরে ব্যথাও আছে তাহলে বুঝতে হবে করোনার আশঙ্কা রয়েছে।
এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কী?
এরকম হলে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। ভয় পাওয়া যাবে না। দেরি না করে সরকার নিয়ন্ত্রিত করোনা চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। হাসপাতালে যেতে হবে। হটলাইনে যোগাযোগ করতে হবে। পরামর্শ নিতে হবে।
তোমার কথায় প্রাণ পাইলাম বাবা। এতোদিন তো ভয়ে ভয়ে শেষ হতে চলছিলাম আমি। আর ভয় নাই আমার।
জী। আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। পারিপার্শ্বিক সংস্রব থেকে দুরে থাকতে হবে। এছাড়াও দেশের বাইরে থেকে যারা এসেছেন তাদের হতে সতর্ক থাকতে হবে। তাদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।
ঠিক বলেছ বাবা। তুমি লোকজনকে এসব জানিয়ে দিও। জাতিকে সতর্ক করিও। আর আমিও এসব মেনে চলার চেষ্টা করব।
ডাঃ মাসুদের পরামর্শ মেনে চলছেন মিস্টার জহির উদ্দিন সাহেব। নিয়মিত ঔষধ খাচ্ছেন এখন। পরিস্কার পরিচ্ছন্নও থাকছেন তিনি।
প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা মেনে চলছেন রুটিন মাফিক। এভাবে কিছুদিন চলার পর পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন বয়োবৃদ্ধ মিস্টার জহির উদ্দিন। এখন তিনি আগের মতোই সুস্থ। পুরোপুরি। তার আশেপাশে আবারও ভির করছেন লোকজনেরা। পরিবারের সবাই। আশেপাশের অন্যরাও।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন তিনি। জহির উদ্দিনের মুখ থেকে বিরবির করে বেরিয়ে এলো “সুস্থতা আল্লাহ তায়ালার একটি বিরাট নেয়ামত”। আজ থেকে এই নেয়ামতের হক আদায় করব নিয়মিত। প্রতিনিয়ত। প্রতিদিন। প্রতিক্ষণ।