শরীরে কাপড়-চোপড় বলতে তো কিছুই নেই প্রায়! অপূর্ব সুন্দরী! এদিকেই আসছে! কে মেয়েটি! রিক্তা না তো! হ্যাঁ, তাই তো! ও এতো সুন্দরী আর বেশরম হলো কীভাবে! এতো বছর পরে…! কিন্তু সে তো কোন আমলের কথা…!
দেখতে দেখতে রিক্তা যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে একদম সামনে এসে দাঁড়াল। রিক্তার দিকে চাইতে বড় লজ্জা হচ্ছে সালাহউদ্দিনের। কিন্তু একী! রিক্তা হেলেদুলে নাচতে শুরু করেছে, তাও আবার মাটির খানিকটা উপরে, শরীরটাকে বাতাসে ভাসিয়ে, ভরহীন, অপ্সরীর মতো। রিক্তা সালাহউদ্দিনের গা-ঘেঁসে মুক্ত-দুরন্ত কেশরাশি সালাহউদ্দিনের শিহরিত অঙ্গে রাতের বেগে ছেড়ে দিলো। রাতের সেই দুরন্ত লীলায় নির্ঝরের বুকের নুড়ির মতো সালাহউদ্দিন হয়ে উঠল বেসামাল, ‘তুমি এতো সুন্দরী হলে কীভাবে!’
রিক্তা হাসতে হাসতে তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করল।
বেসামাল নুড়িময় সালাহউদ্দিন এবার হঠাৎ জগদ্দল পাথড়ের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল, ‘দেখো, সে সময়কার দোষটা কিন্তু আমার ছিলো না। পরিস্থিতিতে…!’
রিক্তা থামিয়ে দিলো। গ্রাম থেকে এসএসসি পাশ করে শহরে আসা রিক্তার প্রথম থেকেই শহরে স্থায়ী হওয়াটা এবং ঢাকায় প্রতিষ্ঠা পাওয়াটা ছিলো ঈপ্সিত। অনেক ঘেটেঘুটে এইসএসসি পরীক্ষার মাসকয়েক আগে সালাহউদ্দিনের সাথে পরিচয়-প্রেম। এমন একটা স্বপ্নই রিক্তার ছিলো আজীবনের। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছর পরে আম খাওয়া আঁটির মতো একদিন ছিটকে যেতে হলো রিক্তাকে।
তারপরে কারও খবর কেউ রাখেনি। শহরের এই জনারণ্যে ভাসমান কচুরিপানার মতো হারিয়ে গেল অনির্দিষ্ট গন্তব্যে। আজ আবার মধ্য বয়সকে টাইম মেশিনে কেটে-চেঁছে একদম কলেজ বয়সী মসৃনতায় অপ্সরায় রূপ নিয়ে সালাহউদ্দিনের বুকের ভেতর ঝড় তুলে দিলো রিক্তা!
সালাহউদ্দিনের বুকের সাথে ভারহীন ক্লান্তিহীন ঝুলে ঝুলে সুশোভিত মোহময় এক পথে এগিয়ে চলল দুজনে। সমস্ত পথে সবুজ গালিচা পাতা। চারদিকে মর্মরিত বৃক্ষ-লতা, বিচিত্র সব বিহঙ্গের কল-কাকলি, দিগন্তবিস্তৃত ন্বর্ণাভ মাঠ, সুরঞ্জিত আকাশ! এ জীবনও কী মানবের ললাটে যুক্ত হওয়া সম্ভব!
হাঁটতে হঁটতে দুজনে কলকল বহমান এক নদীর কিনারে উপস্থিত হলো। কী স্ফটিকসদৃশ এর টলটলে পানি- যেন মধুর নহর। এ নদীর নাম কী! যতোদূর দৃষ্টি যায়, বিচিত্র সব রঙিন আলোর বিচ্ছুরণ। এতো সুন্দর সুরেলা বাজনার সুললিত সুর-লহরী কোথা থেকে আসছে! এ কী রিক্তা শরাব ধরল কবে থেকে! ও বাবা শরাবের পেয়ালা সালাহউদ্দিনের ঠোঁটেও সেঁটে ধরল! এরপর! এরপর রিক্তা আবার গীত-নৃত্য শুরু করল। তারপরে…! ও বাবা ওদিক থেকে আরও একজন আসছে! এ তো আরও বেশি মোহময়ী! ও বাবা, আরও কয়েকজন…! ওরে বাবা এ তো পাগল হয়ে যাবার সব আয়োজন! এতো সুখও কী কপালে লেখা ছিলো!
