‘কতো আশায় দেখি হতাশার বাড়াবাড়ি
কতো আকুতি ঈশ্বরের প্রার্থনা!
সংসার এখানে সংকটে ভাসে
চোখজলে ধুয়ে যায় জীবন
যেনো রক্তহীন ফ্যাকাশে ফসিল’
-শূন্যতা

কবিতার পঙক্তিগুলো কুসুম তাহেরার প্রথম কবিতার বই ‘কষ্টের বর্ণমালা’ থেকে নেয়া। উপহার হিশেবে বইটি যখন আমার কাছে আসে তখন বাসে বসেই পড়েফেলি গোটা কিতাবখানা। তখন এক ঘোরলাগার মধ্যে পাঠ করি কবিতাগুলো। আমাকে বারবার প্রজ্বলিত করে তোলা। আমাকে জাগিয়ে তোলে কবিতার পঙক্তিগুলো। এক চিরাচরিত মোহ শরীর জুড়ে খেলা করতে থাকে। আমি নেশায় বুদ হয়ে যায়। পল্টন থেকে যখন মিরপুর টেকেরবাড়ি এসে পৌঁছি তখন বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো শাদা হয়ে গেছে। কালো অক্ষরগুলো নজরের ভেতর প্রবেশ করে হারিয়ে গেছে অজানা কোনো গন্তব্যে।

কষ্টের বর্ণমালা বইটির একটি আলোচনা লেখব বলে টেবিলে রেখি দিয়েছি। অনেক দিন। বললেই তো আর লিখা যায় না। কবিতার পাঠ যেমন সুখপাঠ্য হয় তার পাঠানুভূলি লেখা ততোটু সুখকর হয়ে ওঠে না। কোথায় যেনো একটি অচেনা সুতো টেনে নিয়ে যায় অন্য গন্তব্যে। আমি সেই গন্তব্য সিদা করে সামনের দিকে যাবো বলে হাঁটতে থাকলে হোঁচট খাই। তাই রেখে দিয়েছি অনেক দিন। টেবিলে আজ বইটি দেখে মনের জানাল উঁকি দিলো কিছু একটা বয়ান করার জন্য। আমি হাতে নেই বইটি। আবার চোখ বুলিয়ে দেখি বইয়ের শরীর। নতুন বইয়ে গন্ধটি লেগে আছে। বেশ টাককা গন্ধ। আমাকে মোহিত করে। আমি লিখতে উদ্বোদ্ধ হই। শুরু করি কবিতার আলোচনা।

কুসুম তাহেরা একেবারে জাত কবি। তার কবিতার পরতে পরতে খেলা করে প্রেম, দ্রোহ আর মানবিকতা। এক অচেনা কষ্ট তার সকল কবিতার ভেতর কেমন লেপটে থাকে। শারীরিক স্পর্শ ছুঁয়ে যায় প্রেমের ভেতর দিয়ে। এ যেনো আদিম শূন্যতার ভেতর নতুন অঙ্কুর উদ্গম।
‘একদিন তারে পাবার উদ্বেগ যাবে
সব শূন্যতা সহনীয় হবে হয়তো…
শোখ বিদায় নেবে… আপাদমস্তক
বৈধব্য স্পর্শ করবে প্রেমিকার পুরো জীবন’
-পেমিকাহীন বৈধব্য

কষ্টের বর্ণমালা’তে কবিতার পঙক্তিগুলো অনুসন্ধানী বাকপ্রতিমতা দেখা যায়। পুরোনো স্বাদকে নতুন রুচির সৃষ্টিশীলতার মধ্যে অবগাহন করতে দেখা যায়। ব্যক্তি থেকে বৃহৎজীবনকে স্পর্শ করে। শরীরের ভেতর দিয়ে জাগিয়ে তোলো দ্রোহের আগুন। যেনো এক ফুঁৎকারে নিভিয়ে দেয় তাবদ আপদ। আনন্দ জেগে উঠা এই শারীক অবগান আমাদের কবিতায় আদি। তবু চিরকার সে সমসায়িক। এই নানন্দনীক বোধ কবির ভেতর খেলা করতে দেখি। সে তার পঙক্তির ভেতরে সহসায় প্রবেশ করিয়ে দেয় আনন্দের পারদ।
‘তুমি ছুঁয়ে দিতে পারে আমার দেহের সকল অনাবাদি ভূমি
তুমি স্বপ্নে এসে প্রতিরাতে যাও চুমে এই ললাট
এভাবে মুছে যাও আমার যতো না পাওয়ার আঘাত!’
-রূপকথা

