যে কোন মহামারিতেই মানবগোষ্ঠীর ওপর সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপ মানুষকেই বহন করতে হয়। মহামারি চলাকালে মানব জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটে! নতুন কিছু সৃষ্টি হয়, কিছু বিলীন হয়ে যায়! এই সব নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে, বেঁচে ওঠে! এবং অসুখ-বিসুখ পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যায় না, মাঝেমধ্যেই ফিরে আসে; তবে কোভিড-১৯ ফিরে আসেনি, এসেছে তার দ্বিতীয় ঢেউ! প্রথমে চীন থেকে ‘কোভিড-১৯’ শুরু হয়েছে। এরপর ছড়িয়ে পড়েছে অতিমারির বেশ ধারণ করে। ‘কোভিড-১৯’ এর শুরু থেকেই বিশ্ব জুড়ে অসন্তোষ শুরু হয়েছে ; ক্রমশ বাড়ছে। প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায় হলেও মানুষ ঠিক এর প্রতিকার বের করে। যুগে যুগে এটাই ঘটেছে; কমেছে-বেড়েছে-থেমেছে-ফিরে এসেছে; সব অসুখেরই আবিষ্কার হয়েছে ভ্যাকসিন। ভ্যাকসিন প্রয়োগে স্বস্তি এসেছে মানব-জীবনে। করোনাভাইরাসেরও টিকা আবিষ্কার হয়েছে বিভিন্ন দেশে টিকা প্রদান শুরু হয়েছে। টিকা নিয়ে আশাবাদী এখন বিশ্ব। তবুও গবেষকগণ আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ করোনাভাইরাস আক্রমণে অনেক মানুষ সুস্থ হচ্ছেন আবার অনেকে দীর্ঘদিন ভুগছেন, কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা গবেষণার তো শেষ নেই; মানবমনের চিরন্তন জিজ্ঞাসা কেন এমন হয়? এ ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি! কেউ সুস্থ হচ্ছেন, কেউ ভুগছেন বা কেউ মারা যাচ্ছেন! ‘কেন এমন হচ্ছে’ এই চিন্তা থেকেই যুক্তরাজ্যে একটি হাসপাতালের ‘আইসিইউ’তে থাকা রোগীদের ওপর গবেষণা করে বের করেছেন মানবশরীরের বিশেষ কিছু জিনের পার্থক্যের কারণেই এমনটা হয়। বাংলাদেশে এথম করোনা শনাক্ত হয় ৮ মার্চ, ২০২০। বাংলাদেশে ৮ মার্চ থেকে ২৮ ডিসেম্বর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫,১০,০৮০, মোট সুস্থের সংখ্যা ৪,৫৩,৩১৮ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৭,৪৭৯ (প্র.আলো. তারিখ: ২৯.১২.২০২০) । বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নতুন রূপে এসেছে করোনা! কোভিড-১৯ এর বর্তমান রূপ খুব ভয়ংকর। ৭০ শতাংশ শক্তি বেশি ধরে এই ছোট্ট মারাত্মক জীবানু। এই শক্তিশালী রূপে ভাইরাসটি দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, ভারত, হংকংসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ছড়ানোর খবর পাওয়া গিয়েছে। নতুন রূপের করোনার সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি। বাংলাদেশেও এই ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে। বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক দল গবেষক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এই তথ্য জানিয়েছেন।

