প্রথম বিয়ের মতো হনুফার দ্বিতীয় বিয়ে হল এক গরিব ছেলের সাথে।
ছেলের বাবা কবিরাজি করে। বাচ্চাদের কানপাকার টোটকা চিকিৎসা করে তার নাম হয়েছে কানপাড়া কবিরাজ। গ্রামের নাম চর সোনাইকাজি। বালুচরে উঁচুমতো জায়গায় এলামেলো কয়টি বাড়ি। যার কোনটিতেই ভালো ঘেরা নেই। এসব বাড়ির মেয়েরা নদিতে গোসল করে। এখানেই বিয়ে হলো হনুফা নামের রূপবতি মেয়েটির। যৌবনের উচ্ছ্বাস যার দেহে এনেছে দুরন্ত নদিরস্রোত।

প্রথম স্বামিকে সে স্বেচ্ছায় তালাক দিয়েছিল। তাকে তালাক দিতে এতটুকু দ্বিধা হয়নি তার। মাদাজালফাড়া গ্রামের রুস্তমকে বিয়ে করার বিষয়ে কোন সম্মতি ছিল না তার। ছেলেটা ছিল একটা কুখ্যাত কালোবাজারি। হনুফার মতের বিরুদ্ধে বাবা তার সাথে জোর করে বিয়ে দিয়েছিল। তখন হনুফা সপ্তম শ্রেণির ছাত্রি। ভাবিদের মুখে সে শুনেছে বিয়ে নারি জীবনের এক পরম প্রাপ্তি। যার শুরু হয় বাসর রাতের মধুময় মিলনের মাধ্যমে। কিন্তু স্বামির আচরণে বাসর রাতের কর্মকা- মধুময় হয়ে উঠেনি হনুফার কাছে। প্রথম রাতের স্মৃতি তার কাছে অব্যক্ত যন্ত্রণার ক্ষত হয়ে আছে। এক কামাসক্ত পশুর বিরক্তিকর হাসফাস শব্দ ছাড়া কিছুই পায়নি সে স্বামির কাছে। স্বামির এ দস্যুতা থেকে পরিত্রাণ পেতে অনেক কেঁদেছিল সে। এই নিরানন্দ দাম্পত্যের অবসানের জন্য সে স্বামিকে তালাক দিতে বাধ্য হয়েছিল। হনুফার রাতগুলো কষ্টকর হয়ে উঠেছিল আনন্দহীন শারিরীক মিলনে। বিবাহিত জীবনের সুখকর বিষয়টি কি তা সে জানতে পারেনি। পড়শি মেয়েরা তাকে যে গোপন সুখের ইশারা দিত সে বিষয়ে সে ছিল একদম অজ্ঞ। তার যে হনুফা নামটা-সে নামে তাকে মিষ্টি করে ডাকেনি তার স্বামি। হনুফা তার স্বামিকে তালাক দেয় অক্ষমতার অপবাদ দিয়ে। আদালতের লোকজন তার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিল। তারা হনুফার দেহে জ¦লন্ত আগুনের উত্তাপ আঁচ করছিল। আদালত থেকে বাড়িতে ফিরে সারাটা বিকেল সে নিশ্চূপ হয়ে থাকে। এতদিন তার স্বামি নামের একটা মানুষ ছিল। আজ সে তার নির্যাতন থেকে মুক্তি পেল। সে ভাবে নারি জীবন হয়ত এমনই। পুরুষের কামনার আগুনের পোঁড়ার জন্যই বুঝি নারির জন্ম। আবার তো তাকে বিয়ে করে সংসার পাততে হবে। তখন যদি এমন ঘটনা আবারও ঘটে। এসব কথা ভেবে রাতে তার ঘুম হয় না।

বাবার উপর মনটা খারাপ হয় হনুফার। কী দরকার ছিল এমন বিয়ের! এখনও সে বান্ধবিদের সাথে স্কুলে যেতে পারত। বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারত। এমন একটা বাজে স্মৃতি তার মনটাকে বিষিয়ে তুলত না। নিজকে শক্ত করার চেষ্টা করে সে। সবকিছু ভুলে আবার নিজকে গোছাতে চায় সে। সেজন্য সে অবিরত ঘুমায়। ঘুমকেই শান্তির একমাত্র অবলম্বন মনে করে সে। বাবা হাঁপানির রুগি। তার বুকের ঘড়ঘড় আওয়াজ আর কাশির তীব্র শব্দে হনুফার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন হনুফা এলোমেলো চিন্তার দূর্বিপাকে ভাসতে থাকে। বাবার হাঁপানি, মায়ের কোমড়ের ব্যথা। সারারাত তাদের চোখে ঘুম নেই। তাদের যন্ত্রণাকাতর শব্দ হনুফার মনে নানারকম আশঙ্কার জন্ম দেয়।

