সেই নারী

আমি সেই নারী
যাকে বহু বছরের পর বছর ধরে
সতীত্বের প্রমাণ দিতে এই সমাজে—
অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিতে হয়েছে।
সেই দহনে এখনো পুড়তে হয় আমায়
পরোক্ষ পুরুষ শাসিত অসাম্য চিতায়!

আমি সেই নারী
যাকে অন্নপূর্ণা নামে পূজিত করে,
চাল আর দিয়াশলাই ধরিয়ে দাও হাতে—
শত অবস্বাদের মাঝেও।
কিন্তু সেই নারীকেই কালক্রমে বাঁচতে হচ্ছে,
সেই খাবারের অবশিষ্টাংশ খেয়ে!

আমিই সেই নারী,
যাকে মা বলে,প্রকৃতি বলে, দেবী বলে—
পূজা করো তোমরা সূর্যের আলোয়।
আর রাতের অন্ধকারে ঠোঁটে রঙ মাখিয়ে,
হাতে কুপি ধরিয়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখো!

আমি সেই নারী,
যাকে সন্তান দানে মেশিন বানিয়ে,
তার কাছ থেকেই আইনস্টাইন, সুভাষ, মুজিবকে উপহার নেও।
কিন্তু সেই নারীর জন্মক্ষণকে অশুভ করে
মা অপয়ার ঘৃণিত গণ্ডিতে মোড়ানো হয়েছিল!

আমি সেই নারী,
যাকে সংসারের অসময়
টিউশনির ফিস দিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়,
কখনো বা ভাইয়ের স্কুলের বই কিনতে হয়।
কিন্তু তাকেই বড় হতে হচ্ছে —
কিছু অবহেলিত শব্দের বেড়াজালে।
কী হবে এত লেখাপড়া করে?
সেইতো মহাপুরুষ নামের কাপুরুষের কথায়
মেয়ে – উঠবশ করা লাগবে তোমায়।”

কিন্তু হ্যাঁ! এমন একদিন ঠিক আসবে,
যেদিনটা সাম্যের ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয়ে,
হাতে ধরিয়ে দেওয়া সেই দিয়াশলাই দিয়েই
সমস্ত অন্যায়, অসাম্যতা, নিপিড়ন—
সমস্ত পুরুষ শাসিত প্রলয়োল্লাস হবে ধ্বংস।
নারী সত্তা হবে কলঙ্ক মুক্ত!

আর -আর তখনই আনন্দ উল্লাসে বলে উঠবো
আমি, হ্যাঁ আমিই সেই নারী।
…………………………………………..

প্রত্যুত্তর

ভেসেছি তোর শহরতলীর অলিগলি ছুঁয়ে
মিশেছি চা কাপের উষ্ণ ধোঁয়ায়,
শিখেছি প্রেমের ভাষা অপেক্ষারত।
বেলকনির দেয়াল জুড়েই তোর সাথে আমার
যে কথোপকথন—
টবে ফুটে থাকা ফুলগুলোও সাক্ষী এই প্রেমের।

ফুল ছুঁয়ে উড়ছে যে প্রজাপতি
সেই প্রজাপতিও বহন করে নিয়ে চলছে এই বার্তা,
শহরটার দৃশ্যহীন অন্য প্রান্তর।

হঠাৎ- হঠাৎ করে যেন প্রতিধ্বনিতে কম্পিত হচ্ছে,
এই তৃষ্ণার্ত শহরটা সেই পরিচিত শব্দটায়,
“ভালবাসি ভালবাসি, খুব ভালবাসিরে তোরে।”

প্রত্যুত্তর দিতে খুব ইচ্ছে করছে,
কিন্তু বাস্তবতা শুধু বাঁধা হচ্ছে,
কাছের দূরের মানুষ পাগল বলবে যে!
পাগল না হয় হলাম একটু তাতে কি,
ইচ্ছেটাতো পূর্ণ হতো-
কিন্তু বৃথা হয়ে যাবে যে ইচ্ছেটা।

প্রত্যুত্তরটা যে কম্পিত হবে না ঐ রকম ভাবে,
পৌঁছাবে না তো সেই হৃদয়টায়।
তার থেকে ভালো নিজ শহর নিঃশব্দ করে,
তোর শহরটা কম্পিত করে ভাসি প্রান্তর থেকে প্রান্তরে।
…………………………………………..

অসম্পূর্ণ সত্তা

জানো তো তিমির!
যে আকাশটায় ট্রাফিক জ্যাম নেই,
আমার হালকা শরীর আজ ডানা মেলেছিল
সেই আকাশে,
সীমান্ত পাড়ি দেওয়া কম্পিত ইচ্ছেঘুড়ি নিয়ে।
শুধুই তোমায়—
আমার মনের অঙ্কিত ক্যানভাসটার সাথে মিলিয়ে,
হালকা আকাশী, নীল রঙের ফতুয়া পরা তুমিটাকে আবিষ্কার করবো বলে।

তোমার পাশে বসে হুড তোলা রিকশায়
হালকা রোদে ছায়া ফেলে,
সমস্ত শহরটাকে সাক্ষী করার নেশায় মেতেছিল
এ মন,
এই ক্ষণস্থায়ী ঝিরিঝিরি বর্ষার রুপের সাথে,
তোমায় প্রথম দেখার আনন্দ নিয়ে ভাসবো বলে,
এই শান্ত শহরটার অশান্ত বাতাসের সাথে।

কিন্তু হঠাৎ অজানা এক নিয়তি যে বাঁধা হলো !
আমার মনের সেই খড়হীন স্রোতে।
এই বাঁধা ডিঙ্গিয়ে কী করে তোমায় ছুঁই বলো?

নীলে রাঙানো কানের দুলটা নিচে পড়ে,
এই বালু-সিমেন্টের সাথে চুরমার হয়ে মিশে গেল,
অথচ এই দুলটা তোমার স্পর্শ পেতে চেয়েছিল!
সেই গাঢ় ধূসর মেঘের শাড়িতে,
বিলীন হতে হলো নিজেকে ধূসর বাস্পের মতো,
যেখানে কিনা তোমায় লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম!
সেই খানে আজ না পাওয়া লুকিয়ে রেখে—

নীল মাখানো কাঠের চুড়িগুলোকে,
হঠাৎ যেন ঘুনপোকা ক্ষয় করতে শুরু করলো,
যারা কিনা তোমায় মিষ্টি সুরে মাতাল করতে চেয়েছিল!

কিন্তু বেলী ফুলের সুভাসীত মালাটা
তোমার মনটায় পড়িয়ে দিয়ে গেলাম,
যেটা কিনা আমার সুভাস তোমায় সবসময়
অনুভব করাবে।
আর কপালের নীল টিপটা নিজেই বয়ে নিয়ে চললাম,
কপালের মাঝে তোমায় আলতো করে আঁকড়ে রাখবো,
যতদিন না এ কপাল তুলসী পাতাতে না সাজে।

তুমিতো কৃপা নামের অর্থ জানো?
তাই আমার এই ফিরে যাওয়ার ব্যাখ্যা দিতে চাইনা।
শুধু বুঝে নিও—
অসম্পূর্ণ সত্তা কাউকে কখনো পূর্ণতা দিতে পারে না।
…………………………………………..

অণু বার্তা

এই যে শোনো,
মধ্যরাতে গানে সুরের মাঝে আবিষ্কৃত
তুমিটাকে বলছি,
অভিমান ভর করছে কী?
কিন্তু ভেবো না তুমি,
মাধবীলতা রুপে প্রেমিকা হতে পারিনি বলে,
তোমার শহর রাঙাতে আসবো না!
কোনো একদিন হঠাৎ,
যেদিন বৃষ্টিধারায় ভিজবে তোমার অলিগলি—
এক ফালি রোদ্দুর নিয়ে,
ঠিক আসবো সেদিনটায়।

লাল শাড়িতে তোমায় জড়িয়ে রঙিন করে দিয়ে যাবো।
চুড়িগুলো দিয়ে ঝংকার তুলে দিয়ে যাবো ওই হৃদয়ে।
নাকের এই নোলক দিয়ে,
অপলক দৃষ্টিপট এঁকে দিয়ে যাবো।
আর হ্যাঁ! কাজল মাখা চোখ দুটি দিয়ে,
ওই কপালে নজর চিহ্ন আঁকবো-
যেন আমার তুমিটা শুধু আমারই নজর বন্দী থাকো।

কথা দিলাম আসবোই সেদিনটায়!
শুভ্র মেঘের ভেলায় ভেসে ভেসে,
তোমার সমস্ত কাঙ্ক্ষিত আশাগুলোকে সঙ্গী করে-
শুধু অপেক্ষায় থেকো প্রিয় আমার।
…………………………………………..

ছায়া

নিঃশব্দে নিঃসাড় কড়া নাড়ছে
কোনো এক অচেনা ছায়া,
বাইরে হাওয়াটা যেন অমাবস্যার আভা দিয়ে মোড়ানো,
আমার আগলে রাখা প্রদীপটাও নিভে গেল।

হঠাৎ কোথা থেকে ধমকা হাওয়া
চারপাশটা ধোঁয়াটে করে দিচ্ছে!
সেই ছায়ার সঙ্গী আলোটা আলেয়ায় রূপ নিয়ে
যেন কেমন এক অজানা রহস্যের সৃষ্টি করছে।
আমি নির্বাক, নিথর—
হঠাৎ যেন কোথা থেকে সাহস অর্জন করে
পা বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছি বারবার,
শুধু তাকেই আবিষ্কার করার নেশায় মত্ত হয়ে।
সব কলঙ্ক ভয়কে বিসর্জনের সুরের সাথে মিশিয়ে।

কিন্তু হ্যাঁ, এটা তো ছায়া-
তবে কেন এত সংশয়!
আবার ফিরলাম নিজের ভিতর,
উৎফুল্লে আনন্দের বন্যায় ভেসে।
মরিচার মত ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে,
মিশে গেল আমাবস্যার অস্থির সাথে,
মনে সেই আচমকা ফিকে ভ্রমটা।
এভাবেই কোন এক ক্ষণে
আমি যে আবার ফিরে পেলাম আমাকে।
…………………………………………..

কল্পনা

মা, বলোতো
তুমি কল্পনা নামে কেনো হলে পরিচিত,
কেন হলে না বাস্তবিক?
তাহলে তো এমনটা আর হতো না,
ভেসে-ভেসে খুঁজতে হতো না কল্পনার সাগরে
আশায় ভারাক্রান্ত মনটা নিয়ে।
গভীর নিদ্রা ভেঙ্গে হঠাৎ মধ্যরাতে
চরতে হতো না কালো মেঘের ভেলায়,
কল্পনা নামক তারাটা খোঁজতে।

কেন মা বলোতো এমন হলো?
কেন আমার বার বার কল্পনার ক্যানভাসটায়
ছবি আঁকতে হয়,
কেন আমাকেই পথের দুষ্টু কাটা গুলো
একাই সরিয়ে- নিঃশব্দে পথ চলতে হয়।

আমাকে কেনোই-বা শৈশব-কৈশর ভুলে
মন বিহীন মানুষ হতে হয়।
কেন আমাকে কাগজ ভরে শুধুই
শূন্যতার গল্প দিয়ে ভরপুর করতে হয়।
কেন আমাকে অতীত স্মৃতিপটের অংশ ভেবেই
শুধু সাঁজাতে হয় বারবার তোমায়।

কেন হলে না আমার বাস্তব বলো তো,
কখনো চাইনিতো—
তবুও কেনো হলে আমার কল্পনা।
হয়তো যেটা চওয়া হয়
সেটাই হয় না পাওয়া!
নিয়তি ভেবেই মেনে নেওয়া
হয়তো আমার ন্যায়।”
…………………………………………..

প্রেম

আচ্ছা! এমন প্রেম কী হয়?
যে চোখের অঝোর জল কথা বলে,
সীমাহীন সুখ নীড়ের অনুভূতিতে।
যে প্রেম সাজাতে পারে প্রতিমুহূর্ত
ফাগুন আকাশের জ্যোৎস্না মেখে।

প্রেম কী এমন হয়?
যে স্মৃতি ক্যানভাস অঙ্কনের মাঝে
ফিরবে বাস্তব রংতুলিতে।
যে প্রেম থাকবে না ইতিহাসে বন্দী
বাঁচবে সন্ধি রুপে হাজারও পবিত্র অনুভূতিতে।

প্রেম কী সত্যি এমন হয়?
যে ফুলে সুভাষের ন্যায়
থাকবে শুধু সেই নির্দিষ্ট ফুলের মাঝে।
যে প্রেম হয় না অভিশপ্ত
কোনো বিষাক্ত অতীতে।

প্রেম কী কখনো আবার এমন হয়?
যে খড়ো সৃষ্টি নদীর বুকে প্রাণ দিয়ে
সাগরে পথে চলতে শেখায়।
যে প্রেম কি না সকল অসহায়ত্বকে
অহংকৃত করে মাথা উঁচু করতে শেখায়।

আসলেই প্রেম কী এমন হতে পারে?
যে জোয়ার ভাটা নদীতে
আনন্দের উজান বেয়ে পৌঁছায় তীরে।
যে প্রেম মেঘলা আকাশপটে
শুভ্র ভেলায় ভেসে শুভ্রতা ছড়াবে।
…………………………………………..

