আত্মপ্রতিকৃতি
১.

লোকটি যখন কিশোর ছিল বন বাদাড়ে ঘুরত
স্বপ্নের আগুন দিয়ে নিজের দুঃখগুলো পুড়ত
দুঃখপোড়া ছাই ছিটিয়ে করত জমি উর্বরা
পাখির সাথে সখ্য ছিল কন্ঠে সুখের সুর ভরা
গোল্লাছুট আর দাঁড়িয়াবাঁধা সঙ্গী ছিল নিত্য
কচুরিপানার নীল ফুলে তার উঠত নেচে চিত্ত।
ডাংগুলি আর নৈ খেলাতে তার ছিল না ক্লান্তি
জন্মগ্রামের জলকাদা-প্রেম হয় কি রে বিভ্রান্তি?
মাছশিকারে দারুণ নেশা ছুটত ডোবা-চাতালে
মদের নেশায় চুর হয়েছে কবে এমন মাতালে?
গোলাপ, বেলি, জুঁই, চামেলি এসব তো খুব তুচ্ছ
সর্ষে ফুলের হলুদ মেখে নাচত নেড়ে পুচ্ছ।
লোকটি যখন কিশোর ছিল বন বাদাড়ে ঘুরত
উড়াল শেখার আগেই এ-লোক ঘুড়ির সাথে উড়ত।

২.

হাঁটতে তো তার ভালোই লাগে হাঁটছে এ-লোক সবখানে
শুধুই কী সে হাঁটে, নাকি থাকে কিছুর সন্ধানে?
মাঝে মাঝে পথের ওপর দাঁড়িয়ে কী সব নোট করে
নোটের ফাঁকে ফাঁকে আবার উক্তি কিছু কোট করে।
আগে তো সব থাকতো মনে এখন কিছুই থাকে না
বুড়ো হওয়ার কী যন্ত্রণা ভোগাচ্ছে সে কাকে না!
শীতের ভোরে হাঁটতে গেলেই হাড়ে ধরে কাঁপন যে
তবু এ-লোক বেরিয়ে পড়ে, আকাশটা খুব আপন যে।
হাঁটতে গিয়ে বৃক্ষ দেখে শীতের মরা ডালগুলো
কবে আবার দেখতে পাবে চেরীফুলের লালগুলো
না হেঁটে তো উপায়ও নেই রক্তে প্রচুর শর্করা
স্বাস্থ্য ছাড়া কী হবে আর ডলার দিয়ে কড়কড়া?
মাথার চুলে পাক ধরেছে চশমা ছাড়া দৃষ্টি নেই
ক’দিন পরে এমন হবে, ভালোবাসার বৃষ্টি নেই
রাতের পরে সকাল আসে শীত পেরুলেই গ্রীষ্ম পাই
বুড়োকালের নেই কোনো পর লোক হয়ে যায় নিঃস্ব ভাই।
এ-চিন্তাটা দূরেই রাখে, চিন্তা তবু নেয় পিছু
খাঁচার পাখি উড়ে গেলে পালক পড়ে রয় কিছু।

৩.

আর কিছু নয় কবিতা লিখেই ক্যারিয়ার বর্বাদ
সারাদিন শুধু অক্ষর বোনে ছন্দের চাষাবাদ।
পড়াশোনাটাও হলো না তেমন ডিগ্রি মেলেনি বড়
দূর শৈশবে খাদ্য-কষ্ট ভাঙাচুরা ছিল ঘরও।
না হয় মেলেনি মাথার ওপর ইট-পাথরের ছাদ
সারা গায়ে তার চুম্বন ছিল কবিতার আহ্লাদ।

