বৃষ্টির প্রার্থনা

একবার বৃষ্টি হোক,এলোমেলো করে দিক সব অভিমান
প্রকৃতির বুক পকেট খুলে একবার মেঘের আলিঙ্গনে
পাখি হয়ে ছড়াক আতরদানীতে ফুলের সৌরভ
পাতায় পাতায় বাজুক ভালোবাসার মোহন বাঁশি।

একবার বৃষ্টি হোক,স্পন্দনে মুছে যাক সব ভুল বুঝাবুঝি
কি এমন হবে ক্ষতি যদি মল্লিকা বনে গুঁজে জোনাকী স্বপ্ন
সবুজ পাতার দোলায় ব্যালকনি ঘিরে থাকে
অজস্র হাসি মুখ রজনীগন্ধার পিপাসার্ত ভিজা পালক।

একবার বৃষ্টি হোক,মাটির গর্ভে ধারন করুক সহাস্য গল্পকথা
পাতায় পাতায় বাতাসের আলিঙ্গনে জাগুক বুকের কপাট
ঝিঁঝিঁর ঝংকারে ঘিরে থাকুক ফুলের শিথান
বৃক্ষ ছায়ায় জ্যোৎস্না লুটাক আলোর পরশ লালচে আভা।

একবার বৃষ্টি হোক, ঘাসের আঙিনা জুড়ে করুক মাতামাতি
এলোচুল আধাফোটা কলি মেঘ মিলনের মর্মর সুর
বৃষ্টির পাঁজরে সুখ খুঁজে নিক ভালোবাসার বাঁধ ভাঙ্গা জল
প্রাঙ্গণে বসন্ত নিয়ে আসুক স্ফটিকে আটকে পরা নীল প্রজাপতি।

একবার বৃষ্টি হোক,ভিজাক শুকনো পথ নিভাঁজ শাড়ির আঁচল
ভিজাক স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাওয়া তাবৎ আড়াআড়ি পাহাড়
স্নানের জলে ভিজাক মৃত্যুর অভিসন্ধি খোঁজাভবঘুরে বিকেল
বেঁচে থাকুক মৃতিকার গন্ধে মাতানো পাখির পাঁচালি।
…………………………………………..

মৃত্যু

তোমার জানাজার পথে বিছিয়ে রেখো শীতফুল চারুকলা
এখন অঘ্রাণের শেষে যদিও কুয়াশার জংলা খুব পীড়া দেবে তবু
আমিও ওই পথে হাঁটছি মনে রেখ!
পিচ্ছিল সরুপথের পাশে শোকনামের নামতার খনি
ক্রমশই পাঠ করছি আমরা বিদ্যাপীঠ , তবু হিসাব রাখতে জানিনা
কতগুলা বেলির নিঃশ্বাস থেমে গেছে জীবন সংগ্রামে
যুদ্ধ আর কৌশল শিখতে শিখতে…
বোধের অতলে ডুব দিয়ে দেখেছি বহুবার
জীবন গল্পের আড়ালে
প্রকৃতির ধারায় প্রতিটা নাবিক বড় একা, বড়ই একাকি!
…………………………………………..

মৃত্যু উপাখ্যান
(মানুষ হিসাবে আমি খুবই লজ্জিত ভাই আবরার)

যখন মাটি-
জমা রেখেছে তোমার নিষ্পাপ ব্যর্থতা
আমি তখন-
মুঠোভরে তুলে রাখি বহু প্রশ্ন আর ভয়ের রোদকণা!
প্রথম কার্তিকে-
আজ উঠানজুড়ে রয়েছে পড়ে দেহ
আজ বৃষ্টি কেঁদেছে খুব, কেনো ধুয়ে দিতে পারেনি;
আমাদের অপরাধ-নিষ্ঠুরতা !
মানুষের অবয়ব তবু মুণ্ডহীন হিংস্রতা ক্রমেই ছড়াচ্ছে
লোমহর্ষ অধ্যায়ের নিষিদ্ধ কাবিন!
দাঁত আর নখের আঁচড়ে কারা নির্লজ্জ অপরাধী হয়ে
দখল নিচ্ছে আমাদের ভালোবাসাময়
অনুভূতির আঙ্গিনাটুকু জুড়ে!
আমরা কি তবে ক্রমেই অনুভূতিহীন জড়পদার্থে
উপনীত হবো?
শতাব্দীর অস্থিমজ্জায় তবে কী অস্থির প্রলাপে মত্ত থাকবে
বীভৎস শুকুনের পাল!
আজকাল-
আমাদের বুকের আঁচিরে বাসা বেধে আছে
কুহক মৃত্যু উপাখ্যান!
…………………………………………..

