১. বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন হয়।

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের বাইরে মানুষের চলা কষ্টসাধ্য। ছোট বড় সবার পৃথক সমাজ আছে। বড় হলে বড়দের সঙ্গে আর ছোটদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হয়। সামাজিক মানুষের সঙ্গে বড় হয়েও কেউ কেউ আবার অসামাজিক হয়। কেন হয় এদিকে যাচ্ছি না আজ। বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন হয়। আজ এ নিয়ে সামান্য কথা। বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ বলতে পরিবারে সদস্যদের কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা, পাড়া প্রতিবেশীদের পরিবেশ, লেখা-পড়ার অবস্থা ও অবস্থান ইত্যাদি যদি উন্নত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয় তাহলে শিশুদের মন-মানসিকতা ও উন্নত মননশীল সম্পন্ন হয়। আর যদি পরিবার, প্রতিবেশী, লেখা-পড়ার অবস্থা ও অবস্থান অনুন্নত হয় তাহলে শিশুদের মন-মানসিকতাও অনুন্নত অমননশীল হয়।

২. একজন অনুকরণযোগ্য মা এবং বাবার কাছ থেকে উপযুক্ত পুরষ্কার ও প্রশিক্ষণের সূযোগ পাওয়া শিশুরা দক্ষ ও নৈপূণ্যের অধিকারী হয়।

এখানে দু’টি বিষয় উল্লেখযোগ্য। ক. অনুকরণযোগ্য মা বাবা বলতে সামাজিক, শিক্ষিত, চরিত্রবান এবং শরীয়ত জীবন পরিচালনাকারী মা বাবা বুঝাতে চেয়েছি। প্রতিটি শিশু অনুকরণ প্রিয়। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন মা যখন ঝাড়ু দেয় তখন শিশুরা ঝাড়ু ওঠানোর শক্তি না থাকা সত্ত্বেও ঝাড়ু ওঠিয়ে ঘর ঝাড়বার চেষ্টা করে অনবরত। বড় ভাই-বোন কুরআন কিতাব পড়লে শিশুরা হু হা, আল্লাহ রাসূল, এক দুই বলার অযোগ্যতায়ও বলে ঘর মাতিয়ে রাখে। মা শাড়ি পরে শিশু মায়ের ওড়না পেঁচায় শাড়ির মতো। বাবা টুপি পরে অবুঝ ছেলে মেয়ে বাবার টুপি পরিধান করবার চেষ্টা করে, পরেও। এখন এই মা আর বাবার কথাবার্তা, ওঠাবসা, চালচলন, খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রীত ও শরীয়ত সম্মত হলে তাদের শিশুও অনুকরণে
উন্নত জীবনের অধিকারী হবে। এগুলোর পৃথক প্রশিক্ষণ দিতে হবে না। মাতা পিতার কাজটাই শিশুদের প্রশিক্ষণ। আর এই মা বাবার কথাবার্তা, ওঠাবসা, চালচলন, খাওয়া-দাওয়া অনিয়ন্ত্রীত ও শরীয়ত পরিপন্থী হলে তাদের শিশুও অনুকরণে অনুন্নত এবং অসুন্দর জীবনের অধিকারী হবে।

খ. দক্ষ ও নৈপূণ্যের অধিকারী করতে হলে শিশুকে উপযুক্ত পুরস্কার দিতে হবে। যেমন আমার শিশু পরীক্ষায় ক্লাসের প্রথম স্থান লাভ করেছে তখন আমার জন্য উচিত তাকে একটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত কাপড় বা ভালো একটি বই ব্যাগ ক্রয় করে [মাতা-পিতার আর্থিক অবস্থার ওপর নির্বর করবে ] দেওয়া। এটি হবে তার কর্ম অনুযায়ী উপযুক্ত পুরস্কার। এভাবে শিশুর ভালো কর্মগুলো সামনে এনে তাকে পুরস্কৃত করলে সে আরও উন্নতি লাভ করবে এবং স্বহাস্যে সামনে অগ্রসর হবে। সঙ্গে সঙ্গে তার মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার না করে একাকী ডেকে নিয়ে বুঝাতে পারলে সে একসময় নৈপুণ্যের অধিকারী হবে। ভালো কাজে পুরষ্কার ও মন্দ কাজে শাস্তি [তাকে বুঝিয়ে বলাটাই তার জন্য শাস্তি] পাওয়া শিশুরা ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য করার ক্ষমতা নিয়ে বড় হয়।
যা আপনি কল্পনাও করতে পারেন নি।