রোগা টিঙটিঙে দেহের ওপর উজ্জ্বল দুটি চোখ
সেই দুটি চোখে খুঁজে পেতো কি-যে রাজ্যের সব লোক।
এখানে-ওখানে তাকে ঘিরে কতো কথাদের আয়োজন
কিছু ভালো কথা আলোকোজ্জ্বল কিছু ছিলো গুঞ্জন।
কেউ বলে ছেলে একদিন খুব নামী দামী কেউ হবে
তাকে ঘিরে লোক মেতে উঠবেই মানবিক উৎসবে
কেউ বলে ধ্যাৎ গরীবের ছেলে লিখেছে না হয় কাব্য
তাই বলে রোজ পাড়া-পড়শিরা তাকে নিয়ে শুধু ভাববো?
যত্ন না পেলে ঝরে পড়ে ফুল এ-তো হামেশাই ঘটে
তাকে নিয়ে কত কথাদের কথা, আজও কত কথা রটে
সেই ছেলে আজ ছেলেদের পিতা কাঁচা-পাকা চুল-দাড়ি
সারাদিন ছোটে, হাঁটে আর খোঁজে কবিতায় ঘর-বাড়ি।

৪.

ফুলের সাথে ভাব ছিল তার পাখির সাথে সখ্য
পাখির মতো উড়বে শুধু এটাই ছিল লক্ষ্য
ঝিঁ ঝিঁ পোকার গান শুনে তার কান হয়েছে বৃদ্ধ
পাখির কাছে ছন্দ শেখার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ
তরঙ্গহীন দীঘির জলে হিজল ফুলের কার্পেট
রাজহংস ঝাড়ছে ডানা ছন্দে দোলে তার পেট
হাওয়ার তোড়ে বাঁশপাতারা বাজায় করতালি
রঙের জাদু শেখায় তাকে শুভ্র জুঁই শেফালি।
কেমন করে কাব্য লেখে ছন্দে এতো দক্ষ?
ফুল-পাখিদের শিক্ষা নিয়ে লোকটি পরিপক্ক
প্রকৃতি যার শিক্ষাগুরু পাঠশালা কী দরকার
সত্যের ওপর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের সরকার।

৫.

আজকাল লোকটির নেশা খুব পানে
তাম্বুলরস নাকি খুব তাকে টানে
মুখে পান ঠোঁটে তোলে তৃপ্তির শিস
প্রথম পানের পিক পুরোটাই বিষ
বিষ ফেলে দিয়ে মুখ রসে টলোমল
দ্বিতীয় পানের পিক হলো অম্বল
ওটাকেও ফেলে দিয়ে হাসে সে স্মিত
এরপর পান হলো পুরো অমৃত।

মাঝে মাঝে কিউবান চুরুটে আগুন
সুখ টান দিয়ে গান করে গুনগুন
হুক্কাও আছে ঘরে লোকে বলে শিশা
খুব বেশি টানে যদি হয় বিবমিষা
মাথা ঘোরে, কাশি হয়, তবু দেয় টান
সপ্তাহে শিশা রোজ এক খিলি পান
মাঝে মাঝে ছবি আঁকে গাছ, পাখি, ফুল
লোকটি পাগল, নাকি কাজী জহিরুল?
…………………………………………..

হজম

আজকাল খুব বিদেশি কবিতা পড়ছিস
তা তোর বেমক্কা বমি করা দেখেই বুঝতে পারি।
হজম শক্তিটা বাড়া রে গর্দভ
চিরতা-টিরতা ধর, কালিজিরা খা, পুদিনা পাতাও চিবুতে পারিস।
বিদেশি পঙক্তিগুলো যে বাটার দিয়ে ভাজা এটা তোর জেনে নেয়া দরকার ছিল না?
অনভ্যস্ত ভেতো-পেটে কিছুটা তো সমস্যা হবেই…
তবু তোকে হজম করাটা শিখে নিতে হবে
যেখানে-সেখানে বমি করে আর লোক হাসাস নে…
যা ছাড়ার তা কমোডে গিয়ে ছাড়, কেউ টের পাবে না মোটেও।
…………………………………………..

