কুরবানী নিয়ে লেখা নজরুলের কবিতাটি মুসলমানদের জন্যেও বোঝা শক্ত। কারণ? কারণ- তার অপরিসীম মিথ ব্যবহার (বলাবাহুল্য, হিন্দু ও ভারতীয় মিথ-বিদ্রোহী-তে যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায়)। কবি নজরুল বেঁচে থাকতে এক মোল্লা কোরবানীর নামে “পশু-হত্যা” বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। তার ঐ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কবি এই আলোড়ন-সৃষ্টিকারি কবিতাটি লেখেন। তিনি জানতেন, তৎকালীন বাবু-কালচারের কেউ ও-কথা মুখে না বললেও-মনে মনে ছিল একই-হিংসার প্রচন্ডতা। দেশভাগ, পাকিস্তান-আন্দোলন, জিন্নার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র, মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতি বাঙালী হিন্দু-মুসলমানকে প্রবল সংঘর্ষের দিকে টেনে নিচ্ছিল। তাই নজরুলের এহেন চমৎকার কৌশল আমাদের সাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত। দেখুন-
“ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
দুর্বল! ভীরু ! চুপ রহো, ওহে খামখা ক্ষুব্ধ মন !
ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, –
আজিকার এ খুন কোরবানীর !
দুম্বা-শির রুম্-বাসীর
শহীদের শির সেরা আজি !- রহমান কি রুদ্র নন ?
ব্যাস ! চুপ খামোশ রোদন !
আজ শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে , শির দে বৎস” শোন !
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !…
এটুকু বুঝতেই আমাদের ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। তৎকালীন মুসলমান বাঙ্গালী সমাজ ছিল ‘মোসলেম-ভারতীয়’ আবেগে আর “বিষাদ সিন্ধু”র উচ্ছাসে থরোথরো; তাই তাদেরকে কথা বলতে হচ্ছিল সাবধানে। ওমর খৈয়ামের ধ্বনি ছিল; কিন্তু প্রকরণে বিনয়!–
“এ তো নহে লহু তরবারের
ঘাতক জালিম জোরবারের
কোরবানের জোরজানের
খুন এ যে, এতে গোর্দা ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন !
এতে মা রাখে পুত্র পণ !
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরা’লো বলির পূত বসন !
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
ইসলামের-ইতিহাস ও কোরানের-গাঁথা তিনি আনলেন নিপুন ভাবে ও ভাষায়; কিন্তু উপমা টানলেন গৌতম বুদ্ধের।
“এই দিনই ‘মিনা’-ময়দানে
পুত্র-স্নেহের গর্দানে
ছুড়ি হেনে ‘খুন ক্ষরিয়ে নে’
রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ !
ছি ছি ! কেঁপোনা ক্ষুদ্র মন !
আজ জল্লাদ নয় , প্রহ্লাদ-সম মোল্লা খুন-বদন !
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
প্রহ্লাদকে বোঝা সহজ ‘কম্মো’ নয়। আজো আমরা প্রতিবেশিকে চিনি না, আর তাদের মিথ জানা তো দূর অস্ত্। তবুও মনে না করিয়ে দিয়ে পারছি না আরো দুটো চরণ:-
“মুসলিম-রণ-ডঙ্কা সে,
খুন দেখে করে শঙ্কা কে ?
টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে,
ওরে হুঙ্কারে, ভাঙি গড়া ভীম কারা, ল’ড়বো রণ-মরণ !
ঢালে বাজবে ঝন্-ঝনন্ !
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন !”
ভীমকে আশাকরি মিথ না-জানা মুসলমানও চিনবেন। কিন্তু ‘স্বাধীনতা’ যে কুরবানীর মন্ত্র হতে পারে সে-তো আজকের ইসলামিস্টরাও মানতে নারাজ। কিন্তু নজরুল??—কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মোজাফ্ফর আহমদের রুমমেট হয়েও যে কমুনিজমে দীক্ষা নেয়-নি (অথচ অনুবাদ করেছেন ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিস্ট সং–‘অন্তর ন্যাশনাল সঙ্গীত’ নামে); মুসলমানদের স্বাধীকার চেয়েও যে ‘লড়কে-লেঙ্গে পাকিস্তানের’ পক্ষে ঝান্ডা ওড়ায় নি; শ্যামা-সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠতম গীতিকার হয়েও যিনি লিখেছেন বাঙালী-মুসলমানের (প্রায়) জাতীয়-সঙ্গীত –ও মন রমজানেরও রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ; আর চির-নিপিরীত, দরিদ্র, খেটে-খাওয়া, বচ্ঞিত বাঙালীদের শিকল ভাঙার শ্রেষ্ঠতম সঙ্গীত-মালা… সে ৪৭-হোক বা ৭১ (কখনোই যাকে ছাড়া পদ্মার ঢেউ বয় না)– সেই উদারতার স্রষ্টাকে বুঝতে সময় লাগবে। লেখাপড়াও লাগবে।
আরো ৫০ বছর পরেও যদি বাঙালী-মুসলমান নজরুলকে বুঝতে না-পেরে গালি দেয়; আমি অবাক হবো না। ‘কোহিনূর’ তো এক সাধারণ সেনাপতির-বউয়ের আঁচলেই বাধা ছিল, বাবর তাকে হত্যা করেনি বলেই দয়া-পরবশ হয়ে তাকে দিয়ে দিয়েছিল সেই বেঁচে-যাওয়া নারী… তার মূল্য বুঝতে দু:সাহসী মুঘলদেরও ১০০ বছর লেগেছিল!! আর ইংরেজদের সে তো রানীর মুকুটেই লেখা আছে?? আপনারাই হিসেব দিন।
সেই নজরুলই আমার আরাধ্য–ধার্মিক অথচ ধর্মান্ধ নন। প্রেমিক অথচ স্বেচ্ছাচারী নন। বিশ্বাসী অথচ অ-প্রগতিশীল নন। এবং কোনোক্রমেই মোনাফেক নন্। যার দু-একটি বাক্যই তাকে চেনানোর জন্য যথেষ্ট: ‘রোজ হাশরে আল্লাহ আমার কোর না বিচার…’; কিংবা “আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো তবু আমারে দেব না ভুলিতে!”