শত হাজার দায়বদ্ধতার আড়ালেও যে কিছু কাজ থাকে সেই কাজগুলোই স্বপ্ন ছুঁয়ার। বেঁচে থাকার দারুন উপাত্ত। সময়ের দোলাচলে নিরন্তর পথ হাটেন পৃথিবীর পথে।

কবি কুতুব রাহমান তার ছড়াগ্রন্থ প্রতিধ্বনি তে যে বর্ণনার বিশাল ছাঁয়া পেতেছেন তা অনন্য রেখাংকিত পথ। তিনি আঁকতে জানেন ছবি।নানান অলংকার আর উপমায় তৈরী করেন রঙিন পথ।

গ্রন্থের প্রথম কবিতা ভালোবাসি যর্থাথই ভালোবাসার। আবেগ ঢেলে দিয়েছেন দিগন্ত জুড়ে। মননের আশার পসরা সাজিয়ে-

ভালোবাসি মেঠোপথ কাদামাখা জল
ভালোবাসি গাছে ঝোলা কাচাঁ পাকা ফল
ভালোবাসি পাখি ডাকা রবিজাগা ভোর
ভালোবাসি বাংলার আলোছায়া ঘোর।

যেখানে অনন্য ছন্দ এবং মাত্রার সন্নিবেশ ঘটিয়ে এঁকেছেন মৌলিক প্লট। নির্মান করেছেন একটি সৌন্দর্যের অধ্যায়।

বিবেক যখন মরা ছিলো আধার ছিলো দুনিয়া
মরা তরু উঠলো হেসে রবের বাণী শুনিয়া

এখানে এক অন্ধকার যুগের রেশ কাটিয়ে আলোক প্রবাহের যে উজ্জ্বলতর অধ্যায় শুরু তারই পরিসর। অনিন্দের ছায়াপাত।
বিশ্ব নবী মোহাম্মদ সা: এর আর্বিভাব এর মধ্য দিয়েই দুনিয়া হয় আলোকিত, আর মানুষ পায় প্রানের স্পৃহা। পথ পায় মুক্তির।

কবি প্রেম আর প্রীতি কবিতায় এক অনুপম ছায়াঢাকা আমাদের জীবনাংশের শিকড় সন্ধানী বাচনভঙ্গিমা লক্ষ্য করা যায়।
সেই আমাদের সকাল থেকে শুরু, ওদিকে বিকেল পেরিয়ে নামে রাতের প্রহর। কবি তার সুবিস্তৃত ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন সুক্ষ্ম অনুভুতিতে।

গাছে গাছে ফল ছিল তাজাপাকা কতো
হররোজ খেতো সবে খেতো অবিরত
নথপরা কৃষাণীর লাজরাঙা মুখ
ধানীরঙ ঢেকে দিতো কতো শত দুখ।

কিশোর কবিতায় নানা খেয়ালীর আলপনায় ভরপুর ।
মা-মাটি ঘেরা সংসার স্মৃতি জাগানিয়া একটি অনন্য কবিতার সমারোহ।
আগেগার সময়ে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ছিল বেশ, ফল ফলাদিও ছিল হাতের নাগালে। কাঁধেকাধ, হাতে হাত রেখে সৌন্দর্যময় সম্পর্কের দরদ ছিল বেশ ।

ডাংগুলি কানামাছি যতো সব খেলা
খেলে খেলে কেটে যেতো আমাদের বেলা
ফলমুল গাছেগাছে পাকা শোভা পেতো
মুসাকির পথচারী পেটপুরে খেতো
আজ আর নেই বুবু সেইসব দিন
বয়সটা বেড়ে গেছে মুছে দিয়ে চিন।

আজকের শিশু “শিরোনাম কবিতায়” বলেন-
আজকের শিশু হয় আগামীর ফুল।
গাদাগাদা বই নিয়ে যায় ইশকুল
জগতটা হয়ে গেছে বই টিভি ঘিরে
যায় নাতো দেখা তারে লোকালয় ভিড়ে
আজকের শিশু যারা ভুলে গেছে মূল
বালিকার ন্যায় দেখি কানে পরে দুল
ভিনদেশী পড়া শিখে বাবু বনে যায়
এদেশের প্রতি তার থাকে নাতো দায়।

একটি আচানক ভাবনার উন্মেষ। বাস্তবতার হিসেব কষে দেখিয়েছেন সমাজের বেতালা চিত্রপটকে। আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের দ্বার।

