ভয়ানক দুর্যোগে এলোমেলো হয়ে যাওয়া একটা সময় এখন। কে কখন কোথায় থাকবে বা কেন থাকবে, তা আর স্বাভাবিক হিসাবের উপর নির্ভর করে না। পরিস্থিতি এখন মানুষকে তাড়া করছে দুরন্ত ট্যাংকের মতো।
বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহের চরপাড়া এলাকা। এখানকার ইসলামিয়া জেনারেল হাসপাতালের পাশে রাস্তার দুইপাশে বেশকিছু টিনেশেড বাসা আছে। এরই একটি টিনশেড ঘরে কয়েকদিনের জন্য এসে উঠেছে ভবিষ্যত। এখানে তার গ্রামের পরিচিত দুইজন একটা রুম ভাড়া করে থাকে। এরা ময়মনসিংহে একটা কাঠের কারখানার ফোরম্যান। ভবিষ্যত গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগআলীতে ‘থ্রি স্টোন’ নামের একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করে। গত ২৫ তারিখ রাতে গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেলে সে টঙ্গী থেকে চলে এসেছে। এখানে এসে উঠেছে। অল্প কয়েকদিন ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকবে এটাই বোঝা যাচ্ছে এখন।
থ্রি স্টোন গার্মেন্টস এপ্রিলের ৪ তারিখ পর্যন্ত বন্ধ। ৫ তারিখ গার্মেন্টস খুলবে। তাই ভবিষ্যতকে আবার টঙ্গী চলে যেতে হবে ৪ তারিখ। তবে কোনো কারণে ছুটি বাড়ালে সে গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা চলে যাবে। তাই এই ১০ দিনের জন্য সে এখানে উঠেছে। কারণ নেত্রকোনা চলে গেলে সেখান থেকে টঙ্গী যাওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া এখন তো গাড়িও চলে না ঠিক মতো। নেত্রকোনা থেকে টঙ্গী গেলে খরচ বেশি হবে। পরিশ্রমও হবে বেশি। সময় লাগবে বেশি।
দেখতে দেখতে এপ্রিলের ৩ তারিখ চলে আসে। সন্ধ্যায় থ্রি স্টোন গার্মেন্টসের মালিক বা চেয়ারম্যান আরশাদ খান জিএম-প্রোডাকশনকে ফোন করে, কী খরব আরশাদ?
আরশাদ সাহেব বাড়িতে ছিলো বিশ্রামের মেজাজে। কখন ৩ তারিখ চলে এসেছে, সে বুঝতেই পারেনাই। তাই হঠাৎ মালিকের ফোন পেয়ে অপ্রস্তুত হয়ে ফোন ধরে বললো, খবর ভালো স্যার।
ভালো আছো?
ভালো আছি স্যার।
কাজকর্ম বাদ দিয়া বাড়িতে বইসা থাকতে তো ভালোই লাগে, না?
না মানে স্যার… সব তো বন্ধ এখন।
বন্ধ বইলা কিছু নাই। খুইলা দাও।
কী খুলবো স্যার?
গার্মেন্টস খুইলা দাও। কালকে থাইকা।
কিন্তু স্যার, ছুটি যদি বাড়ে আরও?
ছুটি বাড়বে মানে? কে বাড়াইবো ছুটি? আমি বলতাছি ছুটি শেষ। তাইলে ছুটি বাড়বো কেমনে?
আচ্ছা স্যার, ছুটি শেষ। ঠিক আছে স্যার।
শুনো আরশাদ। অর্ডার সময় মতো সাপ্লাই দিতে হবে। তাই গার্মেন্টস খুলতে হবে।
ওকে স্যার।
সবাইকে জানায়া দাও। ছুটি শেষ।
জ্বি স্যার।
জিএম-প্রোডাকশন তার তিনজন ম্যানেজারকে বলে, সব শ্রমিককে ফোন করে গার্মেন্টস খোলার কথা জানিয়ে দিতে।
থ্রি-স্টোন গার্মেন্টসে ১ হাজারের মতো শ্রমিক কাজ করে। আপাতত ৬০০ শ্রমিককে ফোন করার জন্য ১০ জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই ১০ জন ৬০ জন করে শ্রমিককে ফোন করে।
এপ্রিলের ৪ তারিখ সকাল ১১টায় ভবিষ্যতের কাছে ফোন আসে গার্মেন্টস থেকে। তাকে বলা হয়, আগামীকাল গার্মেন্টস খোলা হবে। তাই আজকে রাতের মধ্যেই তাকে টঙ্গী চলে আসতে হবে।
না আসলে বা দেরি করে আসলে চাকরি থাকবে না। এটাও তারা বলতে ভুল করে না।
ভবিষ্যত টঙ্গীতে একটা বাসায় থাকে। সেখানে মেস করে থাকে ওরা অনেকে। ভবিষ্যত চিন্তায় পড়ে যায়। আজকে রাতের মধ্যেই তাকে তার টঙ্গীর মেসবাসায় পৌঁছাতে হবে। কালকে সকাল ৮টায় ডিউটিতে না গেলে চাকরি থাকবে না। সে পরিচিত কয়েকজনকে ফোন করে। তাদের কাছ থেকে শোনা যায়, গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতে পারে। তাই এখনই রওয়ানা না দিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলে তারা।
