বকখালি নামটা শুনলে আমার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত রোমান্টিক আবেগ তৈরি হয়! বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এই ভার্জিন সৈকত নির্জনতা প্রিয় পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় ভালো লাগার জায়গা! বাড়ির পাশে সৈকত সুন্দরী দীঘা থাকলে ও সাগর এবং বকখালি সৈকত এর জন্য আমার মনের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতর মায়াময় ভালোবাসার টান! বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া থাকাকালীন বকখালির নির্জন সৈকতে ভ্রমণের প্রিয় স্মৃতি এখনো মনের মণিকোঠায় রয়ে গেছে! বকখালির সৈকতে দক্ষিণের বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর এবং পাড়ে ঘন ঝাউ গাছের সারি দেখতে দেখতে হঠাৎ করে নজরে পড়ে যাওয়া দক্ষিণারায়ের মন্দির দেখার স্মৃতি মনের মধ্যে স্থিরচিত্র হয়ে আছে!! প্রবাদ আছে সুন্দরবনের এই দ্বীপভূমির মানুষজন জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ নিয়ে বিপদজনক জীবন যাপন করেন! আমিও নদীপাড়ের মানুষ! বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম পাড়ের বাসিন্দা হওয়ার কারনে কিনা কে জানে পূর্বদিকের দ্বীপভূমির মানুষজনের প্রতি অদ্ভুত মায়ার টান অনুভব করি! সাংবাদিকতা আমার নেশা হলেও কবিতা লেখার প্রতি রয়েছে আমার ভিন্নতর ভালোবাসা! কবিতা খুব একটা ভাল লিখতে পারিনা জানি! তবুও কবি ও সাংবাদিক একসঙ্গে এই দুই পরিচিতির জন্য বেশিরভাগ কবিতা উৎসবে খুব সহজেই ডাক পেয়ে যাই! এভাবেই পূর্ব পরিচয়ের সূত্রে বকখালি তে এক সাহিত্য আড্ডায় ডাক পেয়েছিলাম! কর্মজগতের প্রবল ব্যস্ততা সত্ত্বেও সমুদ্র পাড়ে দুধ ভূমি এলাকার এই সাহিত্য আড্ডার হাতছানি আমি লুফে নিয়েছিলাম! হলদিয়া থেকে বাসে করে কুকড়াহাটি পৌঁছে লঞ্চে করে নদী পেরিয়ে ডায়মন্ড হারবার ফেরিঘাটের সামনে থেকে দক্ষিণবঙ্গ ভূতল পরিবহন নিগমের বাস ধরে একা একাই রওনা দিলাম বকখালির উদ্দেশ্যে! বাসের মধ্যে হঠাৎ ফোন পেলাম কবি বন্ধু দেবুদার! বিদায় জানালো কাকদ্বীপের সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে! শুনে মনটা ভাল হয়ে গেল! কাকদ্বীপ থেকে একসঙ্গে বাস করে আমি আর দেবুদা চলেছি বকখালির উদ্দেশ্যে! নামখানায় আমার জন্য এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল! হাতানিয়া দোয়ানিয়া নদীর উপর হুগলি দ্বিতীয় সেতুর আদলে তৈরি হয়েছে সেতু! হঠাৎ করে আমি নস্টালজিক হয়ে উঠলাম! মনের পর্দায় উঁকি দিল ফেলে আসা জীবনের রোমান্টিক স্মৃতি! মনে পড়লো এরকমই এক রোদ্দুর দিনে আমার জামাইবাবু সঙ্গীতার এক ছাত্রীর বাড়িতে বকখালি বেড়াতে এসেছিলাম! বকখালি বেরিয়ে ফিরে আসার পথে হঠাৎ করে আমার জামাইবাবুর মাথায় ভূত চাপলো পাথরপ্রতিমা যাবে! ওখানকার ভাগবতপুর কুমির প্রকল্প দেখতে! আমি জামাইবাবুর সঙ্গী হিসাবে বেড়াতে এসেছি তাই কোথাও যেতে আমার কোন সমস্যা নেই! ভুটভুটি নৌকায় হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী পেরিয়ে এপারে নামখানার ঘাট থেকে রোদ মাখা বিকেলে পাথরপ্রতিমা যাওয়ার ভুটভুটি নৌকায় চেপে বসলাম! ভুটভুটি নৌকার পাটাতনের উপর ঠাসাঠাসি মানুষ সারাদিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে! আমি বসেছিলাম নৌকার ধারে বিটের উপরে! পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়া