কিন্তু এ কী! এটা কে! ওর বাবা নয়তো! কী বিভৎস আবয়ব আর কী পাহাড়সম শরীর! সালাহউদ্দিনকে খপ করে ধরে ফেলল। ঘাড় চেপে ধরেছে। কিন্তু রিক্তা কই! পালাল! অন্যরা কই! ও মা, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে যে! উহ কী যন্ত্রণা! মৃত্যু যন্ত্রণা, আ আ…!
তন্দ্রা ছুটে গেল সালাহউদ্দিনের। শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দূর্বল শরীরটাকে টেনে-হিঁচড়ে সে বিছানায় বসিয়ে দিলো। বুক ভরে প্রশ্বাস টেনে নেবার চেষ্টা করতে লাগল। অক্সিজেনের অভাবে শবীরটা কেমন নেতিয়ে আছে। বুকটা হাপড়ের মতো ওঠানামা করছে। এবার সে চারদিকে দ্রুত তাকাতে লাগল। ছোট্ট কক্ষ। চারদিকটা দেয়ালে মোড়া। দরজাটাও ভেজানো। মোট তিনটে বেড। অন্য দুটি খালি, যেন ওই দানবটা দুবেডের দুজনকে গিলে খেয়ে বাইরে পানি পান করতে গেছে তৃতীয়টাকে মসৃনভাবে গলাধকরণ করতে। ভীষণ ভয় করছে সালাহউদ্দিনের। ধীরে ধীরে সালাহউদ্দিন বুঝতে পারছে; ওটা রিক্তা বা তার পিতা নয়। সে স্বর্গ, স্বর্গের হুরী আর নরকের বিভৎস ফেরেশতা বা রিক্তার বাবাকে দেখেছে, তা-ও স্বপ্ন-ভ্রম। সালাহউদ্দিন কী তাহলে বেহেস্তে যেতে পারবে না! তার জীবনের মেয়াদ সত্যি সত্যিই কী শেষ হলো! শরীরটা এবার আবার কেঁপে উঠল। শুধু অক্সিজেনের জন্য নয়, পরকালের আযাবের ভয়ে, মৃত্যুর ভয়ে। সে চিৎকার করল, ‘কে আছো গো.!’
কিন্তু ক্ষীণ একটা শব্দ দেয়ালের ছয় ভাজে গড়াগড়ি করে হুটোপুটি খেয়ে নিজের অস্তিত্বের মধ্যেই মিলিয়ে গেল। দুদিন ধরে শ্বাসকষ্টটা ভীষণ বেড়েছে। একটা অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য সে কেঁদে উঠেছিল পর্যন্ত। কিন্তু তাকে দেওয়া হয়নি। সিলিন্ডারের নাকি ঘাটতি!

‘মোহাম্মাদ সালাহউদ্দিন আছেন?’
‘জী, জনাব, আমি হাজির।’
‘যান, সরাসরি বেহেস্তে চলে যান। আপনি মহামারিতে মরেছেন। আপনি শহিদ। তাই আপনার কোনো হিসাব নেওয়া হলো না।’
কিন্তু পরের স্টেশনে সালাহউদ্দিনকে থামিয়ে দেওয়া হলো। শেষে আবার প্রথম জনের কাছে আনা হলো, ‘এটা আপনি কী করলেন, মহামান্য ফেরেশতা! মহামারিজনিত শহিদী মৃত্যু তো শুধু প্রেগ, ডায়রিয়া আর কলেরায় মৃতদের জন্য বরাদ্ধ। করোনায় মরা এই ঢ্যামনাটাকে পাঠিয়েছেন কেন! এ তো আজীবন বিলাসিতা করে করে, আরাম আয়েশে থেকে থেকে আর অপ্রয়োজনীয় ভুঁড়িভোজ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই নষ্ট করে দিয়েছিল। ও তো মরেছে ওর নিজের দোষে। করোনা কী মৃত্যুরোগ হলো! তার উপরে আজীবন ও মানুষকে যন্ত্রণা দিয়েছে, মানুষের হক মেরেছে। অপ্রয়োজনে কতো জীব হত্যা করে ভক্ষণ করেছে। এখন প্রতিশোধস্বরূপ ক্ষুদ্র ক্ষদ্র এককোষী জীবেরা যদি ওকে আক্রমণ করে আর তার বিরুদ্ধে লড়বার মতো শক্তি যদি ওর অবশিষ্ট না থাকে তার পুরস্কার কী এমন অবৈধভাবে দেওয়া যায়!!’
