সায়ীদ আবুবকর; ৯০ দশকের কাব্যভুবনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তিনি যখন বলেন “আমি দুটি কাব্যভাষা খুব ভালো করে রপ্ত করেছি। একটা হচ্ছে নজরুলের কাব্যভাষা অন্যটা মধুসূদনীয় কাব্যভাষা” তখন স্তম্ভিত না হয়ে পারা যায়না। আমরা তার কথার সত্যতা পেয়ে যাই যখন দেখি ছাত্রাবস্থায় কাজী নজরুল ইসলামের অসমাপ্ত “মরু ভাস্কর” নিজে বাকি অংশটুকু সমাপ্ত করতে চাওয়ার দুঃসাহস দেখান এবং তৎকালীন সাহিত্য পত্রিকা “পাক্ষিক পালাবদল” এ প্রকাশও পায়। অবশ্য পরে কি কারণে সেটা থেমে গেছে আমরা আর জানতে পারিনি। অপর দিকে আমরা দেখি মধুসূদনের ইংরেজি কবিতার অনুবাদ যখন তার হাত দিয়ে বের হয়; হতবাক হয়ে যেতে হয়, মধুসূদনের মূল বাঙলা কবিতা আর সায়ীদ আবুবকরের ইংরেজির অনুবাদ আলাদা করা তখন সত্যি কঠিন হয়ে পড়ে। “প্রণয়ের প্রথম পাপ” তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থবদ্ধ কবিতাগুলোর বেশিরভাগই কবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন লেখা। সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ “কাগজ কুসুম” যা প্রকাশিত হওয়ার পর অন্য ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে তাকে নিয়ে। আধ্যাত্মিক কবির তকমা কেউ কেউ এঁটে দিতে চেয়েছেন তার ললাটে। কেউ কেউ একথাও বলতে চেয়েছেন যে মওলানা রুমি ও আল্লামা ইকবাল এর পথেই যেন হেঁটে চলেছেন কবি সায়ীদ আবুবকর। তার এক কাব্যগ্রন্থ থেকে অন্য কাব্যগ্রন্থের বাঁক ফেরা স্পষ্ট। “প্রণয়ের প্রথম পাপ” দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে, এটা কম কথা নয়। কবিতার বইয়ের দ্বিতীয় মুদ্রণ খুব কমই হয়। প্রণয়ের প্রথম পাপ- প্রথম প্রকাশ- ১৯৯৬ দ্বিতীয় সংস্করণ- ২০০৮, জুলেখার শেষ জাল- ২০০৪, সাদা অন্ধকারে কাল জ্যোৎনায়- ২০০৬, মেসোপটেমিয়ার মেম- ২০০৭, বঙ্গেঁতে বসতি- ২০০৮, এবার একটিবার এক সাথে- ২০১০, কপোতাক্ষ পাড়ের রোদ্দুর- ২০১২, কাগজ কুসুম- ২০১৪। উল্লেখিত তালিকায় নজর দিলে আমরা দেখি এক নির্ধারিত বিরতিতে প্রকাশ করেছেন প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ। তার প্রতিটি কাব্যগ্রন্থই নতুনত্বে ভরপুর মৌলিকত্বে ও স্বকীয় আলোয় উদ্ভাসিত। সমাজ সচেতন কবি নিজেই কাঁধে তুলে নিয়েছেন দায়িত্বের মহাভার পথ চলার সেই শুরু থেকেই। ‘কবিকেই শেষমেশ নিতে হবে সংগ্রামের ভার, হৃদয়ের গান ভুলে, অবশেষে গাইতে হবে এই যুদ্ধনীতি শান্তিনীতি। কে জালিম শান্তি কারে কার- তার সমাধান ও বুঝি দিতে হবে আজ কবিকেই।’ -কবিকেই শেষমেষ, প্রণয়ের প্রথম পাপ। ‘দুঃখশিল্প’ কবিতার মতো কবিতা যেমন তার কলমে এসেছে ঠিক তেমনি ‘সকল প্রসংশা তার’ তার মতো কবিতাও তিনি লিখেছেন। দুঃখশিল্প কবিতায় তিনি বলেছেন- ‘তবুও মেলেনি সুখ, তবুও মেলে না হায়, কবির কষ্টের উপশোম এক ব্যথা সেরে গেলে অন্য ব্যথা করে ওঠে বুকের ভেতরে চিনচিন; এক মৃত্যু পার হলে অন্য মৃত্যু হাতে নিয়ে পেছনে দাঁড়ায় এসে যম; এক ক্ষুধা দূর হলে অন্য এক ক্ষুধা এসে করে রাখে জীবন সঙ্গীন।’ -দুঃখশিল্প। তার কবিতায় বিদ্রোহ প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন ‘কবিমাত্রেই বিদ্রোহী’ আবার প্রেম ও তার কবিতায় সমান্তরাল। “ঘাসফুলে লেবুফুলে ভরেছি এ বুক আমার লাগে না তাই আরবি আতর আমার হৃদয়জুড়ে পৃথিবীর সুখ প্রেম দিয়ে কাটি আমি কঠিন পাথর কিন্তু যদি দুশমন ঘরে দেয় হানা লুটপাট করতে আসে এ মাটির ধন সে মন্ত্রও আমার তো আছে ঢের জানা নিতে হয় কয় ফুঁতে যমের জীবন।” বঙ্গেতে বসতি ( বঙ্গেতে বসতি)। “আমার আত্মার সুখ দেহের আরাম ছোট্ট এই দেশখানি বঙ্গ যার নাম” শিকড়ের গান, (বঙ্গতে বসতি)। “বঙ্গেতে বসতি” কাব্যগ্রন্থখানি প্রেম – ভালোবাসা, কামনা- বাসনায়, বিশ্বাস ও আকাক্সক্ষায় ভরপুর। ‘ইবনে বতুতার দেশ দর্শন’ এর মতো কবিতাও রয়েছে এই গ্রন্থে। কবি যে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পান যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় না এটা তারই প্রমাণ। একই কবিতার ভিন্ন ভিন্ন ছন্দের ব্যবহার বোধ করি এই প্রথম। যা এই কবিতাকে অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। সায়ীদ আবুবকর সম্পর্কে বাঙলা কবিতার রাজপুত্র কবি আল মাহমুদ বলেন “……সায়ীদ আবুবকরের একটা দেশ আছে। দেশটির নাম বাঙলাদেশ। ……….. সায়ীদ আবুবকর আমার বিবেচনায় অতি সম্প্রতি কালের একজন খুবই উল্লেখযোগ্য কবি প্রতিভা।……… আমি অকবিকে মুখের উপর অকবি না বললেও লিখিতভাবে তার কোনো স্বীকৃতি দেইনি। অথচ সায়ীদ আবুবকর এর মতো কবিদের বিষয় আমাদের পাঠকদের কাছে উত্থাপিত না হলে সাহিত্যের সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না বলে আমার ভয় হয়। ……… আমি সায়ীদ আবুবকর এর কবিতার পংক্তিমালা পাঠ করে প্রথম দিকে স্তম্ভিত হয়ে থাকতাম।” দৈনিক আমার দেশ, ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০০৬ “মেসোপটেমিয়ার মেম” কবির অনবদ্য এক কাব্যগ্রন্থ। যেখানে কৃষ্ণ কারাভাঁ’র মত কবিতা তিনি লিখেছেন। লিখেছেন মোরাকাবা, ইহুদীরা, বীভৎস, কাশফুলের মত, তখন আমাকে তুমি ইত্যাদি কবিতা। “কৃষ্ণ কারাভাঁ’য় কবি তার সাথে সম্পর্কিত, পরিচিত সকল রমনীকে এমন শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন যা বাঙলা সাহিত্যের বিরল। এই কবিতাকে মহাকাব্যের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি। বেহুলা বধু কবিতায় তিনি অচেনা এক বিদেশিনী প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে বলেন- “লরে না আমার বেহুলা বধূ আর নয় দুই কিনারে বাস একফুলে হবে আমাদের মধু এক জমিতেই প্রেমের চাষ।” প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছিলাম মধুসূদনীয় কাব্যভাষায় কবির কতটা দখল তা আমরা তার মধুসূদনের ইংরেজি কবিতার অনুবাদ যদি সামনে আনি তবে বুঝতে পারব। “দূরে তুমি আছো বসি; নক্ষত্র যেমন সঙ্গীগণ হতে দূরে মিটি মিটি জ্বলে বিষন্ন বদনে একা; বিচ্ছিন্ন তেমন তুমিও, বন্ধুহে, এস হেথা ফের চলে” -গৌর-দাস বসাকের প্রতি (মধুসূদনের ইংরেজি কবিতা)। “যাও, গিয়া কহো তারে, সে আমার মর্ত্যরে অস্পরী আহা, শুধু তারই তরে প্রেম- অন্ধ আমি জ্বলে পুরে মরি ” -গৌরদাস বসাক (মধুসুদনের ইংরেজি কবিতা)। মধুসূদন দত্তের ইংরেজি কবিতার সবচে আলোচিত কবিতা “প্রিয় বালিশের প্রতি”-র অনুবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্যে পাতায়, তখনই চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। তিন পর্বে লেখা কবিতার অনুবাদ আমরাও একটু পরখ করি।
১ ওহে মম নিসঙ্গ শয্যার একমাত্র সাথী, সুবালিশ মোর! সেই সব যুবা, যারা বিষাদে কাটায় রাতি বধূহীন নিদ্রাহীন অশান্তির ঘরে তোমারে সৃজিলা প্রভু তাহাদের তরে সহজেই যাতে তারা সব কষ্ট যেতে পারে ভুলি ……………..
