ফররুখ আহমদের কবিতায় সমুদ্রমন্থনের শব্দ শোনা যায়। সমুদ্রের বিশালতা, ব্যাপ্তি ও গভীরতা তাঁর কাব্যের প্রকৃষ্ট সংজ্ঞা। সুদূরপ্রসারী কল্পনা, নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে অটল বিশ্বাস, মুসলিম রেনেসাঁর নতুন মূল্যায়ন এবং তাঁর কাব্যে এর ভিন্নতর প্রতিফলন ও কোন কোন ক্ষেত্রে আরেক রেনেসাঁর দিগন্ত উন্মোচন, এসব তাঁর কবিতাকে চিহ্নিত করার জন্য তাঁর কাব্যসাধনার শুরু থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু তাঁর কবিতার এই অন্যতম প্রধান রূপকটির মধ্যেই সমুদ্রের মত ব্যাপ্ত ফররুখ আহমদের কবিতাকে মাত্র ক’টি অনুষঙ্গেই চিহ্নিত ও সীমিত করা তাঁর কবিতার সর্বগামিতাকে পরিহাস করা মাত্র।
তিনি আমাদের সময়ের বোধ করি সবচেয়ে নিঃসঙ্গ কবি। অবশ্য তা শুধুমাত্র আত্মিক অর্থে নয়, তাঁর নিঃসঙ্গতা, তাঁর কাব্যের মতই, সমসাময়িক কাব্য আন্দোলনসমূহের সংগে অসঙ্গতিজনিত। তার বড় কারণ ফররুখ আহমদ অত্যন্ত সচেতন শিল্পী। আত্মসচেতন ও স্বতন্ত্র। এবং অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণীয়ভাবে ভাবাদর্শী। এই স্বাতন্ত্র্য, এই আত্ম-অভিমান ও ভাবাদর্শিতা তাঁর পক্ষে কাজ না করে তাঁর বিপক্ষে কাজ করেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাঁকে পাকিস্তানী আদর্শের প্রচারক বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁর কবিতায় যে সুদুর অতীত বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রিত হয়েছে, বলতে গেলে মুসলিম কিংবদন্তী ও ইতিহাসের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা তাঁর কল্পনার রসায়ণে আপ্লুত হয়ে ভাষা পেয়েছে, সেই কাব্যসৃষ্টির বিরল সৌন্দর্যকে মোটা দৃষ্টিতে ও যেভাবে স্থূলবুদ্ধিতে পাকিস্তানের ভিত্তিভূমি রচনার মাল-মশলা বলে বিবেচিত হয়েছে, আর তাঁকে নিয়ে এক শ্রেণীর পাঠক-সমালোচক-পৃষ্ঠপোষক যে উচ্চবাচ্য শুরু করলেন, তার ডামাডোলে তাঁর সত্যিকার কবিশক্তি অনুদ্ঘাটিত ও অনুল্লেখ্য থেকে গেল। ফররুখ আহমদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য, বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি হয়েও এবং আধুনিক কবিদের অনেককেই কল্পনা ও কবিশক্তিতে অনেক দূরে ফেলে এসেও ‘পাকিস্তানী’ ও ‘ইসলামী’ বলে চিহ্নিত হয়ে তিনি স্থবির হয়ে পড়ে রইলেন। অথচ ত্রিশের দশকের অনেক কবি থেকে যে তিনি অনেক বেশী শক্তিশালী অনেক বেশী অনুভূতিশীল, অনেক বেশী গতিশীল, এটা কোন অতিকথন নয়, ঐতিহাসিক এবং বাস্তব সত্য। এই প্রবন্ধের উপজীব্য বিষয় তাঁর তথাকথিত ‘ইসলামী’ বা ‘পাকিস্তানী’ কবিতাসমূহের পুনর্মূল্যায়ন নয়, যদিও সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে, সম্পূর্ণ নতুন ভূমি থেকে এদের পরীক্ষা করে দেখার সময় এসেছে। ফররুখ আহমদ যে একাধিক অর্থে আধুনিক ছিলেন, ত্রিশ দশকের অনেক কবির তুলনায় বহু উর্ধ্বে ছিল তাঁর সমাজচেতনা ও কালচেতনা, এ প্রবন্ধে তার উপর সামান্য আলোকপাতের চেষ্টা করা হবে। ত্রিশের দশকে বাঙলা সাহিত্যে যে বিস্ফোরণ হয়েছিল তার একটি শক্তি ফররুখ আহমদ, যদিও তাঁর অধিকাংশ লেখা চল্লিশ দশকে সম্পন্ন। কিন্তু ত্রিশ দশকের শেষার্ধে কিছু কিছু কবিতা রচিত হয়েছে তাঁর। সামগ্রিকভাবে ত্রিশ দশকের আন্দোলনের অগ্রযাত্রার তিনিই ছিলেন শেষ কান্ডারী।
মুসলিম নবজাগরণ উপমহাদেশের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তার জগতে একটি সুদীর্ঘ ছায়াপাত করেছিল। মুঘল আমলের শেষদিকে যে অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি-চেতনার ভিত্তিমূল কুরে খাচ্ছিল, বৃটিশ সাম্রাজ্যের দু’শ’ বছরে তা-ই যেন প্রকান্ড হয়ে দাঁড়ালো। ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধর্মান্ধ সমাজ প্রাচীন কৃষ্টি ও তমদ্দুনের চাদরে নিজেকে জড়িয়ে রেখে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চেয়েছে, কিন্তু এই আত্ম-বিস্মরণ খুব সহজেই বাস্তবকে খুলে ধরতে সাহায্য করেছে। ফলে উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলিম সমাজ আত্ম-আবিষ্কারের তাগিদ অনুভব করতে লাগল। ঘটনাপ্রবাহ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যেভাবে মোড় নিতে শুরু করল, তাতে এই সত্য পরিষ্কার হল যে, ভারতীয় উপ-মহাদেশ খন্ডিত হবেই। স্বভাবতই মুসলমান সমাজ নিজস্ব বাসভূমির তাগিদ ও ঐতিহাসিক কারণে এই তাগিদের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি উপলদ্ধি করতে লাগল। দু’টি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে তাই মুসলমান সমাজ মুক্তির স্বপ্নে আন্দোলিত হ’ল, তাদের কৃষ্টি, কলা ও সাহিত্যকেও সর্বভারতীয় কৃষ্টি কলা ও সাহিত্য থেকে স্বতন্ত্র করতে বদ্ধপরিকর হল। কিন্তু সর্বভারতীয় কৃষ্টিতে মুসলমানের সক্রিয় অংশগ্রহণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বহুলাংশে এর পরিমার্জনা ও উন্নয়ন-এই সত্যগুলো সাময়িক নবজাগরণের পিছনে পড়ে রইল যাকে সামগ্রিক বাস্তবতা থেকে আলাদা করা যায় না বা যা আলাদা করার মানে সত্যকে শীর্ণ, সংকীর্ণ করে তোলা, এই অচ্ছেদ্য কৃষ্টিকেই তাঁরা খন্ডিত করতে শুরু করলেন।