‘কোভিড-১৯’ এর কারণে পারিবারিক-সামাজিক অসন্তোষ বেড়েছে ; ক্রমাগত বাড়ছে! করোনার কারণে সামাজিক-পারিবারিক-অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। যে পরিবারের সদস্য করোনাতে আক্রান্ত হয়েছে সেই পরিবার অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম না হলে সুস্থ ব্যক্তির অর্থের চিন্তায় পাগল হওয়ার দশা হবেই। কারণ হাসপাতালের আইসিইউ-তে খরচ চালানোর মতো সক্ষমতা অনেকেরই নেই! আবার মা হাসপাতালে থাকলে বাবা অসহিষ্ণু, বাবা আক্রান্ত হলে মায়ের চিন্তিত মুখ; এর মাঝে চিড়ে-চ্যাপটা হয়ে থাকে সন্তান। এমনিতে দেশে করোনা পরিস্থিতে পারিবারিক সহাবস্থান ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে পরছে! পারিবারিক সমঝোতার দূর্বলতার কারণে পরিবারিক অনেক বিষয়ে মতবিরোধ বাড়ছে! এই দমবন্ধ হওয়া পরিবেশে যখন পারিবারিক কলহ বাড়তে থাকে তখন অত্যাচারের সীমাও ছাড়িয়ে যায় তখন সংসার ভেঙে দেওয়াটাই শ্রেয় মনে হতে পারে! একে অপরকে সহ্য হয় না যখন তখন সংসার ছেড়ে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না! পারিবারিক কলহ আগেও ছিল, এখন বেড়েছে; কলহের কারণে বিচ্ছেদ! পূর্বে যেমন ‘তালাক’ কথাটি উচ্চারণ করলেই বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যেত এখন আর তা হয় না। সেই কারণে সিটি কর্পোরেশনে আবেদন পত্র জমা দিতে হয়। ‘কোভিড-১৯’ এর কারণে চাকরি হারিয়েছে অনেকে, বিদেশে যারা চাকরি করতেন তাঁরা দেশে এসে আর যেতে পারেননি ফলে তাঁদের অনেকেই বেকার হয়েছেন! শুধু চাকরি হারানো নয়, করোনার কারণে মানুষের মনে ভীতির জন্ম হয়েছে! করোনাভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ার পূর্বে যেমন মানুষ চলাফেরা করতে পারতো বর্তমান সময়ে তেমন বাসা থেকে বের হতে পারছে না মানুষ, পরিবার থেকে বের হয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারছে না! এই ভীতি থেকেই “আপনি বাঁচলে বাপের নাম” ধরণের একলা থাকার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে! অর্থনৈতিক, সামাজিকও পারিবারিকভাবে নানান বিধিনিষেধের মধ্যে যেতে হচ্ছে বলেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে মানুষ। অল্পেই মেজাজ হারাচ্ছেন অনেকে! দাম্পত্য কলহ চিরকালের কিন্তু করোনার কারণে এই কলহ বিচ্ছেদে রূপ নিয়েছে ফলে দাম্পত্য-ধারা ভেঙে পড়ছে! এবং দাম্পত্য-ধারা ভেঙে পড়ার কারণে অসহায় হয়ে পড়ছে শিশুরা! শিশুদের কিন্তু বাবা-মা উভয়কেই প্রয়োজন। তাছাড়া বাবা-মা আলাদা হয়ে গেলে শিশুটি যদি মায়ের সঙ্গে থাকে তবে নানা-মামা বাড়ি থাকতে হবে, বাবার সঙ্গে থাকলে বাবার কোন আত্মীয়স্বজনের কাছে থাকতে হবে। এই রকম ভাঙা-সংসারে শিশুটি হয় বেশি বেশি আদর-আশকারা পেয়ে বড়ো হয় কিংবা অনাদর-অবহেলা পেয়ে বড়ো হয়; আদর-আশকারা বা অনাদর-অবহেলা দুটোই শিশুর পক্ষে ক্ষতিকর।