‘দুঃখিত, দ্বিতীয় ফেরেশতা। আপনি ওকে রেখে যান। মিস্টার সালাহউদ্দিন, আমি দুঃখিত, তোমার মতো এক দুরাত্মাকে ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে দিয়েছিলাম বলে! তোমকে সব পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। তুমি জেনারেল লাইনে গিয়ে দাঁড়াও!’
‘আমাকে মাপ করেন ফেরেশতা স্যার। আমি আপনার পায়ে পড়ি স্যার!’
কিন্তু ততোক্ষণে ধাক্কাতে ধাক্কাতে জেনারেল লাইনে নিয়ে চলল একদল ফেরেশতা।
দ্বিতীয়বারের মতো সালাহউদ্দিনের তন্দ্রা ছুটে গেল। সে কেঁপে উঠে জোরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল, ‘কোনটা সত্যি!’

ছয়দিন আগে প্রথম টেস্ট রিপোর্ট যখন সালাহউদ্দিনের হাতে আসে যখন, নিজেকে করোনা পজেটিভ দেখে সে ভয়ে ভিমড়ি খেয়ে বসে পড়েছিল চেয়ারের উপর।
করোনার উপসর্গ প্রথম যেদিন শুরু হয়, সবকিছু সে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। নাক আটকে এসে হাঁচি, জ্বর জ্বর ভাব। সে স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছিল সব। কিন্তু বাথরুমে গোসল করতে গিয়ে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট অনুভূত হতে থাক। হঠাৎ করেই তার শরীরে ভয়ের একটা ঝাঁকুনী খেয়ে যায়। বাথরুম থেকে বের হবার সাথে সাথেই ছোট ছেলেটা বাবা বাবা বলে কীসব বলতে শুরু করল। কৌশলে সে ছেলেকে তাড়ানোর চেষ্টা করে। স্ত্রী রেণুকা ততোক্ষণে ছেলেকে ডাক দিলো বলে রক্ষা।
কিন্তু রাত হবার পরপরই প্রচ- জ্বর এলো। সেই সাথে সর্দিজনিত বদ্ধ নাকে সুরসুরিজরিত হাঁচি। অবশেষে শ্বাসকষ্ট শুরু। রেণুকা হয়তো বুঝতে পেরেছ্,ে ‘কাল হাসপাতালে যাও, টেস্ট করো।’ বলে বাইরে থেকে রুম আটকে দিলো। ছেলে-মেয়েরাও হঠাৎ করে সাড়াশব্দহীন অদৃশ্য হয়ে গেল।
সকাল হতে না হতেই হাসপাতালে ছুটল সালাহউদ্দিন। টেস্ট করাল। চারদিন পরে হাসপাতালে আবার এসে করোনা পজেটিভ রিপোর্ট পেল। কিন্তু ততোক্ষণে শরীরের অবস্থা বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে গেল। দেশের ৯৩ ভাগ রোগীই হাসপাতালে না গিয়ে ঘরে থেকে রোগমুক্তির প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু সালাহউদ্দিনকে বাঁচতে হলে হাসপাতালে না গিয়ে উপায় নেই। ঘরের কেউ সাহস পেল না রোগীকে বহন করে হাসপাতালে নেবার। শেষে ফোন করে করোনা সংশ্লিষ্ট লোকদের সহযোগীতায় হাসপাতালে আসতে হলো।

মাগীর পুতেরা-খানকীর পুতেরা খ্যাক খ্যাক করে বমির মতো রাস্তায় কাশি ঢালে, কাউয়ার হাগুর মতো ফ্যাক করে ছ্যাপ ফ্যালে একদম মানুষের মুখের সামনে। হালার পুতেরা ওদের কোন বাপের কোন চিপা থেকে কোন জীবাণু নিয়া আহে খবর রাখে! আর এমন কোনো হালার পুতের ছ্যাপ থিকাই তো এমনটা হয়েছে!