এই সময়ে আমরা দু’জন কবির সাক্ষাৎ পাই যাঁদের কাব্যভাবনায় বিস্তর অমিল থাকা সত্ত্বেও অন্তত এক জায়গায় মিল ছিল। সেটা হল ইসলামের অতীত জয়যাত্রা ও তৎকালীন বিখ্যাত চরিত্রসমূহ, তাঁদের মহত্ত্ব, চারিত্রিক গুণাবলী ও অপরাজেয় মনোবলকে সমকালীন নবজাগরণের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে। এ দু’জন কবি হলেন ইকবাল ও কাজী নজরুল ইসলাম। বস্তুত এ দু’জন কবি ফররুখ আহমদকে অনেকাংশে প্রভাবিত করেছেন। পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা ইকবালের কবিতায় আরব ও ইসলাম অত্যন্ত সজীব ও বাক্সময় হয়ে ফুটে উঠেছে। এবং নজরুল ইসলামের কবিতায় খলীফা উমর বা খালেদ প্রভৃতি অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে মূর্ত হয়েছেন। কিন্তু এঁদের কাব্যপ্রয়াস কোন খন্ডিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ নয়। তাঁরা প্রকৃত অর্থে সর্বভারতীয় ছিলেন, এলিয়ট-কথিত ব্যক্তি ও ঐতিহ্যের চমৎকার সমন্বয় পাওয়া যায় এঁদের কবিতায়। অবশ্য ইকবাল এ ব্যাপারে যতখানি বিশ্বজনীন ছিলেন, তার থেকে বেশী ছিলেন নজরুল ইসলাম। ইকবালের দার্শনিক মন সমকালীন চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে কয়েকটি সম্ভাব্য পথের নির্দেশ দিয়ে এবং নজরুল একান্তভাবেই কবি ছিলেন বলে জোর দিয়েছেন মানবিক গুণাবলীর উন্মেষের উপর। কিন্তু বৃহদর্থে এ দু’জন কবি সমকালীন গণমানসকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, চমৎকৃত করেছেন এবং আন্দোলিত করেছেন।
ফররুখ আহমদ প্রথাসিদ্ধ কবি ছিলেন, এ কথা সর্বৈব সত্যি নয়। মাঝে মাঝে তাঁর কবিতায় প্রথাবিরোধিতা, যা থীম থেকে শৈলীর ক্ষেত্রে বেশী প্রযোজ্য এবং নানানভাবে উচ্চারিত। (অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে তিনি বিচিত্রভাবে ব্যবহার করেছেন, মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে নতুন ডাইমেনশনে স্থাপিত করেছেন, একদিকে মুক্তছন্দের সাবলীল গতিতে ভেলা ভাসিয়েছেন, অন্যদিকে সনেটের মত নিয়মনিষ্ঠ ও ধ্রুপদী সাহিত্যের শৃংখলা সমন্বিত কবিতাও রচনা করেছেন।) কিন্তু যখনি তিনি প্রথাসিদ্ধতার নকল ভূমিতে প্রবিষ্ট হয়েছেন, তখনি অনেকটা স্বেচ্ছায় তিনি তাঁর কল্পনা ও মননশক্তিকে শৃঙ্খলিত করেছেন। তুলনায় নজরুল ইসলাম (বা মোহিতলাল মজুমদার) অনেক বেশী স্বাধীন। নজরুল ইসলাম এসব যধপশহবুবফ উপমা চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন সত্যি, কিন্তু ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্ন মেজাজে। ফলে তারা নতুন অর্থ লাভ করেছে। ফররুখ আহমদ যখন ইরান-তুরান বা আরবের দিকে দৃষ্টি মেলেন, কেন জানি না, তিনি এক ধরনের সবল উৎসাহ অনুভব করেন, এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই অতীতে ঢোকার ছাড়পত্র হয়েছে তাঁর স্বচ্ছন্দ সাবলীল গতি ও ভাষার স্বচ্ছতা।
যে কারণে পুঁথিসাহিত্যে বিষয়ের সত্যাসত্য অপেক্ষা প্রকাশের ক্ষেত্রে বেশী প্রাধান্য দিত, সেই একই কারণে ফররুখ আহমদ অনেক ক্ষেত্রে বর্ণনাপ্রধান হয়ে পড়েছেন। পুঁথিসাহিত্য, বিশেষ করে মুসলমান পুঁথিলেখকের সৃষ্টিতে একটি বিশেষ কমপ্লেক্স প্রাধান্য পেয়েছে। হিন্দুদের যেমন দেবদেবীগণ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলে সাধারণ পাঠকের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করতেন, সেরূপ মুসলমান পুঁথি সাহিত্যের বীরপুরুষরা অসম্ভবকে সম্ভব করার সাথে সাথে এমন সব কাজ করে বসতেন যা ধর্মীয় কষ্টিপাথরে অনুচিৎ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। হযরত হামজাকে নিয়ে রচিত পুঁথিতে তাঁর বীরগাঁথার পাশাপাশি তাঁর অসাধারণ শক্তির পরিচয় দানের জন্য তাঁকে অসংখ্য রমণীবেষ্টিত রাখা হয়েছে, তাঁর আয়ু হয়েছে একশ বছর। সাধারণ পাঠক এতে উৎফুল্ল হত এবং বর্ণনার যাদুকরী গুণে সবকিছুই সম্ভবপর বলে মনে হত। ফররুখ আহমদের কবিতায় উনবিংশ শতাব্দীর পুঁথি সাহিত্যের সচেতন ছাপ দেখা যায়। বিষয়বস্তু নির্বাচনে তিনি পুঁথিসাহিত্যিকদের মত সর্বজন পরিচিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবিশেষের জীবন, বিশেষ অবস্থাসূচক ঘটনা ইত্যাদির প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন। কিন্তু পুঁথিসাহিত্যের সবচেয়ে বড় প্রভাব তাঁর বর্ণনাভঙ্গিতে। অত্যন্ত সচেতনভাবে শব্দকল্প রচনা ও চয়নের মাধ্যমে, আবহ নির্মাণের কুশলতায় ও নানা অপরিচিত শব্দ থাকা সত্ত্বেও পুঁথিসূলভ গতি ও স্বাচ্ছন্দ্যকে তিনি তুলে ধরতে পেরেছেন। উদাহরণঃ
১. কেটেছে রঙিন মখমল দিন ওজুদে চিকনা সরে,
তবু দুরচারী সফরের ঢেউ ভেসে এল বন্দরে,
হাতীর হাওদা ওঠাও মাহুত কিংখাব কর শেষ,
(সিন্দাবাদ)
২. ডাকে বাগদাদী খেজুর শাখায় শুক্লা রাতের চাঁদ
মাহগির বুঝি দজলার বুকে ফেলে জ্যোৎস্নার জাল,
(দরিয়ার শেষ রাত্রি)
৩. যখন রক্তিম চাঁদ অন্ধকার তাজীতে সওয়ার
উঠে আসে দিগ্বলয়ে, ওয়েসিস নিস্তব্ধ নির্জন,
দুরে পাহাড়ের চুড়া ধ্যানমৌন-
(হাতেম তা’য়ী)
অর্থাৎ বর্ণনায় ফররুখ আহমদ অদ্বিতীয়। কিন্তু নিসর্গ তাঁর কাছে সৌন্দর্যমন্ডিত প্রেক্ষাপটে-অথবা অপ্রাপ্ত সম্ভাবনা। আধুনিক কবিদের মতো নিসর্গকে তিনি জটিল মানসিক অবস্থার প্রতিফলন হিসাবে দেখেন নি। ইংরাজি কবিতার সমসাময়িক কবিরা যে অর্থে নিসর্গ ব্যবহার করেছেন বা তাঁর সমসাময়িক বাঙালি কবিরা যে সূক্ষ্ম ও দূরবর্তী অর্থে নিসর্গ ব্যবহার করেছেন, তিনি সেই জটিল মানসিক বা আধ্যাত্মিক অর্থে নিসর্গ চিত্রিত করেন নি। ফররুখ আহমদের কবিতায় নিসর্গ প্রধান উপস্থিত বিষয় নয়, যেমন জীবনানন্দ দাশের কবিতায়। তাঁর কবিতায় নিসর্গ বর্ণনামূলক এবং সহজ ও সরল অর্থে বর্ণিত। এজন্য তাঁর উপমা-চিত্রকল্প নিসর্গ-কেন্দ্রিক হলেও পুরোপুরি নিসর্গনির্ভর নয়। সমসাময়িক কালের অনেক বাস্তব চিত্রও তাঁর কাব্যে স্থান পেয়েছে। তথাপি এ কাজে তাঁর কুশলতা দেখে বিস্মিত হতে হয়। ফররুখ আহমদের কবিতার একটি বিশেষ গুণ হল এই যে, যে-মেজাজে তিনি লিখতে শুরু করেন, যে অবস্থা বা অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে আরম্ভ করেন, রূপক উপমা চিত্রকল্পের স্রোতে কোথাও তা স্থলিত হয় না, নষ্ট হয় না। অভিজ্ঞতা, অনুভূতির এই সম্পূর্ণতা তাঁর কাব্যকে যথেষ্ট স্থৈর্য্য দিয়েছে, ব্যাপ্তি ও গভীরতা দিয়েছে। তাঁর উপমা-চিত্রকল্প রচনার পটুতার কয়েকটি উদাহরণঃ
১. যেমন শীতের পাখী উড়ে গেলে রক্তিম পালক
পড়ে থাকে ক্ষীণ স্রোতা নদীতীরে
……ফসলের
দিনশেষে রিক্তমাঠে শস্যদানা,
(হাতেম তা’য়ী)
২. উটের ঘন্টার শব্দে ম্লান মরু-বালু ওড়ে, মুছে যায় বেলা,
(কাফেলা)
৩. হীরার কুচির মত এ হৃদয় পৃথিবীর ক্রুর নিষ্পেষণে
(হীরার কুচির মত)
৪. তারাফুল ফোটানো সে কোন নলবনে গভীর মেঘের ছায়াম্লান মাটির বাঁশরী সুর ভেসে চলে ডাহুকের
(মধুমতীর তীরে)
৫. আমার হৃদয় স্তব্ধ, বোবা হয়ে আছে বেদনায়
যেমন পদ্মের কুঁড়ি নিরুত্তর থাকে হিমরাতে
যেমন নিঃসঙ্গ পাখী একা আর ফেরে না বাসাতে।
(ক্লান্তি)
৬. রাত্রির পেয়ালা পুরে উপচিয়া প’ড়ে যায় ডাহুকের সুর
শুধু সুর ভাসে
বেতস বনের ফাঁকে চাঁদ ক্ষয়ে আসে
রাত্রির বিষাদ ভরা স্বপ্নাচ্ছন্ন সাতোয়াঁ আকাশে।
(ডাহুক)
এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। রূপ-রস-গন্ধময় নিসর্গ বর্ণনায় তিনি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তুলনীয়। জীবনানন্দ দাশ যেমন তাঁর ইতিহাস-ভূগোল চেতনায় সুদুর মিশর-ব্যাবিলনের চিত্র বর্ণনা দিয়েছেন অত্যন্ত রোমান্টিক মেজাজে, ফররুখ আহমদও আরব-ইরানের যে কোন বর্ণনায় তেমনি সাবলীল, রোমান্টিক। কিন্তু সর্বত্র এক জিনিস পাঠকের দ্রুত দৃষ্টি আকর্ষণ করেঃ ফররুখ আহমদ নিসর্গ বর্ণনায় উচ্ছুসিত নন কখনো, বরং একটি মৃদু বেদনা, কোমল অনুভূতি তাঁকে ঘিরে রেখেছে সবসময়। এই বেদনা কি তাঁর সহজাত অর্থাৎ যুগদেশকালের প্রতি সচেতন অনুভূতিসমূহের ভিতর-প্রকাশ? মাত্র কয়েকটি উদাহরণঃ
১. নৈশ কুকুরের ডাক মিশে যায়, দুরে মিশে যায়-
আমাকে ঘিরিয়া ফেলে মিশরের প্রেতায়িত স্বর
(অপসৃতা)
২. বর্ষার মেঘের নীচে ছায়াচ্ছন্ন আরিচায় এসে
মনে হ’ল পারঘাট যেন এক নিষ্প্রাণ কবর
(আরিচা-পারঘাট)
৩. যে চায় বাঁচতে এই পৃথিবীর আশা, ভালবাসা,
ময়নামতীর মাঠে কাঁদে তার অতৃপ্ত পিপাসা।।
(ময়নামতীর মাঠে।। ৪)
৪. এখন বহে না হাওয়া এ বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ধারে,
এই অজগর রাত্রি গ্রাসিয়াছে সকল আলোক,
সোহরাবের লাশ নিয়ে জেগে আছে নিঃসঙ্গ রুস্তম।
(স্বর্ণ-ঈগল)
তাঁর কাব্যের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে এই বিষাদ বাতাস। একটি অস্বচ্ছ, অস্পষ্ট এবং ধরা-ছোঁয়ার বাইরের কোন জগৎ থেকে যেন তিনি উঠে এসেছেন, পৃথিবীর সকল দিগন্তে তিনি আবিষ্কার করেছেন নামহীন এই বিষ্দা অনুভূতিকে। ফররুখ আহমদ সমসাময়িক বিষয়বস্তু নিয়ে যে সব কবিতা লিখেছেন, সেসবের সর্বত্রই এক স্তব্ধ স্থবির ও দুঃখভারাক্রান্ত জীবন চিত্রিত করেছেন। অতীতাশ্রয়ী কবিতার বহুলাংশেও সেই একই বিষণ্ণতার উপস্থিতি। যেন উভয় জগতেই তিনি একই অনুভূতির অশুভ ছায়াপাত লক্ষ্য করেছেন। জীবনানন্দ দাশের মত এক্সপ্রেশনিষ্ট তিনি কতখানি প্রভাবিত হয়েছিলেন বলা মুশকিল, তবে তাঁর কবিতায় একটি ক্ষীণ ফল্গুস্রোতের মত যে নিঃসঙ্গতা, বেদনা ও নৈরাজ্যের স্রোত প্রবহমান, তার সাথে এক্সপ্রেশনিষ্ট ভাবধারার একটি স্বাভাবিক মিল চোখে পড়ে বৈকি। এবং অন্য অর্থে আমরা যদি এক্সপ্রেশনিষ্ট প্রকাশভঙ্গিকে সে যুগের কাব্যজিজ্ঞাসার এবং সমাজ-জিজ্ঞাসার বহিঃপ্রকাশ বলে ধরে নিই (যেভাবে বেশীর ভাগ কবি ও সমালোচক বা পাঠক ত্রিশের ও চল্লিশের দশক সম্বন্ধে এই রায় দিয়েছেন) তা হলে দেখা যাবে ফররুখ আহমদের কবিতা যুগ ও সমাজ দ্বারা কতখানি প্রভাবিত। অথচ ফররুখ আহমদের মত কবির মধ্যে এই প্রভাব অজান্তে, চোরাপথে কাজ করবে, এ তথ্য মেনে নেয়া সম্ভব নয়। ফররুখ আহমদ কতখানি যুগ ও কালসচেতন কবি ছিলেন, তাঁর কবিতার এই এক্সপেশনিষ্ট প্রকাশ ভঙ্গিমা থেকে তার কিছুটা আঁচ করা যায়। তিনি সময়ের ভিতর দিয়ে, অনেক সময় ইতিহাসের চশমায়, বর্তমানকে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি সমকালের সামনাসামনি দাঁড়াতেন, সেসব ক্ষেত্রে তাঁর দাঁড়ানোর যতখানি ঋজুতা দেখা যেত, তার থেকে বেশী দেখা যেত অনুভূতি। সমকাল ও কালের সমস্যাগুলির সংগে তিনি একাত্ম ছিলেন। তাঁর কবিসত্তার বড় অংশটি এই কালের সংগে নাড়ীরবন্ধনে আবদ্ধ ছিল, তাই তাঁর কবিতায় ঘুরে ফিরে একই কেন্দ্রে ফিরে আসার এত আয়োজন।
ফররুখ আহমদের সংগে দু’জন কবির মিল অস্বীকার করার উপায় নেই-একজন ইংরাজ কবি ইয়েটস, অপরজন জীবনানন্দ দাশ। এর পূর্বে তাঁর সংগে আমরা ইকবাল ও নজরুলের মিল নির্ণয় করেছি। কিন্তু সেই সাযুজ্য সম্পূর্ণ থীম বা বিষয়বস্তু এবং দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কিত। প্রকাশের বেলায় এই দুই কবির সাথে তাঁর মিল সামান্যই, যদিও নজরুলের মত ছন্দোবদ্ধ প্রকাশে ফররুখ ছিলেন সিদ্ধহস্ত। কিন্তু ইয়েটস ও জীবনানন্দের সংগে প্রকাশভঙ্গির ও বিষয়-ব্যবহারে তাঁর মিল সবচেয়ে বেশী লক্ষণীয়। ইয়েটস যেমন আইরিশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নাভিমুলে থেকেও খুব সহজে নিজের কল্পনার জগতে পালাতে পারতেন, ফররুখ আহমদ অনেকটা ইয়েটস-এর মত নিজস্ব কল্পনা জগতে পাখা মেলতেন। কেল্টিক পুরাতত্ত্ব, রূপকথা, পুরাণ ও কিংবদন্তীতে ইয়েটস এক বিচিত্র পৃথিবীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। একদিকে যেমন তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নিজস্ব ঐতিহ্য-কৃষ্টি-সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করে স্বাধীনতার চেতনাকে জোরদার করেছিলেন, অন্যদিকে তেমনি ঐ সমস্ত পুরাতত্ত্বের রূপক ও প্রতীকের নতুন প্রেক্ষিতে সংযোজন ও নতুন মূল্যায়নে ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর দুরাশ্রয়ী কল্পনা একটি সুন্দর ও সুস্থ জীবনধারায় প্রোথিত হল। ইয়েটস যে ভাসমানতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন এবং তার ‘কন্যার জন্য প্রার্থনা’ কবিতার জবপড়ৎফ রহ ড়হব ফবধৎ ঢ়বৎঢ়বঃঁধষ ঢ়ষধপব-এর সুবর্ণ সম্ভাবনাময় জীবনাযাত্রার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, কেল্টিক মিথলজীর উর্বর জগতে সেইটি সম্ভাব্য, এবং দুরার্থে, একমাত্র সম্ভাবনা হয়ে দেখা দিল। ইয়েটস-এর মিথলজী শুধু কল্পনা-ভিত্তিক, অসম্ভব এবং অতিরঞ্জিত বলে যাঁরা উড়িয়ে দিতে চান, তাঁরা তাঁর বাস্তবতা ও কল্পনার দ্বন্ধের সুবর্ণ সমাধানটিকে খাটো করে দেখতে চান। কেল্টিক মিথলজীকে তিনি নিজের কল্পনা ও অনুভূতিতে সিক্ত করে পরিবেশন করেছিলেন, কেননা তিনি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সেই মিথলজীর জগতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, এর সৃষ্টিশীল কেন্দ্রে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন। এই মিথলজী তাঁর নিজস্ব মিথলজী ও কেল্টিক মিথলজীর সমন্বয়। ফলে প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি প্রাণময় সাবলীল এবং সংহত হতে পেরেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে, এমনকি সমষ্টিগতভাবেও, কেল্টিক পুরাতত্ত্ব তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারত না, কেননা গ্রীক ও রোমান পুরাতত্ত্বের মত এর বহুমুখিতা, বৈচিত্র এবং স্তরবিন্যাস ছিল না। কিন্তু ইয়েটস এই মিথলজীকে আপন কল্পনা ও ভাবানুভূতিতে মিশিয়ে এমন চমৎকারভাবে পরিবেশন করেছিলেন যে, তারা একটি লুপ্ত পৃথিবীর ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য নিয়ে বেরিয়ে এল। ফররুখ আহমদ ঠিক একইভাবে ইসলামী ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকলায় আকৃষ্ট হয়ে ছিলেন। কিন্তু ইয়েটস-এর মত কাব্যিক স্বাধীনতা তাঁর ছিল না বলে তিনি ততটা সফল হতে পারেন নি। কিন্তু এলিয়ট যেমন কবির মনকে একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সংগে তুলনা করেছেন, যার সংস্পর্শে নতুন নতুন বস্তু বিভিন্ন অর্থ বহন করে পুষ্ট হয়, তেমনি ফররুখ আহমদ সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উৎকৃষ্ট প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বিশেষ করে এই প্রকাশভঙ্গি ও অতীতভূমিতে প্রবেশের ভঙ্গি দুই কবির ক্ষেত্রে সমান। দুই কবিই সমকালীন ঘটনার চাপে অতীতমুখী হয়েছিলেন। এবং যা আহরণ করে এনেছিলেন বর্তমানের প্রয়োজন মিটিয়েও তা বিশ্বজনকে উপহার দেওয়া গিয়েছিল। ইয়েটস-এর তুলনায় ফররুখ আহমদকে আরো বেশী রাস্তা অতিক্রম করতে হয়েছিল ধ অপরিচয়ের বাধা তাঁর ক্ষেত্রে ছিল বেশী। একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হয়ে তাঁর গ্রহণযোগ্য প্রতিটি জিনিস খুঁজে বের করে তা আত্মস্থ করে ফিরে আসা দুরূহ কাজ অবশ্যই, কিন্তু ইয়েটস-এর মত ফররুখ আহমদের গুঢ় তাগিদ ছিল। ইয়েটস-এর ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্যবোধ কতটা কাজ করছিল জানি না, যদিও তাঁর আইরিশ পরিচয়টাই যথেষ্ট বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই স্বাতন্ত্র্যবোধের পেছনে-কিন্তু ফররুখ আহমদ প্রধানত আরব-মিশরের দিকে ধাবিত হয়েছিলেন এই স্বাতন্ত্র্যবোধের তাড়নায়। এবং সকল শক্তিশালী কবির মত সহজেই তিনি অতীতের এই উর্বর জমিতে ফসল ফলিয়েছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব তাগিদেই। ইয়েটস ও ফররুখ আহমদের মধ্যে এই প্যাটার্নটি খুব সহজেই চোখে পড়ে। দু’জনেই অতীতের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছিলেন প্রধানত সমকালের প্রয়োজনে, একটি বাহিরপ্রবাসী তাগিদে। কিন্তু অতি শীঘ্রই সেই তাগিদ একটি প্রচন্ড আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তাঁরা উভয়েই নিজস্ব কবিমানসের গুঢ় তাগিদে সেই পৃথিবীর অধিবাসী হয়েছিলেন, দু’জনেরই মূল ভাবাদর্শিতা কবিশক্তিকে সচল করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ইয়েটস যেখানে খুব সহজেই ভাবাদর্শিতা কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছিলেন, ফররুখ আহমদ হয়তো কোনদিনই পরিত্রাণ পান নি তার হাত থেকে। ইয়েটস-এর বেলায় অবশ্য সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ ভাবাদর্শিতার মোহ ছিন্ন করতে সাহায্য করেছে। জীবনানন্দ দাশও অতীতাশ্রয়ী হয়েছেন। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ কোন ভাবাদর্শিতা, সমকালের তাগিদ বা বাহিরপ্রবাসী কোন শক্তির প্রভাবে অতীতমুখী হন নি। তিনি হয়েছেন নিছক কল্পনার খাতিরে তাঁর ইতিহাস-ভূগোলবিহারী মনের খোরাক জোগাতে। এবং যেহেতু কোন বাইরের দাবী ছিল না, তাই তিনি কোন সীমাবদ্ধতায় প্রভাবিত হননি, এজন্যই ফররুখ আহমদের তুলনায়, জীবনানন্দ দাশ অনেক বেশী রোমান্টিক, অনেক বেশী সুদুরবিহারী। তিনি একটি বিশেষকাল বা ঘটনাপ্রবাহে থমকে থাকেননি, তিনি ইতিহাসের আগে প্রাগৈতিহাসিক লোকে, ভূগোলেরও বাইরে ‘নবীন ভূগোল লোকে’ মিশে গেলেন। সঙ্গতভাবেই তাঁর কবিতায় সুদুরের হাতছানি আরও ব্যাপক, আরও অর্থপূর্ণ। লক্ষণীয়, জীবনানন্দ দাশ কোন ঐতিহাসিক চরিত্র-চিত্রণে প্রয়াসী হন নি। তিনি এর অসুবিধাসমূহ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং এরূপ প্রচেষ্টা যে তাঁর কল্পনাকে সীমিত সংকীর্ণ করে দেয়, সে সম্পর্কেও তিনি সচেতন ছিলেন। কিন্তু ফররুখ আহমদের সংগে জীবনানন্দ দাশের মিল হল অতীতকে বর্তমানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে। উভয় কবি এখানে সচেতন বাকশিল্পী। জীবনানন্দ দাশ যেমন দুরাশ্রয়ী চিত্রকল্প/রূপক/উপমার মাধ্যমে সুদুরকে অভিজ্ঞতার সীমানায় পৌঁছে দিয়েছেন, ফররুখ আহমদও কাল ও যুগের বাধা অতিক্রম করে প্রতিটি ঘটনা, চিত্রকে সমসাময়িক করতে চেয়েছেন প্রকাশের সাবলীলতার মধ্য দিয়ে। বলা বাহুল্য, সমসাময়িক এ দুই কবি অন্য যে কোন কবির চেয়ে বেশী পরিশ্রমী, বেশী শক্তিশালী। অন্য কোন কোন কবির মধ্যে এই ইতিহাস-ভূগোল চেতনার প্রকাশ দেখা যায়, কিন্তু সর্বত্রই তা আধা-প্রচেষ্টা বা অসম্পূর্ণ ও নিস্তেজ প্রচেষ্টারূপে দেখা যায়। জীবনানন্দ দাশ তাই ফররুখ আহমদকে প্রভাবিত করেছেন। ক’একটি ক্ষেত্রে এই প্রভাবশৈলীর ছদ্মবেশ বেরিয়ে পড়েঃ যেমন-
১. সবে নীড়ে ফেরে পাখী, নিভে যায় আলো, জ্বলে ওঠে আলো,
(দোয়েলের শিস)
২. সাড়ে আটটার ট্রেন উগারিয়া গেল তার আহার্য রাতের
(পটভূমি)
৩. এক রাত্রে ডালিমের ডালে স্নিদ্ধ উজ্জ্বল শিশির
(রাত্রির ঘটনা)
৪. দুরচারী পাখীদের সাথে
নোঙর ভাসিয়া চলে পাখীদের পাখাতে পাখাতে।
তারপর চেয়ে দেখ শিশির কণিকা দুর্বাঘাসে
(নোঙর)
কোন সোচ্চার প্রভাব নয়, কিন্তু জীবনানন্দ দাশের চিত্রকল্প, চিত্রপট ও আবহ রচনার কুশলতা ফররুখ আহমদের ছিল বলে এবং তাঁর কল্পনা ও চিন্তাশক্তির একটি সুস্থ সম্মিলন তাঁর কবিজীবনের শুরুতেই সম্ভব হয়েছিল বলে তিনি নিজস্বতায় ভাস্বর। লক্ষণীয়, আধুনিক বাংলা কবিতায় এক্সপ্রেশনিস্ট ভাবধারার সবচেয়ে সার্থক প্রকাশ জীবনানন্দে, সেদিক থেকে দেখতে গেলেও এই দুই কবির ভিতর একটি অনুচ্চারিত সাযুজ্য চোখে পড়ে। কিন্তু ফররুখ আহমদের কবিতায় কোন অবস্থাতেই জীবনানন্দ দাশের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী নয়। উপরোক্ত উদাহরণসমূহে, পুরোপুরি প্রভাব নয়, বরং প্রভাবের ইঙ্গিত রয়েছে। এবং এসব কবিতায়ই তিনি একাধিক সুর বাজিয়েছেন বলে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য জীবনান্দ দাশ উপস্থিত। বরঞ্চ বলা চলে, জীবনানন্দ দাশের প্রভাব তাঁকে পশ্চিম থেকে মুখ নিজস্ব ভূমিতে প্রবেশের একটি সাময়িক অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। উভয় কবি অতিমাত্রায় রোমান্টিক ছিলেন, অনুভূতি-প্রবণ ছিলেন, হয়তো সেই কারণেই দেশজ কৃষ্টিকলার লুপ্ত জগতের প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ-যে আকর্ষণ অজানা ও অচেনা লোকের আকর্ষণ। কিন্তু দুই কবির ক্ষেত্রে এই সূক্ষ্ম চেতনা, পরিপূর্ণ অংশগ্রহণ ও ঐতিহ্যবোধের গর্ব এই দুই পল্লবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সময়হীনতা, ইতিহাসের অতীত ইতিহাস চিরন্তন ঘটনা-প্রবাহের সুদুর উৎসের ভিতর দিয়ে তাঁরা নিজদেশ ও সমাজকে প্রত্যক্ষ করেছেন। জীবনানন্দ দাশ বা ফররুখ আহমদ কেউই একাত্ম হ’তে পারেননি সেই অতীতের সংগে। ব্যাবিলন, মিশর, নিনেভা, আফ্রিকার হরিৎ প্রান্তরে জেব্রা ইত্যাদি একটি প্রবল অনুভূতিপ্রবণ মনের কল্পনার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে কাব্যিক বৈধ্যতা লাভ করেছে সত্যি, কিন্তু কবি ও তাঁর কাব্য সামগ্রীর মধ্যে দূরত্ব সম্পূর্ণ ঘুচিয়ে দিতে পারেনি। পাঠক এই অংশগুলিতে তার কল্পনার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারে বলে এবং অপরিচয়ের আস্বাদ গ্রহণ করতে পারে বলে তাঁর অনুগামী হয়। কিন্তু কেন জানি জীবনানন্দ দাশ তাঁর সম্পূর্ণ অতীতাশ্রয়ী কবিতায় সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, বরং যে সব কবিতায় তাঁর কল্পনার উড্ডয়ন তাঁর পারিপার্শ্বিকতার সংগে একসূত্রে প্রথিত, সেসব কবিতায় তিনি উড়াল দেন আবার ফিরে আসেন এবং বস্তুত এই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি কবিতাকে চমৎকার নতুনতর এক আবেদন প্রদান করে। এসব কবিতার ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকরদের মত খন্ড খন্ড চিত্র নির্মাণ হয়তো কোন আংশিক চিত্রকে প্রকাশ করে না, কিন্তু এর সামগ্রিক আবেদন অনস্বীকার্য। অতীত ও বর্তমানে যত বেশী স্বচ্ছন্দ আনাগোনা, কবি তত বেশী সার্থক।
ফররুখ আহমদ যেখানে ঐতিহ্যমন্ডিত তাঁর নিজস্ব অতীতের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখান, জীবনানন্দ দাশের মত তিনিও পক্ষপাতিত্বের মাত্রা অনুযায়ী স্বচ্ছন্দ অথবা অস্বস্তিবোধ করেন। আগেই বলা হয়েছে, ফররুখ আহমদের অতীত বিষয়বস্তুগত এবং কল্পনার স্বাধীন বিচরণ উভয় দিক দিয়ে সীমিত। তিনি যত বেশী সেই অতীতে প্রবিষ্ট ততবেশী তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব। ফররুখ আহমদ একটি অভাবিত উপায়ে এই অস্বাচ্ছন্দ্য কাটিয়ে উঠেছেন। জীবনানন্দ দাশ যেমন বাংলার চিরন্তন দৃশ্যাবলী ও দৃশ্যপটের পালাবদলকে তাঁর অতুলনীয় নিসর্গ বর্ণনায় ধরে রেখেছেন তেমনি ফররুখ আহমদ একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাধ্যমে তাঁর কল্পনাকে ধাবিত করেছেন। তাঁর কাব্যের অনেকাংশে সমুদ্রের যে বিশ্বস্ত বর্ণনার দেখা মেলে, যে বর্ণনা তাঁকে বিষয় ও ঘটনাসমূহের ভীড় থেকে কল্পনার মুক্তাঙ্গনে নিয়ে আসে, তা আসলে তার অস্থির মনের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। লক্ষণীয়, অতি সাম্প্রতিক দেশজ চিত্র বর্ণনায় সমুদ্রের স্থান নেই, কারণ এসব কবিতায় তাঁর গতি সাবলীল। সমুদ্রের দেখা মেলে কবিতায়, যেখানে অপরিচয়ের দূরত্ব ঘোচানোর জন্য প্রেক্ষাপট ও নিসর্গ উভয় অর্থে সমুদ্রকে ব্যবহার করা হয়েছে। কতিপয় উদাহরণঃ
১. কালো আকীকের মত এ নিকষ দরিয়ার বুক ছিঁড়ে
(সিন্দাবাদ)
২. কাল ঝোড় রাতে দাঁড়ের আঘাতে দামী জেওরের মত হীরা জওহর ফুটেছিল কত দরিয়ার নীল ছাঁচে,
(দরিয়ায় শেষ রাত্রি )
৩. ভাঙো দরিয়ার ঘূর্ণি তুফানে জীর্ণ প্রাচীন মন
(বন্দরে সন্ধ্যা)
৪. এ কী ঘন-সিয়া জিন্দেগানীর বা’ব
তোলে মর্সিয়া ব্যথিত দিলের তুফান-শ্রান্ত খা’ব
(পাঞ্জেরী)
সর্বত্রই অবস্থাবিশেষের এক একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে তাঁর সমুদ্র বর্ণনা। অনুভূতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বৃহত্তর প্রতিবেশে। বোধের রাস্তাগুলো ক্রমাগত প্রশস্ত করেছেন। যা ক্ষুদ্র প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র পারিপার্শ্বিকতায় বাষ্ময় হত না, বৃদ্ধি পেত না, তাকে সমুদ্রের ব্যাপ্তি দিয়ে অনবদ্য করেছেন। ফররুখ আহমদ যখন সমুদ্রের রুদ্র মূর্তি, তার প্রচন্ড রূপ আঁকেন, তখন তিনি ইংরেজ চিত্রকর টার্নারের মত অনন্য হয়ে ওঠেন। টার্নারের সমুদ্রচিত্র অংকনে শক্তি এবং গতির অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়, যা সমুদ্রের উন্মত্ত চিত্রটির সঠিক ও জীবন্ত প্রকাশ। ফররুখ আহমদের কবিতায়ও তেমনি গতিময় এবং রুদ্র হয়ে দাঁড়ায় সমুদ্র। যে কারণে ত্রিশ দশকের কবিদেরকে বাইরের দিকে দৃষ্টি ফেলতে হয়েছে সে কারণে ফররুখ আহমদও সমুদ্রকে বেছে নিয়েছেন। ত্রিশের কবিরা বহুলাংশে বর্তমানকে প্রকাশ করতে গিয়ে অতীতকে কোন কোন সময় অস্বীকার করেছেন-সেই অতীতকে যা শুধুই ঘটনা সমষ্টির সমাহার। জীবনানন্দ দাশ যত সহজে এই অদূর অতীতকে পিছনে ফেলে এমন এক অতীতে উপস্থিত হয়েছিলেন যা কল্পনার চারণভূমি হিসাবে বৈধতা পেয়েছিল, অন্যান্য কবি সেই অতীতে তত সহজে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে তাঁরা নিজেদের অতীত ও নিজস্ব মিথলজী সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন। ফররুখ আহমদের কবিতায় সমুদ্র তেমনি এক মিথলজীর বহিঃপ্রকাশ। তাঁর ভাবনা-চিন্তা, কল্পনা-অনুভূতির সহগামী হিসাবেই সমুদ্র বেশী গুরুত্বপূর্ণ।
ফররুখ আহমদ অত্যন্ত নগর-সচেতন কবি ছিলেন। আপাতঃদৃষ্টিতে তাঁকে স্বপ্নালু, ভাবাদর্শী এবং রোমান্টিক মনে হলেও তাঁর অতিমাত্রায় সমকালচেতন মন সবসময় সক্রিয় ছিল বর্তমানের জটিল জীবনযাত্রা, শূন্যতা, নির্জনতা, নৈঃসঙ্গ, আত্মিক অসারতা ও স্নায়ুবৈকল্যের রহস্য-উন্মোচনে। ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের আনুষঙ্গিক পাশবিকতা, অমানুষিক বর্বরতা ও ধনী ও গরীবের মধ্যে ন্যাক্কারজনক বৈসাদৃশ্য তাঁকে বিচলিত করেছিল। ত্রিশের যে কোন কবি থেকে তিনি অধিক মাত্রায় সমকালচেতন ছিলেন। এবং তাঁর ইসলামী ঐতিহ্যবোধের প্রয়োজনে লিখিত কবিতাসমূহ বাদ দিলে এত স্বল্প কথায় এত তীর্যকভাবে বর্তমানের সমস্যাসমূহ প্রকাশ করার ক্ষমতা অন্যকোন কবিতে দৃষ্ট হয় না। ফররুখ আহমদ ব্যক্তিকে নিয়ে বেশী ভাবিত ছিলেন না, ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে সমাজকে দেখতেই তিনি উৎসাহী ছিলেন। একারণে তাঁর ব্যঙ্গ কবিতার সংখ্যা অনেক। তুলনায় প্রেমের কবিতা সংখ্যালঘু। প্রেমের কবিতা বা যে অর্থে প্রেম ভালোবাসার নিবিড় উচ্চারণ বিভিন্ন কবিতে ধ্বনিত হয়, তার সকল উপাদান ফররুখ আহমদে ছিল, কিন্তু প্রেমের কবিতা তিনি বেশী লেখেননি, কারণ বোধ হয় তাঁর ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রতি অনীহা। অথচ যখন তিনি প্রেমের কবিতা লিখেছেন, অতি উঁচুদরের কবিতা লিখেছেন। এবং ব্যক্তির সর্বোচ্চ প্রতীক হিসাবে সিন্দাবাদ তাঁর কবিতায় শুরু থেকে উপস্থিত। কিন্তু সিন্দাবাদ ব্যক্তির ভিতর দিয়ে ব্যক্তিহীনতায়, একের ভিতর দিয়ে বহুতে পরিণত হয়েছে।
মাত্র তিনটি কবিতার আলোচনা থেকে ফররুখ আহমদের প্রবল যুগকেন্দ্রিক মনের পরিচয় পাওয়া যাবে। ‘লাশ’, ‘পটভূমি’ এবং ‘পোড়ামাটি’ যেন তিনটি অঙ্গুলি তুলে সমকালকে শাসন করছে। ফররুখ আহমদের এই পর্যায়ের কবিতাসমূহে কোন অকারণ ভাবোচ্ছ্বাস নেই, কোন মোহ কী উত্তেজনা নেই। যেন আনুপূর্বিক প্রতিটি ঘটনা প্রতিটি অভিজ্ঞতা একের পর এক সাজিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র খাড়া করেছেন। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহী কবিসত্তা তীব্র ঘৃণার অগ্নি ছড়াচ্ছে প্রতিটি কবিতায়। নগরীকে তিনি সুস্থ চেতনার হন্তারক ধরে নিয়েছেন বৃদ্ধদেব বসুর মত, সুধীন দত্তের মত, সমর সেনের মত, বিষ্ণুদের মত। কিন্তু নগরী তো মানুষেরই সৃষ্টি। তাই তিনি ওঁদের চাইতে এক ধাপ এগিয়ে মানবতার মুখোশটাকেই ছিঁড়ে ফেলতে উদ্যত হয়েছেন, মানুষের ব্যক্তিগত গ্লানির উৎসে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেনঃ
মানুষের হাড় দিয়ে করেছ এ নগর-পত্তন
মরুভূমি হল বন, মরুভূমি মানুষের মন
(পোড়ামাটি)
লক্ষণীয় : মরুভূমি, পোড়ামাটি ইত্যাদি নিসর্গ দৃশ্য এলিয়টের ডধংঃব খধহফ-এর সংগে গভীর সম্পর্কযুক্ত। সমসাময়িক কবিদের মত এলিয়টের প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। সভ্যতাকেও মানুষের সমাজকে মরুভূমি বা পোড়ামাটির সংগে তুলনা করার এই প্রবণতা এলিয়টের পরে বহুব্যাপ্ত। নগর সম্পর্কে ফররুখ আহমদের দ্বিধাহীন মন্তব্যঃ
এখানে কলের ঝড়ে ঘুম ভাঙে শব্দিত জগতে
সন্ধ্যার জনতা হেথা কালি বয়ে নিয়ে যায়
মরমের পরতে পরতে
(পোড়ামাটি)
নগরী ও নগরজীবন শাপপ্রস্ত। মুক্তির সম্ভাবনা সুদুর এবং কবির ভাষায় যতদিন মানুষ এই যান্ত্রিকতায় নিষ্পিষ্ট হয়ে “সংকীর্ণ গলির পথে দৃষ্টিহীন কুকুরের মত/প্রেতাত্মার বোঝা” বইতে থাকবে ততদিন মুক্তি অসম্ভব। অন্যত্রঃ
বিকট শব্দের মেঘ বিছায়েছে নগরীর আকাশে ধূসর
রঙচটা বিবর্ণ চাদর
ট্রাফিকের আর্তনাদে, ট্রামে, বাসে পথের পাথর
ম্লান হয়ে যায় যেন……..
