আমি আমার বুঝ হবার পর আম্মুকে কখনোই প্রাণ খুলে হাসতে দেখিনি। স্বাভাবিক ভাবে হেসেছে, চিরচেনা হাসি মুখ তার। কিন্তু আবেগ অনুভূতি নিয়ে প্রফুল্লতা কাজ করেনা তার মধ্যে। কিন্তু আজকে হটাৎ আম্মুকে খুব প্রফুল্ল আর খোশমেজাজে দেখে কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করলাম আম্মু কি হয়েছে?
“কই কিছুনা”
“আম্মু কি হয়েছে বলো না”
আম্মু এড়িয়ে যায়। তখন বললাম, “আম্মু তুমি এমন কেনো? আমার বন্ধুর আম্মুরা তাদের সাথে কত আন্তরিক আর তুমি…”
“তোর বন্ধুদের মায়েদের কোনো চাপা কষ্ট আছে?”
“আম্মু!”
কিছুক্ষণ পরেই খবর দেখাচ্ছে রাজাকারের ফাঁসি কার্যকর। আম্মুর হাস্যোজ্জ্বল মুখ আর খুশি দেখে কে।
আমিও হাসি দিয়ে আম্মুকে জিজ্ঞেস করি, “রাজাকার কি তোমার কিছু হয়?”
আম্মু কষে একটা চড় দিয়ে বললো, “রাজাকার কেনো আমার কিছু হতে যাবে?”
“না আম্মু আসলে প্রশ্নটা এভাবে করতে চাইনি, মানে এই রাজাকার টা কে?”
“কেউ না”
“আম্মু!!”
মন মরা হয়ে রুম থেকে বের হয়ে যাবো ঠিক তখনই পিছন থেকে আম্মু ডাক দিয়ে বললো, “রাফি, দুই কাপ চা নিয়ে আমার পাশে একটু বস বাবা”
খানিক পরেই চা নিয়ে আম্মুর পাশে বসে বললাম,”আম্মু রাগ করোনা আমার ভুল হয়েছে আর কিছু জিজ্ঞেস করবোনা”
“ধুর, বোকা ছেলে।রাগ করবো কেনো?”

আম্মু জানালা দিয়ে বাহিরে আকাশ দেখছে।চায়ে চুমুক দিয়ে বললো “সামনের মাসের ৭ তারিখ তোর মামার জন্মদিন”
“মামা কই? কি করে আম্মু?”

আম্মু চায়ের কাপটা রেখে বলে, “তখন তোর মামা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের ছাত্র। টগবগে জোয়ান ছেলে। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ থেকে কারফিউ থাকলেও সরকার সব স্বাভাবিক করে দেখার চেষ্টা করে। তখন ভাইয়া ঢাকা থেকে গ্রামে চলে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি কিংবা ঢাকার অবস্থা ভালো না সে জন্য না। তার আসার মূল কারন মা আর আমি। যদি গ্রামে মিলিটারি ঢুকে আর আমরা বিপদে পড়ি সেজন্য গ্রামে চলে আসে।
প্রায় ১৫-২০ দিন পরে গ্রামের পুরাতন স্কুলটার পিছনে মিলিটারিরা ঘাটি বেধেছে। যদিও তার আগে কিছু কিছু লুটপাট হতো। কিন্তু পুরোপুরি নির্যাতন, শাসন চালানোর জন্য আটঘাট বেধেই ঘাটি বেধেছিলো। আর এতে সাহায্য করেছিলো গ্রামের মজিদ আর নাসির মিয়া।

ঘাটি বেধেই শুরু করে নির্যাতন, শোষণ। অনেক হিন্দু পরিবার কে বাধ্য করে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে।

যে ঘরে যুবতী মেয়ে থাকতো তাদের নিয়ে রাখতো মিলিটারির ডেরায়। যদি শুনতো কোনো ঘরের ছেলে যুদ্ধে গেছে তাহলে সেই ঘর আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলতো। আর তাদের এসব তথ্য দিতো মজিদ আর নাসির রাজাকার।

ভাইয়া একদিন শুক্রবারে জুম্মার নামায পড়ে মসজিদ থেকে বের হতেই মিলিটারিদের সামনে পড়ে। মিলিটারিদের অফিসার ভাইয়াকে দাড়াতে বলে জিজ্ঞেস করে, “তুঝে ইহা নয়া লাগতাহে”
ভাইয়া কিছু বলার আগেই রাজাকার মজিদ বলে, “হুজুর ইয়ে লারকে ঢাকা ছে আয়াথা”
“ও ইয়ে বাত হে, আচ্ছা তেরি নাম কেয়া হে অর কিয়া কাম কারতা হে?”
ভাইয়া বলে, “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩য় বর্ষে পড়ি”
ভাইয়ার কথা শুনে মিলিটারিদের চোখ যেনো কপালে উঠে। ভাইয়া পাশ কাটিয়ে চলে আসে।
বাসায় এসে ভাইয়া এগুলা বললে আমি আর মা অনেক ভয় পাই। মা ভাইয়াকে আর বাহিরে বের হতে দেয় না।

