জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে নীলিমা। যখনই মন খারাপ হয় তখনই জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় সে।বৃষ্টির সঙ্গে নীলিমার সখ্য বহুদিনের। বৃষ্টি শুরু হলেই নীলিমার চোখে মুখে এক আশ্চর্য অনুভূতি খেলা করে। নীলিমা দৌড়ে যায় বারান্দায়। অপলক তাকিয়ে থাকে বৃষ্টির ঝরে পড়ার দিকে। মনে হয় যেন বৃষ্টির সবকটা ফোঁটা নীলিমার মনের খবর জানে।

আজও বৃষ্টির পানে অপলক তাকিয়ে নীলিমা। মনটা উদাস।গতকালের ঘটনাটা তাকে তাড়িয়ে বেরুচ্ছে। কী নিষ্পাপ চোখ মুখ! নিষ্পাপ চাহনি! কোথায় যেন একটা মায়া লুকিয়ে যে মুখে। আবার কোথাও যেন একটা আর্তনাদ। দুমড়ে মুচড়ে পড়ছে হৃদয় সৈকত। বারবার কানে বাজছে –
একটা ফুল নেন আম্মা। একটা ফুল নেন। বাসস্টপে দাঁড়িয়ে ছিল নীলিমা। একটা ছোট মেয়ে কয়েকটি গোলাপ হাতে তার শাড়ির আঁচল ধরে টানছিল। পেছন ফিরে তাকিয়েই নীলিমার হৃদয়টা যেন কাঁচের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। কোনও কিছু না বলে স্রেফ তাকিয়ে রইল নিষ্পাপ মুখটির দিকে।
হঠাৎ জড়িয়ে ধরে মেয়েটিকে। ভেজা কন্ঠে নীলিমা বলতে শুরু করল– কী বললি, আবার বলতো সোনা।আর একবার বল মাঝে। আবার বল সোনা। আবার বল।
নিষ্পাপ মুখটি কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। অনবরত, বলতে লাগলো– আম্মা, একটা ফুল নেন আম্মা। আম্মা, একটা ফুল নেন, আম্মা। আম্মা, ও আম্মা।
ডুকরে কেঁদে উঠল নীলিমা। হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার বলতে শুরু করল– হ্যাঁ, মা নেবো তোর সব কটা ফুল নেবো।আবার আমাকে মা ডাক সোনা।আর একবার ডাক।
মেয়েটা কী বুঝলো কে জানে? সেও বলতে শুরু করল– আম্মা, ও আম্মা, আম্মা গো, আম্মা, ও আম্মা।
নীলিমা কিছু বলতে পারলো না আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মেয়েটিকে। ঠিক যেমন মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেয়। নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য এটি।
নীলিমা টাল সামলিয়ে মেয়েটিকে বলল–
আম্মা তোমার নাম কী?
মৌ।
ওলে বাবালে, আমার লক্ষী সোনা, মৌ সোনা।
আমার মৌমাছি।
আনমনে নীলিমা ছড়া কাটতে শুরু করল–
মৌমাছি মৌমাছি
কোথাও যাও নাচি নাচি?
দাঁড়াও না একবার ভাই
ওই ফুল ফোটে বনে
যাই মধু আহরণে
দাঁড়াবার সময় তো নাই।
ততক্ষণে আশেপাশে অনেক মানুষ জমে গেছে। নীলিমার এই কান্ড দেখে সবাই অবাক। একজন ভদ্রমহিলা এমন টোকাই একটা মেয়েকে এভাবে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর কথা বলছে দেখে সবাই জড়ো হয়েছে।
কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই নীলিমার। যে হৃদয় অনন্ত হাহাকার নিয়ে অপেক্ষায় থাকে মা ডাক শোনার তার এসবে ভ্রূক্ষেপ করলে চলে না। চোখের জলে মুছতে মুছতে হন হন করে ছুটে চললো নীলিমা।
নীলিমার মন বিষাদে ভরা। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে কখনও বৃষ্টি ছোঁয়ার চেষ্টা করছে আবার কখনও গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে। বিয়ের পরে প্রায়ই আলমাস আর নীলিমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খেতো, চাঁদ দেখতো, জোছনা স্নান করতো, খুনসুটি হতো। আস্তে আস্তে সব কেমন ফিকে হতে লাগলো। সবকিছু কেমন যেন অচেনা হতে শুরু করল। তারপরও সবকিছু ঠিক হলো আলমাসের কারণে। স্বামী হিসেবে দারুণ মানুষ সে। একদিন অফিস থেকে ফিরে নীলিমাকে মন খারাপ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাছে এসে বলল–
কি হয়েছে আমার বউটার?
নীলিমার মুখে কোনো কথা নেই।
কাছে এসে নীলিমার হাতে নিজের হাতটা রেখে আলমাস বলল–
কী হয়েছে? মন খারাপ কেন আমার বউটার?
কিছুই বলতে পারলো না নীলিমা। আলমাসকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদতে লাগলো।
আলমাস যা বোঝার বুঝলো। নিশ্চয়ই আবার কেউ নীলিমাকে তার মাতৃত্বের ব্যাপারে খোঁটা দিয়েছে বা কিছু বলেছে।
নীলিমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আলমাস সান্ত্বনা দিলো তাকে।
কে কী বলে বলুক সোনা, আমি তো আছি তোমার সঙ্গে। আজ হয়তো আমাদের সন্তান নেই তার মানেই যে আমাদের সন্তান কোনও দিন হবে না তা কিন্তু নয়। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখো। একদিন নিশ্চয়ই তুমি মা ডাক শুনতে পাবে। নীলিমা কিছুই বলল না।আলমাসের শার্টের কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আরো জোরে কাঁদতে লাগলো।
প্রায় দশ বছর হয়েছে আলমাস নীলিমার বিয়ে হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সন্তান নেই তাদের। এ ব্যাপারে আত্মীয় স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীর নানান কথা হজম করতে হয়েছে নীলিমার। আলমাসকে কম শুনতে হয়নি।
বাবা মা আলমাসকে অনেকবারই বিয়ের জন্য প্রেসার দিয়েছিল কিন্তু আলমাসের দৃঢ়তা আর নীলিমার প্রতি ভালোবাসা তাকে বিকলা চিন্তা থেকে দূরে রেখেছে। এভাবে ক্রমশ ভেঙে পড়তে লাগলো নীলিমা। আলমাস বুঝলো পরিবেশ পরিবর্তন করলে হয়তো নীলিমার মনটা ভালো হবে। আর না হলেও অন্তত এরকম খোঁচা দেওয়া কথা খুব একটা শুনতে হবে না।
বাসা পরিবর্তন করায় কিছুদিনের জন্য একটু শান্তিতে থাকা গেছে সত্যিই কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি। দিন রাত বাবা মা ফোন করে বিয়ের জন্য বলতো আলমাসকে।
একদিন গোপনে নীলিমা ডাক্তারের কাছে যায়। বিভিন্ন রকম পরীক্ষা করতে বলে ডাক্তার। পরীক্ষার ফলাফল নীলিমার পক্ষে অর্থাৎ নীলিমার কোন সমস্যা নেই।
কিন্তু এই খবরটা আলমাসকে জানায়নি নীলিমা। জানায়নি তার বাবার বাসাতেও। জানলে হয়তো তারাও নীলিমাকে অন্য কোথাও বিয়ের জন্য বলবে। স্রেফ ভালোবাসা। শুধু ভালোবাসাই দুটি মানুষকে শত সহস্র বাধা সত্ত্বেও একত্রে রেখেছে।