একটা বিষাক্ত স্মৃতি হনুফার মনটাকে কষ্ট দেয়। এখন তার দিকে সবার আলাদা ধরণের নজরদারি। মানুষকে সে কৈফিয়তই বা দেবে কত। কারও সাথে সে আগের মতো প্রাণ খুলে কথা বলতে পারে না। কোনখানে একা যেতে চরণে জড়তা ভর করে। কোথায় যেন বাঁধা। সামনে এগুতে প্রতিটি পদক্ষেপে সে হোঁচট খায়। তার দেহের গ্রন্থিতে যেন পচন ধরেছে। তার জীবন থেকে এমন কিছু মুল্যবান জিনিষ খোয়া গেছে যা কোনদিন উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। তাদের বাড়িটাও অনেক বদলে গেছে। ভাইয়েরা এখন ভাগ হয়ে আলাদা সংসার পেতেছে। এখন হনুফা কার কাছে থাকবে। চারদিকে থমথমে শূন্যতা নেমে এসেছে। মেজো ভাইয়ের ফুটফুটে বাচ্চাটা দুমাস হল নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। ও বেঁচে থাকলে হনুফার দিনগুলো আনন্দে কেটে যেত। হনুফা বুঝতে পারে এ সংসারে তার আগের মতো আবেদন নেই। এখন কী করবে সে। সে ভাবে আবার সে বই নিয়ে স্কুলে যাবে। মন দিয়ে পড়ে জীবনের মোড় পরিবর্তন করবে। কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব করবে সে। তার রুগ্ন পিতা এই বোঝা কী বহন করতে পারবে।

হনুফার খাবার রুচি কমে গেল চিন্তা করে করে। শুষ্ককাশি আর ঘুষঘুষে জ¦রে তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তার দিকে তেমন মনোযোগ নেই কারও। একদিন প্রবল জ¦রের কারণে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। পাশেই উপজেলা হাসপাতাল। সেখান থেকে একজন ডাক্তার নিয়ে আসা হল তার চিকিৎসার জন্য। তার চিকিৎসায় দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠল হনুফা। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিল সে। সে ভেবেছে এ জগতে বেঁচে থেকে কী লাভ হবে। সবাই যখন তার প্রতি বিরক্ত হয়ে গেছে তখন তার মরে যাওয়া অনেক ভালো। কিন্তু অপু নামের ডাক্তার ওর নিয়মিত খোঁজ নিতে থাকে। তার সেবার গুনে হনুফার মন থেকে হতাশার মেঘ কেটে যেতে থাকে। ওর অন্তরে আবার জন্ম নেয় বেঁচে থাকার বাসনা। অপু তাকে কোমল কণ্ঠে হনুফা বলে থাকে। খুব মোহময় লাগে হনুফার শ্রবণে সে সম্বোধন। হনুফা ভাবে তার কানের ভেতরে কি আরও কান আছে। তার মনের ভেতর কি লুকিয়ে আছে আর একটি মন। যার খোঁজ সে জানত না। অপুর একটি মায়াবি ডাক তার মনের জানালা খুলে দিল। হনুফা এখন মনের আকাশে রূপালি চাঁদ দেখে। দেখে প্রবাহিত নদি এবং নিবিড় শাল তমালের অরণ্য। যেখানে গলে পড়ে শরতের বিমুগ্ধ জোসনা। মাঝে মাঝে অপু তাকে দেখতে আসে। একটি মায়াময় জীবনের ইশারা সে তার হৃদয়ে ঢেলে দিয়ে যায়।

কিছু মানুষের হৃদয় বড় মাপের থাকে। যারা মানুষকে নিয়ে ভাবে। হনুফাকে নিয়ে ভাবে অপু। হনুফার অসহায় মুখ তাকে ভাবায়। ওর অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে একান্তে অনেক ভাবনা আসে অপুর মগজে। হনুফার বাবা এখন রোজগার করতে পারে না। ওর মাও অসুস্থ। ওর ভাইয়েরা পৃথক সংসার পেতেছে। এই অবস্থায় কী করে ভালো থাকবে সে। কে তাকে খাওয়াবে। হনুফার অনাগত ভবিষ্যত নিয়ে একটা পরিকল্পনা মাথায় এসেছে অপুর। হনুফা যদি লেখাপড়া করে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তাহলে ওর কোন অসুবিধা থাকবে না। এ কথাটি হনুফাকে বুঝাতে চেষ্টা করে অপু। ওর বাবাকেও কথাটা বলে সে। সে একথাও খুলে বলে হনুফার পড়ার খরচের কোন সমস্যা হবে না। ওর সব খরচ অপু বহন করবে। এর বিনিময়ে সে কিছুই কামনা করবে না। হনুফার সোনালি ভবিষ্যতই তার একান্ত চাওয়ার বিষয়। হনুফার বাবা প্রস্তাবে সম্মত হয়। হনুফাকে বুঝানোর বিষয়টা সে দেখবে বলে অপুকে কথা দেয়।

হনুফা সহজে অপুর কথায় রাজি হতে চায় না। সে কি আবারও পড়তে বসতে পারবে? আবার ভাবে নিশ্চয় পারবে। আবার কখনও মনে হয় মোটেই পারবে না। কোথায় যেন একটা মানাত্মক গরমিল। তার মনে হয় সে একটা অন্ধকার গর্তে পড়ে আছে। এখান থেকে সূর্যের আলো সে দেখতে পায় না। কতদিন থেকে তার বইয়ের সাথে সম্পর্ক নেই। বইয়ের প্রতি তার কোন আগ্রহ নেই। যখন সে স্বামির বাড়িতে গেছে তখন থেকে বইয়ের একটি পাতাও উল্টে দেখেনি। ইংরেজী তো দূরের কথা বাংলা অক্ষরও মনে হয় সে ভুলে গেছে। তার বান্ধবিরা এখন নবম শ্রেণিতে পড়ে। হনুফা তো এখন নবম শ্রেণির বই পড়তে পারবে না। ওকে আবার নিচের ক্লাশে ভর্তি হতে হবে। তিন বছর স্বামির ঘর করে হনুফা অনেকটা বদলে গেছে। তার দেহে এখন লজ্জামেশানো দ্বিধা বোশেখের ঝড়ের মতো মাতম তোলে। শিক্ষকের সামনে ওর চেয়ে ছোট মেয়েদের সাথে বসে এখন কি ক্লাশ করা সাজবে। ওর স্তনযুগল বাহু নিতম্ব ওকে হতভম্ব করে তোলে। কেমন করে নিজকে সে সতৃষ্ণ সব চোখের সামনে আড়াল করে রাখবে। রাতে সে মায়ের কাছে থাকে। ঘরে কোন জানালা নেই। নেই কোন চেয়ার টেবিল। শ্বাসকষ্টের কারণে সারাটা রাত বাবা বিছানায় উপুড় হয়ে জেগে থাকে। এমন পরিবেশে কী করে পড়ায় মন দেবে হনুফা। তবু সে অপুর প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করে। সে বলে তাকে যদি পড়াশুনার উপযুক্ত পরিবেশ দেয়া হয় তাহলে সে চেষ্টা করবে।