কয়েকদিন পর ভাইয়া খবর পায় ঢাকার অবস্থা ভালো না, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রদের ধরে মারধর, নির্যাতন করছে। কার্জন হলের সামনে প্রতিবাদ করার জন্য নির্যাতিত ছাত্ররা এক হয়েছে। ভাইয়া শুনে ঢাকায় আসতে চায়, কিন্তু মা বাধা দেয়। দেশের অবস্থা ভালো না, ভাইয়ার কিছু হলে আমাদের কি হবে? তাই ভাইয়াও আর কিছু বলে না।

একদিন ২ জন মিলিটারি আর মজিদ নাসির রাজাকার দুইজন মিলে সোলাইমান চাচার চায়ের দোকানে ঝামেলা করলে ভাইয়া আর তার বন্ধুরা প্রতিবাদ করে। পরে মজিদ ভাইয়াকে থাপ্পড় দিয়ে বলে, “বেশি লেখা পড়া হিক্কা গেছো? কথা কইতে আইবানা। জিহবা টান দিয়ে ছিড়ালামু কইলাম।”
রাগে ফুলে উঠে ভাইয়া আর তার বন্ধুরা। কিন্তু কিছু বলেনি কারন তাদের হাতে বন্দুক ছিলো। চুপচাপ চলে আসে।

তার কিছুদিন পর থেকেই গ্রামে তান্ডব চলে। নির্যাতনের মাত্রা যেনো দিন দিন বাড়ছে। চলছে হত্যাযজ্ঞ। যুদ্ধে গিয়েছে কেও এমন শুনলেই ধরে ধরে নিয়ে গুলি করে মারছে। নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে কিংবা নতুন বউদের তুলে নিয়ে যায়। আমাদের পাশের বাড়ির এক নতুন বউ কে তুলে নিয়ে যায়। তার স্বামী ঢাকার কোনো একটা সেক্টরে যুদ্ধ করে এটা তারা খবর পায়, আর খবর টাও দেয় রাজাকাররা। তাছাড়াও সে ছিলো সুন্দরী এটা ছিলো তার দোষ। গ্রামে ভাইয়ার বন্ধু শরীফ ভাই আমাদের বাড়িতে ভাইয়াকে ডাকতে আসে। ডেকে এইসব কথা বলার পর বলে,”জুনায়েদ এবার কিছু করতেই হবে। অই হায়ে না গুলার নির্যাতন আর সহ্য করতে পারছেনা গ্রামবাসী।”
মা বলে, “না বাবা শরীফ আমার জুনায়েদ রে তোরা এগুলাতে ডাকিস না”
ভাইয়া হতভম্ব হয়ে বলে, “মা কি বলছো এসব। আমরা যদি সাহস করে না দাড়াই কে দাঁড়াবে? আর তাছাড়া আজকে যদি আমার বোন কে তারা নিয়ে যেত তাহলে?”
মা শুধু কাঁদে। পরক্ষণেই মা ভাইয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “যা বাবা বন্দিদশা মুক্ত করে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা কর।”

ভাইয়াসহ ওরা ৫ জন যায় যুদ্ধে, বিভিন্ন গ্রামে। প্রতিদিন ভোর সকালে যেতো আর অনেক রাতে আসতো। কোনো রাতে বাড়িতে আসতোই না। যেদিন না আসতো মা আর আমি অনেক ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কত আতঙ্ক, এই বুঝি কিছু হলো। ভাইয়া ফিরবে তো? কয়েকদিন পরেই ভাইয়ার চেহারা তামাটে রঙ এর হয়ে যায়। চেনাই যায় না।

গ্রামের অনেক বাড়ি মিলিটারিরা পুড়িয়ে দিয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটা বাড়ি ছিলো বিল্ডিংয়ের। আমাদের বাড়ি ছিলো গ্রীল করা বিল্ডিংয়ের। তাই পোড়ানোর ভয়টা কম ছিলো। ভাইয়া একদিন দুপুরে খেতে আসে।
মা জিজ্ঞেস করে, “আজকে রাতে আসবিনা?”
“ঠিক নেই মা”
খানিক পরেই শরীফ ভাইয়া বাসায় এসে ভাইয়াকে বলে, “গোপন খবর আছে, মিলিটারিরা আজকে নাকি রাজনদের বাড়িতে যাবে তাদের উচ্ছেদ করতে”
“কিছু কর‍তে চাইছিস?”
“একদম!, ভাবছি গ্রেনেড ছুড়বো”
“কখন?”
“সন্ধ্যায়”
ভাইয়া খাওয়া শেষ না করেই উঠে পরে। অর্ধেক খাওয়া হয়েছিলো মাত্র।
ভাইয়ারা রাজনদের বাড়িতে গিয়ে তাদের অন্য বাসায় পাঠিয়ে দেয় আর বাড়ির সামনে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকে।