তারপর ভবিষ্যত নিজের গার্মেন্টস ছাড়াও তার পরিচিত অন্যান্য গার্মেন্টসের কয়েকজন শ্রমিককে ফোন করে। এদের মধ্যে দুইজনকে পাওয়া যায়, যারা এখন ময়মনসিংহ শহরে আছে। তারা জানায়, তাদের পরিচিত আরও অনেকেও ময়মনসিংহ শহরে আছে। তবে তারা সবাই আজ সারাদিন অপেক্ষা করবে। সন্ধ্যার দিকে গার্মেন্টসের নম্বরে দুয়েকজন ফোনে যোগাযোগ করবে। তখন যদি খবর পাওয়া যায় যে, সত্যি সত্যিই গার্মেন্টস খুলবে তাহলে তারা বাকিদেরকে জানিয়ে দিবে।
সন্ধ্যার সময় তাদের একজন গার্মেন্টসে ফোন করে জানতে পারে, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়নাই। থ্রি স্টোন গার্মেন্টসসহ আরও তিনটি গার্মেন্টস আগামীকালকে সত্যি সত্যিই খুলবে বলে তারা জানতে পারে। এরকম আরও অনেক গার্মেন্টসও পরেরদিন খোলার ব্যাপারে তাদের শ্রমিকদের নিশ্চিত করেছে বলে জানা যায়। এইসব গার্মেন্টসের শ্রমিকদের আগামীকাল সকাল ৮টায় কাজে যোগ দিতে হবে।
তাতে একটা অস্থিরতা কাজ করে শ্রমিকদের মধ্যে। সারাদেশ থেকে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ। আন্তঃজেলা বাস যোগাযোগ বন্ধ। রেল যোগাযোগসহ অন্যান্য সব ধরনের পাবলিক ট্রান্সপোর্টও বন্ধ। কিন্তু যানবাহন না থাকলেও যেতে হবে কর্মস্থলে। চাকরি হারানোর কথা যখন একজন মানুষের মনে আসে তখন তার প্রাণটা এক ভয়াবহ হাহাকারে ভরে ওঠে। তাই বিকল্প যানবাহনের খোঁজ করে তারা হন্যে হয়ে।
ঢাকার কাছাকাছি বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকার পথে আসার মতো যানবাহন দরকার তাদের।
ময়মনসিংহ শহরে অবস্থানরত ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শ্রমিকরা যেকোনো উপায়ে তাদের কর্মস্থলে পৌঁছার উপায় খুঁজতে থাকে। ভবিষ্যত কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করে এ ব্যাপারে। এর মধ্যে বাবুল ভাই বলে, পিক-আপে করে ঢাকা বা গাজীপুর যাওয়া যাবে। একটা পিক-আপের সাথে কথা বলে বাবুল ভাই। সে ৭ জনের একটা লিস্ট করে পিক-আপটা ভাড়া করেছে।
সবকিছু ঠিকঠাক করে লিস্টের সেই ৭ জনের সবাইকে চরপাড়া মেডিক্যালের সামনে আসতে বলে বাবুল ভাই।
সন্ধ্যা ৬টায় সবাই চরপাড়া মেডিক্যালের সামনে আসতে শুরু করে। এরমধ্যে বিভিন্ন জনের সাথে যোগাযোগ করে আরও দুইজন প্যাসেঞ্জার পাওয়া যায়। পিক-আপ ড্রাইভারও দুইজন প্যাসেঞ্জার জোগাড় করে ফেলে।
সাড়ে ৭টায় পিক-আপ ছাড়ে চরপাড়া থেকে। ৮ ফুট বডির পিক-আপের চারপাশে ১১ জন দাঁড়ায় ওরা। দুই-তিনজন দাঁড়িয়ে থাকতে ভয় পেয়ে বসে পড়ে। জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে তারা ঢাকার দিকে যাচ্ছে। তাদের কেউ টঙ্গী যাবে, কেউ বোর্ড বাজার যাবে, আবার কয়েকজন আশুলিয়া যাবে।
ময়মনসিংহ শহরের বাইরের মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ড পার হতে হতে আরও অনেকগুলো পিক-আপ দেখা যায়। সেগুলোতেও দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ। দুয়েকজন মেয়ে শ্রমিকও দেখা যাচ্ছে। এই পিক-আপ কোনো প্যাসেঞ্জার ভেহিক্যাল না। এটা দিয়ে মানুষ পরিবহণের কোনো অনুমতি নেই। তবু প্রচুর শ্রমিক ও গার্মেন্টসকর্মী ঢাকায় যাচ্ছে এই পিক-আপগুলোতে করে।
কাঁধের ব্যাগটা পিক-আপের তলায় নামিয়ে রেখে ভবিষ্যত সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বাবুল ভাইকে বললো, এভাবে দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া টঙ্গী পর্যন্ত যাওন যাইবো ভাই?
বাবুল ভাই বললো, যাওন যাইবো না কেন? যাওন যাইবো। আমি তো আসার দিন পিক-আপে কইরাই আইলাম।
ওও। আমি তো বাসে আইছিলাম।
তুমি কতো তারিখ আইছিলা?
২৫ তারিখ রাইতে।
ও আইচ্ছা, এর জন্যেই বাসে আইতে পারছিলা। আমি তো ২৬ তারিখ আইছি। বাসে জায়গা পাইনাই।
তারপর পিক-আপে আইছেন?
হ্যাঁ, পিক-আপেই তো আইছি। এছাড়া আর কি কোনো উপায় ছিলো?
অসুবিধা হয়নাই পিক-আপে আইতে?
অসুবিধার কিছু নাই। পিক-আপে কইরা অনেকে ঢাকা টঙ্গী পার হইয়া আশুলিয়া যাইবো।
আশুলিয়া তো আরও দূর।
তাইলে চিন্তা করো। হেরা যাইবো কেমনে?