অপু লোকটা যে কী ধরণের! কেন সে হনুফাকে পড়ার জন্য প্রেরণা দেয়। কেন তাকে দুস্তর পথের যাত্রি করতে চায়। তার কথা শুনতে হনুফার মোটেই ভালো লাগে না। হনুফার চেহারা সুন্দর। এই সৌন্দর্যের সাথে যদি শিক্ষা যোগ হয় তখন কতনা সুন্দর হবে। লেখাপড়া করে সুযোগ্যা হয়ে একদিন চাকুরি করবে সে। সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে প্রতিদিন সে অপিসে যাবে। কতনা উপভোগ্য হবে সেই দিনগুলো। বাবা-মাকে তখন সে সেবাযত্নে সুখি করতে পারবে। হনুফা বুঝতে পারে না কেন তাকে পড়াতে চায় অপু ডাক্তার। তার মনে একটি প্রশ্ন অজান্তে জেগে ওঠে। এই জগতে স্বার্থ ছাড়া কেউ তো কারও পেছনে টাকা খরচ করে না। তাহলে তার পেছনে অপু এত টাকা নষ্ট করতে চায় কেন। হনুফা একদিন অপুকে বলে-
“আপনি আমাকে পড়তে বলেন কেন? আমি তো আর পড়তে চাই না।”
“তুমি চিন্তা করে দেখ কেন তোমাকে পড়তে বলি। পড়লে তুমি নিজকে গড়তে পারবে।”
“এখন কি আমার দ্বারা এটা সম্ভব হবে। সব সময় সবার দ্বারা কি সবকিছু হয়?”
“কেন সম্ভব হবে না। তুমি চেষ্টা করলে হবে। আমি তোমার পেছনে থাকব।”
“আমার পরিবারের যে দশা সেটা আপনি বুঝতে পারবেন না।”
“আমি সবকিছু ঠিক করে দেব। তোমার পড়ার পরিবেশ তৈরি করব। বল তুমি পড়বে কিনা?”
“আচ্ছা পড়ব। তারপর কি হবে?”
“তারপর কি হবে মানে? যোগ্যতা হলে তুমি নিজের জায়গা করে নিতে পারবে।”
“তারপর। তারপর কি হবে। আমাকে বিয়েশাদি করে ঘর করতে হবে না?”
“করবে। যোগ্য মেয়ের বিয়ের কোন সমস্যা হবে নাকি?”
“সমস্যা তো হবে। বড় করবেন আপনি বিয়ে করবে আরেকজন?”

হনুফা বিগলিত হয় অপুর কথায় কিন্তু তার মন জলের মতো প্রবাহিত হয় না। সে উতলা হয়ে আবারও বরফের মতো শীতল হয়। কেনাবেচার বাজারে যে এসেছে তার মনে কি কোন সুস্থিরতা থাকে। যে রূপ যে যোগ্যতায় বিক্রি হতে যেজন উন্মুখ, ফিরে দেখার অবকাশ তার কোথায়। কল্পনায় হনুফা লেখাপড়া শিখে চাকুরি করে। দামি শাড়ি পড়ে হাওয়ায় ভেসে অপিসে যায়। বেতন ড্র করে বাজারে যেয়ে মনের মতো কেনাকাটা করে। সে একা একা একটি বিষয় নিয়ে অনেক ভাবে। সত্যি যদি তার জীবনে এসব অর্জন হয় অপুর এ বদান্যতার কী প্রতিদান দেবে সে। তার চরণতলে সেকি এই নারি জনমের বাসনা কামনা বিছিয়ে দিতে পারবে না। হনুফা তো প্রাণহীন জড় পদার্থ নয়। তারও তো ইচ্ছে অভিরুচি আছে। হনুফার মন প্রবলভাবে জানতে চায় অপুর মনের সেই গোপন স্বপ্নের কথা যার কারণে সে এতকিছু করতে চায়। কেন সে হনুফার জন্য এতকিছু করতে যাবে। তার জীবন স্রোতকে কোন মোহনার দিকে চালিত করতে চায় সে। সে স্বপ্নের কথা হৃদয়ঙ্গম না করে আলোছায়া পথে হনুফা একদম চলতে পারবে না। অপুর কাছে এসে হনুফা মাতাল ফাগুনের সুঘ্রাণ পেয়েছে। তার সরল মনটি সে ঘ্রাণে পাগলপারা হয়ে গেছে। ভঙ্গুর কাচের মতো সে মনটি সামান্য আঘাতে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে। তার হৃদয় চায় অপু সেই খ-িত মন নতুন করে নির্মাণ করুক। অপু মানুষ হিসেবে ভালো। কিন্তু তাকে দ্বিধাহীনভাবে ভালো বলতে পারে না হনুফা। কোথায় যেন বাধা। জোসনা তো সবার প্রাণে শিহরণ জাগায় কিন্তু দিগন্তপ্লাবি চাদ তো কারও আপন নয়। অপুর একটি কর্মবলয় আছে। সেখানে সে আপন মহিমায় বিচরণ করে। সে বলয় ভেঙ্গে সেতো চাদের মতো হনুফার আকাশে উদিত হবে না। স্বামিকে ছেড়ে দিয়ে হনুফা নিদারুণ শূন্যতা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তার মন এখন পাখা মেলে উড়তে শিখেছে। তার পরিপুষ্ট শরির এখন পুরুষের সংসর্গ চায়। তার মন উতলা হয়ে সুদূরের গগণে হারিয়ে যায়। মনের এ আকুতি পূরণ না করে তার পক্ষে এক মুহূর্ত স্থির থাকা সম্ভব নয়।

হনুফা শুনেছে অপুর বউ আছে। তার একটি মেয়েও আছে। অপুর পক্ষে হনুফাকে আপন করে নেয়া কী করে সম্ভব হবে। আর সেই বা কী করে নিজকে এমন জটিল সমস্যার দিকে ঠেলে দেবে। একদিন অপু হনুফাকে বলে-
“দেখ হনুফা, অল্পশিক্ষিতা থাকা তোমাকে মানায় না। তোমার মতো সুন্দরি মেয়ে অযতেœ নষ্ট হবে তা আমার সহ্য হবে না।”
“আমার চেয়ে কত সুন্দরি মেয়ে আছে আপনি একটু বেশি বলেন।”
“মানুষের বাইরের রূপের চেয়ে ভেতরের শিক্ষার কদর বেশি। শিক্ষার মাধ্যমে হৃদয় উজ্জ্বল হয়। আমি চাই তোমার বাইরের সৌন্দর্যের মতো হৃদয়ও আলোকিত হোক।”
আর একদিন অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে অপু বলে-
“আমাকে তুমি ভালোবাসতে পারবে হনুফা। তোমাকে গড়ে তোলার বিনিময়ে আমাকে আপন করে নিতে পারবে তুমি?”
অপুর কণ্ঠে ছিল গভীর অনুনয়। তার কণ্ঠের করুণ আর্তি অনুভব করে সচকিত হয় হনুফা। সে বলে-
“আপনার তো বউ আছে। সে যদি কষ্ট পায়? আমার জন্য অন্য কেউ কষ্ট পাবে কেন?”
“মনে হয় সে কষ্ট পাবে না। আমি তোমাকে যোগ্য করে তুলব। তুমি কারও মাথার বোঝা হয়ে থাকবে না।”
কবিতার গলা শান্ত। গভীর রাতের মতো। তার চোখে তারার জ্যোতি গলে পড়ছে। হনুফার অন্তর নিথর নিরাবেগ। সে বলে-
“আপনার মেয়েটা তো অনেক বড় হয়েছে। সেও কষ্ট পাবে। তার তো বুঝার বয়স হয়েছে।”
হনুফার কথা সহজ হলেও ওর মধ্যে ছিল সাবলীল গতিময়তা। যা অপুর আবেগকে স্তব্ধ করে দেয়। অপু অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে-
“হনুফা, তুমি আমাকে বিশ্বাস কর না? আমি তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। তুমি যে আমার অনেক আপন হয়ে গেছ।”

হনুফার কণ্ঠ শান্ত নিরাবেগ। তার সুশ্রি অবয়বে নিরুত্তাপ ভঙ্গি খেলা করে। অপরূপ লাবণ্যের উচ্ছলতা সেখানে। একসময় ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে সে। দুহাতে কোমল মুখখানা ঢাকে। অপু এ কান্নার অর্থ খুঁজে পায় না। সে তাকে সুখ দিতে চায়। সম্পদ এবং স্বাচ্ছন্দে তার জীবন ভরিয়ে দিতে চায়। হনুফা সে কথা বুঝতে চায় না। নিজের জন্য সে অন্যের জীবন নষ্ট করতে পারে না। প্রায় সে নির্জনে বসে কাঁদে। অপুর জন্য তার মায়া হয়। অসুখের সময় হনুফা তার চোখে মমতার প্রদীপ্ত শিখা জ্বলতে দেখেছিল। সেই তার অন্তরে ভালোবাসার বীজ রোপণ করেছে। তার হৃদয়ের নিরস বালুচরে সেই উষ্ণতার চঞ্চল ধারা বইয়ে দিয়েছে। কাউকে আপন করে ভাবতে এত ভালো লাগে হনুফা তা কোনদিন জানত না। এখন একাকি শয্যায় তার চোখে একটুও ঘুম আসে না। ফুলেল শাখায় ভ্রমরের মৃদ্যু গুঞ্জন তার মনে অচেনা কাঁপন লাগায়। নিশুতি রাতে দূর প্রান্তরের বটমূলে কার যেন হৃদয় মোহিত করা বাঁশির সুরে সে উন্মনা হয়ে যায়। অপুকে নিয়ে ভেবে ভেবে হনুফা ক্লান্ত হয়ে যায়। তার ছোট্ট মনখানা এতসব ভাবনার ভারে একসময় মুষড়ে পড়ে। জ¦রাত্রান্ত রোগির মতো নিদ্রায় জাগরণে সে প্রবল প্রদাহে তড়পাতে থাকে।

অপুকে নিয়ে হনুফা তার ভাবনাকে এগিয়ে নিতে চায় না। ওকে নিয়ে বেশি করে ভাবলে হনুফা অসুস্থ হয়ে পড়ে। মৃত্তিকা থেকে গগণের চাদ ধরার দূরাশার মতো ধূর্ত-প্রহেলিকায় সে খেই হারিয়ে ফেলে। একটা অসম দুরত্বকে শুধুমাত্র ভালোবাসা নামক বস্তু দিয়ে আয়ত্ত করা যায় না। কল্পনার ঘোটকে চড়ে হনুফা জনহীন রাতের নিস্তব্ধতায় অনেক অনেক পথে ছুটে বেড়ায়। আকাশের ললাটে জ¦লে থাকা অগণিত জোতিষ্কের ধূসরপৃষ্টে সে কোন মমতার প্রচ্ছায়া দেখতে পায় না। সে শুধু শুনতে পায় সাথিহারা বিহঙ্গের ক্রন্দন আর বহমান নদির বুকে অস্ফুট জলকল্লোল। যার ঘরে শিক্ষিতা রূপসি বউ আছে তার অন্তরে তো অপূর্ণতার হাহাকার থাকা কথা নয়। সুন্দর চেহারার মানুষ ডাক্তার অপু। হনুফার চেহারার সাথে তার আছে আশ্চর্য রকমের মিল। তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে হনুফার আপত্তি নেই। তার প্রত্যক্ষ নজরদারিতে বড় হতে চায় সে। তার হাত ধরে তার সাথে পা ফেলে জীবনের দুস্তর পথে এগিয়ে যেতে চায় সে। সে তার মনটাকে সান্ত¡না দিতে চায়। এভাবে দিনের পর দিন সে শূন্যতায় ঝুলতে পারবে না। এর একমাত্র সমাধান দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। অন্যথায় সমাজের সব বাধা ঠেলে হনুফা পথ চলতে পারবে না। সেজন্য হনুফা অপুকে তাকিদ দেয়।
“আমি এভাবে পড়তে পারব না। পড়ায় আমার একটুও মন বসে না।”
“কেন মন বসে না? মন বসার সব ব্যবস্থা আমি করে দেব।”
“কী ব্যবস্থা করবেন আপনি?”
“তোমার থাকার জন্য আলাদা ঘর বানিয়ে দেব। সেখানে ভালো লাগার সব জিনিষ থাকবে।”
“ওসবে কোন কাজ হবে না। ওই ঘরে আমি একা থাকতে থাকব নাকি?”
“তোমার ঘরে তুমি থাকবে। আর মন দিয়ে পড়বে।”
“কাজ নেই একা থেকে। একা আমার ভয় করে।”
“তোমার মা থাকবে। তাহলে তো ভয় লাগবে না।”
“মা কতদিন আগলাবে আমাকে। মা যখন মরে যাবে তখন কে থাকবে।”
“তখন অন্য কেউ থাকবে। যখন যেমন তখন তেমন হবে।”
“ওসব কথা বাদ দিন। আপনি থাকবেন কিনা বলুন। আমার মন আপনাকে চায়।”
“আগে পড়া শেষ কর। ওসব পরে দেখা যাবে।”
“আচ্ছা একটা কথা বলুনতো। এসব কিসসা কীসের জন্য করছেন? আমার পড়া নিয়ে আপনার নাটক কিসের?”

অপু দমকে যায় হনুফার কথায়। একটি কথাও সে বলে না। হনুফা যা বলে তা সবাই বলবে। একটি যুবতি মেয়ে কোন আশায় দিনের পর দিন প্রহর গুনবে। লেখাপড়া করে চাকুরি পাওয়া সহজ কাজ নয়। একটি নড়বড়ে সংসারের স্বামি পরিত্যাক্তা মেয়ে যার উপর রয়েছে অসংখ্য সতৃষ্ণ চোখের লোলুপ দৃষ্টি সে কী করে মনকে সংযত করে চড়াই উতরাই পেরিয়ে ছুটতে পারবে সোনালি সূর্যের সন্ধানে। গভীর চিন্তায় ডুবে যায় অপু। হনুফা তো সঠিক কথাটি বলেছে। হনুফাকে বিয়ে করে তাকে সোহাগ সান্নিধ্য দিয়ে সে তো তাকে তার কাঙ্খিত ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পারে। হনুফা চাইলেও অপু সহজে তাকে গ্রহণ করতে পারে না। কোথায় যেন বাধা। একটা অদৃশ্য সে ভেঙ্গে ফেলতে পারে না। তার সামাজিক অবস্থান তাকে এ পথে আসতে দেয় না। তার অন্তর অজানা আশঙ্কায় সংকুচিত হয়। হনুফা বুঝে তার বর্তমান অবস্থার মুল্য অপুর কাছে নেই। অপু যে হনুফাকে চায় সে হল অন্য কোন নারি। যে শিক্ষিতা উপার্জনক্ষম এবং স্বাবলম্বি। হনুফা অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। অপুর দেখানো স্বপ্ন অসার অবাস্তব মনে হয় তার কাছে। যে দিন সে হারিয়ে এসেছে তা ফিরে পেতে ¯্রােতের বিরুদ্ধে চলতে পারবে না সে। তার মন উদাস হাওয়ার মতো উড়তে চায়। অপুর কথা পালন করা তার পক্ষে কোনক্রমে সম্ভব হবে না। কাল্পনিক আকাঙ্খা ছুঁড়ে ফেলে তার মন চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।

হনুফা ভাবে খুব জলদি তার বিয়ে করা দরকার। ধনি, গরিব, শিক্ষিত, মূর্খ কোনকিছু তার দেখার বিষয় নয়। তার শুধু একজন মানুষ দরকার। তার হাত ধরে সংসারের দুর্বিপাকে হারিয়ে যাবে হনুফা। এমন এক নিভৃত লোকালয়ে সে বসত করবে যেখানে জীবন সম্পূর্ণরূপে ভাগ্যের হাতে সমর্পিত। সেজন্য খুব দ্রুত সে একজন অশিক্ষিত গরিব ছেলের সাথে বিয়েতে রাজি হয়। তার নতুন স্বামির নাম নূর হোসেন। নিজের নসিবকে ধিক্কার দিয়ে চলমান নদির স্রোতে অন্ধকারে লাফিয়ে পড়ে হনুফা। অপুকে সে কিছুই জানতে দেয় না। রাতের আঁধারে মুখ লুকিয়ে স্বামির হাত ধরে চলে যায় সে চর সোনাইকাজি গ্রামে। আকাশে তারা হাসছে। বালুচরে হেঁটে যেতে হনুফা দেখতে পায় নীরবে বয়ে যাচ্ছে ক্ষীনবহা ধরলা। নদির মৃদ্যু কলতানে তার মন শুকনো মাটির মতো কঠিন হয়। আনন্দ এবং বেদনার ঊর্ধ্বে উঠে যায় তার মন। নদির পাড়ে বসে তারার আলো দেহে মাখে সে। অগণিত নক্ষত্রের প্রতিচ্ছবি নদির তরঙ্গে খেলা করে। সেদিকে তাকিয়ে সহসা চোখের জলে ভিজে যায় তার বুক। স্বামির বুকে মাথা গুঁজে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, “বল তুমি আমার আপন হবে না ওই নদি। বল তুমি কি আপন হৃদয়ের কান্না বুঝবে?” হনুফা ঝরঝর করে কাঁদে। তার কান্নার কোন মানে বুঝতে পারে না তার নতুন স্বামি। নির্জন রাতে তারা দুজন অনেক নিবিড় হয়। বাহুর বন্ধনে কাছে টানে। পাশ দিয়ে বয়ে চলে জলের স্রোত। ওপারের তীরে নৌকা বেঁধে কে যেন করুণ সুরে গান গায়- “ও নদিরে… আমারে যাও লইয়া, কোন ঘাটে সে নাও ভিড়াবে গেল না যে কইয়া..