এমনিতেই করোনার কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ। অনলাইনে ক্লাস; শিশু কিশোরদেরও ক্লাস করার কারণে মোবাইল ব্যবহারের প্রয়োজন হয় এবং অনলাইনে ক্লাসের জন্য প্রয়োজন ইন্টারনেট! ছোটো-বড়ো সকলেরই মোবাইলে এখন ইন্টারনেট প্রয়োজন! না হলে ক্লাস করা যায় না! কথা হলো শিশুদের হাতে মোবাইল, বাবা-মা অফিসে; এই শিশুদের মোবাইলে ক্লাস করতে করতে অন্য বিষয়ে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বিস্তর! মোবাইলে ‘চাইল্ডলক’ এর ব্যবস্থা আছে কিন্তু তা কতক্ষণ? এর মাঝে যদি পারিবারিক কলহ চলতে থাকে তাহলে ওরা যায় কোথায়? সন্তান উভয়ের; বিচ্ছেদের কারণে দুইজন দুইদিকে চলে গেলে মানসিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় শিশুরা। দেশে ‘কিশোর গ্যাং’-এর উপস্থিতি আছে! কিন্তু কেন? শিশু-কিশোররাই তো দেশের ভবিষ্যৎ। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার থেকেই আসে; কিন্তু চাকরিজীবী বাবা-মা যদি সারাদিন পরে বাড়ি ফিরে ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়েন ঐ শিশুদের কী উপায়? নিজের সন্তানের কথা ভেবে নারী-পুরুষ উভয়কেই সহনশীল হতে হবে। কিন্তু তা হচ্ছে কি? হচ্ছে না! দিনদিন বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। কারণ একটাই সহনশীলতার অভাব। বিয়ের পর ভেবে নিতে হবে পরিবার উভয়ের। যদিও ‘পুরুষ বিয়ে করে আর নারী বিয়ে বসে’ আর এই কারণে পুরুষ বিয়ে করে নারীকে ঘরে নিয়ে আসে এগুলো অতি পুরানো কথা। এই কথা পুরানো হলেও এই রীতি-প্রথার বাহুঘেরে এখনও সমাজ-পরিবার চলছে। উন্নতি যে হয়নি তা নয়, নারী আজ চাকরি করছে, ব্যবসা করছে, সংসার সামলাচ্ছে তবুও বিবাহবিচ্ছেদ! কিন্তু কেন? আজও কেন নারীর ওপর যৌতুকের জন্য অত্যাচার? কেন মেয়েদের স্কুল-কলেজে যাওয়ার পথে হেনস্থা হতে হয়। শুধু যে মেয়েদের হেনস্থা হতে হয় তা নয় ছেলেদেরও অনেক সময় হেনস্থার শিকার হতে হয়, হতে হয় হয়রানির; কিন্তু কেন এই হেনস্থা-হয়রানি হতে হয়? নারীর বোধশক্তি কবে হবে? পুরুষেরই বা কবে?

নারী শারীরিকভাবে দূর্বল তা ঠিক! তাঁরা এখন পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বাইরে বের হচ্ছে তাও ঠিক! নারী আজ পরিবার চালাচ্ছে, রাষ্ট্র চালাচ্ছে তবুও নারীর হেনস্থার শেষ নেই! এই করোনা সময়ে নারীকে ধর্ষণ এবং খুন করার মচ্ছব শুরু হয়েছে। আবার মামলা করা হলে জেলের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে! এখানে ভূক্তভোগীটির বলার কিছু নেই! তাঁর অভিভাবক(বাবা-মা-বা অন্যান্য সদস্য) যা বলে সেটাই করে। ভূক্তভোগীদের মধ্যে ৪৫% শিশু-কিশোরী (তাঁরা কোন কথা বলার পর্যায়ে থাকে না)। ১ জানুয়ারী,২০২০ থেকে ৩০ অক্টোবর,২০২০ রাজধানীর ৫০ থানার তথ্য অনুযায়ী ৫২৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৬টি ধর্ষণ, ৩৬টি দলবদ্ধ ধর্ষণ, ৩টি ধর্ষণের পর খুন! ভূক্তভোগীদের ২৭% শ্রমজীবী নারী, ২৪% শিক্ষার্থী, ৬৪ % বিয়ের আশ্বাস ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে এই অপকর্ম করা হয়েছে! এদের মধ্যে ৩ বছর থেকে ৪৫ বছর বয়সী শিশু ও নারী রয়েছে! আর আসামীদের বয়স ১০ বছর থেকে ৬০ বছর! ৪০ জনের বয়স জানা যায়নি (২৬ ডিসেম্বর,২০২০ এর প্র.