আমাদের ব্যাক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নানাবিধ সমস্যা। যেটা থেকে বের হওয়া আমাদের জরুরী। তাই কবি ভালোটাই কামনা করেন।
কবি আইনের শাসন কবিতায় তীর ছুঁড়ে দিয়েছেন। সমাজ রাষ্ট্র নিয়ে তিনি বেশ সজাগ। সাহসের বুলেট নির্মাণ করতে তরুণদের উৎসাহ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে কবি বেশ সুদৃঢ় ভাবে একটি সুন্দর পথ নিমার্ণের চিত্র এঁকেছেন।

রুখে দাড়াঁও ঘুরে দাড়াও
মুক্তি কামী জনতা
বিনাভোটে কেড়ে নিতে
পারবেনা কেউ ক্ষমতা ।

কবি নজর রাখেন ঠিক আমাদের জাতিগত দ্বন্দ্ব।
অন্যায় অবিচারে হাহাকার স্বদেশের কথা ।
অনুচ্চারিত জনগনের মানবতা। সৈরাচারি মিডিয়ার বন্দনা। মানবতার গায়ে আঘাত হত্যা, গুম, এসবের প্রতি বেশ সজাগ ও সচেতন কবি। ভাঙ্গনের সুর শুনি- কবিতায় যাথার্থই বলেছেন-
ভাঙ্গনের সুর শুনি কান পেতে ওই
ভয় আর বিহবলে বিচলিত হই।

বিবেক যখন আই সি ইউ
রক্ত নদী পাড়ি দিয়ে
লাশের দেশটা পাইছি নিউ,

পংক্তিগুলো গনতন্ত্র শিরোনামের কবিতার।
কবিকে সব সময় পীড়া দেয় , আজকের গনতন্ত্রের মিঠে হাওয়ার। সঠিক বোধের বিকাশ চান কবি।

আর চান আইনের শাসন। কবি চান উদারবাদী একটি রাষ্ট্রের উদ্ভব ।
কবি দুর্নীতিবাজ কবিতায় যথার্থ চিত্রপট নিয়ে আলোচনা করেছেন।
“স্বাধীনতার সুখ পেলাম কই? বৈষম্য হয়নি দূর
ঘরে ঘরে যায় শোনা যায় মানুষ জনের করুন সুর”।

কবি কুতুব রাহমান একটি বৈষম্যহীন সমাজ তৈরীর প্রত্যাশা রাখেন। সমস্ত সম্ভাবনার একটি প্লাটফ্রম নির্ণয়ে। দুর্বোধ্যতার আড়ালে চৈতালিক ইন্দ্রজালের বিশুদ্ধতার ছায়াময় জীবন কামনা করেন।তার অভিযোগটা সব সময় কুসংস্বকারের বিরুদ্ধে। সমর্থন থাকে সহজ এবং নতুনত্বের সেতু বন্ধনে।

হাত মিলায় ন্যায়ের পক্ষে তিনি খোলাসা করে দিতে চান অস্পষ্ট দাবিদার সকল হীণমন্যতা। তিনি অংক করেন বাস্তবতার। একটি লজিকেল প্রয়োগ ঘটানো সমাজ এবং উন্নত রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা কবিকে তাড়িত করে।
কবি বহিজাগতিক ও ইহজাগতিক মেলবন্ধনের সন্নিবেশে মানবিক বোধের একটি দীপ্ত সমাজ নির্ণয়ের পক্ষপাতি।

তুমি যদি রাহবার
খোদার এই জমিনে
তোমাকেই দলে টানে
কমবখত কমিনে।
তহবত শিরোনামের একটি ছোট কবিতায় তার অনন্য ভাবনায় অনুপম শক্তির প্রয়াস ফুটেছে। ইমানের জৌলুসে সীমানা এঁকেছেন কবি। একটি সঠিক পথে সুন্দরময় আলোক প্রভাকে। তিনি জীবনের বাস্তব আলোর শান সওকত হিসাবে দেখেছেন।

সর্বশেষে বইয়ের নামকরনে যে শিরোনামটি ‘প্রতিধ্বনি’, সেখানে তিনি অনেক সময় রঙিন পথ, দুরন্তপনা, জীবনের বহু লুকোচুরি, রাত বিরাতের সময় ক্ষেপন। সেই তুমিটাই এখন পেল একটি সুন্দর আলোময় গতিপথ। প্রশিদ্ধ ভাবনার বিলাসী উঠোন। ভালো লাগার একটি জলজ সরোবর।
সর্ব শেষে মূল ঠিকানাই কবিকে অনুসন্ধিৎসু করে।