এখন আমিও অশ্বত্থ

বহুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি
মৃত্যু আমাকে গ্রহন করেনি
বার বার আমাকে টেনে ধরেছে জীবন
কোথাও তখনও কিছু ছিল বুঝি বাকি
বুঝি এখনও আছে।
প্যাটিওর ইটের ফাঁকে গজিয়ে ওঠা আগাছার ভয়ার্ত চোখ আমি দেখেছি
যদি আর একটি দিন বেঁচে থাকা যায়
জীবনের দিকে বাড়িয়ে দেয় সন্ত্রস্ত পত্রগুচ্ছ
যদি ভোরের আলো এসে আরো একটি নতুন দিনের গান শুনিয়ে যায়
এই তৃষ্ণা আমারও ছিল
আমিও তখন মানুষের পায়ের নিচে গজানো আগাছা
দুপুরের রোদে নুয়ে পড়ার আগেই উঁচু হয়ে দেখে নিতাম অশ্বত্থের উঁচু ডাল
কত কতবার পথচারীর পায়ের নিচে পড়ে ছুঁয়েছি মৃত্যু
ছুঁড়ে দেয়া বোতলের উচ্ছিষ্ট থেকে গড়িয়ে পড়া জলে কতবার বেঁচে উঠেছি,
তবু ভোরের আলোর গায়ে ভর দিয়ে দেখেছি অশ্বত্থের উঁচু ডাল,
কি অবিরাম বাতাসে দোলে তার নিরাপদ পাতা।
এখন আমিও অশ্বত্থ
আমিও ঝড়ের চেয়ে মজবুত
তবু বার বার মনে হয় সব ডাল নিয়ে ভেঙে পড়ি মৃত্যুর গুহায়।
…………………………………………..

শিডিউল

ফেইসবুকে যুগলবন্দী আগামী বুধবার,
পরের সপ্তাহে শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে আলোচনা কফি ও কবিতায়
আগামী মাসে ছেলেটা ফ্লোরিডা চলে যাচ্ছে,
আগামী বছর দেশে যাবো, ডিসেম্বরে ছেলের বৌভাত করবো ঘটা করে,
নিজের একটি একক বইমেলা, সে তো অনেক দেরী, এতো আগে ভাববার কোনো কারণ নেই…
কত কত শিডিউল, ক্যালেন্ডারে ক্রমাগত দাগ কাটি আর ভাবি, অমুকটা দেরী আছে, পরে ভাবা যাবে।
কিন্তু হুট হাট সব সামনে এসে দাঁড়ায়
চোখের নিমিষে সূর্য ডুবছে, সূর্য উঠছে
রোববার পেরুতে না পেরুতেই শুক্রবার এসে ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে।
যে দিনটির শিডিউল করা হয়নি,
একেবারে অনিশ্চিত হয়েও সবচেয়ে নিশ্চিত যে দিন
সেটিও কি খুব কাছে এসে পড়ছে না, এমনি করে, অজান্তেই?
…………………………………………..

সকলেরই ভালো হোক

পৃথিবীটা কালো হোক, পৃথিবীটা শাদা হোক,
কিছু কিছু লালও হোক
আমি চাই সকলেরই ভালো হোক।
ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব
ধর্ম-অধর্মে কেটে যায় ছন্দ
এইসব চুকে যাক
আমি চাই সকলেই সুখে থাক।
মহামারি, দুর্যোগ, যুদ্ধের ঘন্টা
হু হু করে কেঁপে ওঠে মনটা
ভয়ানক আঁধারেও ঘরে ঘরে আলো হোক
আমি চাই সকলেরই ভালো হোক।
…………………………………………..

প্রগাঢ় গলুই

সিঁড়িগুলো হেঁটে হেঁটে পায়ের পরিধি মাপে
গলে যায় গোড়ালির উত্তাপে পথের দৈর্ঘ্য।
একটি পুরনো নৌকা তবু ঘাটে বাঁধা
কুয়াশার ভেতরে লুকিয়ে রাখে ছৈয়ার ঐশ্বর্য।
দৃশ্যমান প্রগাঢ় গলুই
বয়সের ঢেউয়ে দুলতে দুলতে
বুকের ভেতর ঠোকরাতে থাকে।