কুসুমের কবিতার পরতে পরতে প্রেম। একজন প্রেমিককে সামনে রেখে তার কবিতাগুলো আবর্তিত হয়েছে। কে সে প্রেমিক যার জন্য বিরহের মালা গেঁথে চলছে কবি। তার খোঁজ হয়তো আমরা কখনো পাবো না। তবে তার কবিতার ভেতর দিয়ে সেই প্রেমকে অনুভব করতে পারবো। আমাদের এই প্রেমিক চিরকালিন। রক্ত মাংসের এই প্রেমিক মানবিক। তার মধ্যে খেলা করে কাম, বাসনা, দ্রোহ আর না পাওয়ার বেদনা। সেই চোখের পানিতে দয়িরা হয়। অচেনা বাতাসে ভেসে আসে তার কবিতা। শ্রবণে আমরা আপ্লোত হই।
‘আমি আটকে আছি বহু যুগ তোমার ভেতর
আমার শ্বাসপ্রশ্বস স্নাযুতন্ত্র তোমার বিন্দুতে আটকে আছে
সেই কবে ছুঁয়ে গেছে… দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে হয় প্রতিদিন

আমি আজও নিয়মিত স্মৃতির আকাশে হাতড়ে ফিরি
তোমার অপেক্ষায় রোজ বুড়ো হই
অতঃপর শূন্যেই মিলন শূন্যেই বিরহ গুনি নিশিদিন
-হৃদয় কারাগার

‘কষ্টের বর্ণমালা’ বইয়ে বিদ্রিত হয়েছে মানবিকতা, কখনো দেশাত্ববোধে, আবার প্রেমের মায়ায়। তার কবিতা আকাশ ছোয়ার স্বপ্ন নেই আছে উথাল-পাতাল মানসিক বয়ান আর ফেলে আসা প্রেয়সীর ঠোঁটে চুমু খাওয়া মোহাচ্ছন্ন সময়। কবিতা যে পঙক্তির পর পঙক্তি সেই বালাই তার কবিতায় অপ্রতুল। এক পঙক্তি থেকে অন্য পঙক্তি ছুটে চলে কিশোরী প্রেমিকার মতো।
‘ভীষণ তৃষ্ণার্ত আমি এই নদী, এই ছায়াবট
আমাকে ফিরিয়ে নাও আমার শান্ত ওষ্ঠ গহ্বর
বিবর্ণ বিকেল শেষে… শান্ত নদীর তীরে।‘
-তৃষ্ণার্ত আমি

কুসুম তাহেরার কবিতার বই ‘কষ্টের বর্ণমালা’য় আমরা তাকে নতুন সময়ে কাছে অর্পন হতে দেখি। আগামী বিচার করবে তার কাবিতার মাহাত্ব, সময় বলে দিবে নতুন কবিতার হাটে কার কামরুপ উজ্বল হবে। সেই আমায় কবিকে অগ্রসর হওয়ার আহবান করছি। আমার মোলাকাত হবে আগামী বই নিয়ে। কবির প্রতি ভালোবাসা অফুরান।

বইটি প্রকাশ করেছে ‘প্রতিভা প্রকাশ’ ২০২১ একুশে গ্রন্থমেলায়। যাতে ৫৬টি কবিতা রয়েছে। বইটির নান্দনিক প্রচ্ছদ করেছেন আইযুব আল আমিন। যার মূল্য নির্ধারন করা হয় মাত্র একশত ষাট টাকা। বইটি বহুল প্রচার কামনা করছি।