হুম, বুঝলাম।
অনেকে তো নারায়ণগঞ্জেও যাইবো।
নারায়ণগঞ্জে যাইবো পিক-আপে?
হ্যাঁ যাইবো তো। রূপগঞ্জ, কাঁচপুর, সোনারগাঁওয়ের অনেক গার্মেন্টসও খুলতেছে কালকে। ময়মনসিং থাইকা অনেকেই ওইদিকে যাইবো।
অনেক সময় লাগবো তো যাইতে।
চিন্তা কইরো না ভাই। রাস্তায় যানবাহন কম। প্রাইভেট গাড়ি বন্ধ, বাস বন্ধ। ননস্টপ যাইবোগা।
হ্যাঁ, বুঝছি।
দাঁড়ায়া থাকতে কষ্ট হইতেছে?
কষ্ট হইছিলো। এহন একটু কষ্ট কম লাগতাছে।
অভ্যাস হইয়া যাইবো। আল্লা আল্লা করো।
রাত ১১টা বাজে। টঙ্গীর চেরাগ আলী বাসস্ট্যান্ডে পিক-আপ থেকে নামে ভবিষ্যত। তার বাসায় বা মেসে যায়। মেসবাসার ১টা রুমে ওরা তিনজন থাকে। মেসে পৌঁছে ঘরের তালা খুলে সে। বিছানার তোষক উল্টে রাখা ছিলো। সেটা সোজা করে বিছিয়ে দেয়। তারপর মনে হয় খাওয়া দাওয়া করা দরকার।
এখানে রান্না হয় মেস সিস্টেমে। কাজের বুয়া আছে রান্না করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু এখন তো কাজের বুয়া নাই। অবশ্য কাজের বুয়া মাঝে মাঝে না থাকলে তারা নিজেরা রান্না করে খায়। তবু এই রাতের বেলায় তো একা একা রান্না করে খাওয়া সম্ভব না। তাছাড়া রান্না করতে হলে তো বাজারও করতে হবে। সেটা এখন তো আর হবে না। তাই বাইরের কোনো খাবারের হোটেল থেকে খেয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যত খাওয়ার জন্য বাইরে বের হয়।
এখানে তো খাবারের হোটেলগুলোও এখন বন্ধ। খাবারের হোটেল কখনো বন্ধ থাকে না। ঈদের দুয়েকদিন ছাড়া সারা বছরই এগুলো খোলা থাকে। কিন্তু এখন তো একটা ভয়াবহ সময় শুরু হইছে। যুদ্ধের মতো। মনে হচ্ছে, কোনো অবরোধ বা অসহযোগ পরিস্থিতি দেশজুড়ে। তাই খাবারের কোনো হোটেল খোলা পায় না সে। শেষ পর্যন্ত দোকান থেকে পাউরুটি আর কলা কিনে নিয়ে মেসে ফিরে যায়। ঘরে বসে একা একা কলা দিয়ে পাউরুটি খেয়ে টিউবয়েলের পানি খায় ভবিষ্যত। এছাড়া কী আর করবে?
রাত হয় অনেক। কেমন যেন থমথমে পরিবেশ চারপাশে। জনশূন্য এলাকা। তাদের এই মেসের চারটা রুম। চার রুমে ওরা ১৫ জন থাকে। কিন্তু আর কেউ এখনও আসেনাই। তাই প্রচ- খালি খালি লাগে। তবু ঘুমাতে তো হবে। কারফিউয়ের মতো।
খালি বাসার খালি ঘরে শুয়ে পড়ে সে। কিন্তু ঘুম আসতে চায় না সহজে। অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের চিন্তায় ঘুম আসে না তার। এই অল্প কয়টা দিনের জন্য গার্মেন্টস কেনই বা বন্ধ হলো আর কেনই বা আবার এতো তাড়াতাড়ি খুলে দিলো? ছুটিটা বাড়াতে পারতো। আর কোনো কিছুই তো এখনো খুলেনি। তাইলে গার্মেন্টস এতো তাড়াতাড়ি কেন খুললো? যাই হোক, বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে সে।
সকাল সাড়ে ৭টা। আধঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠেছে ভবিষ্যৎ। ৮টার মধ্যে গার্মেন্টসে ঢোকার লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তাই তাড়াতাড়ি গার্মেন্টসে যাওয়ার জন্য বের হয়ে পড়ে সে। খাবার কিনতে দোকানে যেতে যেতে চোখে পড়ে, একটা খাবারের হোটেল খোলা। সেটা খোলা দেখে তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়ে সেটায়। টেবিলে বসে যায়। কী খাবে কিছু জিজ্ঞেস না করে পরোটা আর ডাল-ভাজি দেয় খাবার দেওয়ার ছেলেটা। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে গার্মেন্টসের দিকে হাঁটা শুরু করে ভবিষ্যত।
সকাল ৮টা বাজে। থ্রি স্টোন গার্মেন্টসের গেইটের লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে সে। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৫০০ জনের বেশি শ্রমিক। লাইনে তো এতো লোক দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। লাইনে দাঁড়ানোর পর চেক করে তাদের দ্রুত ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার কথা। কিন্তু আজকে তো কেউ ভেতরে ঢুকছে বলে দেখা যাচ্ছে না। গার্মেন্টসের গেইট বন্ধ। গেইট না খুলে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে শ্রমিকদের। ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না কাউকে ভেতরে। হয়তো এখনো প্রোডাকশন ফ্লোর রেডি হয়নাই, এরকমটাই ভাবছে সবাই।
রোদের মধ্যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত শ্রমিক। এর মধ্যে তাদেরকে বলা হলো, গার্মেন্টস খোলার ব্যাপারে বিজিএমইএ-র সিদ্ধান্ত এখনো আসেনাই। তাই শ্রমিকদের গার্মেন্টসে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। বিজিএমইএ-র সিদ্ধান্ত আসার পর জানানো হবে, গার্মেন্টস খোলা হবে কি না।
ভয়াবহ একটা তাচ্ছিল্যের সামনে পড়ে এই শ্রমিকরা। বিজিএমইএ-র সিদ্ধান্ত আসার পরই যদি গার্মেন্টস খোলা হবে, তাহলে গতকাল তাদেরকে আসতে বলা হলো কেন? আজকে এলেই হতো। বিজিএমইএ-র সিদ্ধান্ত আসার পর দুপুরে ফোন করলেও তো আজ রাতের মধ্যে তারা চলে আসতে পারতো। একদিন আগে কেন আসতে বললো? অবশ্য একদিন আগে আসাটাও সমস্যা নয়, কিন্তু এখন যদি বিজিএমইএ-র সিদ্ধান্ত গার্মেন্টস না খোলার হয়, তাহলে তারা কী করবে? আবার ৫০০ টাকা খরচ করে ফিরে যাবে?
সাড়ে ৮টার সময় ভবিষ্যত ফোন করে বাবুল ভাইকে, হ্যালো ভাই?
জ্বি, ভবিষ্যত বলো।
কী খবর ভাই?
কাজ করি। ডিউটি শুরু হইছে ৮টা থাইকা।
আমাদেরকে গার্মেন্টসে ঢুকতে দিতাছে না। দাঁড় করায়া রাখছে গেইটের বাইরে।
কেন? দেরি কইরা গেছো নাহি?
আরে না না। গার্মেন্টস খুলবো কি না সেই সিদ্ধান্তই হয়নাই।
ওমা। এইতা কী কয়? সিদ্ধান্ত না হইলে আসতে কইলো কেন?
সেইটাই তো বুঝতাছি না ভাই।
কী আর করবা? দাঁড়ায়া থাকো।
হাফিজের ফোন আসে সকাল ৯টায়, ভবিষ্যত ভাই?
হ্যাঁ, কও হাফিজ।
খুব ঝামেলা ভবিষ্যত ভাই?
কী ঝামেলা?
১ ঘন্টা ধইরা দাঁড়ায়া আছি গেইটের সামনে। গার্মেন্টসে ঢুকতে দিতাছে না।
ও বুঝছি। আমাদেরও তো একই অবস্থা।
কতোক্ষণ দাঁড়ায়া থাকতে অইবো কিছু জানো?
না হাফিজ। কিছু জানি না। এহনো কিছু জানা যায়নাই।
সকাল সাড়ে ৯টায় হ্যান্ডমাইক নিয়ে দুইজন ম্যানেজার থ্রি স্টোন গার্মেন্টসের গেইটের সামনে আসে। তারা হ্যান্ডমাইকে বলে, আমরা এখনো বিজিএমইএ থেকে গার্মেন্টস খোলার অনুমতি পাইনি। আপনারা আজকের মতো বাসায় ফিরে যান। যার যার স্থানীয় বাসস্থানে অবস্থান করুন। আগামীকাল বিজিএমইএ-র নির্দেশনা পেলে যদি গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে তা আপনাদেরকে মোবাইলে মেসেজ দিয়ে জানানো হবে। আর কিছু না জানালে আপাতত আর আপনাদের কাজে আসতে হবে না।
কী আর করবে এই শ্রমিকরা? একটা তামাশা যখন শুরু হয়, তা থেকে মানুষ সহজে বের হতে পারে না। তামাশার মধ্যেই তাকে হাহাকারের নৃত্য করতে হয়।
অন্য সবার মতোই ভবিষ্যত বাসায় ফিরে যায়। সকালে তো নাস্তা করেছিলো গলির মাথার একটা দোকানে। কিন্তু এখন আবার সেই দোকানটাও বন্ধ। হয়তো পুলিশ এসে বন্ধ করে দিয়েছে। এখন তো আবার মানুষের প্রয়োজন মেটানোর অনুমতি নাই। মানুষের প্রয়োজনের কথা চিন্তা না করেই সবকিছু হুটহাট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
খাবার হোটেল বন্ধ। তাহলে খাবে কী? পাউরুটি আর কলা খেয়ে কি আর পরিশ্রমের কাজ করা যায়? আর রান্না না করেই বা কয়দিন চলা যাবে? তাই সে মেসে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে। রান্নার হাড়ি-পাতিল বের করে তাক থেকে। ভিম লিকুইড ছিলো রান্নাঘরে। ভিম লিকুইড দিয়ে সেগুলো ধুয়ে মেজে রান্নার আয়োজন করতে থাকে। এই ঘরটাতে ওরা ৩ জন থাকে। বাকি ২ জন এখনো আসেনাই। একজন থ্রি স্টোন গার্মেন্টসেই চাকরি করে। নাম সৌরভ। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ। সে গার্মেন্টস অন্তত ১ মাস পরে খুলবে, এরকম একটা অলিখিত তথ্য পেয়ে সিরাজগঞ্জের বাড়িতে চলে গেছিলো। তাই এখনো আসে নাই। একদিনের মধ্যে সিরাজগঞ্জ থেকে আসা সম্ভব না। টাঙ্গাইল হইলেও পারতো।
হাড়ি-পাতিল আর থালাবাসন ধোয়া শেষ করে সিলিং ফ্যানটা ছেড়ে বিছানার ওপর বসে ভবিষ্যত। তারপর হাফিজের সাথে কথা বলে মোবাইল ফোনে।
