দুই ঈদের মধ্যে শিশু বয়সে কোরবানির ঈদটাই আমাদের কাছে বেশি প্রিয় ছিল। রোজার ঈদের কোন বিশেষত্ব ছিল না, নতুন জামাকাপড় পড়ে আত্মীয়দের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া, বড়দের সালাম করে সেলামি পাওয়া এবং রাতে টিভিতে হুমায়ূন আহমেদের নাটক, ইত্যাদি এবং আনন্দমেলা দেখা।

কিন্তু কোরবানির ঈদের মজায় ভিন্ন মাত্রা যোগ হতো বাসায় গবাদি পশুর আগমনে। শহুরে সমাজে কেউ গবাদি পশু পালেন না। গরু ছাগল দেখতে হলে আমাদের গ্রামে যেতে হতো। তাই ঈদের আগের দুদিন পুরোদস্তুর রাখাল হয়ে যাওয়ার সুযোগ আসায় আমরা আনন্দে হারিয়ে যেতাম! কার গরু কারটার চেয়ে বড় এবং শক্তিশালী, তাই নিয়ে চলতো বন্ধুদের মধ্যে প্রতিযোগীতা।

“আমাদের গরুর শিং দেখেছিস? একদম ‘তরোয়ালের’ মত। তোদের গরুকে একটা গুতা দিলেই মাথায় ফুটা হয়ে যাবে।”

“আরে, তোদের গরুতো সাদা। আর সাদা মানে গাধা! আমাদের গরু কালো, কালো মানে ভাল।”
“হাহাহা। তোদের গরু রোগা! মাংস নাই! খালি হাড্ডি!”
“আর তোদের গরু বাট্টু! আমাদের গরু তোদেরটার উপর দিয়ে হেঁটে চলে যাবে!”

আমাদের গরু কেনা হতো ঈদের একদিন কি দুদিন আগে। ঘাস, ভুষি, পানি খাইয়ে গরুর সেবা যত্নের কোন কমতি রাখতাম না। এই সেবা করতে করতেই গরুটিকে ভালবেসে ফেলতাম।

ঈদের দিন সকালে দেখতাম প্রতিটা গরুর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অবলা প্রাণীগুলো কিভাবে বুঝতো যে সেটাই তাদের জীবনের শেষ দিন? হুজুর বলতেন, ওরা নাকি আগের রাতে স্বপ্নে টের পায়। কে জানে! গরুকে প্রশ্ন করলেতো আর জবাব পাওয়া যাবেনা।

গরুর কান্না দেখে আমাদের মন খারাপ হয়ে যেত। আব্বুকে গিয়ে অনুরোধ করতাম, এই গরু বাদ দিয়ে অন্য গরু কিনতে, ওটাকে কোরবানী করতে। আমরা এটাকে পালবো।

আব্বু আমাদের বোঝাতেন, কোরবানির ঈদে সবচেয়ে প্রিয় প্রাণীটিকেই কোরবানী করতে হয়।

সেই অর্থে আমাদের কোরবানী সফল বলতেই হয়। একদিনেই আমাদের অতি প্রিয় হয়ে উঠা পশুটিকে কোরবানির সময়ে আমাদের বুক কেঁপে উঠতো। আব্বুকেতো আমরা কখনই কোরবানির সময়ে স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে দেখিনি। গলা কাঁটা পশুর ছটফটানির দৃশ্য তিনি নিতে পারতেন না। তিনি বাসায় বসে থাকতেন। জবাই শেষে মাংস কাটাকাটির সময়ে তিনি নিচে আসতেন।

আমরা দুই ভাই বাপের স্বভাব পাইনি। কোরবানির সময়ে আমরা নিজেরাতো উপস্থিত থাকতামই, এমনকি মাঝে মাঝে হুজুরের সাথে হাত মিলিয়ে আমরাই পশু জবাই করেছি। এটাই কোরবানির প্রকৃত নিয়ম। নিজের প্রিয় পশুটিকে নিজ হাতেই জবাই করে আল্লাহকে বলা, “আমার কাছে তোমার অপেক্ষা প্রিয় এই পৃথিবীতে আর কিছুই নেই।”

এবারে কোরবানী নিয়ে আমাদের একটা পারিবারিক গল্প বলা যাক।

আমার বড় আব্বা, মানে আমার বাবার দাদা ছিলেন জমিদার মানুষ। রায়তরা তাঁর গোয়ালের গরু নিয়ে তাঁরই জমি চাষ করে ফসল ফলাতেন। তাঁর বাড়ির গোয়ালে জন্ম নেয়া একটা ষাঁড়ের স্বভাব ছিল খুবই আলসে। চাষীরা সেটাকে দিয়ে হালচাষ করাতে পারতো না, সে সুযোগ পেলেই মাঠে বসে জাবর কাটতো।

বড় আব্বা একসময়ে রাগ করে ষাঁড়টাকে বেঁচে দিয়েছিলেন। নতুন মালিক ষাঁড়টিকে নিয়ে চলে গেল।

পরেরদিন ফজর নামাজ পড়তে বড় আব্বা উঠে দেখেন বাড়ির উঠানে ষাঁড়টি দাঁড়িয়ে আছে। সে নতুন মালিকের গোয়াল থেকে দড়ি ছিঁড়ে দূরের পথ চিনে চলে এসেছে। তাঁকে দেখে সে ‘হাম্বা’ বলে একটা ডাক দিল। তার চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরছে। তিনি এসে ষাঁড়টিকে আদর করে দিলেন। সে গলা উঁচু করে আদর নিল।

সকাল হতেই নতুন মালিক এসে হাজির। বড় আব্বা তাকে কেনা টাকার চেয়েও খানিকটা বেশি দিয়ে ফিরিয়ে দিলেন। ষাঁড়টির ভালবাসার মূল্য তিনি রাখলেন। এরপর থেকে তিনি নিজ হাতে তাকে ঘাস খাওয়াতেন। ঘাস খাওয়ানোর ফাঁকে ফাঁকে তার মাথায়, গলায় হাত বুলিয়ে দিতেন। ষাঁড়টিকে তখন দেখে মনে হতো এতে সে খুব আনন্দ পাচ্ছে।

এরপর বছর ঘুরে ঘুরে কোরবানির ঈদ এলো। আল্লাহ যেখানে নির্দেষ দিয়েছেন সবচেয়ে পছন্দের পশুটিকে কোরবান করতে, সেখানে বড় আব্বা তাঁর আদরের ষাঁড়টিকেই বেছে নিলেন। ‘আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ সর্বশক্তিমান) বলে ছুড়ি চালালেন ষাঁড়টির গলায়। ষাঁড়টি ছটফট করতে করতে মারা গেল।

সেই একটি মাত্র কোরবানির ঈদেই বড় আব্বা কোন মাংস খাননি। বরং বলা ভাল, খেতে পারেননি।