৩. অনায়াসে কথা বলা ও ভাব বিনিময়ে সক্ষম শিশুরা দ্রুত স্বনির্ভর ও স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে বড় হয়।

অনায়াসে কথা বলা ও ভাব বিনিময়ের সুযোগ শিশুদেরকে সাধারণত মাতা-পিতা দিতে রাজি হয় না। তাঁরা মনে করে শিশুরা বড় হলে বাচাল প্রকৃতির হয়ে যাবে। যতটা সামলিয়ে রাখা যায় মনে করেন ততটা ভালো। একটু স্থীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যেসব শিশুকে শিশুকালে দমিয়ে রাখা হয় সেসব শিশু আসলে অঙ্কুরেই মারা যায়। পরে এরা বড় হয়েও দশের সামনে প্রয়োজনীয় কথাটাও বলতে পারে না। শুধু সংকোচবোধ-ই থাকে তার পুরো জীবনবর। এসব শিশুরা স্বনির্ভর ও স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে বড় হতে পারে না। আর যেসব শিশু নিজের মনের ভাব মা-বাবা, ভাই-বোনদের কাছে নির্ভয়ে বলতে পারে, সংকোচবোধ করে না, এসব শিশু দ্রুত স্বনির্ভর ও স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে বড় হয়।

৪. সুখকর পারিবারিক অনুভূতির ভেতরে বড় হওয়া শিশুরা সামাজিক মেলামেশায় দক্ষ হয়।

সমাজে দু’ধরণের ধনী আছে। কেউ আত্মীক ধনী আবার কেউ আর্থিক ধনী। আত্মীক ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুর অনুভূতি সচ্ছ-সুন্দর ও সুখকর হয়। এরা সামাজিক মেলামেশায় দক্ষ হয়। ভেতর বাহির এদের সুন্দর থাকে। আর্থিক ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া আংশিক শিশুর অনুভূতি সুখকর ও সুন্দর হয়। অধিকাংশের বাইরের মতো ভেতর সুন্দর হয় না। আংশিক শিশুগুলো সামাজিক মেলামেশায় সামানযস্যপূর্ণ হয় তবে অধিকাংশ শিশু সামাজিক মেলামেশায় ভারসাম্যহীন হয়ে যায়।

৫. নিজস্ব পরিবেশে বৈচিত্র্যময় বস্তুর পরিচয় জেনে সেসব ব্যবহার করা বা নেড়েচেড়ে দেখার সূযোগ পেলে শিশুরা সৃজনশীল হয়।

মনে কর রাবেকের বাবার একটি মটর বাইক, একটি ল্যাপটপ, দু’টি গাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি আছে। তিনি তা ব্যবহার করেন বা পরিচালনা করেন। রাবেক এখনও পরিচালনা করার যোগ্যতা রাখে না। শুধু বাবার পাশে বসে দেখে দেখে বড় হচ্ছে। এর মানে অন্য দশটি শিশুর থেকে পৃথক হয়ে রাবেক বড় হচ্ছে। কোন বাটন চাপলে ল্যাপটপ অন হয়, কীসে কীক করলে বাইক চালু হয়। এসব সে শুধু দেখেই যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে চাপে। একসময় সেও এসব বস্তু পরিচালনা করতে সক্ষম এবং একজন সৃজনশীল মানুষ হয়ে ওঠবে।

৬. যত্নের মাধ্যমে বড় হয়ে উঠা শিশুরা সমাজ সম্পর্কে ইতিবাচক ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব লালন করতে শেখে।

যে জিনিসের যতবেশি যতন হবে এই জিনিস ততবেশি উন্নত দীর্ঘমেয়াদি হবে। জংগ ধরলে লুহা শেষ। ঘষামাজা করলে সাফ হয় তবে মূলে ফেরে না। কিন্তু প্রথম দিক থেকে যত্ন নিলে ভালো থাকে এবং মেয়াদুত্তীর্ণ হয়। ঠিক তেমনি একটি শিশু। তার খাবার, গোসল, শিক্ষা ও অষুধ ইত্যাদি বিষয়ে মাতা-পিতা যত যত্নবান হবেন সেই শিশু বড় হয়ে পরিবার এবং সমাজের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার সহায়ক হবে। আর অযত্নে বড় হওয়া শিশুরা সমাজ বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনেকাংশে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করবে না। কারণ সে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হয়েছে।

৭. পরিবারের বাইরে প্রতিষ্ঠানে লালিত পালিত হওয়া শিশুরা নিষ্ক্রিয় ও বদমেজাজী হয়।

পরিবারের বাইরের প্রতিষ্ঠানে বলতে বিশেষ করে কওমি মাদরাসা, এতিমখানা এবং প্রাইভেট কিন্ডারগার্টেন-এ লালিতপালিত শিশুদের কথাই বলছি। এদের অধিকাংশের বয়স দশ এগারো-ই থাকে। কোনো কোনো বাঁচ্ছা সাত আটেরও থাকে। এরা মাত্রিস্নেহ ও পিত্রিস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হয়। এরা নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। সমাজ বিচ্ছিন হয়ে বড় হওয়ার কারণে একসময় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নিরাপত্তার অভাববোধ করে। সব’চে বড় যে ক্ষতি হয় তা হলো এদের মেজাজ নষ্ট হয়ে যায়। এই বদমেজাজি থেকে বেরিয়ে আসা তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়। আমার এই কথাগুলো অনেকে মেনে নিতে পারবেন না। কিন্তু আমি একযুগেরর বেশি শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে এগুলো বলছি। আপনার শিশুকে বিভিন্ন প্রহিষ্ঠানের বোর্ডিংএ দেন আমার সমস্যা নেই তবে কমপক্ষে বয়স পনের ষোল করে দেন। তখন সে শিশুর উপরোল্লেখিত বিষয় পেয়ে বাইরে গেলে ক্ষতির দিকটা কমে গেল।

৮. বেশি বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সূযোগ শিশুর ধর্মীয় আগ্রহকে জাগ্রত রাখে।

প্রতিটি শিশু জন্মগ্রহণ করে দ্বীনের ওপর। মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদ, নাসারা বানায়। আপনার শিশুকে ইচ্ছানুযায়ী আপনি গড়তে পারবেন। শুধুমাত্র আপনার সদিচ্ছার দরকার। আপনি মসজিদে যাচ্ছেন তাকে কোলে নিয়ে চলেন। আপনি সদকা করবেন তাকে দিয়ে দেন। ধর্মীয় মাহফিলে যাচ্ছে তাকে সঙ্গে নিন। তাকে সালাম করুন সেও সালাম শিখবে। লজ্জাবোধ করলে নিজে ঠকবেন। তাকে বহন করার সামান্য কষ্ট আজ মেনে নিলে তার ভবিষ্যত সুন্দর হবে। এর ভালো ফল আপনিও ভোগ করবেন। আর আপনার শিশুকে আপনি এড়িয়ে চললে সে অনেক কিছু শেখা থেকে বঞ্চিত হবে। এর কুফল আপনাকেও ভোগ করতে হবে।

৯. পরিবারে অবহেলিত ও অধিক তিরস্কৃত শিশুরা বড় হলে পরিবার ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি বিদ্রোহী হয়ে পড়ে।

আমরা অনেক অভিভাবক খুঁজে পাইনে স্বীয় ছেলে কেন পরিবারের প্রতি বিদ্রোপমনোভাবাপন্ন। কেন নিজের কোনো এক মেয়ে অন্যান্য মেয়েগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রমী। কারও কোনো তোয়াক্কা না করে চলে। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। অপকর্মে লিপ্ত হয়। আমার এই সামান্য বয়সের উপলব্ধি এবং দু’একজনের সঙ্গে কথা বলে যা জানতে পেরেছি তা হচ্ছে পরিবারের বড়দের অবহেলা এবং তিরস্কার। এই ছেলে মেয়েগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজনের অবহেলার ও তিস্কারের সম্মুখিন হয়।
কিছু ছেলে বাবার অবহেলা এবং তিস্কারের কারণে পরিবার ও সামাজিক ব্যবস্থার বিদ্রোহী হয়। আর কিছু মেয়ে বাবার অবহেলা ও মায়ের তিস্কারের কারণে পরিবার ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি বিদ্রোহী হয়ে পড়ে। পিতা-মাতাদের উচিত সব সন্তানকে সাধ্যানুযায়ী একচোখে দেখা।