অভিশাপ

আবদ্ধ এই ঘরটা থেকে বের হয়ে যখন
নীল আকাশে ডানা মেলে খোঁজে চলি,
এক কলঙ্কহীন পবিত্রতায় ঘিরে থাকা—
শুদ্ধ শহরের প্রয়াসী হয়ে।

হঠাৎ কোথা থেকে যেন আতঙ্কিত মেঘ এসে
ঝাপটে ধরে,
আর বার-বার বিবর্ণ মাখানো সুরে বলতে থাকে,
তুমি দ্রুত ফিরে যাও তোমার গন্তব্যে
না হলে যে—
ঐ যে লাশের গন্ধ মাখানো বাতাস দেখছো
চাদরের ন্যায়ে আবৃত করে তোমায়—
এক অভিশাপে পরিণত করবে।

আর পারবে না কোনদিন ফিরতে,
পারবে না আর আকাশী রঙে রঙিন হতে,
না পারবে মুক্ত বিহঙ্গী হয়ে উড়তে,
আর না পারবে জ্যোৎস্না নিয়ে নিজেকে সাঁজাতে।

সব কেড়ে নিয়ে তোমার,
প্রতিদান রুপে তোমায় জ্বালাবে অগ্নিকুন্ডে।
…………………………………………..

অর্থহীন জীবন

তরঙ্গহীন জীবনে-
প্রেমে ঢেউ এনে দেওয়া বাতাস যেমন
সীমান্তের শেষে তাকে শান্ত হতে হয়।

অভিশাপ শব্দের রেশকে যেমন
সময়ের অন্তিমে বিলীন হতে হয়।

দিবস সূচনাকারী সূর্যকে যেমন
গোধূলী লগ্নে নিজেকে কবর দিতে হয়।

প্লাবিত বন্যাকে যেমন
তার অন্ত গণ্ডীতেই স্তিমিত হতে হয়।

অসহ্য সুখকে যেমন
বেদনার নিকট মাথা নোয়াতে হয়।

প্রকৃতির সৃষ্টি যৌবনকে যেমন
বৃদ্ধত্বের কাছে হার মানতে হয়।

দিনের এই ঝলকানো উজ্জ্বলতাকে যেমন
নিশি রাতের কালো ছায়ায় হারিয়ে যেতে হয়।

তেমনি ভাবে প্রকৃতির নিয়মে সৃষ্টি মানবকে
সময়ের পরিক্রমায় নিজকে মৃত্তিকার অংশ হতে হয়।

তবে কেন বৃথা অহংকার ফুঁসে—
আগুনের বেলুন সৃষ্টি?
কেন বেড়ে উঠছে মনের মাঝে অভিশাপের—
প্রকান্ড আলপিন?
…………………………………………..

জীবনসত্তা

জাতি আজ জীবনের দুকূল ভেঙ্গে
বসবাসের সূচনা করছে,
শকুনের তৃষ্ণার্ত চোখ ঘিরে ফেলছে—
অজানা মৃত্যুকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে স্তুপ করছে।

লালিত স্বপ্নগুলো ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে
লক্ষহীন পথে ছুটে চলছে,
অনাহারী ক্ষুধার্তকে অভ্যাস করে আশাপতির অপেক্ষায়,
বিশ্বপ্রেমিক তার প্রতিদিবস মৃত্যুর লিস্ট পূর্ণ করছে,
চার দেয়াল শুধু সাহসিক আশাকে খুড়ে খুড়ে খাচ্ছে,
ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে শেষ সম্বলটুকুও,

তবুও আশার বীজ বপন করে চলছে উৎস্বর্গীয় সৈনিকের সাথে,
মৃত্যুকে জীবন দেওয়ার নেশায়
সেবক-সেবিকা আজ ছুটে চলছে,
হার না মানা গণতন্ত্রও বেদনাহত হৃদয়ে
চেষ্টার সমুদ্রে ডুবেছে,
নিশীথ ছায়া বিলীন করে সকালের সূর্য উঠাতে ঐক্যতান ছন্দে।