কোরআন বিশ্ব মানবতার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ হেদায়াতের গ্রন্থ, আলোকবর্তিকা, আল কোরআন মানব জীবনের বিশেষত মুসলিম জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, চলার গাইড বা সাথী, মানব নামক মহাযন্ত্রের ক্যাটালগ, হৃদয়ের প্রশান্তি, দুনিয়ার শান্তি আর পরকালীন মুক্তির নির্দেশিকা। কোরআনই পৃথিবীকে শ্রেষ্ঠ মানব সভ্যতা উপহার দিয়েছে। কোরআনের সংস্পর্শে একটি ছোট কাপড়ের টুকরা বা একখন্ড কাঠ অনেক অনেক দামী হয়ে যায়। তেমনি কোরআনের পথে চলা মানুষগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল মানুষ, মানুষ ও মানবতা এমনকি সকল সৃষ্টির উপকারী মানুষ, মহান রবের প্রিয় মানুষ।

এই কোরআন পৃথিবীর সেরা ভাষা, আখেরাতের ভাষা, মহান রবের ভাষা, রাসুলে আরাবী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষা আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। আবরী মধ্য প্রাচ্য তথা আরবের ভাষা। আরব ভূখন্ড থেকে আমার অবস্থান হাজার হাজার মাইল দূরে। মহান রবের অশেষ মায়া আর দয়া তিনি এই ছোট্ট একটি ভূখন্ড আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের অল্প একটু জায়গায় পৃথিবীর সবচেয়ে গনবসতি পূর্ণ এলাকায় আমাদেরকে মুসলমান হিসাবে কবুল করেছেন। এই জন্য আমাদের পূর্ব পুরুষগনের খুব চেষ্টা ছিল, এমন কথা খুব একটা বলা যায় না। মহান আল্লাহ মায়ার চাদরে ঢেকে আমাদের তাঁর পথে নিয়েছেন।

আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা। আরবী ভাষা আমাদের জন্য বুঝা একটু কঠিন বৈ কি। আমরা যাতে আমাদের মায়ের ভাষায় কোরআন বুঝতে পারি এ জন্য অনেক আল্লাহর প্রিয় বান্দা পরিশ্রম করেছেন, করে যাচ্ছেন। রংপুরের আমির উদ্দিন বসুনিয়া রাহঃ গিরিশ চন্দ্র সেনের প্রায় ৭২ বছর আগে আল কোরআনের প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন। গিরিশ চন্দ্র সেনের জন্মেরও ১ বছর আগে পবিত্র কোরআনুল কারীমের সর্ব প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলায় অনুবাদ করেন মৌলভী নইমুদ্দিন। কিন্তু কী নির্মম পরিহাস আমরা বেশির ভাগ জনতা জানি যে গিরিশ চন্দ্র সেন কোরআনের প্রথম বাংলায় অনুবাদকারী।

আমরা কোরআন থেকে দূরে থাকার কারণে আমাদের ইতিহাস. ঐতিহ্য. অবদান সবকিছু সম্পর্কেই বেখবর। এই বেখবর জাতিতে শীড় দারা উচুঁ করে দাঁড়াতে কেবলমাত্র এই কোরআনেরই প্রয়োজন। যার সংস্পর্শে চরম বর্বর আরব জাতি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিল। অশান্তির জায়গায় শান্তি, জুলুমের জায়গায় ইনসাফ আর ন্যায় দখল করে নিয়েছিল। খলিফা, রাজা, বাদশাহগন খবরদারী করার পরিবর্তে জনগনের খাদেম হয়েছিল। সেই কোরআন আজো আমাদের মাঝে বিদ্যমান। কিন্তু সাহাবাদের মত জযবা নেই। তাদের মত দায়ীও অনুপস্থিত। মানুষের মধ্যে কোরআনকে বুঝা এবং সামগ্রিক জীবনে বাস্তবায়নের প্রেরণা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই যুক্তরাজ্য প্রবাসী শায়খ হাফেজ মাওলানা শফিকুর রহমান আল মাদানী কর্তৃক আল কোরআন অনুবাদের এই প্রয়াস।

শায়খ শফিকুর রহমান ১ মার্চ ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার আলীমপুর (কুমার সাহিল) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম। তিনি ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে ১১ বছর বয়সে সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। তিনি বাংলাদেশে মাস্টার্স স্তরের শিক্ষা (মাদ্রাসা শিক্ষা, ১৯৭৯ খ্রি.) সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে সৌদি আরবের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদিনা থেকে উচ্চতর ইসলামিক শিক্ষার জন্য স্কলারশিপ লাভ করেন। ডিসেম্বর ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি মদিনা মনোয়ারা গমন করেন এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ মদিনার ফ্যাকাল্টি অফ কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ (১৯৮৪, ১৪০৪ হিজরি) থেকে কুরআনিক সাইন্সেস (উলুম আল কুরআন) বিষয়ে আরেকটি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর তাঁকে যুক্তরাজ্যস্থ সৌদি এনজিও দারুল ইফতায় একজন দাঈ ও শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