আলো)। সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ- রেখে আইন পাশ হয়েছে তবুও খবরের কাগজ খুললেই এই অপকর্মের খবর দেখতে পাওয়া যায়। এই অপকর্ম কখন কমবে যখন মানুষ মানবিক হবে, মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটবে, মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হবে। এই অপকর্ম তখনই থামতে পারে যখন এই অপরাধের লজ্জা-কলঙ্ক শুধু নারীকে নয় পুরুষকেও বহন করতে হবে তখনই থামতে পারে। এই দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয় বা শুধু পরিবার-সমাজের নয়; এই দায়িত্ব সবার।

নারী এখন পুরুষের গলগ্রহ নয় বরং পুরুষের পথসঙ্গী! নারী কাঠের পুতুল নয়! নারীর চিন্তা-চেতনার অবশ্য অনেকটা উন্নতি হয়েছে তবুও কোথায় যেন নারী আটকে থাকে, কিছু বলতে বললে “কাঠের পুতুলের” মতো নিরব ভূমিকা পালন করে কেউ, কেউ বা শেখানো বুলি বলে! তা করলে তো হবে না! নারীকে “কাঠের পুতুলে” প্রাণ সঞ্চার করে নিতে হবে। অন্য কেউ করলে হবে না, নিজের প্রাণ নিজেকেই সঞ্চার করতে হবে। কিন্তু তাই বলে বিচ্ছেদ কাম্য নয়! পরিবারে সহনশীলতা শুধু নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, পুরুষের ক্ষেত্রেও! এই সংসার উভয়ের! সংসার হলো ‘সমস্যার’ মহাসমুদ্র যা অন্তহীন পারাবারের মতো। এই পারাবারে যখন একই তরণীতে দুজনে থাকে তখন যে কোন ঘটনা বা যে কোন কা-ই ঘটুক না কেন তাতে বিশেষ কিছু যায় আসে না বা ক্ষয়-ক্ষতি কিছু হলে দুজনের মধ্যেই থাকে (পরিবারের অন্যান্য জনেরা যে আহত হন না তা নয়)! বিয়ের পর যতোদিন দুজনে থাকে ততোদিন ভালো কিন্তু দুজন থেকে যখন তিনজনে রূপান্তরিত হয় অর্থাৎ তাঁদের ঘরে সন্তান আসে তখন কিন্তু ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মারামারি, বিচ্ছেদে অনেক কিছু এসে-যায়; কারণ এর প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর! একজনকে এই পৃথিবীতে এনে রাস্তার মাঝে একলা ছেড়ে দেওয়া কিংবা এই সন্তানের দায়ভার কোন-একজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কী উভয়ের (বাবা-মা) কর্তব্যের মধ্যে পড়ে? সন্তানের জন্য সহনশীল হওয়া বাবা-মা উভয়ের কর্তব্য! সন্তান যদি অপরাধ করে তবে সেই অপরাধের লজ্জা বাবা-মা উভয়ের, সন্তানের অপরাধের লজ্জা পরিবারের সবার ওপর এসে পড়ে, মুখ লুকাতে হয় পরিবারের সকলকেই! আবার নিগৃহীত হয় যে, সেই শুধু কষ্টসাগরে ডুবে যায় না, তাঁর নিকটজন-স্বজনও কষ্টে ডুবে যায়! সংসারে দুঃখ-কষ্ট থাকে, মনোমালিন্য হয়, হতেই পারে তাই বলে বিচ্ছেদ কি কাম্য? বিচ্ছেদ কখনও কাম্য নয়, কাম্য হতে পারে না! স্বামী-স্ত্রী যখন বাবা-মা হয় তখন উভয়কেই সহনশীল হতে হবে পরিবারের জন্য; সন্তানের জন্য। স্কুলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত মা-বাবাই সন্তানের শিক্ষক; মা-বাবা তাঁদের আচার-আচরণে সন্তানের কাছে পূজনীয় হয়ে উঠতে না পারলে সন্তান কখনও সঠিক পথের দিশা পাবে না। সহনশীলতা মানুষের বড়ো ধর্ম। সহনশীলতাই পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রকে সুন্দর আগামী উপহার দিতে পারে।