দুপুরবেলা অন্য ঘরগুলোতে আরও দুইজনকে আসতে দেখা যায়। তাদেরকেও গার্মেন্টস থেকে ফোন করে গতরাতের মধ্যেই চলে আসতে বলেছিলো। কিন্তু তারা পিক-আপ পায়নাই গতকাল। তাই আজ ভোরবেলা রওয়ানা দিয়ে সোজা গার্মেন্টসে গেছিলো সকালে। দুপুর পর্যন্ত কাজও হয়েছে গার্মেন্টসে। কিন্তু তারপর আবার ছুটি দিয়ে দিয়েছে। বলেছে আপাতত আসতে হবে না। বিজিএমইএ-র নির্দেশনা পেলে তা তাদেরকেও মোবাইলে মেসেজ দিয়ে জানানো হবে। তখন আবার আসতে হবে।

সবুজরঙের একটা ক্যাকটাস আছে আমার বাসার ড্রয়িং রুমে। প্লাস্টিকের ক্যাকটাস। এর দুইটা ডাল বা মাথা। ডাল দুইটাও সবুজ। উজ্জ্বল সবুজ ক্যাকটাসটা। ম্যারোন কালারের প্লাস্টিকের টবে রাখা ক্যাকটাসটা। আমার ২ বছরের ছেলে এটার নাম দিয়েছে ভূত। আমার ৪ বছরের মেয়েও সেটাই মেনে নিয়েছে। সেও এই দুইমাথাওয়ালা সবুজ ক্যাকটাসটাকে ভূত বলে। প্লাস্টিকের ক্যাকটাসের প্রাণ নেই। ভূতের মতো। মানুষের প্রাণ চলে গেলেই তো মানুষ ভূত হয়। তাই ভূতও প্রাণহীন।
বহুযুগ আগে গ্রামে গ্রামে যখন ডায়েরিয়া বা বসন্তের মহামারী হতো তখন গণহারে মানুষ মারা যেতো। জনশূন্য হয়ে যেতো অনেক পাড়া মহল্লা বা পুরো গ্রাম। তখন সেইসব পাড়া মহল্লা বা গ্রামে ভূতের বসবাস হতো। মানুষ সেইসব গ্রামকে ভূতের গ্রাম বলতো। সে গ্রামের উপর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তায় কেউ রাতের বেলা যেতো না।
এই করোনা মহামারীর যুগে এই উজ্জ্বল সবুজ রঙের দুই মাথাওয়ালা ক্যাকটাসের ভূতটা দেখে আমার সেই ভূতের গল্প মনে পড়লো।

এপ্রিলের ৬ তারিখ। কলকারখানা অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং কাজে আমি টঙ্গী গেলাম। কারখানা খুলবে কি না ঠিক নেই। কিন্তু জরুরি কিছু রেট্রোফিটিং কাজ করতে হবে তাদের। বিল্ডিং ক্রটিপূর্ণ, তাই মেরামত করতে হবে।
আমি আমার জিপ গাড়ি নিয়ে থ্রি স্টোন গার্মেন্টসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু আগের মতো আজকে ফ্যাক্টরির গেইটে দাঁড়ালে গেইট খুললো না। আগে যেদিন এসেছি সেদিন গাড়ি দেখে আর গেইট খুলতে বলা লাগেনাই। ফোন করলাম কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার জাকির ভাইকে, জাকির ভাই, ফ্যাক্টরি বন্ধ নাকি?
জাকির ভাই বললো, হ্যাঁ, ফ্যাক্টরি তো বন্ধ।
কিন্তু আমার তো আসার কথা ছিলো আজকে।
আপনে আসছেন?
হুম আসছি। আমি গেইটে। গেইট বন্ধ। বললো, ফ্যাক্টরি নাকি বন্ধ?
ফ্যাক্টরি বন্ধ হলেও সমস্যা নাই। জিএম স্যার আছে। আমি ইঞ্জিনিয়াররে পাঠাইতাছি। আপনে ওয়েট করেন।
আচ্ছা ঠিক আছে, পাঠান।
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার গাড়িও দাঁড়িয়ে আছে। ৫ মিনিট পর সাইট ইঞ্জিনিয়ার এসে বললো, সরি স্যার, ফ্যাক্টরির গেইট খোলা যাবে না আজকে। গাড়ি বাইরে থাকুক। অসুবিধা হবে না। গার্ডরা খেয়াল রাখবে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি ভেতরে যাবো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনে চলেন। জাকির স্যারের রুমে যাইতে বলছে।
আচ্ছা চলেন।
জাকির ভাইয়ের রুমে গেলাম।
জাকির ভাই জিজ্ঞেস করলো, কী অবস্থা শরীফ ভাই?
আমি বললাম, এই তো ভালো। আপনাদের কী অবস্থা?
অবস্থা তো শুনছেন মনে হয়।
কিছু তো শুনছি। গতরাত থেকে শুনতেছি।
ফ্যাক্টরি খোলা দরকার। কিন্তু মিডিয়াতে তুমুল প্রতিবাদ। শ্রমিক নেতাদের ফোন আসতেছে অনেক। তাই এখন পর্যন্ত বন্ধ রাখছি।
হুম, সমস্যা তো।
ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকলেও রেট্রোফিটিংয়ের কাজ দেরি করা যাবে না। ডিআইএফই থেকে চিঠি আসছে বিল্ডিংয়ের রেট্রোফিটিংয়ের জন্য। এরপর ১ সপ্তাহ হয়ে গেছে। তারা দ্রুত কাজ করতে বলেছে।
তাইলে কাজ শুরু করে দেন।
হ্যাঁ, আজকেই আপনের সাথে সব ফাইনাল করে ফেলবো। চলেন জিএম স্যারের রুমে।
হুম চলেন।
জিএম ফাইন্যান্সের সাথে মিটিংয়ে বসলাম। সাথে কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার জাকির ভাই আর সাইট ইঞ্জিনিয়ার জাহিদ।
জিএম ফাইন্যান্স ফাহমিদ সাহেব বললেন, খুব সমস্যার মধ্যে আছি ভাই। এতোগুলা অর্ডার ঘাড়ের ওপরে। ফ্যাক্টরি না খুইলাও পারতাছি না। আবার খুলতেও পারতাছি না। সারা পৃথিবীতে করোনা ভাইরাস যেভাবে ছড়াইছে তাতে বিজিএমইএও চাপের মধ্যে আছে।
এখন কী করবেন? কিছু বোঝা যাচ্ছে?
দেখি কী হয়। আগে আপনার সাথে ডিলটা শেষ করি। এরপরে আবার মিটিং আছে ডাইরেক্টর আর চেয়ারম্যান স্যারের সাথে।
জাকির ভাই বললেন, শরীফ ভাই, কোটেশনটা দেন।
আমি আমার কোম্পানির খামে ভরা কালার প্রিন্ট করা কোটেশনটা খাম থেকে বের করে জিএম সাহেবকে দিলাম।
তিনি দেখে বললেন, কোটেশন যা দিছেন তা মোটামুটি ঠিক আছে। এখন ১ লাখ টাকা কমালেই হয়।
আমি অবাক হলাম। এটা রেট্রোফিটিং কাজের কনসালট্যান্সির কোটেশন। ৪৫ লাখ টাকা রেট্রোফিটিংয়ে খরচ হবে। কাজ তারাই করবে। আমরা শুধু ডিজাইন আর সুপারভিশন করবো। এখন কোটেশন যদি ঠিক থাকে তাহলে ১ লাখ টাকা কমাতে হবে কেন? কিন্তু সেটা তো সরাসরি বলা যাবে না। তাই বললাম, ৪ লাখ টাকার মধ্যে ১ লাখ টাকা কমাইলে কেমনে হবে ভাই? আপনাদের ফাউন্ডেশনের রেট্রোফিটিং খরচ তো অর্ধেক কমিয়ে দিলাম। সেখানে প্রায় ৪০ লাখ টাকা বাঁচবে আপনাদের।
সেইটা ঠিক আছে। এরজন্যই তো আপনার উপর এতো ভরসা আমাদের। তবুও ৫০ হাজার টাকা এ্যাট লিস্ট কমাইতে হবে। তা না হইলে ডাইরেক্টর স্যার কইবো, কী মিটিং করলা? টাকা তো কমলো না।
আচ্ছা ঠিক আছে। তাইলে সাড়ে ৩ লাখ করেন।
ওকে ঠিক আছে।
ফাহমিদ সাহেব জাকির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আজকেই উনারে ওয়ার্ক অর্ডার মেইল কইরা দাও। আর ১ লাখ টাকার একটা চেক রেডি থাকার কথা। এখনই সেইটা দিয়া দাও।
জাকির ভাই বললো, আচ্ছা স্যার, আমি এ্যাকাউন্টসে কথা বলে চেক দিয়া দিতেছি।
মিটিং শেষ হলো। তারপর জাকির ভাই রুম থেকে বের হয়ে গেলে মাহমিদ সাহেব বললেন, আর কী বলবো ভাই। অবস্থা এহনো বুঝতাছি না।
আমি বললাম, বিজিএমইএর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন শুনলাম।
সেটা একটা কথার কথা। আসলে আমাদেরকেই বাইয়ারদের সাথে কথা বলতে বলছে বিজিএমইএ। বাইয়াররা যদি শিপমেন্টের ডেট পিছায় তাইলে ফ্যাক্টরি ১৪ এপ্রিল খুলবো। আর যদি পেছাতে রাজি না হয় তাইলে কালকেই খুইলা দিতে হইবো।
হুম, তাই তো।
গার্মেন্টস না খুললে রেট্রোফিটিং কাজের ফাউন্ডেশনের পার্টটা এই বন্ধের মধ্যেই কইরা ফেলবো ভাবতেছি।
সেইটা কইরা ফেলতে পারেন। পরশুদিন থেকে কাজ শুরু করে দেওয়া যাবে।
আপনে তাইলে রেট্রোফিটিং ড্রয়িংয়ের সাথে কাজের সিডিউলটাও দিয়ে দেন।
হুম দিয়া দিবো। কালকেই আমি সব মেইল কইরা দিবো।
কতোদিন লাগতে পারে ফাউন্ডেশন পার্ট রেট্রোফিটিং করে মাটি ভরাট করতে?
আমি আমার সামনের খোলা নোট বুকে কাজের ধাপগুলো লিখতে লাগলাম আর সাথে সাথে মুখেও বলতে লাগলাম।
গার্মেন্টস বিল্ডিংয়ের যে ফাউন্ডেশনগুলো রেট্রোফিটিং করবে বা ফুটিং থিকনেস বাড়ানোর কাজ করবে সেগুলো দুই শিফটের লেবার দিয়ে রাত-দিন মিলিয়ে করলেও ১৫ দিন লেগে যাবে। তারপর ফাউন্ডেশনের উপরে শর্ট কলাম রেট্রোফিটিংয়ের কাজ করতে হবে। কলামের রড তো ফুটিং থেকেই ওঠানো থাকবে। তখন কলামের সেন্টারিং করতে ৩ দিন ও ঢালাই করতে আরও ১ দিন লাগবে। তার পরে ৪৮ ঘন্টা অপেক্ষা করে সেন্টারিং খুলে মাটি ভরাট করতে লাগবে আর দুয়েকদিন।
ওকে ঠিক আছে। তাহলে তো ১৫ দিনের মধ্যেই কাজ করা যাবে। দুয়েকদিন বেশি লাগলে তখন তা ম্যানেজ করা যাবে।
হ্যাঁ, সেভাবেই প্রোগ্রাম করে ফেলেন। আমরা তো রেডিই আছি।

আমি কাজ শেষ করে চেক নিয়ে গার্মেন্টস থেকে বের হয়ে গাড়ির কাছে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার গাড়িতে পত্রিকার স্টিকার দেখে চার-পাঁচজন শ্রমিক আমাকে ঘিরে ধরলো। একপাশে গাছের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ালাম তাদের সাথে। শুনতে লাগলাম তাদের ভোগান্তির কথা।
ভবিষ্যত নামের ছেলেটার সাথে কথা হলো। তার কাছে শুনলাম, গত কয়েকদিনে তার বিপুল ভোগান্তির কাহিনী। সেই গল্পই বলছিলাম এতোক্ষণ।
তাদেরকে আমি বললাম, গার্মেন্টস খোলার সম্ভবনা আছে এখনো। শিপমেন্টের ডেট না পিছালে কালকে খুলে দিতে পারে। আর শিপমেন্টের ডেট পিছালে ২০ দিন পরে খুলবে।
২০ দিনটা অবশ্য গার্মেন্টস থেকে পাওয়া কোনো ইনফরমেশন না। আমি নিজেই সেটা বললাম ফাউন্ডেশন পর্যন্ত রেট্রোফিটিং কাজের সময় হিসাব করে।
পরে খবর নেওয়ার জন্য ভবিষ্যতসহ কয়েকজন গার্মেন্টস কর্মীর মোবাইল নম্বর নিলাম আমি।
সেদিন সন্ধ্যায় বিজিএমইএ-র নোটিশ এলো। নোটিশে বলা হলো, গার্মেন্টস আপাতত বন্ধ। তবে কোনো ফ্যাক্টরির যদি অর্ডার সরবরাহের তাড়া থাকে, তাহলে তারা স্বাস্থ্যবিধি ও করোনা ভাইরাসের সবরকম সতর্কতা মেনে গার্মেন্টসের প্রোডাকশন চালু রাখতে পারবে।
পরের দিন ৭ তারিখ ভবিষ্যতের ফোন এলো আমার মোবাইলে। সে অত্যন্ত অসহায় কণ্ঠে বললো, স্যার, ফ্যাক্টরি চালু হয়নাই।
আমি বললাম, আমি কাল-পরশু আসতে পারি। তখন কথা বলবো। সব শুনবো।
ঠিক আছে স্যার। আপনার সাথে অবশ্যই দেখা করবো।
ওকে, দেখা কইরো।
টাইমটা একটু জানাইয়া দিয়েন।
ফোন কইরো কালকে সকাল ৯টায়। তাইলে বলতে পারবো কখন আসবো।
ধন্যবাদ স্যার।

আমি রেট্রোফিটিং কাজের ড্রয়িং ৭ তারিখ রাতে মেইল করে দিয়েছিলাম। আজ এপ্রিলের ৮ তারিখ। সকালে জাকির ভাই ফোন করে বললো, ফ্যাক্টরিতে চলে আসতে। আমি ড্রয়িং প্রিন্ট করে আর ওয়ার্ক সিডিউল রেডি করে আবার থ্রি স্টোন গার্মেন্টসে আসলাম। এরা গার্মেন্টস খুলেনাই। তাদের তো এতো খরচ করে স্বাস্থ্যবিধি মানার সরঞ্জাম আনার দরকার নাই। বাইয়াররা রেট্রোফিটিং কাজের জন্য ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখার জন্য রাজি হয়েছে। তাই আরও ২১ দিনের মতো বন্ধ রেখে এর মধ্যে রেট্রোফিটিংয়ের সব কাজ করে ফেলাটাই ভালো হবে। তাতে রেট্রোফিটিংয়ের জন্য প্রোডাকশন বন্ধ থাকার ক্ষতি হবে না।
ভবিষ্যতকে বলে দিয়েছিলাম আমার আসার সময়টা। আজকের মিটিং শেষ করে গার্মেন্টস থেকে বের হলাম। বাইরে আমার গাড়ি দেখে ভবিষ্যতসহ দুই-তিনজন শ্রমিক অপেক্ষা করছিলো। তাদের সাথে কথা বললাম কিছুক্ষণ। আবার তাদেরকে পিক-আপে করে ফিরে যেতে হবে টাকা খরচ করে, কষ্ট করে। ভবিষ্যত আমাকে ধরলো, তার বাসায় যেতে হবে। কী দুরাবস্থার মধ্যে তারা পড়েছে তা দেখতে হবে। আমি বললাম, আজকে আমার তাড়া আছে।
কথা দিলাম, পরে একদিন যাবো, যদি সে ততোদিন এখানকার বাসায় থাকে।

রেট্রোফিটিংয়ের কাজ শুরু হলো ৮ তারিখ থেকে। ২২ তারিখ সব শর্ট কলাম ঢালাই হয়েও গেলো। প্রতিদিনের রেট্রোফিটিং কাজের পিকটোরিয়াল এভিডেন্স ডিআইএফই বা ডাইফ-এর এসেসরদের কাছে মেইল করে দেওয়া হয়েছে নিয়মিত।
একদিকে থ্রি স্টোন গার্মেন্টসে আমার রেট্রোফিটিং কাজ চলছে। আর অন্যদিকে চলছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কপাল ভাঙার ঘটনা।
আজ ২৪ এপ্রিল। সকালের দিকে শুনলাম, আশুলিয়ায় সিগমা ফ্যাশনে বেতন বকেয়া রেখে এক কারখানার ৮ শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে।
বিকালে ডাইফ থেকে পজিটিভ রিপ্লাই আসার পর কলামের সেন্টারিং খোলা হয়। রাতারাতি মাটি ভরাট করে মাটির ওপর স্টিলের সিট বিছিয়ে দেওয়া হয় চলাচলের জন্য। এখন প্রোডাকশন স্টার্ট করা যাবে। আর পূর্বের নোটিশ অনুযায়ী আগামীকাল গার্মেন্টস খুলবে।

রেট্রোফিটিং কাজ শেষ করে ২৫ তারিখ খোলা হলো থ্রি স্টোন গার্মেন্টস। সেদিনই প্রোডাকশনের কাজ শুরু হলো। তবে গ্রাউন্ড ফ্লোরের দুইটি ইউনিটের ২০০ শ্রমিক প্রথমদিন কাজ করতে পারলো না। তাদেরকে ২৮ তারিখ কাজে আসতে বলা হলো। ২৫ তারিখ রাত ৮টার পর মাটির ওপর বিছিয়ে রাখা প্লেইন সিট তুলে প্রোডাকশন ইউনিটগুলোর ভেতরের ৮টা কলামের সবগুলোর চারপাশের ফ্লোরে টাইলস করে দেওয়া হলো। টাইলসের মসলায় র‌্যাপিড হার্ডেনিং এ্যাডমিক্সচার দেওয়া হলো। তাতে ১৪ দিনের বদলে দুই-তিনদিনের মধ্যে টাইলসের মসলা শক্ত হয়ে গেলো।
২৮ তারিখ সকাল পর্যন্ত দুইদিনের বেশি সময় পার হলে টাইলস করা প্রোডাকশন ইউনিটগুলোতে শ্রমিকরা কাজ শুরু করলো। তারপর করিডোর এরিয়ার ১২টা কলামের ৪টা করে টাইলস করা হলো ৩-৪ দিন করে গ্যাপ দিয়ে। তারপর আবার রোজা ঈদের জন্য গার্মেন্টস বন্ধ দেওয়া হলো ৫ দিনের জন্য। এখন প্রোডাকশন বন্ধ। কিন্তু রেট্রোফিটিংয়ের কাজ চালু রাখা হলো।
ঈদের পর আমি আবার গেলাম গার্মেন্টসে। ভবিষ্যতের বাসায় যেতেই হলো সেদিন। সেখানে গিয়ে দেখলাম, অনেক কাহিনী।
দরিদ্র শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্টের কাহিনী অনেক বিশাল। এর শুরু অনেক আগে। এর কারণ অনেক গভীরে। একমাস বা দুইমাসের কাহিনী নয় এগুলো। বছরের পর বছর ধরে কয়েকযুগের দীঘল সেই আর্থসামাজিক অনটনের ইতিহাস। সেসব কাহিনী লিখতে গেলে আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে সারাদিন এইসব মানুষের মধ্যে পড়ে থাকতে হবে।
এখানে মেসের একটা ঘরে থাকে তামিম ও রাসেল। টঙ্গীতে একটা শোরুমে চাকরি করে তামিম। তার মার্চ মাসের বেতন দেয়নাই এখনো। বাসাভাড়া বাকি। বাড়ির মালিক তাকে ঘর ছেড়ে দিতে বলছে বারবার।
সে মালিককে বললো, লকডাউনের মধ্যে বাসাভাড়া চাওয়া ঠিক না। এখন অনেকের চাকরি নাই। যাদের চাকরি আছে, তাদের কবে বেতন দিবে তার ঠিক নাই।
কিন্তু বাড়ির মালিক বললো, এখন না হয় ভাড়া নিলাম না। কিন্তু লকডাউনের পরে কেমনে ভাড়া দিবা? দুইমাসের মধ্যে সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে? না কি সমস্যা আরও বাড়বে?

জুন মাস চলে এসেছে। সব গার্মেন্টস এখন খোলা। কোনোটা ১ মাস বন্ধ ছিলো আবার কোনোটা ২ মাস বন্ধ ছিলো। আবার দুয়েকটা গার্মেন্টস পিপিই বানানো উপলক্ষ্যে ১৫ এপ্রিল থেকেই খোলা হয়েছিলো। এপ্রিলের শেষের দিকে আরও বেশ কিছু গার্মেন্টস খোলা হয়। রোজা ঈদের পর মে মাসের শেষের দিকে প্রায় সব গার্মেন্টসই খুলে দেওয়া হয়েছে।
বিজিএমইএ ঘোষণা করে, সেসব গার্মেন্টস বন্ধ ছিলো, তাদের শ্রমিকদের ১ মাস বা ২ মাস বন্ধ থাকার জন্য ৬৫% বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ঘোষণা হলেও তা কবে যে বাস্তবায়ন হবে তা কে বলবে? এই ১ মাস বা ২ মাসের বেতন শ্রমিকরা পাবে কি না তা অনিশ্চিত।