তিনি যুক্তরাজ্যের একজন যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক (পিজিসিই, ১৯৯০ খ্রি.)। আশির দশকের শেষ থেকে নব্বই দশকের প্রথম কয়েক বছর তিনি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন মুসলিম স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে তিনি পূর্বেকার ওয়েস্ট লন্ডন ইনস্টিটিউট অব হায়ার এডুকেশন, বর্তমানে ব্রকনেল ইউনিভার্সিটি থেকে সাফল্যের সাথে পোস্ট গ্রাজুয়েট সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন (পিজিসিই) সম্পন্ন করে ইউকে কোয়ালিফায়েড টিচার স্টেটাস (কিউ টি এস) অর্জন করেন। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি দারুল ইফতা থেকে ইস্তফা দিয়ে এবং শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে ইউকে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)-এ একজন চ্যাপলেইন (ধর্মীয় উপদেষ্টা/পরামর্শক) হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ডিপ্লোমা ইন ম্যানেজমেন্ট সম্পন্ন করে একজন ম্যানেজার হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। শায়খ শফিকুর রহমান ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবে ইসলামিক দাওয়া বিষয়ক কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। যুক্তরাজ্যে আসার পর থেকে দাওয়াতুল ইসলাম ইউকে অ্যান্ড আয়ার-এর সাথে তাঁর দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক রয়েছে। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে তিনি দাওয়াতুল ইসলাম লন্ডন মেট্রোপলিটন সিটি-এর সম্পাদক হিসেবে এবং ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে দাওয়াতুল ইসলাম ইউকে অ্যান্ড আয়ার-এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯-২০০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি দাওয়াতুল ইসলাম ইউকে অ্যান্ড আয়ার-এর আমির হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ইসলামিক শরিয়াহ কাউন্সিলের একজন সদস্য। কোরআনে হাফিজ শায়েখ শফিকুর রহমান ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অদম্য মেধাবী। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অনলাইনে ভার্চুয়্যাল আলোচনায় কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সারগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই আলোচনায় উপকৃত হচ্ছেন দেশ-বিদেশের হাজারো দর্শক।

শায়েখ শফিকুর রহমান আল মাদানী অত্যন্ত সহজভাবে বাংলা ভাষায় কোরআনের অনুবাদ করেছেন। শব্দের কাঠিন্যতা পরিহার করে সহজ, প্রাঞ্জল এবং বোধগম্য শব্দের গাঁথুনি দিয়ে তরজমা সম্পন্ন করেছেন। মূল অর্থের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতগুলোর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। তাঁর লিখিত কোরআনুল কারিমের তরজমা পড়ে সাধারণ পাঠকও কোরআনের সারনির্যাস অনুধাবন করতে পারবেন। কোরআনের শাব্দিক নয়, অর্থের তরজমা করা হয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে বড় বড় বাক্য ব্যবহার পরিহার করা হয়েছে। কোরআনের শিক্ষাকে পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছানোর জন্য ছোট ছোট বাক্যে তরজমা করা হয়েছে। প্রতিটি সূরার শুরুতে একটি ভ‚মিকায় সূরা সম্পর্কে জানার মতো সাধারণ তথ্যাদি, যেমন- নামকরণ, ঐতিহাসিক পটভ‚মি, বিষয় সংক্ষেপ ইত্যাদির উল্লেখ করা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট সূরার আলোচনার বিষয়টি বুঝতে সহায়ক। এছাড়া ভূমিকাতে কোরআন সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অত্যন্ত সহজভাবে সাবলীল ভাষায় আলোচনা করেছেন। তাজবীদ সংক্রান্ত বিষয়ও রেখেছেন এই তরজমায়। যেকোনো ব্যক্তি এই তরজমা অধ্যয়ন করলে কোরআনের ইলম অর্জন করতে পারবেন এবং এর মাধ্যমে কোরআনের ইলম অর্জন করার পাশাপাশি সামগ্রিক জীবনে বাস্তবায়নের প্রেরণা সৃষ্টি হবে।

উন্নতমানের কাগজ, বাধাই এবং আকর্ষণীয় কাভারে কোরআনের তরজমা এই দ্বিতীয় সংস্করণটি “সিলেট মুসলিম সেন্টার” এর পক্ষে প্রকাশ করেছে সিলেটের স্বনামধন্য, সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘পান্ডুলিপি প্রকাশন’। তরজমা গ্রন্থের হাদিয়া রাখা হয়েছে ৭৫০ টাকা। আল্লাহ তরজমাকারকে হায়াতে তায়্যিবাহ দান করুন এবং উম্মাহর জন্য তাঁর ইলমের পরিধিকে আরো বাড়িয়ে দিন। তাঁর এই শ্রমকে আল্লাহ তায়া’লা কবুল করুন। দুনিয়া ও আখেরাতে উত্তম জাযা দান করুন। আমাদেরকে কোরআনের রঙে রঙ্গিন হওয়ার তাওফিক দিন। আ-মি-ন।