শরত রানী

শরত রানী, শরত রানী মেঘের দোলনা চড়ে
আমায় কেনো করো উদাস,অমন ব্যাকুল করে!
বিনুনিতে কাশফুলের কাব্য লিখে লিখে
আমায় কেনো যাও গো ছুঁয়ে, ভরা ঝিলের জলে!
আমি ছিলাম ঘুমের ঘোরে বর্ষা গায়ে মেখে
তুমি কেনো ভিজিয়ে দিলে শিশিরের স্বাদ মেখে!
কখনও দাও রোদের মায়া, কখনও বা বৃষ্টি
মুঠোর ভিতর ভরা যৌবন, এ কেমন অনাসৃষ্টি!
সাতসকালে শিউলি ঝরাও, বিছাও উঠোন কোণে
আমায় কেনো করো আকুল, অমন মিষ্টি জাল বুনে!
পেঁজা তুলার মেঘের কাছে শৈশব হাসে হেলায়
স্বপ্ন পরী, মেঘের তরী,জোনাক শাড়ির ভেলায়!
ডাহুকী যখন ডাক দিয়ে যায় ঝোপের আড়াল থেকে
আমি তখন তোমায় খুঁজি দারুণ ডাহুক সেজে
হাতের তালুয় জ্যোৎস্না আসে, রেশমী খোঁপা খোলে
আমিও যে গা ভাসালাম নিগুঢ় প্রেমজ দোলাচলে!
…………………………………………..

প্রাঞ্জল প্রতিবিম্ব

মায়ের মুখের প্রতিচ্ছবি পড়েছে
পুকুর পাড়ে জলের ধারে পিপলগাছের তলায়,
মা এখনো আঁচলে হলুদ জড়িয়ে উনুনের পাশে দাঁড়িয়ে;
পটলের দোলমা আর চিতল মাছের কোফতা রাঁধবেন বলে!
সময়ের বাঁকে কতোদিন সাঁতরে চলেছি ,কখনো ছুটে গিয়েছি শৈশবের আঙ্গিনায়
আবার কখনো-বা কৈশোরে,
সেদিন দেখেছি তাঁকে গুনগুনিয়ে গাইছেন নিজের অজান্তে
চোখে ছিলো প্রশান্তির ছায়া,
আমার কৈশোরক দিনগুলো হুড়মুড় করে লাফিয়ে উঠলো তখন,
দৌড়ে গিয়ে জলের প্রতিবিম্বে খুঁজেছি তাঁকে
তিনি তখন হলুদ শস্যক্ষেতে সোনালি হাসিতে হয়েছেন উজ্জ্বল!
মা এখন শুধুই-
সোনালি ফ্রেমের ওপারে প্রতিবিম্বে প্রাঞ্জল প্রজাপতি…
…………………………………………..

নীল এলবাম

জানালার ফাঁক দিয়ে যেটুকু আলো আসে
দিঘীর জলের মতো অদেখায় নেচে ওঠে বোধ,
সেই আমার প্রেম!
আজকাল ভুলে গেছি, উঠোন জুড়ে উপচে পড়া
কারো, হলুদ আলোয় মুখের আদল !
ভুলে গেছি, চুড়ির ভাঁজে আটকে যাওয়া
উসকো খুসকো কোচকানো চুল!
অতঃপর-
ঋণাত্মক ভাবনারা;
আটকে পড়ে সাদাপাতার ক্যানভাসে
হয়তোবা,কবিতারা জেনে গেছে-
কখন ছুঁয়েছে শার্টের বোতাম, সব-কটি ফর্সা আঙুল!
কখন ক্ষয়ে গেছে প্রিয় নাম, জলের আঘাতে
এখন শুধুই বাতাসে অনুভূতিগুলো ছড়ায়
ধোঁয়া উঠা কফির উষ্ণতা!
তবে কি কোথাও জীবন ছিলো না?

আকাঙ্ক্ষার গাছ ও মাধবীলতা

জীবনকে-
বাঁধাকপির মতো পেঁচিয়ে দেখছো কেনো?
এবার একটা আকাঙ্ক্ষার গাছ লাগাও;
দেখোনি?
ওখানে রোদফুল প্রেমের সুগন্ধি ছড়াচ্ছে
শিকড়ে আনন্দ বুনছে সবুজ পাতা
সময়ের কালগর্ভে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে
নিপুন সেমিকোলনে অস্তিত্বের উচ্ছ্বাস।

মৃত্যুর আঙ্গুল ছুঁয়ে ফিরে এসে দেখি
এখানে মাধবীলতার ঘ্রাণে ভরে গেছে পৃথিবীর সমস্ত শরীর!
ভেবো না, সম্বন্ধের সেতুতে পড়েছে আটপৌরে রোদ!
এখানে নারীর মতো জীবন সুন্দর
প্রচণ্ড বিশ্বাসে মাখা-
মাতৃস্তন্যের মতো পুণ্য এবং সমৃদ্ধ করো ভাবনাকে!
কেননা, প্রত্যয় আর দৃঢ়তাই পারে
শস্য অর্জনের চিহ্নস্মারক হতে।
…………………………………………..

