বিগত ২০০৫ সনের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে আমি লেখা দিবার জন্য ‘দৈনিক ইত্তেফাকে’র উপদেষ্টা সম্পাদক আখতার-উল-আলমের অফিস কক্ষে প্রবেশ করে কুশল বিনিময় শেষে চেয়ারে আসন গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে আরো দু’জন ভদ্রলোক সে কামরায় প্রবেশ করেন। তাঁদের একজন ছিলেন স্বনামধন্য অধ্যাপক, আদর্শবাদী সাহিত্যিক ও নিষ্ঠাবান সংস্কৃতিসেবী জনাব মুহম্মদ মতিউর রহমান।
জনাব মতিউর রহমানের সাথে আমার অনেক আগেই দেখা হয়েছিল। ১৯৭০ সনের জানুয়ারি মাসে যখন তিনি ঢাকা থেকে সদ্য প্রকাশিত ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন, তখনই তিনি প্রথম একবার টেলিফোনে এপয়েন্টমেন্ট করে আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন কবিতা নেয়ার জন্য। আমি তখন তাঁকে একটি কবিতা দিয়েছিলাম, তিনি যথাসময় সেটা দৈনিক সংগ্রামের সাহিত্য পাতায় ছেপে পত্রিকার কপিসহ সম্মানী দেয়ার জন্য আমার সঙ্গে দ্বিতীয় বার দেখা করেছিলেন। সে বহুদিন আগের কথা। তাই আমি তা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলাম। জনাব মতিউর রহমানই আমাকে পুনর্বার সেটা স্মরণ করিয়ে দেন।
দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে আমার আর দেখা-সাক্ষাৎ হয় নি। একাত্তরের ডিসেম্বরে দৈনিক সংগ্রাম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারপর জানলাম জনাব মতিউর রহমান দীর্ঘ বিশ বছর দুবাইতে প্রবাস জীবন-যাপন করেছেন। তাই আমাদের পরস্পরের মধ্যে দেখাশুনা বা সাক্ষাতের তেমন কোন সুযোগ ছিল না। বয়সের ভারে আমিও এখন ন্যুজ্ব হয়ে পড়েছি। জনাব মতিউর রহমানও সময়ের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন প্রৌঢ়ত্বের কোঠায় উপনীত। তাই দীর্ঘ অদেখার পর প্রথম নজরে পরস্পরকে চেনা প্রায় অসম্ভবই ছিল। কিন্তু উনি আমার নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে চিনে ফেললেন এবং পরম আনন্দাতিশর্যে উল্লসিতভাবে বলে উঠলেন : ‘আমি তো আপনাকেই খুঁজছি।’
জনাব মতিউর রহমানের সাথে দীর্ঘদিন আমার দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা না হলেও তাঁর নাম আমার কাছে অজানা-অচেনা ছিল না। ‘ফররুখ একাডেমী’ প্রতিষ্ঠা ও তার মুখপত্র ‘ফররুখ একাডেমী পত্রিকা’র মাধ্যমে তিনি আমাদের পরম প্রিয়পাত্র ও সুহৃদ হয়ে উঠেছেন। দূর থেকে আমি তাঁর মূল্যবান সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও অবদান গভীর আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করে যাচ্ছিলাম। মাঝখানে প্রায় তিন বছর আমি বিদেশে অবস্থানকালে তাঁর অবদান সম্পর্কে আমার ধারণা নিতান্তই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরবর্তী পর্যায়ে (জনাব আখতার-উল-আলমের অফিসে সাক্ষাতের পর) আমাদের পরিচয় নিবিড় হলে তাঁর বহুমুখী অবদানের ব্যাপ্তি দেখে আমি তাঁর গুণমুগ্ধ- একথা অকপটে স্বীকার করছি। আমাদের ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মূলধারার সাহিত্যিকদের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম অনুরাগ তাঁকে এক ঈর্ষণীয় অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রসঙ্গত, মরহুম দেওয়ান আবদুল হামিদ তাঁর পূর্বসূরী হিসাবে প্রয়াত সাহিত্যিক ও তাঁদের সাহিত্য-কর্ম সম্পর্কে লেখার মাধ্যমে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন সশ্রদ্ধচিত্তে আমি তাও স্মরণ করছি।
অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানের কর্মক্ষেত্র ও কর্ম-তৎপরতা বিস্তৃত ও বহুধা-বিভক্ত। শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নানাবিধ কর্মকাণ্ডের কথা বাদ দিলেও তাঁর সাহিত্য-বিষয়ক, জীবনী, সমাজ-সংস্কৃতি ও ধর্ম, অনুবাদ, সম্পাদনা, সাংগঠনিক ক্রিয়াকলাপ তাঁকে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বহু গুণে গুণান্বিত এমন ব্যক্তির উদাহরণ বর্তমান সামাজিক-সাহিত্যিক পরিবেশে একান্ত বিরল। নিভৃতির আড়াল থেকে ইদানিং তিনিই আমাকে সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমের পাদপ্রদীপে উপস্থাপনার প্রচেষ্টা চালিয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছেন।
অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান আমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদের একান্ত অনুরাগী। তিনি ফররুখ আহমদের উপর বই লিখেছেন, নিয়মিত লেখালেখি করছেন এবং সর্বোপরি তিনি ফররুখ একাডেমী (বর্তমান নাম ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন) প্রতিষ্ঠা করে প্রাতিষ্ঠানিক ফররুখ-চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদনায় ‘ফররুখ একাডেমী পত্রিকা’ প্রকাশিত হচ্ছে। এতে লেখার জন্যে তিনি বহু বিদগ্ধ ব্যক্তিকে অনুপ্রাণিত করেছেন। একাডেমীর পক্ষ থেকে তিনি ফররুখ আহমদের উপর এ যাবৎ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। একাডেমীর পক্ষ থেকে কবির জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন উপলক্ষ্যে তিনি নিয়মিত সভা-সেমিনার করে চলেছেন। পত্র-পত্রিকায় লেখার মাধ্যমে ও টিভি সম্প্রচারের মারফত তিনি ফররুখ-চর্চার দিগন্তকে নানাভাবে সম্প্রসারিত করার কাজে তৎপর রয়েছেন। মূলত আমাদের উভয়ের ফররুখ-প্রীতির এ সাধারণ অনুভূতি থেকেই আমরা সহজেই পরস্পর নিবিড় সম্পর্কে জড়িত হয়ে পড়ি।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে কবি ফররুখ আহমদের সাথে আমার দীর্ঘ মধুর সম্পর্কের কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করছি। তিনি আমাদের অগ্রজ কবি। প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তিনি আমাদের নিকট ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয়। সৌভাগ্যবশত আমি তাঁর স্নেহসিক্ত নিবিড় সম্পর্ক লাভ করেছিলাম। কবিতা-চর্চায় তিনি আমাকে নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন। অধ্যাপক মতিউর রহমানের সাথে পরিচিত হয়ে তাঁর উৎসাহে আমি পুনরায় এ বৃদ্ধ বয়সেও ফররুখ-চর্চায় লিপ্ত হই। তিনি ইতোমধ্যেই তাঁর সম্পাদিত একাডেমী পত্রিকার জন্য আমার নিকট থেকে কয়েকটি লেখা নিয়ে তা ছেপেছেন। বর্তমানে আমি তাঁর পরামর্শ ও অনুরোধে ফররুখ আহমদের উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করেছি। তিনি যথারীতি এগুলো তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা শুরু করেছেন ও পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন (২০০৮ সনের জুন মাসে প্রকাশিত)। এটা আমার জন্য যেমন আনন্দের তেমনি ফররুখ-অনুরাগী সকল সুধি-বিদগ্ধ ব্যক্তির নিকটই আনন্দদায়ক বলে মনে করি। মুহম্মদ মতিউর রহমানের সাথে পরিচয় না ঘটলে এবং তাঁর উৎসাহ ও তাগিদ না পেলে এ কাজটি কখনো আমার দ্বারা সম্পাদিত হতো বলে মনে হয় না। তাই আমি মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট তাঁর কর্মময়, সফল, দীর্ঘজীবন কামনা করি।