কিছুক্ষণ পরেই ৯ জন মিলিটারি এসে রাজনদের বাড়িয়ে ঢুকে। ঘরে কাউকে না পেয়ে বের হলেই ভাইয়া ঝোপ থেকে বের হয়ে তাদের উপর গ্রেনেড ছুড়ে আবার ঝোপে ভিতর যায়। গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়ে ৯ জনের অস্তিত্বই থাকে না।

সবাই ঝোপ থেকে বের হয়ে তাই যেনো উপলব্ধি করে।

মিলিটারি ক্যাম্পে খবর পৌঁছে গেলো কে বা কারা যেনো মিলিটারিদের উপর হামলা করেছে। জানার জন্য খোঁজ লাগায়। কিন্তু খোঁজ পাওয়ার আগেই রাজাকার মজিদ আর নাসির ভাইয়ার নাম আর বাকি ৪ জনের নাম বলে দেয়।
শরীফ ভাইয়ার বাবাকে আর আমাদের বাসা থেকে আমাকে আর মাকে তুলে নিয়ে যায়।
খবর শুনে ভাইয়া, শরীফ ভাইয়া, মোবারক ভাইয়া ঘাটিতে যায়। বাকি দুইজনকে না পাওয়ায় ওদের ৩ জনকে অনেক মারধর করে। মোবারক ভাইয়াকে রাইফেলের কয়েক ঘা দেওয়ার পর ৩ টা গুলি করে মেরে ফেলে। কিন্তু ভাইয়া আর শরীফ ভাইয়াকে গাছের সাথে উলটা করে বেধে পিটায় রাজাকার দুইজন। মা, আমি আর শরীফ ভাইয়ের বাবা অনেক কান্নাকাটি করি কিন্তু তারা নির্যাতন কমায় না।
রাজাকার দুইজন বলে, “বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ “
ভাইয়ারা বলে, “না”
“হারামখোর, বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ “
“না না না”
“এই বুড়ি, ছেলে গুলোকে বল বলতে”
মা আর শরীফ ভাইয়ের বাবা দুজনেই কাঁদে, কিছু বলে না।

ভাইয়া তখন বললো,”মা তুমি কেঁদো না, তোমার সোনার ছেলেরা আছে তারা দেশ স্বাধীন করবে। এদের বিচার করবে”
রাজাকার দুইজন ভাইয়াকে আবার পিটাতে লাগলো আর বলে, “বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ”
ভাইয়া রাজাকারদের মুখে থুতু দিয়ে বলে, “মরে গেলেও বলবো না”
“এই নে মর তাহলে” বলেই মিলিটারিদের থেকে বন্দুক নিয়ে ভাইয়া আর শরীফ ভাইয়াকে গুলি করে আমাদের চোখের সামনে মেরে ফেলে। দাঁড়িয়ে থেকে তাদের মৃত্যু যন্ত্রণা দেখেছি, ছটফট করে মরতে দেখেছি। মিলিটারিদের প্রধান রাজাকারদের বাহবা দেয়।

মা আর শরীফ ভাইয়ের বাবা অনেক কান্নাকাটি করে আর বলে লাশ দুইটা যেনো দিয়ে দেয়। কিন্তু তারা বলে লাশ কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিবে নয়তো কুকুরকে দিয়ে খাওয়াবে তবুও লাশ দিবেনা। মা বাড়িতে এসে অনেক কান্নাকাটি করে। শরীফ ভাইয়ের বাবা বাক প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। দুইদিন পরে আমি আর মা ঢাকায় চাচার বাসায় চলে আসি। পরে শুনেছিলাম ভাইয়াদের মধ্যে বাকি ২ জন দল বড় করে কয়েকদিনের মধ্যেই গ্রাম শত্রুমুক্ত করে। আর রাজাকার নাসিরকে ঠিক সেভাবেই গাছে উল্টো করে বেধে মারে গ্রামবাসীদের সামনে।কিন্তু মজিদকে পাওয়া যায়নি। গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিলো।
তাই এখনো কোনো রাজাকারের ফাঁসি হলে এত আনন্দ হয় আমার। মনে হয় প্রতিটা রাজাকারই যেনো মজিদের প্রতিচ্ছবি। তাদের ফাঁসিতে যেনো দেশ কলঙ্কমুক্ত হয়। কোনো মানুষই তার প্রিয় মানুষের মৃত্যু চোখের সামনে দেখতে চায় না।
আমার ইচ্ছে হয় রাজাকারের ফাঁসির দাবি নিয়ে পথে প্রান্তরে বিক্ষোভ করি।”

চায়ের কাপ ফাঁকা। আম্মুর কথা গুলো শুনে আমি নির্বাক। আম্মুর চোখের কোণে পানি জমে গেছে। আব্বু আম্মুকে আমরা কত তুচ্ছ কারনে বিরক্ত করি অথচ তাদের মনে থাকে লুকায়িত চাপা কষ্ট। আর দেশ প্রেম কি তা এই লুকায়িত গল্পের বহিঃপ্রকাশ না হলে বুঝাই যেতো না। মা দেশের জন্য তার সন্তানকে উৎসর্গ করে আর দেশ প্রেমিক সন্তান তার মাতৃভুমির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে।