ছোট ভাই সুরেশ শয্যাগত হয়ে পড়েছে। অসুখটা ব্লাড প্রেসার। সুখেন্দুর সঙ্গে পরামর্শ করতে গিয়েছি। সে আমার বন্ধু এবং বিখ্যাত ডাক্তার।
সুখেন্দুর দেখা পেলাম তার ডিসপেনসারিতে । সে মন দিয়ে সুরেশের রোগের সব লক্ষণ শুনে বলল, ” ভয়ের কারণ নেই। আজ প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছি, কাল সকালে নিজে গিয়ে দেখে আসব রোগী কেমন আছে।”
সে কাগজ কলম নিয়ে প্রেসক্রিপশন লেখার উদ্যোগ করছে, এমন সময় ঘরের ভেতর প্রবেশ করল এক অদ্ভুত মূর্তি।
আগন্তুক নারী। কিন্তু তার এমন চেহারা, দেখলেই শিউরে উঠতে হয়। প্রথমেই নজরে পড়ে তার দেহের শীর্ণতা ও দীর্ঘতা। সে এত রোগা যে তার হাড় কয়খানা কেবল চামড়া দিয়ে ঢাকা আছে বললেই হয়। আর অধিকাংশ পুরুষের চেয়ে মাথায় বেশ উঁচু। তার বয়সও আন্দাজ করা যায় না। ত্রিশও হতে পারে, পঞ্চাশও। পায়ে জুতো আছে বটে, কিন্তু তার বেশভূষা আধুনিক নারীর মতো নয়।
তারপরেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল তার ভয়াবহ গায়ের রঙ। একেবারেই মৃতদেহের মতো পাণ্ডুর এবং রক্তহীন। অন্তত দু’দিনের বাসি মড়ার দেহের রঙ এমনিধারাই। আমি দু দিনের বাসি মড়া কখনো দেখিনি। তবু কেন জানি না, এই কথাই মনে হল।
সুখেন্দুরও মুখে চোখে ফুটে উঠল বিস্ময়ের ভাব।
মেয়েটি অতি ক্ষীণ এবং অস্পষ্ট স্বরে বলল, ” আমি ডাঃ এস. বসুর কাছে এসেছি।”
সুখেন্দু বলল, ” আমারই ঐ নাম। বসুন। আপনার কি কোনও অসুখ করেছে?”
মেয়েটি বসল না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বলল, ” আজ্ঞে হ্যাঁ।”
” অসুখটা কি?”
” সেটা জানবার জন্যই তো আপনার কাছে এসেছি!” স্বর ক্ষীণ হলেও তার মধ্যে পাওয়া গেল যেন ব্যঙ্গের আভাস!
সুখেন্দু উঠে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে একটা দরজা ঠেলে পাশের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ” বেশ, আমার সঙ্গে আসুন। “
মেয়েটিও তার পেছন পেছন চলল এবং পাশের ঘরে প্রবেশ করবার আগে হঠাৎ ঘুরে আমার দিকে দেখল।
আমার বুকটা ছাঁৎ করে উঠল! আমি দেখলাম দুটো মাছের চোখ…..সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন দুটো মরা মাছের চোখ!
খানিকক্ষণ পর ডাক্তার ও রোগিণী দুজনেই পাশের ঘর থেকে ফিরে এল।
সুখেন্দু টেবিলের ধারে বসে কলম হাতে নিয়ে শুধোলে, ” আপনার নাম?”
মেয়েটি উত্তর দিল, ” আমোদিনী দেবী। “
প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে সুখেন্দু বলল, ” দুটো ওষুধ লিখে দিলাম, ব্যবহার করে কেমন থাকেন জানাবেন। “
ভিজিটের টাকা টেবিলের ওপর রেখে, প্রেসক্রিপশন নিয়ে রোগিণী দরজার দিকে এগোল, কিন্তু বাইরে যাওয়ার আগে আর একবার হঠাৎ ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে গেল।
আবার দেখলাম, সম্পূর্ণ সেই দুটো মরা মাছের মতো চোখ!
মনের অস্বস্তি মনেই চেপে সুখেন্দুকে জিজ্ঞাসা করলাম, ” ওর কি অসুখ হয়েছে?”
সুখেন্দু বলল, ” অ্যানিমিয়া, বিষম অ্যানিমিয়া। ও এখনো বেঁচে আছে কি করে বুঝতে পারছি না।”
বাড়ির দিকে ফিরছি।
গাড়ির ভেতর বসেই দেখতে পেলাম, রাস্তার ফুটপাথের ওপর দাঁড়িয়ে আমার বাড়ির বৈঠকখানার জানলার দিকে তাকিয়ে আছে একটা নারীমূর্তি। যেমন রোগা, তেমনি ঢ্যাঙা চেহারা।
গাড়ির শব্দে নারীমুক্তিটি চমকে ফিরে চকিতে একবার চেয়ে হনহন করে চলে গেল। তাকে দূর থেকে চিনতে পারলাম না বটে, কিন্তু কেন জানি না, আবার মনে পড়ল সুখেন্দুর ডিসপেনসারিতে দেখা সেই অদ্ভুত রোগিণীর কথা।
আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে, আমার বাড়ির বৈঠকখানার দিকে তাকিয়ে মূর্তিটা কি দেখছিল?
গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই সেটা বুঝতে দেরি হল না।
বৈঠকখানার ভেতর বাড়ির সব লোক এসে জড়ো হয়েছে। সকলেই হায় হায় করছে। নিশ্চয়ই ঘটেছে কোনও অঘটন।
ভিড় সরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। একখানা ইজি চেয়ারের ওপর চিত হয়ে পড়ে আছে আমার ছোটভাই সুরেশের অচৈতন্য দেহ। তার দুই চোখ বিস্ফারিত, হাত পা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। বিস্ফারিত চক্ষু নিবদ্ধ হয়ে আছে রাস্তার ধারের জানলার দিকে এবং তার মধ্যে ফুটে আছে এক প্রচণ্ড আতঙ্কের ছাপ।
কিন্তু কেন? জানলার ভেতর দিয়ে পথের ওপরে কি বা কাকে দেখে সুরেশ এতটা ভয় পেয়েছিল?
তৎক্ষণাৎ ডাক্তার ডাকা হল। তিনি সব দেখেশুনে বললেন, ” আর কোনও আশা নেই। রোগীর হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে অত্যধিক ব্লাড প্রেশার জনিত কারণে।”
ভাইয়ের মৃতদেহ নিয়ে এসেছি নিমতলার শ্মশান ঘাটে।
দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠেছে চিতার আগুন। বড় নিষ্ঠুর ঐ চিতা। মানুষ যাদের ভালবাসে তাদেরই গ্রাস করা তার ধর্ম।
সংসারে আপন বলতে ছিল কেবল আমার এই ভাইটি। সেও আমায় ফেলে চলে গেল। দুনিয়ায় আজ আমি একা।
চিতার কাছে উবু হয়ে বসে গালে হাত দিয়ে এইসব ভাবছি। আচম্বিতে মুখ তুলে আমার দুই চক্ষু হয়ে উঠল সচকিত।
খানিক তফাতে একদল কৌতূহলী লোকের মাঝখানে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে এক সুদীর্ঘ, কঙ্কালসার নারীমূর্তি। সেই রোগিণী! মরা মাছের মতো দুটো নিষ্পলক ড্যাবডেবে চোখে সে তাকিয়ে ছিল আমার দিকেই।
আমার সর্বাঙ্গের ভেতর দিয়ে খেলে গেল যেন উত্তপ্ত বিদ্যুৎ প্রবাহ।
কিন্তু এক লাফে দাঁড়িয়ে উঠেই দেখি, পলকের মধ্যে সেখান থেকে অদৃশ্য হয়েছে সেই রহস্যময়ী নারীমূর্তি!
কেটে গিয়েছে প্রায় এক বছর।
মানুষ একেবারে একলা থাকতে পারে না। একটি স্প্যানিয়েল কুকুর পুষেছি। সে আমার অষ্টপ্রহরের সঙ্গী….নাম তার জনি। তাকে আমি ভালবাসি, সে মানুষ হলেও তাকে আরও বেশী ভালবাসতে পারতাম না।
সেদিন বিকেলে গড়ের মাঠে বেড়াতে গিয়ে কার্জন পার্কের একখানা বেঞ্চে বসেছিলাম। জনি আপনমনে খেলা করে বেড়াচ্ছিল ঘাস জমির এখানে ওখানে। তারপর সে ছুটতে ছুটতে চলে গেল আমার পেছন দিকের একটা ঝোপের ওপাশে।
মিনিটখানেক পরেই সে ক্রুদ্ধস্বরে ঘেউঘেউ করে উঠল এবং পর মূহুর্তেই শুনলাম তার আর্ত চিৎকার।
তাড়াতাড়ি উঠে ঝোপের ওধারে ছুটে গেলাম।
প্রথমটায় জনিকে দেখতে পেলাম না। তার বদলে দেখলাম, একটা নারীমূর্তি মাটির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে কি যেন লক্ষ্য করছে।
আমার পদশব্দে চমকে উঠে ফিরে তাকিয়েই সে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং হন্তদন্তের মতো দ্রুতপদে চলে গেল সেখান থেকে। কিন্তু ঐ একঝলক দেখাতেই চিনতে পারলাম। সে সেই দীর্ঘ, কৃশ ও পাণ্ডুর রোগিণী…. দুই চোখ যার মরা মাছের মতো বিস্ফারিত ও ভাবহীন!
সে যেখানে ঝুঁকে পড়ে জায়গাটা দেখছিল, সেখানে আড়ষ্ট হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে জনির দেহ। দৌড়ে গিয়ে তার গায়ে হাত দিয়ে বুঝলাম, সে আর বেঁচে নেই। আমার বলবান, স্বাস্থ্যবান ও সুবৃহৎ কুকুর, আচমকা এইভাবে মারা পড়ল কেমন করে?
হঠাৎ খিলখিল করে শুকনো হাসি শুনে মুখ তুলে দেখি, খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে আছে সেই বীভৎস রোগিণী! ক্ষীণ অথচ খনখনে গলায় সে বলে উঠল, ” আসব, আবার আমাদের দেখা হবে!”
নিদারুণ ক্রোধে আচ্ছন্ন হয়ে গেল আমার সর্বাঙ্গ। দুই হস্ত মুষ্টিবদ্ধ করে মারমুখো হয়ে আমি বেগে ছুটে গেলাম তার দিকে।
কিন্তু তাকে ধরতে পারলাম না। আশ্চর্য ক্ষিপ্রগতিতে সে চলে গেল আমার নাগালের বাইরে এবং হারিয়ে গেল চৌরঙ্গির সচল জনতারণ্যে।
কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে এসেছি। আজ তিন বৎসর ধরে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি ভারতের এখানে ওখানে। সেই শরীরী অমঙ্গল এখনো আমায় দেখা দেয় নি।
এখনো আমি ভেবে পাই না, ও কে ছিল! ভূতপ্রেত? শয়তান? পিশাচ? জ্বিন? না কি……অন্যকিছু? তবে ও যে কোনও পার্থিব জীব নয়, সেটা আমি বুঝতে পেরেছি।
আমার মন বলে, এখনও সে আছে আমার পেছনে পেছনে। শেষবারের মতো আবার তার চরম দেখা পাব যে কোনও দিন, যে কোনও মূহুর্তে!
সে কি আমার নিয়তি?