ছড়া হোক যুদ্ধের চকচকে তরবার
দেশটাকে গড়বার
সত্যরে ধরবার
সাহসের সাথে শুধু মন দিয়ে লড়বার।

ছড়া হোক যুদ্ধের ক্ষুরধার তরবার
মোগলের দরবার
তাজি ঘোড়া চড়বার
শহীদের হাত ধরে বারে বারে মরবার।

‘ছড়া’ নামে একটি ছড়ায় একথা লিখেছেন সাজজাদ হোসাইন খান। ওই ছড়ার ভিতর দিয়ে ছড়াকার সাজজাদ হোসাইন খানের কেবল ব্যক্তিত্ব আদর্শ রূপায়িত হয়নি, বাংলাদেশের ছড়ার চারিত্রও নির্দেশিত হয়েছে। একথা না মেনে উপায় নেই, বাংলাদেশের ছড়া অত্যুত্তম। তরুণ-অতরুণ অনেকেই ভালো ছাড়া লেখেন। সেই দেশবিভাগোত্তর কাল থেকেই। তবে স্বাধীনতার পরে ছড়ার যেভাবে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, সম্প্রতি আমাদের সাহিত্যেই, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ছিল না। স্বাধীন সার্বভৌম একটি ভূখন্ডের ফুল-ফল-ফসল আমাদের এই শিল্প-সাহিত্য। দিশা যদি না হারাই, তাহলে আমাদের অন্য কোনো কোনো শিল্পমাধ্যমের মতো ছড়া অগ্রসর হয়ে যাবে আরো। সাজজাদ হোসাইন খানের এই ছড়ার মধ্যে যে কথা গেঁথে দেওয়া হয়েছে, সেই সংগ্রামশীলতা বাংলাদেশের ছড়ার কেন্দ্রচরিত্র।

সাজজাদ হোসাইন খানের কিছু ছড়া শিশু-কিশোরতোষ, আর কিছু ছড়া সর্বজনভোগ্য। আর কিছু প্রাপ্তমনস্কদের জন্যে। এমনিতেও মনে হয় আমার, সাজজাদের ছড়াসমগ্র পড়তে পড়তেও মনে হচ্ছিল, ছড়া তথা সামগ্রিক শিশু-কিশোর সাহিত্যকে আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসকারগণ কেনো তাঁদের গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেন না। আমি তো এর কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। শিশুসাহিত্য এমন একটি মাধ্যম যা পড়ে সব শিশু-কিশোরেরাই বড় হয়ে উঠেছে, আমাদের জীবনের সেই প্রথম আহারকেই অবজ্ঞা করবো আমরা? শিশুকিশোরদের পত্রিকা প্রকাশ করব, খবরের কাগজে সপ্তায় একটি পৃষ্ঠা বরাদ্দ রাখব, কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাস থেকে বাদ দেবো? কবে কোন্ প্রথম কৈশোরে অমুকের সময় পড়েছিলাম ভোম্বল সর্দার করে কিং কং, আব্বা এনে দিয়েছিলেন সে-বই তো ভুলিনি।
আরেকটু বড় হয়ে পড়েছিলাম বিভূতিভূষণ বঙ্গোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী’র ছোটোদের উপযোগী সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু, সেই বই পড়ে চোখের পানিতে ভেসেছিলাম, সত্যজিৎ রায়ের ছবিগুলির দু’একটি তো এখনো গাঁথা হয়ে আছে মনে। সাহিত্যের ইতিহাসে শিশু-কিশোর সাহিত্যেকে বাদ দিলে তা সম্পূর্ণ হয় না বলে মনে করি।
আমাদের সাহিত্যের একটা মুশকিল হচ্ছে, বিকাশটা কোথাও একটু খাপছাড়া হচ্ছে। যাঁরা গল্প-কবিতা লেখেন, তাঁরা শিশু-সাহিত্য রচনা করেন না- সৌখিন একটু সাধনা চর্চার কথা বলছি না। ভিতরটার শিশু-কিশোররা পড়ে না বলেই তো কবিতা-গল্প লেখা হয়, সে ছোটদের লেখাও লিখবে না কেনো? ছোটদের রচনাকারকরা আলাদা, কেমন যেন অপাঙক্তেয়। শিশু-কিশোর সাহিত্যকেও কেমন যেন ওঁচা মনে করা হয় ভুল।
খুব ভুল। কেমন ছড়া, ছোটদের কবিতা নয়, ছোটদের জন্যে গদ্যরচনা আরো দরকার। মহাপুরুষদের, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, বীর, শিল্পী, সাহিত্যিকদের মহৎ জীবন পত্রিকায় তুলে ধরা দরকার শিশুদের সামনে। আজকের কিশোর-কিশোরীরা যদি বিভ্রান্ত হয়ে থাকে, যা হরদম আলোচিত হয়, তার কারণ তাদের সামনে মহৎ জীবনাদর্শ তুলে ধরা হচ্ছে না। স্কুলে র্যাপিড রিডার হিসেবে আমরা পড়েছিলাম Our He…… নামে একটি বই। কোথায় হারিয়ে গেল এমন গ্রন্থ! আজকাল শিশুদের বিচিত্র বিদ্যার গাদাগাদি বই পড়ানো হয়। মানুষ হতে পারে যাতে, যা পড়ে শিশুচিন্তের উদ্বোধন ঘটে, বড় হওয়ার চেষ্টা করে, তেমন বই তো দেখি না। টুটাফাটা গল্প পড়িয়ে হবে না। চাই- যাতে কিশোর মনের সন্ধিৎসা জাগ্রত হয়, স্বপ্ন দেখতে শেখে, কাজ করবার উৎসাহ জাগে। আমাদের সাহিত্যে তার শোচনীয় অভাব। রাত্রি পার হয়ে যাচ্ছে। নিউটন গবেষণাকর্মে নিরত; ট্রেন থামতে দেরি হচ্ছে, স্টেশনে বসে এডিসন কী এক গবেষণা করে যাচ্ছেন একা একা; ভোর চারটের সময় উঠে রবীন্দ্রনাথ লিখতে বসছেন; নজরুল ইসলাম জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে লিখে যাচ্ছেন মহাবীর খালেদকে নিয়ে সুদীর্ঘ কবিতা; মুনশি মেহেরুল্লা গ্রামে গ্রামে বক্তৃতা দিয়ে জাগাচ্ছেন মুসলমানকে; বেগম রোকেয়া স্বামীর রেখে যাওয়া টাকা দিয়ে প্রাসাদ তৈরি না করে কলকাতায় মেয়েদের স্কুল করছেন- এসবের কথা কে বলবে শিশুকিশোরদের?
ছড়া কিছুটা হলেও এই জাগৃতির কাজ করছে। সাজজাদের ছড়াও।
সাজজাদ হোসাইন খান কুশলী ছড়া-লিখিয়ে। আমাদের সেরা ছড়াকারদের একজন। রাশি রাশি ছড়া লেখেননি, কিন্তু যখনই লেখেন তাঁর হাতে সোনা ফলে। ছড়া রচনার কুশলতা তাঁর অনায়াস। ‘ছড়া’ নামের এই ছড়াটিই একটু দেখা যাক। ৪-মাত্রার মাত্রাবৃত্ত। যে সংগ্রামী আদর্শের কথা বলা হয়েছে ছড়াটিতে, ৪-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে তা নৃত্য করে উঠেছে। আবার, ৮-পংক্তিতে একই অন্তমিলের মধ্যে কোথাও বিন্দুমাত্র আয়াসের চিহ্ন নেই। চমৎকার! এই একটি ছড়াই সাজজাদের ছড়ার আদর্শিকতা যেমন ধারণ করেছে, তেমিন ছড়া রচনায় তাঁর সক্ষতাও প্রমাণিত করেছে।
সাজজাদের আদর্শিকতার একটি উদাহরণ তাঁর রচিত কিশোরতোষ গদ্যগ্রন্থ দুই কাননের পাখি। সেখানে মুনশি মেহেরুল্লা এবং কবি ফররুখ আহমদ ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর এই দুই মহান মানুষের জীবন ও কর্মের ইতিবৃত্ত তিনি ছোটদের মতো করে তুলে ধরেছেন। আমি তো বলব, এই বই স্কুলে স্কুলে পাঠ্য হওয়া উচিত।
প্রধান ছড়াকার তিনি। ছড়ার জগৎই তাঁর জগৎ। ফলে একরকম ছড়া তিনি লেখেননি। ছন্দ-মিলে নৃত্য করে তাঁর ছড়া সব মিলিয়ে ধারণ করেছে জীবনের সামগ্রকেই। দ্রোহের কথা আছে, দৈনন্দিনের কথা আছে, প্রতিবাদ আছে, রঙ্গ-ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আছে, প্রকৃতির বন্দনা আছে, রাজনীতির কথা আছে- কিন্তু সাজজাদ হোসাইন খান ব্যক্তিমানুষটি যেমন, তেমনি তাঁর লেখা থেকেও নিজেকে অন্তরালবর্তী রেখেছেন।
জাত-সম্পাদক সাজজাদ হোসাইন খান। সেই কৈশোরকাল থেকে কোনো না কোনো পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করে যাচ্ছেন। আত্মপ্রচারের সম্মোহ থেকে মুক্ত, সম্পাদকী ক্রীড়াও তিনি আয়ত্ত করতে পারেননি অথবা ঘৃণা করেন, কোনো ভিড়ে বা ডামাডোলে তিনি মিশলেন না, নিজের ধরনে-বিশ্বাসে নিঃশব্দে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু এক কোণায় বসে সবই লক্ষ্য করছেন। তা না হলে কি করে তিনি লিখলেন, ‘বুদ্ধিজীবীর বদ্ধঘরে’র মতো ক্ষুরধার ছড়া?

ইচ্ছে করে বুদ্ধিজীবী হই
ঘরের কথা পরের কাছে কই
চোয়ালটাকে শক্ত করে
উড়াই কথার খই।

বুদ্ধিজীবীর বদ্ধ ঘরে
হরেক জিনিস নড়েচড়ে
হঠাৎ রাজা
একটা যদি লই।

খায়েশ জাগে বুদ্ধিজীবী হই
মিলবে নাকি বৈদেশীয়া সই?