২ যবে নিশি আসে নামি পৃথিবী র পরে প্রকৃতির তুলি দিয়া আঁকা আঁকি করে মেদিনী গগন আর জলধির মুখ; সেই ক্ষণে, মম এই তাপিত অন্তরে তুমি শুধু ঢালি দাও কী মধুর সুখ.
৩ কাহারও প্রেমিক আমি নই, কাহারো না আমি ভালবাসী; একদা যদিও ঢের বাসিতাম ভাল, বন্ধুগণে সেই প্রেম হইয়াছে বাসি ……………….. সুপ্রিয় বালিশ মোর, বুকে এস, বক্ষমাঝে ঢালো সুখমধু ; ধিক সব মানবীকে! আজ থেকে তুমি হও সম্রাজ্ঞী আমার, জীবনের একমাত্র বধূ।” -প্রিয় বালিশের প্রতি (মধুসূদনের ইংরেজি কবিতা)। সমাজ সচেতন কবি তার দায়বদ্ধতা ভুলে যাননি, তিনি তার কমিটমেন্ট থেকেই লিখেছেন। “বাঙালি বধূর গান” “রেখো মা পুত্রের মনে” শবে কদরের প্রার্থনা” ওড টু হাওয়া বিবি “ মাহুয়া” “মা” “পরবাসী বাঙালির বউ।” এই সমাজের একটা অংশের কষ্ট কবিকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছে তাই তিনি কলমে তুলে এনেছেন কষ্টের প্রকাশ। কেমন কওতো দেহি তোমার আক্কেল, ফোন করছো এত দিন পর কাতারে কামাতি গেছ কুমিরের ধন- কি হবেগো এইধন দিয়ে এদিরি শরীলে আজ চিতার আগুন, জ্বলেয়ায় যুবতীর অন্তর ফিরে আসো, কচুঘেচু খাই, তবু থাহি স্বর্গসুখে ভিটে বাড়ি নিয়ে পাড়ার নটীরা সব বলা কওয়া করে; ছিনালের এমনি ভাতার বকনার মত বউ থুয়ে মানুষটা কি পরানে গিয়ে ছে কাতার।” -পরবাসী বাঙালির বউ (কপোতাক্ষ পাড়ের রোদ্দুর)। বিশ্ব সাহিত্যে তার রয়েছে অবাধ বিচরণ। চসার থেকে ইয়েটস পর্যন্ত পড়াশোনা তার ব্যাপক। “ভিন্ন ভাষার শ্রেষ্ঠ গল্প” নামে তার অনুবাদ গল্পগ্রন্থ ও প্রকাশ পেয়েছে। নোবেল লরিয়েটের নোবেল লেকচার তিনি অনুবাদ করেছেন। বাঙলা কাব্য সাহিত্যের অন্যতম গ্রন্থ কবি আল- মাহমুদ এর “সোনালী কাবীন” ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন এবং সেটা আমেরিকার I- Proclaim প্রকাশ করেছে, বর্তমানে যার দ্বিতীয় সংস্করণ চলছে। শুধু তাই নয়, তার কবিতা স্প্যানিশসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হচ্ছে। পোয়েম হান্টার ডটকম-এ তার অবস্থান বিশ্বের ৫০০ কবির মধ্যে ৮৭ তে পৌঁছে গেছে। যেখানে বাঙালি কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া অন্য যারা আছেন সবার অবস্থান ৩০০ এর বাইরে। Bangla Literature নামে ইংরেজি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনাও করছেন নিয়মিত। কাব্যভুবনের আনাচে কানাচে ভ্রমণ করছেন কবি, শক্ত হাতে হাল ধরে। তিনি তার গন্তব্যকে ভুলেন নাই মুহূর্ত কালের জন্য। ব্লাকহোল এ হারিয়ে যাননি তিনি। লক্ষ্য স্থির রেখে শুধু সামনেই এগিয়ে চলেছেন। টালমাটাল এই বিক্ষুব্ধ সাগরের উর্মিমালা একের পর এক নির্মম চপেটাঘাতে তাকে কূলে পৌঁ ছার শিক্ষাই যেন দিয়েছে, আর তিনিও কি বিপুল উৎসাহে এগিয়ে চলেছেন সম্মুখ পানে। বাঙলা কাব্যভুবনের এক নতুন পাখি, যিনি ডেকে চলেছেন অবিরাম, তার জাতিকে জাগিয়ে তুলবার লক্ষ্যে, গেয়ে চলেছেন ঘুম ভাঙানিয়া এক গান তার নিজস্ব কণ্ঠে। স্রষ্টা- বিমুখতা কবির পথ নয় এ কথাই মনে করিয়ে দিলেন তার পাঠককে সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ “কাগজ কুসুম” উপহার দেয়ার মধ্য দিয়ে।