সাত রঙ

১.
সমুদ্র-স্নান করতে চাও
তবে দুঃখ দাও! আরও দুঃখ দাও!
মানুষতো পাথর নয়! হবে উপত্যকা।

২.
তুমি ছুঁয়ে দিলে বিষ-গন্ধী জিব্বার ছোবলে
বুকের ভিটায় মুহূর্তেই চন্দ্রগ্রাস হবে।

৩.
যুবকের আঁকাবাঁকা দৃষ্টি
পুড়িয়ে দেয় হেমন্তের সোনালি ফসল।

৪.
আবেগের কথা বলতে গেলে
নদীই বেশি আবেগী।
আর যদি বলো সোহাগি
তার আর এক নাম মেঘ হতে পারে।

৫.
জন্মের পাশাপাশি
মৃত্যু শব্দটা খুব মানানসই
কারন সূচনা মানেই সীমান্তের অপেক্ষা।
জন্ম মানেই মহাকালের কাছে আত্মসমর্পণ।

৬.
মহাকালের মুখাপেক্ষী আমি জলের কান্নাচোখে
ঝর্ণাধারায় আত্মসমর্পণ করবো মেঘের কাছে ।

৭.
ক্ষুধা পেলেই কানে আসে ফুটন্ত ভাতের শব্দ
জন্মান্ধ আমি খুঁজি মানুষের ভেতরের বর্ণমালা
মিত্রতা খুঁজি জলের মাঝে বৃষ্টির ছন্দে।
…………………………………………..

দৃশ্যের ভেতর কঙ্কাল

জীবিতরা বেঁচে আছে কথার কথায় ছলে-বলে কৌশলে
চোখ খুললেই চোখে পড়ে নিষিদ্ধ আত্মার কথোকপথন
ওরা ছায়ার পেছনে আঁকড়ে আছে আয়ূরেখা বাড়ানোর বাড়াবাড়িতে
চুমু খাচ্ছে দীর্ঘায়ূ রাতের পায়ে, ছুটছে কৃত্রিম স্বপ্নের চৌকাঠ ঘিরে
কিন্তু কিছুতেই দেখতে পাচ্ছেনা আগাম দৃশ্যের অস্থির চিত্র
দেখতে পাচ্ছেনা সময়ের ধূম্রকুণ্ডে বিভ্রান্ত পথিকের আহাজারি
ওরা মৃত, ওরা অজ্ঞান, ওরা জানেনা;ওরা এখনও কেবল প্রেতাত্মা
তাই চোখের সামনে দেখছি;
ভীষণ ভয়ানক এবং পিচ্ছিল দৃশ্যমান পথ ও আমাদের প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ!
কারণ আজকাল বাতাসের কানে কানে শুধুই ছড়াচ্ছে
আমাদের কলঙ্কিত অস্থিমজ্জার ঘ্রাণ।
…………………………………………..

আপন মনে

প্রতিদিন নিত্য ব্যবহার্য চিরুনির মতো
নিজেকে গুছিয়ে নেবার অভ্যেস করার চেষ্টা করেও
অপারগ হই বারবার…

ভাবছি এবার মাটির স্পর্শে পা ভেজাবো
জুতো জোড়াকে দেবো বিসর্জন
নিজেকে চিনে নেবার শেষ চেষ্টাটুকু
না হয় আর একবার করি!

গাছেরও আবরণ আছে, রোদ-উত্তাপ সয়ে নিতে জানে
হাঁড়িকেই কেন পুড়ে পুড়ে দিতে হবে অগ্নিপরীক্ষা?
ভাগ্যিস দীর্ঘশ্বাসগুলো কেউ দেখতে পায়না
নয়তো প্রতি সেকেন্ডে শ্বাসচ্যূত হতো বিশ্বাসী নিশ্বাসের।

উদীচী বৃষ্টিতে ভিজে গেছে ডাকবাক্স
না জানি কত খবর হবে কুয়াশা
মেঘ আজীবন বার্তাবাহক বৃথাই কাঁদে!