আজও তোমার ধ্বনি বাজে কর্নে যে
সজীব তুমি ছন্দ ছড়ার বর্ণে যে।

কবি ও ছড়াকার কুতুব রাহমান লেখার মাঝেই নিয়মিত আলো প্রজ্জ্বলন করে যাচ্ছেন। সম্প্রসারিত ভাবনার বিস্তৃত প্রবাহে ।
ঢেউ জাগাচ্ছেন তার স্বভাব সুলভ ও সৌন্দর্যের অনুসন্ধানে
জীবনের সখ্যতায় গড়ে তুলছেন তার অনুসন্ধানী চিত্রপট। সৃজনশীল লেখার অসীম দীপ্তিতে আলো ছড়িয়ে পড়ুক সেটাই প্রত্যাশা।

ছড়াকার কুতুব রাহমানের জন্ম ১৯৮৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার, নানশ্রী গ্রামে।
পিতা-মোঃ রইস আলী।
মাতা- খাদিজা বেগম।
স্ত্রী-নাজমা বেগম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকা। কবি দুই সন্তানের জনক। ছেলে সালমান রাহমান, মেয়ে আরিফা রাহমান।
পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে প্রথম সন্তান তিনি।
ভাই-বোনেরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্কুল-কলেজ শিক্ষক সহ বিভিন্ন ভাবে সমহিমায় উদ্ভাসিত। কবি কুতুব রাহমান একজন ক্বারী, হাফিজে কুরআন।
তিনি কৃতিত্বের সাথে আলিম শেষ করেন।
কবির বর্তমান পেশা ইমাম ও খতিব হিসেবে নিয়োজিত।
কবি ও ছড়াকার কুতুব রাহমান নিয়মিতই সহজসরল সমীকরণে খোরাক দিয়ে যাচ্ছেন পাঠকদের। তিনি দৈনিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, সাপ্তাহিক, অনলাইন-অফলাইন, লিটল ম্যাগ সহ বিভিন্ন সাময়িকীতেও লিখে যাচ্ছেন।
তিনি স্বল্প সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে পেয়েছেন সম্মাননা।
সাউথ ছাতক ইসলামিক এসোসিয়েশন সম্মাননা পদক। জালালাবাদ কবি ফোরাম সম্মাননা স্মারক । ঝাল ছড়া সাহিত্যের সম্মাননা স্মারক। মুফতি আব্দুল খালিক রহঃ সম্মাননা স্মারক। আল্লামা আবুল হাসান রহঃ সম্মাননা স্মারক।

নানা প্রতিকুলতাকে মোকাবেলা করে লিখে যাচ্ছেন বেশ দৃঢ়তায়। প্রকৃত শিকড়ের প্রবাহ সন্ধানে।
তার দ্বিতীয় ছড়াগ্রন্থ প্রতিধ্বনী স্বাক্ষর রাখবে বলে আমরা বিশ্বাসী। ছড়াগ্রন্থ প্রতিধ্বনী হোক সৃষ্টিশীল পথের নতুন বিন্যাস। উচ্চকিত শিল্পের মানদণ্ড। গড়ে উঠুক কবির জন্য অনুভবের পাহাড়। পাঠকের কাছে হয়ে উঠুক অসামান্য শিল্প মননের একজন। প্রত্যাশা রাখি অনেক।

কুতুর রাহমান’র ২য় ছড়াগ্রন্থ প্রতিধ্বনি।
পায়রা প্রকাশনী। গ্রন্থস্বত্ব লেখক নিজে। প্রকাশ কাল একুশে বইমেলা -২০১৯।
বইটি বাজারজাত করেন অনলাইন পরিবেশক, রকমারি ডট কম। মূল্য ১৫০ টাকা
প্রকাশক সিদ্দীক আহমেদ। বইটি উৎসর্গ করেছেন কবির মা-বাবাকে। প্রচ্ছদ করেছেন- শ ই-মামুন। সুন্দর প্রচ্ছদ, ধূসর কালার। চার ফর্মার বই ৬৪পৃষ্ঠা, ৬৪টি কবিতা। ছড়া গ্রন্থ প্রতিধ্বনি’ নিয়েই আজ যতসামান্য আলোকপাত করার চেষ্টা।
কুতুব রাহমান এর “ছড়াগ্রন্থ” প্রতিধ্বনি আশাজাগানিয়া এক উচ্ছাসার। আলাদা অনুভবের। খুটিঁয়ে দেখেছেন জীবনের ধারাপাত। উৎসের অনুসন্ধানী। মুলত: শেকড়ের টান।