সূর্যের আলো সরাসরি মুখের উপর পড়াই অস্বস্তি হচ্ছিল! আমার পাশে বসেছিল বছর 15 র একটি মেয়ে! মাথায় ছাতা দিয়ে রোদের আড়াল করছিল! আমার কাছে ছাতা ছিল না তাই হাত দিয়ে চোখ ঢেকে রোদ আড়াল করে ভুটভুটি নৌকার এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে দুপাশের অপরূপ বাদাবনের জঙ্গল দেখছিলাম মগ্ন হয়ে! হঠাৎ করে দেখলাম এক সময় আমি ছাতার ভিতরে চলে এসেছি! আমার পাশে বসা মেয়েটি রোদ থেকে আড়াল করতেই আমার মাথায় তার ছাতাটি ধরে রেখেছে! আমি মনে মনে খুশি হলেও মুখে কিছু বললাম না! বড় ঢাউস ছাতার মধ্যে লোক বোঝাই ভুটভুটি নৌকার মধ্য থেকেও আমরা যেন একটু আড়াল খুঁজে পেলাম! কিছুটা সময় পরে মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞেস করল আপনারা কি ভগবতীপুর এ কুমির প্রকল্প দেখতে যাচ্ছেন! বললাম হ্যা! তারপর মেয়েটি বলল আপনারা এই বিকেলে কুমির প্রকল্প ঘুরে আর ফিরে আসতে পারবেন না! কারণ এই ভুটভুটি নৌকা আজ আর ফিরবে না! ফিরবে কাল সকালে! রাতে আপনাদের ওখানে থাকতে হবে! কিন্তু ওখানে পর্যটকদের কোন থাকার ব্যবস্থা নেই! আমি মেয়েটির কাছে জানতে চাইলাম তোমার বাড়ি কি কুমির প্রকল্পের কাছে! মেয়েটি বলল হ্যাঁ কাছাকাছি! তখন আমি মেয়েটিকে মজা করে বললাম যদি থাকার কোথাও জায়গা না পাই তোমাদের বাড়িতেই থাকবো! অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম মেয়েটি খুব উৎসাহের সঙ্গে বলল হ্যাঁ অবশ্যই আমাদের বাড়িতে চলে আসবেন থাকার যদি কোন জায়গা না খুঁজে পান! কোন সমস্যা হবে না! আমি মেয়েটির কথায় সেভাবে গুরুত্ব দিলাম না মনে মনে! কোথায় কোথায় জানতে পারলাম মেয়েটি কাকদ্বীপে কেনাকাটা করতে গিয়েছিল! গল্প করতে করতে কখন যে ফেরিঘাটে চলে এসেছি খেয়াল ছিল না! ফেরিঘাট থেকে একটু দূরেই ভাগবতপুর কুমির প্রকল্প ঢোকার সুদৃশ্য গেট! গেট দিয়ে কুমির প্রকল্পের ভেতরে কিছুটা ঢুকে গিয়েছি, হঠাৎ মিশন থেকে সেই মেয়েটির দাঁড়া দাঁড়া ডাক শুনে চমকে ওঠে পিছনে ফিরলাম! মেয়েটির হাত নাড়িয়ে আমাকে কাছে ডাকছে! আমি কাছে যেতেই মেয়েটি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে বলল রাতে যদি থাকার কোথাও যাওয়া না পান, কোনরকম সংকোচ না করে আমাদের বাড়িতে চলে আসবেন! কিছুটা দূরে হাত দেখিয়ে বলল ওই মোড়ের পড়ে আমাদের বাড়ি! বলবেন সুরভি দের বাড়ি যাবো! সবাই দেখিয়ে দেবে! আমি মেয়েটির কথায় সায় দিয়ে কুমির প্রকল্পের ভেতরে চলে এলাম! তখন আমার মাথায় কুমির প্রকল্প দেখার চিন্তা করছিল! রাতে থাকার সমস্যা নিয়ে মাথা কাজ করছিল না!আশির দশকে কেন্দ্র সরকারের বন ও পরিবেশমন্ত্রী লুপ্তপ্রায় প্রাণী কুমিরের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পাথরপ্রতিমা ভগবতপুর এই কুমির প্রকল্প তৈরি করেছিল! কুমির প্রকল্পের ভিতরে ঘুরে দেখলাম এখানে বিভিন্ন জায়গায় ডিম ফোটানোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন তারের জাল দেওয়া ঘেরা জায়গায় বিভিন্ন সাইজের কুমিরের বাচ্চাকে লালন পালন করা হচ্ছে! একটা সময় কুমিরগুলোর সাইজ যখন বড় হয়ে যায় তখন তাদের খাঁচা থেকে ধরে বনদপ্তরের লঞ্চে করে বঙ্গোপসাগরের মহানায়ক ছেড়ে দিয়ে আসা হয়! যাতে এই সমস্ত কুমির গুলো সমুদ্রের পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে! কুমিরদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জানালেন বিভিন্ন সাইজের কুমিরদের মূলত কুচো চিংড়ি খেতে দেয়া হয়! একটু বেশি বড় হয়ে গেলে এই কুমিরগুলোর খাদ্যের চাহিদা খুব বেড়ে যায়, যা তাদের পক্ষে যোগান দেওয়া সম্ভব হয় না! তখন তারা সেই সমস্ত কুমির বাচ্চাগুলোকে সমুদ্রের জলে ছেড়ে আসতে বাধ্য হন!পুরনো আস্তানার কথা মনে রেখে কুমিরগুলো জলে ভেসে ভেসে আবারও প্রকল্পের সমুদ্রের পাড়ে এসে জড়ো হয়! তখন আবারও তাদেরকে জাল দিয়ে ধরে সমুদ্রের মোহনায় ছেড়ে আসতে হয়! এভাবে বার দিয়ে করার পর একসময় তারা নতুন আস্তানা খুঁজে নেয়! কুমির প্রকল্পের বিভিন্ন খাঁচা ঘুরে ঘুরে এবং কর্মীদের সঙ্গে এদের প্রজনন বিষয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে সূর্য পশ্চিম দিকে অস্ত চলে গেছে তার খেয়াল ছিল না! প্রকল্পের কর্মীরা একসময় জানালেন এবার প্রকল্পের গেট বন্ধ হয়ে যাবে পর্যটকদের বেরিয়ে যেতে হবে! আমরা প্রকল্পের গেটের বাইরে এসে যখন পৌছালাম তখন দেখি চারিদিকে ঘন ঘোর অন্ধকার! কুমির প্রকল্পের ভেতরে সোলার লাইটে আলোকিত হলেও দীপভূমির অন্যান্য এলাকায় তখনো এই পরিষেবা চালু হয়নি!আমাদের সঙ্গী তখন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই কুমির প্রকল্প দেখতে আসা আরো দুজন যুবক! কোথায় রাত্রি বাস করব এই চিন্তাই নদীর পাড়ে এসে ভুটভুটি নৌকার মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম এখানে পর্যটকদের রাত্রিবাসের জন্য এখনও কোন আবাস গড়ে উঠেনি! মাঝিরা তাদের নৌকায় রাত কাটানোর আমন্ত্রণ জানালো! আমাদের সঙ্গী দুজন বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া পর্যটক জানালো কিছুদিন আগেও তারা একবার এই কুমির প্রকল্প দেখতে এসে নৌকাতেই রাত কাটিয়ে ছিল! কিন্তু সারারাত মশার উৎপাতে একটুও ঘুমাতে পারেনি! শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম সুরভীর বাড়ি খুঁজে সেখানে রাত্রিবাসের কোন ব্যবস্থা হয় কিনা চেষ্টা করে দেখব! আর তা না হলে শেষ পর্যন্ত নৌকাতেই এসে বাকি রাতটা কাটিয়ে দেবো! রাস্তায় স্থানীয় মানুষজন কে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল আরেকটু এগোলে রাস্তার বাঁক ঘুরলেই পড়বে সুরভি দের বাড়ি! আমরা চারজন অন্ধকার মাটির রাস্তা হেটে চলেছি কোথাও কোন মানুষের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি না! ভয় লাগছে এই নির্জন দ্বীপে চার জন যুবককে দেখে লোকজন আবার চোর-ডাকাত না ভেবে বসে! রাস্তার পাশে হঠাৎ একটি চা দোকানের দেখা পেলাম! আমাদের পোশাক আশাক দেখে বাইরের লোক বুঝতে পেরেই কয়েকজন যুবক জানতে চাইলেন আমরা কোথায় যাব! আমরা তখন চাঁদ ওখানের যুবকদের আমাদের সমস্যার কথাটা খুলে বললাম! চায়ের দোকানে অন্যান্য যুবকের মাঝে বসে থাকা একটি যুবক বলল হ্যাঁ আপনাদের তো আমি ভুটভুটি নৌকায় আসতে দেখেছিলাম! তখন আমি পান বিক্রি করে বাড়ি ফিরছিলাম! কোন সুরভি দের বাড়ি যাব এই এই নিয়ে কিছুক্ষন তর্কবিতর্কের পর আমরা স্পষ্টভাবে বললাম সুরভি দের বাড়ি যাওয়াটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়! আমাদের মূল সমস্যা কোথায় রাত্রি বাস করব! তখন চা দোকানের অন্যান্য যুবকরা আমাদের ভুটভুটি নৌকায় একসঙ্গে আসা দেবাশীষ নামের যুবকটিকে বলল তোদের বাড়িতে তো অনেক জায়গা রয়েছে, তুই অন্তত এক রাতের জন্য এই সমস্ত অতিথিদের নিয়ে যা! যুবকটি তাতে সম্মত হয়ে আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পথে হাটা শুরু করল! কথায় কথায় যুবকটির কাছ থেকে জানতে পারলাম সে একসময় তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়এ পড়াশুনা করেছে! তাই আমাদের এদিককার রাস্তাঘাট লোকালয় তার চেনা!ভগবতপুর কুমির প্রকল্প দেখতে এসেছিলাম শুনে দেবাশীষ জানালো তার দাদা ওই প্রকল্পের একজন স্থায়ী কর্মী! কলকাতার অফিসে কাজে চলে যাওয়ার আমাদের সঙ্গে তার দেখা হয়নি! দেবাশীষের বাড়িতে গিয়ে দেখি বিরাট খড়ের চালের দোতালা ঘর! বাইরে মাদুরে বসে তার বাবা রেডিওতে গান শুনতে শুনতে মাছধরা জাল তৈরি করছে! আমাদের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে আলাপ পরিচয় হওয়ার পর জানতে পারলাম তিনি আদতে মেদিনীপুরের কাঁথির আদি বাসিন্দা! জীবন জীবিকার টানে তার বাবা এই পাথরপ্রতিমা এসে ঠাঁই গেড়েছিল! সেই থেকে তিনি এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা!সারাদিনের জার্নির ক্লান্তিতে বাইরের উঠোনের মাদুরে গড়াগড়ি খেতে গিয়ে কখন যে আমাদের ক্লান্তিতে চোখ জুড়িয়ে এসেছিল টেরই পাইনি! কারণ মনে মনে ধরেই নিয়েছিলাম আজ আর রাতের খাবার জুটবে না না খেয়েই রাত কাটাতে হবে! হঠাৎ করে ঘুম ভাঙলো রাতের খাবারের জন্য ডাক পড়ায়! এখনো মনে আছে সেই রাত্রিতে অযাচিত অতিথিদের হৃদয়বান গৃহস্থ ঝিঙের পস্তুরাল এবং মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাইয়ে ছিলেন! আর ঘরের ভিতরে দাওয়াই দুটি আলাদা খাটে আমাদের মশারীটা নিয়ে রাতে শোয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন! সারাদিনের ক্লান্তির কারণে রাতেও ঘরে ঘুমিয়ে ছিলাম! সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন সূর্য অনেকটা উপরে উঠে গেছে! আমরা তড়িঘড়ি করে প্রাতঃকৃত্য সম্পাদন করে বেরিয়ে আসার জন্য রেডি হয়ে গেলাম! বাড়িতে বাবা ও ছেলেকে কোথাও দেখতে পেলাম না! মধ্যবয়স্কা গৃহবধু নিজে সেজেছে আমাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করলেন! মহিলাটির পাশে একটি 15-16 বছরের মেয়ে অবাক বিস্ময় রাতের অতিথিদের দেখছিল আর মুচকি মুচকি হাসি তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছিল! কেন জানিনা মেয়েটির মা আমার সঙ্গে খুব আন্তরিক ভাবে কথা বলছিল! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি এটা জানার পর নিজেই জানালেন তার এই মেয়েটি এবার মাধ্যমিক দেবে! আমি মেয়েটির দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে ভালো করে দেখলাম! অদ্ভুত লাবণ্য সরলতা মাখা একটি মুখ! আমরা হলদিয়া থেকে এসেছি জেনে গৃহকর্ত্রী জানালেন ওখানে খুব বড় মাপের হলদিয়া উৎসব হয়! এখানকার অনেকেই ওপারে যায় হলদিয়া উৎসব দেখতে! আমি বললাম আপনিও আসুন এবার হলদিয়া উৎসব এর সময়! হলদিয়াতে আপনার থাকার কোন সমস্যা হবে না! তিনি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন হ্যাঁ যেকোনো সময় একবার ঠিক হলদিয়াতে বেড়াতে যাব! মেয়েটি এতক্ষণ একদৃষ্টে আমার দিকে অদ্ভুত মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল! মায়ের এই কথায় মেয়েটির চোখে মুখে অদ্ভুত আনন্দের ঝিলিক আমার নজরে পড়লো! আমি আমার নাম ঠিকানা লিখে গৃহকর্ত্রীর হাতে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম! বাইরে বেরিয়ে দেখি পাশের বাড়িতে