কিয়ামুল লাইল পরিচয় :

কিয়ামুল লাইল অর্থ রাত্রি জাগরণ বা রাত্রে দাঁড়ানো। মহান আল্লাহ সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভের আশায় গভীর রজনীর শেষ ভাগে জেগে নামাজে দাঁড়ানোকে কিয়ামুল লাইল বলে। অধিকাংশ জমহুর ওলামায়ে কিরাম কিয়ামুল লাইল বলতে তাহাজ্জুদ নামাজকে বুঝিয়েছেন। আর এই নামাজ সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মহাগ্রন্থ আল কোরআনের সুরা মুয্যাম্মিলে ইরশাদ করেছেন- ‘রাতে জাগরণ করো (নামাজ আদায় করো)। রাতের কিছু অংশ বা তার কম অথবা তার একটু বেশি।’ আর নফল নামাজের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতময় নামাজ হচ্ছে কিয়ামুল লাইল, যা তাহাজ্জুদ নামাজ হিসেবে পরিচিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে ঘোষণা করেন :’তারা রাতের সামান্য অংশেই নিদ্রায় যেত এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত’ (সুরা আয্যারিয়াত :১৭-১৮) সুরা বনি ইসরাঈল ৭৯ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- “এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, ইহা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।”

মহান আল্লাহর অপার নিয়ামাতের অংশীদার হওয়ার লক্ষ্যে গভীর রজনীতে আরাম আয়েশকে উপেক্ষা করে একমাত্র কেবলমাত্র আল্লাহ সন্তুষ্টি ও ক্ষমার আশায় নিজকে মহান মাবুদে ইলাহীর দরবারে সমার্পণ করাই তাহাজ্জুদ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে নফল ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় ইবাদত হচ্ছে তাহাজ্জুদ। এই সময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দুনিয়ার আসমানে এসে নিজে তাঁর বান্দাহদের ক্ষমা চাওয়ার জন্য আহবান জানান এবং এই সময় তিনি বান্দাহদের ক্ষমা ও প্রিয়ভাজন করে নেন। হাদিসে রাসুল সাঃ ইরশাদ হয়েছে- আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমাদের মহা মহীয়ান রব্ব প্রতি রাতের এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করে বলেন, আছে কেউ আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দিবো? আছে কেউ আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করবো? আছে কি কেউ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো? (সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ১৩১৫)

কিয়ামুল লাইলের গুরুত্ব :

নফল ইবাদতের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় ইবাদত হচ্ছে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ। বান্দাহ যখন দুনিয়ার সমগ্র ব্যস্ততাকে ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর সমীপে নিজকে সমার্পণ করে তখন আল্লাহ বান্দাহর উপর এত বেশি খুশি হন যে তার জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। আল্লাহর রাসুল সাঃ গোটা জিন্দেগীতে দুই একবার অসুস্থ্যতাজনিত কারণে আরেকবার উম্মাতের উপর এই নামাজ যেন ফরজ না হয়ে যায় এই কারণে তাহাজ্জুদ নামাজ ছেড়েছেন। অন্যথায় তিনি ইচ্ছে করে কখনো এই নামাজ ছাড়েননি। এই বিষয়ে হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক রাতে মসজিদে সালাত আদায় করছিলেন, কিছু লোক তাঁর সাথে সালাত আদায় করল। পরবর্তী রাতেও তিনি সালাত আদায় করলেন এবং লোক আরো বেড়ে গেল। অতঃপর তৃতীয় কিংবা চতুর্থ রাতে লোকজন সমবেত হলেন, কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বের হলেন না। সকাল হলে তিনি বললেনঃ তোমরা যা করেছ আমি লক্ষ্য করেছি। তোমাদের নিকট বেরিয়ে আসার ব্যাপারে এ আশঙ্কাই আমাকে বাধা দিয়েছে যে, তোমাদের উপর তা ফরজ হয়ে যাবে। এটা ছিল রমযান মাসের ঘটনা।(সহিহ বুখারী ১১২৯) উক্ত হাদিস দ্বারা স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় তাহাজ্জুদ সালাত কতই গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। সুরা ফুরকানে ইরশাদ হয়েছে- রহমান’-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্র ভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’; এবং তারা রাত্রি অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দণ্ডায়মান থেকে। (সুরা ফুরকান ৬৩,৬৪)

১। কিয়ামুল লাইল আল্লাহর কাছে বান্দাহর আত্মসমার্পণ

মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে নিজকে পেশ করাই কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের উদ্দেশ্য। যখন পৃথিবীর রাত্রের কোলে আরোহণ করে আরামের ঘুমে বিভোর তখন আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাঁর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জেগে নামাজে দাঁড়িয়ে যান। হাদিস শরীফে এসেছে –
ইব্নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতে তাহাজ্জুদের উদ্দেশে যখন দাঁড়াতেন, তখন দু’আ পড়তেন- “হে আল্লাহ্! আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা, আপনি আসমান যমীন ও এ দু’য়ের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর নিয়ামক এবং আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আসমান যমীন এবং তাদের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর কর্তৃত্ব আপনারই। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমান যমীনের নূর। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আকাশ ও যমীনের মালিক, আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনিই চির সত্য। আপনার ওয়াদা চির সত্য; আপনার সাক্ষাৎ সত্য; আপনার বাণী সত্য; জান্নাত সত্য; জাহান্নাম সত্য; নবীগণ সত্য; মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য, কিয়ামত সত্য। ইয়া আল্লাহ্! আপনার নিকটই আমি আত্মসমর্পণ করলাম; আপনার প্রতি ঈমান আনলাম; আপনার উপরেই তাওয়াক্কুল করলাম, আপনার দিকেই রুজূ’ করলাম; আপনার (সন্তুষ্টির জন্যই) শত্রুতায় লিপ্ত হলাম, আপনাকেই বিচারক মেনে নিলাম। তাই আপনি আমার পূর্বাপর ও প্রকাশ্য গোপন সব অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনিই অগ্র পশ্চাতের মালিক। আপনি ব্যতীত সত্য প্রকৃত কোন ইলাহ্ নেই, অথবা (অপর বর্ণনায়) আপনি ব্যতীত প্রকৃত কোন সত্য মা’বূদ নেই। (সহিহ বুখারী১১২০)

২। কিয়ামুল লাইল আল্লাহর কৃতজ্ঞতার মাধ্যম

কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ সালাত আদায়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের অন্যতম মাধ্যম। বান্দাহর প্রতি রাত দিনে মহান আল্লাহ হাজারো রহমত বর্ষিত হচ্ছে যা বান্দাহ কখনো কল্পনাও করতে পারে না। এই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বান্দাহকে গভীর রজনীতে আল্লাহ সমীপে নিজকে অর্পন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।হাদিস শরীফে এসেছে- মুগীরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাত্রি জাগরণ করতেন অথবা রাবী বলেছেন, সালাত আদায় করতেন; এমনকি তাঁর পদযুগল অথবা তাঁর দু’ পায়ের গোছা ফুলে যেত। তখন এ ব্যাপারে তাঁকে বলা হলে তিনি বলতেন, আমি কি একজন শুকরিয়া আদায়কারী বান্দা হব না? (সহিহ বুখারী১১৩০)

৩। কিয়ামুল লাইল আদায়কারীর নাম আল্লাহর জিকিরকারীদের তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়

যারা রাতের শেষভাগে জাগ্রত হয়ে স্বীয় রবের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সালাত আদায় করে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদেরকে তাঁর জিকিরকারী মাহবুব বান্দাহদের তালিকাভুক্ত করে নেন।এই প্রসঙ্গে সুনানানে আবু দাউদের এক হাদিসে বলা হয়েছে- আবূ সাঈদ ও আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্র থেকে বর্ণিতঃ তারা বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি রাতের বেলায় স্বীয় স্ত্রীকে সজাগ করে উভয়ে কিংবা প্রত্যেকে দু’ দু’ রাক’আত সলাত আদায় করলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণকারী ও স্মরণকারিনীর তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়।
(সুনানে আবু দাউদ১৩০৯)

৪। কিয়ামুল লাইলকারীর পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়

যারা পূর্ণ ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে কিয়ামুল লাইল করবে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তার পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করে তাকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ করে নেবেন। এই প্রসঙ্গে রাসুল সা. বলেন- নিশ্চয়ই আল্লাহপাক রমজান মাসের রোজা তোমাদের ওপর ফরজ করেছেন। আমি তোমাদের জন্য নিয়ম করেছি, এ মাসের কিয়ামুল লাইল বা রাত্রিকালীন ইবাদতকে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি পূর্ণ ঈমান সহকারে এবং গুনাহ মাফের আশায় এ মাসে রোজা রাখে ও কিয়ামুল লাইল আদায় করে, তাহলে সে এমন নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেমন নিষ্পাপ তার মা তাকে প্রসব করেছেন। তিনি আরও বলেন- যে ব্যক্তি রমজান মাসে পূর্ণ ইমান সহকারে ও গুনাহ মাফের আশায় কিয়ামুল লাইল করবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। এ মাসে রাসুল (সা.) নিজেও কিয়ামুল লাইল করেছেন এবং আমাদেরও তা করতে বলেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল পালন করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন; তবে দৃঢ়ভাবে নির্দেশ দিতেন না। এরপর তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশা নিয়ে রমজান মাসে কিয়াম করবে (রাতের বেলায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে), তার পূর্বের সব গুনাহখাতা মাফ করে দেওয়া হবে।'(আবু দাউদ)

সর্বোপরী বলা যায় বান্দাহ তার রবের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম হল কিয়ামুল লাইল।আল্লাহ কারীম, আমাদেরকে কিয়ামুল লাইল আদায়ের তাওফিক দিন, আমাদের যাবতীয় গুনাহরাশি ক্ষমা করে আপনার মাহবুব বান্দাহদের কাতারে শামিল করুন, আমীন।