(পটভূমি)
বা,
এই সব শড়কে এখনো
মরা মানুষের প্রাণ
সংখ্যাহীন করোটি অম্লান,
পশুর মতন মৃত্যু সে খবর রয়েছে এখানে
(বিরান সড়কের গান)
কিন্তু সকল অসারতার পিছনে মানুষ নিজে। মানবিক কোন গুণের কোন অস্তিত্ব নেই, মানুষ নিজেই তার মৃত্যু এবং ধ্বংস ডেকে এনেছে। ‘লাশ’ কবিতায় কঠোর ভাষায় বিবেকবিহীন হত্যাকারী হিসাবে চিহ্নিত করে তাকে জনসমক্ষে উপস্থিত করেছেন, সবচেয়ে বেশী সমকালচেতন কবিতা হিসাবে ‘লাশ’ শুধু একটি বিশেষ সময়ের করুণ ধ্বংসের সাক্ষীই নয়, বরং অনাগত সকল অমানুষিকতা পাশবিকতার প্রতিও ঘৃণার মূর্তিমান এবং সরব প্রকাশ।
জানি মানুষের লাশ মুখ গুঁজে পড়ে আছে ধরণীর ’পর
ক্ষুধিত অসাড় তনু বত্রিশ নাড়ীর তাপে প’ড়ে আছে
নিসাড় নিথর
পাশ দিয়ে চলে যায় সজ্জিত পিশাচ, নারী নর
অতঃপর,
পৃথিবী চষিছে কারা শোষণে, শাসনে
সাক্ষ্য তার রাজপথে জমিনের ’পর
তাঁর কণ্ঠ ক্রমে সোচ্চার হতে হতে চিৎকারে পরিণত হচ্ছেঃ
স্ফীতোদর বর্বর সভ্যতা
এ পাশবিকতা,
শতাব্দীর ক্ররতম এই অভিশাপ
বিষাইছে দিনের পৃথিবী,
সমগ্র সভ্যতার প্রতি অনাস্থাবাণী উচ্চারণ করে কবি মানুষের নকল অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছেনঃ
কার হাতে হাত দিয়ে নারী চলে কাম সহচরী?
কোন সভ্যতার?
কার হাতে অনায়াসে শিশুকণ্ঠে হেনে যায় ছুরি?
কোন সভ্যতার?
এবং একটানে সভ্যতার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে কবি একটি ভয়ানক সত্যের সম্মুখীন হয়ে আঁতকে উঠেছেনঃ ‘জড়পিন্ড হে নিঃস্ব সভ্যতা’-এবং এই জড় সভ্যতার প্রতি তাঁর শেষতম অভিশাপঃ “ধ্বংস হও-/তুমি ধ্বংস হও।।”
ফররুখ আহমদের অনুভূতি তীক্ষ্ণ ও কোমল ছিল বলে বেশীক্ষণ এই বীভৎস সত্যকে তিনি সহ্য করতে পারতেন না তাঁকে তাঁর কল্পনার অমল জগতে আশ্রয় নিতে হত। কিন্তু তাই বলে তিনি পলায়নপর কবি ছিলেন না। বাস্তবকে গ্রহণ করতে, বাস্তবের ভিতর চিত্র অংকন করতে, কোন কোন সময় এই জরাগ্রস্ত বাস্তবকে উন্মোচন করতে এবং ‘লাশ’-এর মত কবিতায় বাস্তবকে আঘাতে আঘাতে চরম সত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে তিনি কখনো পিছপা হননি। ত্রিশের কবিরা যেমন এলিয়ট বা অডেন অথবা স্পেন্সারের মতাদর্শে প্রভাবিত হয়েও কোন কোন ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যক্তিকে সমাজের পটভূমিতে স্থাপন করে তাকেও তার সমস্যগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, ফররুখ আহমদও তেমনি বাস্তবকে অত্যন্ত নিকট থেকে খুঁটিয়ে দেখেছেন, বাস্তবকে ও বাস্তবের মেকী বহিরঙ্গকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। কিন্তু ফররুখ আহমদ সবার থেকে স্বতন্ত্র এই জন্য যে, তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র কৃত্রিমতা নেই।
ত্রিশের দশকের কোন কোন কবির কবিতা অনেক সময় নির্জীব ও কৃত্রিম মনে হয়, যেমন সুধীন দত্তের নাস্তির বাতাসে ঘেরা কবিতাসমূহ একটি মতাদর্শ প্রচারের বাহন বলে মনে হয় অনেক সময়, সমর সেনের কবিতায় রোগগ্রস্ত মহানগরীই প্রধান উপস্থিতি বলে মনে হয় কোন কোন সময় এবং সমকালের সংগে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ত বলে এসব কবিতায় এক ধরনের ক্লান্তি পরিলক্ষিত হয়, যেন একঘেঁয়ে জীবনের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে গিয়ে কবিতাগুলোও একঘেঁয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফররুখ আহমদের মধ্যে সমকাল ও তার ভাবনা সমস্যা Obsess হয়ে দাঁড়ায়নি, ফলে ক্লান্তি বা একঘেঁয়েমির অভিযোগ তাঁর ক্ষেত্রে কখনো প্রযোজ্য নয়।
একই কবিতায় সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন সুর বাজানো ও তাদের সমন্বয়ে অন্য একটি সুর সৃষ্টি করা বাস্তকিই প্রতিভার কাজ। কিন্তু ফররুখ আহমদ একই সাথে বিভিন্ন কোটিতে, বিভিন্ন ভূমিতে সঞ্চরণ করতে পারতেন বলে ও তাঁর কল্পনা বিভিন্ন অনুষঙ্গে একই সাথে পল্লবিত হতে পারত বলে তিনি অনেক ক্ষেত্রে সত্যিকার কাব্যিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি করতে পারতেন। উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসী প্রতীক আন্দোলনের কবিরা এই গুণের পরিপূর্ণ বিকাশ দেখিয়েছেন, তাঁদের কবিতায় একাধিক, কোন কোন ক্ষেত্রে অগণিত অনুভূতির চিত্র এমনকি প্রেক্ষাপট পাশাপাশি বিদ্যমান। প্রকৃত অর্থে Contrast-এর এত সুন্দর উদাহরণ আর কোথাও নেই। ফররুখ আহমদের কবিতায় একাধিক মানসিক ও কালিক অবস্থা ও চেতনা, বোধ বা অনুভূতি মূর্ত হয়েছে, এবং পাশাপাশি থেকেছে, সমসাময়িক থেকেছে। ‘পটভূমি’ কবিতায় তেমনি একটি চিত্র পাওয়া যায়। সমস্যাসঙ্কুল জরাগ্রস্ত এবং যান্ত্রিকতায় পিষ্ট নগরের প্রেক্ষাপট মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে সুস্থ, সতেজ ও মুক্ত পাহাড়ী দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়েছে, এবং এই পালাবদল স্বপ্নের গতিতে সম্পন্নঃ
ভেসে যায় চোখের পলকে
ফুটপাত, কারখানা, যন্ত্রপড়ি। এই বদ্ধ ঘর-
শুনি যেন জীবন্ত উচ্ছল
প্রাণবন্ত জীবনের প্রসারিত পাখার খবর,
নিবিড় আঙ্গুর বন, বরফ জমানো চূড়া সৃদৃঢ় পাথর।
ফররুখ আহমদ যেন এমনি একটি “প্রাণবন্ত জীবনের’ জন্য অপেক্ষমান। যে পাহাড়ী ছেলেটি ছাতা-সারানোর শোন-তীব্র স্বর তুলে শহরকে সচকিত করে যাচ্ছে, সে ঐ ‘প্রাণবন্ত জীবনের প্রতিনিধি হিসাবে তার বিদ্রোহ ঘোষণা করে যাচ্ছে। কিন্তু আধুনিক ব্যক্তির দুর্ভাগ্য, মেকী যান্ত্রিকতায় এই শাশ্বত, সুস্থ ঘোষণাটির কোন দাম নেইঃ
শতাব্দীর ব্যর্থতার রাজপথে ঘুরে ছাতা-সারানোর
তোলে তিক্ত সুর….
এই পরাজয় মানুষের গ্লানিকে চরমে পৌঁছে দেয়। কিন্তু এই পরাজয় শেষ কথা নয়। সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় লালিত কবির একটি কবিতা ‘পাথরের দিন’ এই প্রসঙ্গে তাঁর নির্ঘোষ বক্তব্য তুলে ধরেছেঃ
দীর্ণ করি পাথরের মৃত স্তর সংগ্রাম আহত
দুঃস্বপ্নের শেষে আনে ফসলের রক্তিম সকাল।।
সেই একই ঘোষণা ‘বৈশাখ’ কবিতায়। এই কবিতায় শেলীর Ode to West Wind-এর প্রভাব লক্ষণীয়। সমকালীন জীবনধারার প্রতি প্রচন্ড অনাস্থা ও অসহিষ্ণুতাকে তিনি শেলীর মত প্রবলভাবে ব্যক্ত করেছেন।
ফররুখ আহমদের ভাষা বর্ণনাধর্মী, চিত্রধর্মী। যে অবস্থা, অভিজ্ঞতা তিনি প্রকাশ করতে চান, তার পরিপূর্ণ প্রকাশের জন্য ভাষার কারুকাজ, চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষার মোহজাল সৃষ্টি করে তিনি তাকে পূর্ণতা দিয়েছেন। তাঁর আরবী ফার্সীর পক্ষপাতিত্ব সত্ত্বেও যে সত্যিকার শৈল্পিক মেজাজ প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর কবিতায় তা সহজাত বাঙালী ও অতিমাত্রায় দেশজ। ফররুখ আহমদের সকল কবিতা পড়ার পর যে দুটি ধারণা জন্ম নেয় পাঠকের মনে তারা পরস্পরবিরোধী। যে শিল্পী সময়ের তাড়নায় ও নকল অনুভূতির তাগিদে অপরিচিত ভূমিতে প্রবেশ করে দিশেহারা হয়েছেন তিনি কত সহজে নিজেকে উদঘাটিত করতে পারেন আপন প্রতিবেশে, আপন দেশকালের গন্ডীতে, তা যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনি আনন্দের বিষয়। কয়েকটি চিত্র তাঁর কবিতার চিরন্তন মূলধন হয়ে থাকবে। তাঁর প্রকৃত কবিশক্তিকে জানতে হলে এদের অবহেলা করা সম্ভব নয়। এবং যাঁরা ফররুখ আহমদকে ধর্মীয় ঐতিহ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে তাঁকে খাটো করতে চান তাঁরা এ পর্যায়ের কবিতাগুলোকে পাশ কাটিয়ে যান। অথচ আসল ফররুখ আহমদ এই কবিতাসমূহে মূর্তঃ
১. বেতস লতার তারে থেকে থেকে বাজে আজ বাতাসের
বীণা, ক্রমে তাও থেমে যায়,
প্রাচীন অরণ্যতীরে চাঁদ নেমে যায়,
গাঢ়তর হল অন্ধকার
(ডাহুক)
২. বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে ঝিল্লীও নীরব, পাখীদের
বাসায় নিঃসাড় ঘুম
(সিলেট স্টেশনেঃ একটি শীতের প্রভাত)
৩. ঘাসের সবুজ শীষে অরণ্যের রঙ জেগে আছে।
তোমার চোখে নীল মেঘমুক্ত আকাশের আলো
(প্রত্যয়)
৪. তারাফুল ফোটানো সে কোন নলবনে গভীর মেঘের
ছায়াম্লান মাটির বাঁশরী সুর ভেসে চলে ডাহুকের-,
(মধুমতীর তীরে)
৫. উটের ঘন্টার শব্দে ম্লান মরু বালু ওড়ে, মুছে যায় বেলা
(কাফেলা)
৬. গোধূলি-তরল সেই হরিণের তনিমা পাটল
-অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা শিঙে ভেসে এল চাঁদ
(বন্দরে সন্ধ্যা)
অসংখ্যা উদাহরণ দেয়া যায় তাঁর কবিতা থেকে। কিন্তু তাঁর কবিতার যে মহৎ গুণ-সম্পূর্ণতা আর সংহতি, তা এতে ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা, কেননা ফররুখ আহমদের কবিতা একটি ভাস্কর্যের মত-সমগ্র অংশটিই একটি বিশেষ অনুভূতি। অবস্থা/অভিজ্ঞতা-নির্দেশক। কোন বিশেষ অংশে সম্পূর্ণকে পাওয়া দুষ্কর, অংশে পাওয়া যাবে না সম্পূর্ণর প্রকাশ। এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কথা হল, যে চিত্রদৃশ্যপট তিনি নির্মাণ করেছেন, তারা সমগ্রের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার্যঃ এককভাবে হয়তো এরা সৌন্দর্যমন্ডিত, কিন্তু সমগ্রের সংগে তাকে স্থাপন করলে আরো অর্থময়, সৌন্দর্যমন্ডিত হয়ে দাঁড়ায়।
ফররুক আহমদ শক্তিশালী কবি, অনুভূতিশীল কবি, সচেতন কবি। দেশকাল ভূগোলের পরিপূর্ণ বিকাশ তাঁর কবিতায়। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হবে কোন বিশেষ চিহ্নে তাঁকে আলাদা করে দেখলে। তাঁর কবিতার একটি পিঠ দেখে তাঁর সম্বন্ধে রায় দেয়ার প্রথা এখন বাতিল করা প্রয়োজন। যাঁর সৃষ্টি বিশাল, যাঁর নির্মাণ নিখুঁত, তাঁকে ক্ষুদ্র গন্ডী ও স্থুল দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা নির্বুদ্ধিতা।

(শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ‘ফররুখ আহমদঃ ব্যক্তি ও কবি’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত, লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান)