মধ্যরাতের নির্জন বিশাল পুকুরটির দিকে তাকালে মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া এক টুকরো নদীর অংশ। পাড় ঘেঁষে সারি সারি তাল গাছ মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। জ্যোৎস্নার আলোতে চারপাশ ঢাকা। যত দূর চোখ যায় ধূসর শুন্যতা। জলের ভিতর থির থির করে চাদঁটি কাপঁছে। দিনের বেলা এ স্হানটি বেশ নির্জন থাকে। কালেভদ্রে দু একজন আসে রাতের বেলায়। দিনেও মাঝে মধ্যে মানুষ আসে।
আমি প্রতিরাতেই এখানে আসি নির্জনতা ভাঙ্গার বাসনায়। ভাঙতে পারি না। চিৎকার করে কাঁদি। অথবা কাউকে ডাকি। কিন্তু কেউ সাড়া দেয় না। আমি জানি এখানে কেউ একজন চুপচাপ বসে থাকে। সে যেন কারও জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনে। একসময় চাদঁ টি লুকিয়ে পড়ে কিছুক্ষণের জন্য। আমি হাঠঁতে গিয়ে থমকে দাঁড়াই। কেউ যেন আমার পিছু পিছু আসে। গা ঘেঁষে হাঠে। দাড়িয়ে থাকি। তখন মনে হয় পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে গর্ভবতী নিস্তবধ্বতায়। পিছু তাকাই।
কেউ নেই। যতদূর চোখ যায় শুধু ভাসে ধূসর শুন্যতা। কে ওখানে?
কোথাও কারও সাড়া শব্দ নেই। থমথমে নিরব রাত্রি। দূরে শোনা যায় পাখির ডানা ঝাপটার শব্দ। পুকুরের সচ্ছ জল লাল বর্ণ ধারণ করে। ঢেউ ওঠে। রক্তের ঢেউ।
ঢেউয়ে-ঢেউয়ে হঠাৎ চাদঁ টি লুকিয়ে পড়ে জলের নিচে।আমি হারিয়ে ফেলি আজম্ম পিপাসা স্বাত্ন অচেনা বন্ধু কে।
মনে পড়ে।
সেই তরুন নসুর কথা। কে বা কারা যেন তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে এ পুকুরে ডুবিয়ে রাখে। দুদিন পর নসুর দেহ ভেসে ওঠে। গ্রামের মানুষ হতবাক এ ভয়াবহ দৃশ্য দেখে। নসুর একটা অঙ্গ ও নিখুঁত ছিলনা।হত্যাকারীর আস্ফালন চিত্র সারা দেহে। এমন কাজ মানুষ করতেই পারে না। গ্রামের মানুষের এ ধারণা এতদিন ছিল। নসুর বাবা সেদিনই মারা যায়। মা একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায়। হত্যাকারী কেউ এখনও ধরা পড়েনি।
আমি দ্রুত-পায়ে সামনে এগোতে থাকি। একমুহুর্ত ও দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। মনে হয় কে যেন আমার পিছু পিছু আসে। হয়তো নুসু! কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু বলতে পারে না।
নুসু কি বলবে?
আমাকে মেরো না! আমাকে ছেড়ে দাও! আমি অনেক দূরে চলে যাব! আম্মা! আম্মা! আল্লা! আল্লা! আমাকে একটু পানি দাও!
গল গল রক্তের শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। নিরব হয়ে আসে নসুর পুরো পৃথিবী। তবুও অনেকক্ষণ জেগেঁ ছিল দুটি চোখ। চোখ দুটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুচিয়ে দিলে। চেয়ে থাকার শেষ চাওয়া ব্যর্থ হয়।
আমি বাড়ির কাছে আসতেই আনমনে হেসে ওঠি। নুসু কোনদিনও ফিরে আসবেনা। সে অনেক দূরে চলে গেছে।
কিন্তু! না! না! কোন কিন্তু নয়। সব মিথ্যা। সব মিথ্যা।
দরজার চৌকাটে দাড়াতেই মনে হল। পৃথিবীর সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখনও নুসুর হত্যাকারীরা জেগেঁ থাকে। রাতের বেলা ঘুমুতে পারে না। শত শত নসু রাতের বেলা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। ঘর থেকে বেরুলেই পিছু নেয়। জানালা দিয়ে উকি মারে। গা ছোয়ঁ। ফিস ফিস করে আওয়াজ তুলে।
কিন্তু! না, কোন কিন্তু নয়।
আমি এসব কি ভাবছি? আমি নুসু নামক কাউকে চিনিনা! তাকে কোনদিন দেখিনি! সব মিথ্যা। সব মিথ্যা।
ঘামে ভেজাঁ সার্ট খুলে ফেলি। শুয়ে পড়ি বিছানায়। কতদিন হয়ে গেল ঘুমুতে পারিনা। বড্ড ক্লান্তি। শরীরের কোষ গুলো নিস্তেজ হয়ে আসছে। একসময় ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম নয়, স্বপ্ন ওম। রক্তাক্ত নুসু দাড়িয়ে কাঁদছে। দুচোখ বেয়ে রক্ত ঝরছে। লাল, লাল রক্ত।
নুসু বলতে শুরু করে। আমাকে মেরোনা! আমাকে বাঁচতে দাও! আমাকে বাঁচতে দাও! ধীরে ধীরে একটা নুসু থেকে কোটি কোটি নুসু তে পরিণত হয়। বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলে। মুক্তি চাই! মুক্তি চাই!
হঠাৎ আমি ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠি।
বিশ্বাস কর, নুসু! তোমার হত্যাকারীরা ভালো নেই। ওরা নরকে বন্দি। তুমি ওদের ক্ষমা কর। হঠাৎ নুসু দূরে কোথাও পালিয়ে যায়। আমি নুসু! নুসু! চিৎকার করে ডাকি। কেউ সাড়া দেয় না। দূরে কোথাও কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। কে একজন নাকি অনেকজন অন্ধকারে দাড়িয়ে চুপি চুপি কাঁদছে। আমি সমগ্র পৃথিবী জড়িয়ে ধরে কাঁদতে চেষ্টা করি। কিন্ত পারি না। পৃথিবী আমার কাছ থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে থাকে।