মাতৃত্বেই মায়ের পূর্ণতা। আর এর বিকল্প কিছু হতে পারে না। এভাবেই এমন না পাওয়ার বেদনা মনে পুষে পুষে সংসার জীবনের পঁচিশটা বছর পার করল নীলিমা-আলমাস।
কিন্তু নীলিমা স্বাভাবিক জীবন পার করলেও আলমাস প্যারালাইজড হয়ে শয্যাশায়ী। আলমাস এখন কথা বলতে পারে না।ইশারায় সব কথা বলে।নীলিমাও বুঝে– ভালোবাসে যে দুজন দুজনকে। সেজন্যই তারা পরস্পরের কথা বোঝে। এতক্ষণ বারান্দাতেই ছিল নীলিমা। হঠাৎ গোঙানির আওয়াজ কানে এলো তার। ছুটে গেল রুমের দিকে। আলমাস বিছানার পাশে রাখা ফিল্টার থেকে পানি নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিছুতেই পারছিল না। ফিল্টার থেকে পানি সংগ্রহের সামর্থ্য নেই আলমাসের।
কী হচ্ছে কী? একটু আগে এখানে ছিলাম তখন বলোনি কেন? যদি পড়ে যেতে তাহলে কী হতো? আমাকে কষ্ট দিতে ভালো লাগে খুব তাই না? কথা বলছো না কেন? পানির পিপাসা পেয়েছে আমাকেই বললেই হতো। কেন এমন করো তুমি। আমার আর ভালো লাগে না। মনে হয় সব ছেড়ে চলে যাই। আর কখনও ফিরবো না।কখনও না।

রাগে গজগজ করতে করতেই কথাগুলো বলছিল নীলিমা। কিন্তু এতো রাগের মাঝেও পানির পটটা হাতে নিয়ে আলমাসকে মুখে পানি তুলে দিলো নীলিমা। ঠিক যেমন মাঝে তার ছোট্ট সন্তানকে মুখে তুলে পানি খাইয়ে দেয়।
আলমাসের মুখে কোনো কথা নেই। চোখে কোনো অভিমান জমা নেই। সারাটা জুড়ে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা। আর এতেই বারবার পরাজিত নীলিমা। এতেই তার আমরণ বসবাস।
আলমাসকে শুইয়ে দিয়ে আবার বারান্দায় চলে এলো নীলিমা। পড়ন্ত বিকেলের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো- শুধু একবার মা বলে ডাক না সোনা। একবার। তোকে আমি চকলেট কিনে দিবো। তোকে গাড়ি চড়াবো।তোকে নিয়ে বেড়াতে যাবো। তোকে গোসল করাবো। খাওয়ার সময় তুই খেতে চাইবি না। তোকে আমি দৌড়ে ধরে আনবো। আদর করে খাওয়াবো। ঘুম পাড়াবো।তুই আমাকে চুমু দিবি। আমি জড়িয়ে ধরবো তোকে।

শুধু একবার বল সোনা। একবার মা বলে ডাক।একবার। বল। তুই খুব দুষ্টু। আমাকে আর দেখতে ইচ্ছে করে না। আগেতো প্রায় রাতে আমার কোলে শুয়ে ঘুমাতি। এখন আর মায়ের কোল ভালো লাগে না। কবে আসবি সোনা।আয় না। সোনা তাড়াতাড়ি আয়। একবার মাকে দেখে যা। একবার। শুধু একবার আয়।
তুই ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদিস কেন।ওলে বাবা লে, ওলে আমার সোনা। আমার সোনা। একবার মা বল না। একবার একবার। শুধু একবার। তোকে আর কখনো জিদ করব না।শুধু একবার মা বল। আর কখনো শুনতে চাইবো না। একবার বল। মা বল সোনা, বল না। বল।
বিকেলের রোদ তখন পাড়ি জমিয়েছে ঘরে। নীলিমার হাহাকার ক্রমশ বাড়ছে…