সালাহউদ্দিন নিজেও অবশ্য এমনভাবেই খ্যাক খ্যাক করে রাস্তায় বরাবর কাশি আর থুথু ফেলে। তা হোক না, একজন দুজন এমনটা করলে কী আর হয়! তবে এখন তো সচেতন হয়ে গেছে। এখন তো ভুলেও ছ্যাপ বাইরে ফেলবে না।
সেদিন বিকেলবেলায় মনোব্বর, রাজু, বাচ্চু, সেলিম এদের সাথে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছিল অনেকক্ষণ। ওদের কাছ থেকে এলো না তো! রাজু হালার পুতে ফকিন্নির পোলা; চরিত্র ভালো না। খাইতে পায় না অথচ মোটরবাইক কিনে ভোত ভোত দৌঁড়ায়। মাদারিপুরে বাড়ি। এই করোনার মধ্যে সরকারি সব নিষেধাজ্ঞায় বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইতিমধ্যেই তিনবার সে বাড়িতে গেছে এসেছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে বছরেও একবার বাড়ি যায় না। এবার নাকি আবার ড্রাইভার হালার পুতেগোও আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হবার সময়। সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দুই-তিন হাজার জনপ্রতি ভাড়া নিয়ে যাত্রী আনা নেওয়া করে। হের উপরে একদল আবার নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি করছে ধুমছে। একদল আবার করোনার হাসপাতাল খুলে ভুয়া রিপোর্ট দিচ্ছে; বিশাল তাদের চিকিৎসা কর্মী বাহিনী। এই হালাগোই তো ব্যবসা। এমনকি পুরো দেশের মেম্বার চেয়ারম্যানেরাও সরকার কর্তৃক গরিবকে দেয় রিলিফের চাউল সবার চোখে ধুলো দিয়ে গায়েব করে দিয়েছে। এই সিজনে ওসব না হয়ে বাড়িওয়ালা হয়ে কোনো লাভ আছে! অভাবে পড়ে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে সবাই গ্রামে ছুটছে। বাসা পড়ে আছে খালি। যেগুলো আছে, তারও ভাড়া কমাতে হয়েছে।

এবারের মতো যদি মুক্তি পাই, মাগীরে আমি ঘরছাড়া না কইরা ছাড়ছি না। মাগীর কা- দেখেছ! টেস্ট তো টেস্ট, লক্ষণ দেখেই মাগী ছেলে দুইটা আর মাইয়াটারে লইয়্যা একদম আলাদা হয়ে গেল! হোক আলাদা, ওরা বেঁচে থাক কিন্তু ঠিকমতো অন্তত খাবারটা তো দিবি! বাঁচার জন্য দূরে থাকবি থাক কিন্তু ভালোবাসার অনুভূতিগুলোও কী ধর ছেড়ে পালাল! সরকার তো কইছেই, একগজের দূরত্বে থাকলেই তো হলো! টেস্টের রেজাল্ট শুনে মাগী কী কা-টাই না করল! ভেতরে একলা রোগীকে ঠেলে দিয়ে বাইরে থেকে রুম আটকে দিলো! সাদিকা-মারে, রিয়াজরে, নাহিদরে; এটা পোলাপানও এলো না! মেয়েটা শুধু খাবার দাবার এগিয়ে দিয়েছিল। নইলে মনে হয়, না খেয়েই বদ্ধ জেলে মরতে হতো! বাপকে ভুলে গেলি! মিডিয়া খুললেই দেখা যায়, করোনা রোগীর আপনজনেরা রোগীকে ছুঁড়ে ফেলে চলে গেছে, লাশ পর্যন্ত ফেলে পালায়। হায়রে, কার জন্য এতো সম্পদ গড়ে যাচ্ছি! বাপ সরকারি চাকরি করতো। কয় টাকাই বা বেতন পেত! ঘুষের টাকা দিয়ে জমি আর এই দু-দুটি বাড়ি করে মরে গেছে। তাকে কী দিচ্ছি! কী হয় এতোকিছু করে! আমি যা রেখে যাবো, কার জন্য রেখে যাবো! আখেরে আমার কী-ই বা লাভ হবে! হায়রে, নাওন না, খাওন না, যতœ না। ভালো তো মোবাইলটা সাথে ছিলো। নইলে ঘরের মধ্যেই পচে থাকতে হতো। কোনোমতে যদি সুস্থ হয়ে ফিরতে পারি মাগী, তুই শেষ, তোর তিন তিনটা পোলাপানও শেষ! আমারে বাপ ডাকবি! দেখামু মজা!