১০. মাতা-পিতার তুচ্ছ বিষয়ে মিথ্যা আশ্রয় শিশুকে মিথ্যাবাদীতে পরিণত করে।

শিশুদের সামনে যতটা সম্ভব মিথ্যা এড়িয়ে চলুন। তারা কিন্তু অভিভাবকদের থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। আমরা জানি না যে তুচ্ছ জিনিসের কারণে কতবড় অপরাধি হচ্ছি। কথা বলার সময় মিথ্যা বলছি এ কথাটিও অনেকের বোধের বাইরে চলে গেছে। কিন্তু সবার ঠোঁটস্থ আছে “মিথ্যা বলা মহা-পাপ।” কীভাবে মাতা-পিতা শিশুকে মিথ্যাবাদীতে পরিণত করে তার একটা উদাহরণ দেই। আয়শার বয়স সাত। এবয়সের শিশুদের সারণত মায়েদের পেছনে পেছনে ঘুরে সময় কাটে। আয়শার বাবা ফোনে স্ত্রীর কাছে জানতে চাচ্ছেন ঘরে খরচাদি কী আছে আর কী নেই। দেখে বলি বলে ফোন কেটে দিলেন। আয়শা তখন জিজ্ঞেস করে মা কে ফোন করেছেন? তার মা উত্তর দেন তোর বাবা। আয়শা আরও নানা প্রশ্ন করে। কোনো উত্তর না দিয়ে খরচ রাখার জায়গায় গেলেন। আয়শা পেছনে পেছনে গেছে। রাফিকা ফোন ব্যাক করলেন। একনাগাড়ে বলতে লাগলেন পেঁয়াজ নেই, মরিচগুঁড়া নেই, হলদে ফাকি শেষ, ধনিয়া দু’একদিন যাবে ইত্যাদি। অতঃপর ফোন কেটে দিলেন। আয়শা তখন জিজ্ঞেস করে মা সব খরচ তো আছে এরপরও বলেন নেই, কেন মা? রাফিকা উত্তর দেয় ‘এইভাবে বলতে হয়। তা না হলে পরিবার চলে না। আয়শা আবার জিজ্ঞেস করে মা আমারও এভাবে বলতে হবে? মা মাথা নেড়ে উত্তর দেয় হ্যাঁ। এই ক’টি কথা আপনি খেয়াল করে দেখুন কী সরলভাবে শিশুকে মিথ্যা শেখানো হচ্ছে। রাফিকা আরও হাজারদিন সত্য বলুন কিংবা মিথ্যা বলুন আয়শা আর জিজ্ঞেস করবে না। কারণ তার মাথায় দেওয়া হয়েগেছে এইভাবে বলতে হয়।

তাই পারিবারিকভাবে মিথ্যা এড়িয়ে চলুন।মিথ্যা বলা কতটা খারাপ কিংবা আপনাদের বাড়ির সকল সদস্যরা এই মিথ্যা বলাকে কতটা ঘৃণা করেন— সে সম্পর্কে স্পষ্ট স্বীয় শিশুকে ধারণা দিন।স্কুল থেকে ফিরলে বা কোনও বন্ধুর সঙ্গে মিশলে, লক্ষ রাখুন তার চারপাশের বন্ধুরা কেমন। তাদের মধ্যে কারও মিথ্যা বলার প্রবণতা থাকলে তা যেন আপনার শিশুকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে যত্নবান হোন। কোনো কারণে আপনার শিশু কি নিজের উপর আস্থা হারাচ্ছে বা অবহেলিত হচ্ছে কোথাও, সে দিকে নজর রাখুন। এ সব কারণ ঘটলেও শিশুরা মিথ্যার আশ্রয় নেয়।

আপনার শিশুকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হলে আপনাকেই এগিয়ে আসতে হবে।