সালাহউদ্দিন চোখ মোছে, ‘হাশরের মাঠ শুরু হইল নাকি! সবাই এমন নিষ্ঠুর কেন!’

আর ওই হুজুর হালার পুতেরাও কী কইল! মাস্ক পরতে নিষেধ করল! করোনার দায়িত্ব নিজেরা নিলো, সামাজিক দূরত্ব মানতে নিষেধ করল। তাই তো প্রথমদিকে করোনাকে গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। অথচ আজ তাদের খবর নেই। একবার পাইলে ওগো মুখ হা করাইয় থুথু গিলাইয়া দিতাম। তবে পরে তো ঠিকই বেশ সাবধানে থেকেছি। কিন্তু কোথা থেকে এই ক্ষুদ্র অণুজীবরা তাড়া করল! করোনা ভাইরাস শরীরে কীভাবে এলো! ওই হালার পুতদের সাথে মেশার ফলেই এলো নাকি! তার মানে ওদের কেউ করোনা জীবাণু বহন করছে! তা ওরা অসুস্থ হলো না কেন! তার মানে ওদের অজান্তেই ওদের দেহসৈন্যরা করোনা শত্রুদের মেরে ফেলেছে!

অথচ দেখো, ওই মাইন্দারের পুতেগো কারবার। কী ঘিজ্ঞি বস্তি! আট হাত বাই ছয় হাত রুমের একেকটি ঘরে কতোজন মানুষ গাদাগাদি করে থাকে। কাজের ঠ্যালায় হোগার মধ্য দিয়া কৃমি বাইর হয়ে যায়। একটার গায়ের উপরে আরেকটা না শুইলে শোবার জায়গায় টান পড়ে। সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। চা খানায় আড্ডা দেয়। কী সব খায়। মাস্ক তো দূরের কথা, পিন্দনে ত্যানাও রাখে না হালার পুতেরা আর মাগীরা। কিন্তু কই, করোনার বাপেরাও তো ওদের নাকে-মুখে ঢুকতে হাজারবার ভাবে! আর কোনোমতে ঢুকে গেলেও বাপ বাপ করে পালায়। পাশের গলির ঘনবসতিপূর্ণ খেটে খাওয়া মানুষদের বেশ কয়েকজন করোনায় আক্রান্ত হলো। ভেবেছিল, এবার এ মহল্লা সাবাড় হয়ে যাবে। কিন্তু কই, এক শালাও তো মরল না। মরল তো না-ই, কাহিলও করতে পারল না হালাগো। ঘরের মধ্যে পুলিশ কর্তৃক বাধ্যতামূলক কয়েকদিন লকডাউনে থাকার পরে দিব্যি সুস্থ হয়ে ঢ্যাং ঢ্যাং করে আগের মতো রাস্তায় নামল। অথচ মরল এলাকার ডাকসাইটে ডাক্তার বাবু। আক্রান্ত হয়ে কাহিল হলো তার তার চৌদ্দ গুষ্টি।
সালাহউদ্দিনের দুটি বাড়ির একটি বস্তি অন্যটি ছিলো দোতালা। বছর বিশেক আগে দোতালাটি ভেঙে পাঁচতলা করা হয়। বাবাই করেছিলেন। সালাহউদ্দিন তখন প্রায়শই দেখেছে- নির্মাণ শ্রমিকেরা দুপুরে মোটা চালের ভাত আর সামান্য তরকারি নিয়ে দিব্যি বসে গেছে ময়লার মধ্যে। খাওয়ায় সে কী তৃপ্তি! খাবারের সাথে বালি ময়লা পেটে না যাওয়ার কথা নয়। যেই মানুষগুলো জীবনের সাথে এতো সংগ্রাম করে তারা সহজেই হজম করে নেয় বালি-পাথড়-ময়লা। সেই সাথে নিশ্চয়ই বিভিন্ন জীবাণুও হজম করে প্রতিনিয়ত। আর আজন্ম যারা এতোসব জীবাণু হজম করে চলে তাদের শরীরে যে ইমিউনিটি সিস্টেম গড়ে ওঠে, সেসবের কাছে করোনা কেন করোনার বাপেরাও পিষে চ্যাপ্টা হয়ে হজম হয়ে পায়খানার সাথে পড়ে যায়। নইলে এতোদিনে সব বস্তি আর ফুটপাতের খেটে খাওয়া সব মানুষ মাটির নিচে জৈব সার হয়ে যেত। এরা করোনায় হয়তো আক্রান্ত হয় কিন্তু নিজেরা টের পায় না। এদের অজান্তেই এদের দেহের ভেতরের সৈন্যরা এই করোনা শত্রুদের মেরে ফেলে, যা এদের অনুভূতি পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রয়োজনও বোধ করে না এই দেহ সৈন্যরা। তবুও এই মানুষেরা মরে। অল্প বয়সেই মরে, চিকিৎসার অভাবে মরে। অতিরিক্ত খাটুনীতে অকাল বার্ধক্যের কারণে মরে।
এশিয়া আফ্রিকার মানুষ তাই হয়তো কম মরে। অথচ মরে সব উন্নত দেশের উন্নত মানুষেরা। মরবে না কেন! তারা জীবনের সাথে কী যুদ্ধ করে বড় হয়! যুদ্ধ যা-ও করে, তা তো দেহকেন্দ্রিক খাটুনীর যুদ্ধ নয়। তারপরে ব্যক্তিগত বিলাসী গাড়ি-বাড়ি-এসিতে থাকা, ফাস্টফুড খাওয়া, মদ্যপান আরও কতো কী! এদের ইমিউনিটি সিস্টেম নিজেরাই ধ্বংশ করে দেয়। আর এদেশের যারা মরে তারাও তো ওদের মতো উন্নত শ্রেণির মানুষই!
আর সালাহউদ্দিন সারাজীবনটা তো এমন ভাবেই কাটিয়েছে। ভাড়ার উপর ভাড়া চাপিয়ে ভাড়াটিয়াদের হেনস্তা করে সেই টাকা দিয়ে উন্নত দেশের উন্নত মানুষদের অনুকরণ করেছে; উন্নত চরিত্র নয়, শুধু ভোগ-বিলাস। গাড়ি একটা আছে কিন্তু কোথাও যাওয়া তেমন একটা হয় না। আরামের ঢোলা প্যান্ট শার্ট পরে রাস্তায় ঘোরে, ভাড়াটিয়াদের উপর খবরদারি করে, ভাড়া বাড়ানোর বিভিন্ন ফন্দি আঁটে। আর ট্যাক্স তো ফাঁকি দেয় বিশ্রীরকমভাবে। সারাদিন বিছানায় শুয়ে মোচড়ায়। রাতে ঘুম হয় না, শরীরে অসুখ ছাড়ে না। সারাজীবনে শরীরের ভেতরে কোনো সৈন্যবাহিনীই তৈরি হতে দেয়নি। আর সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে এই করোনা জীবাণুরা।

সালাহউদ্দিন ঘেমে উঠে জোরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল, ‘নাহ, বাঁচতে আমার হবেই! এই মৃত্যুফাঁদ হইতে কোনোমতে যদি মুক্তি পাই, নিজেরে আমি আবার নতুন করে সাজাব।’