লাঙ্গল চুষছেন গৃহকর্তা! আমরা সকলে সৌজন্য বিনিময় সেরে নদীপাড়ে ভুডভুডি নৌকা ধরার জন্য এগিয়ে চললাম! সকালে শান্ত পরিবেশে ভুটভুটি তে আসার সময় বারবার মেয়েটির মায়াবী মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল! নদীপারের বাদাবনের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমার মনটা অদ্ভুত বিষন্নতায় ভরে উঠছিল! বাড়ি ফিরে নিজের পড়াশোনার চাপ আর বিভিন্ন কর্ম ব্যস্ততার ভিড়ে এক সময় ভুলে গিয়েছিলাম এই স্মৃতি!বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আমি যখন একটি পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ করছি! সেই সূত্রে হলদিয়া উৎসব এর সাহিত্য সভা ও আলোচনা সবার দিনগুলিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে! এইজন্য খুব ব্যস্ত থাকতে হয়! দিনটা ছিল হলদিয়া উৎসব এর সাহিত্য সভার দিন! দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাহিত্য সভা শেষ করে উৎসব অফিসের দিকে ফিরে আসছি অতিথি সাহিত্যিক ও কবিদের নিয়ে! এমন সময় মাইকে ঘোষণা শুনলাম আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য উৎসব অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন মানুষ! আমি যেন দ্রুত উৎসব অফিসে এসে তাদের সঙ্গে দেখা করি! আমি মনে মনে ভাবছিলাম আমার বাড়ির লোকজন কোনদিন এই সব দেখতে আসে না! তাহলে কে হতে পারি! ভাবতে ভাবতে এক সময় উৎসব অফিসের সামনে এসে চমকে গেলাম! পাথরপ্রতিমা থেকে সেই গৃহকর্ত্রী মাসিমা ছেলে দেবাশীষ ও মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হলদিয়া উৎসব অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন! আমাকে উৎসব অফিসের সামনে দেখতে পেয়ে তারা যেন হাতে চাঁদ খুঁজে পেলেন! তাদেরকে উৎসব অফিসের ভেতরে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ালাম এবং টিফিন করালাম! সবে সন্ধ্যা নামছে উৎসব মাঠে মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে! আমি তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে উৎসব মাঠের পাশে আমার বাসায় নিয়ে এলাম! দু’কামরার কোয়ার্টারে আমি তখন একাই থাকতাম! গ্যাস ছিল, নিজেই রান্না বান্না করে খেতাম! যেদিন রান্না করতে ইচ্ছে করতো না, সেদিন নিচে হোটেলে গিয়ে খেয়ে আসতাম! আমার পরিকল্পনা ছিল গেস্টদের নিয়ে রাতে উৎসবের মাঠে কোন এক রেস্টুরেন্টে খেয়ে আসব! কিন্তু মাসিমা রান্নার সব সরঞ্জাম দেখে বললেন তিনি রান্না করবেন! আমি নিচে গিয়ে রাতে ও সকালের খাওয়ার জন্য সমস্ত কিছু কিনে আনলাম! সেদিন হলদিয়া উৎসবে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান ছিল! মাসিমা তা শুনে খুবই খুশি হলেন এবং ছেলে মেয়ের সঙ্গে গান শুনতে যেতে চাইলেন! উৎসব কমিটির একজন কর্মকর্তা হিসাবে আমার কাছে অনুষ্ঠান মঞ্চের সামনে ভিআইপি আসনে বসে গান শোনার জন্য আলাদা পাশ ছিল! মাসিমা ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই সমস্ত রান্নাবান্না কমপ্লিট করে ফেললেন! আমরা রেডি হয়ে মূল মঞ্চের দিকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান শুনতে বেরিয়ে পড়লাম! নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা উৎসব মাঠে যেদিন বোম্বের শিল্পীরা আসেন সেদিনই বেশি ভিড় করে! এদিন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানের সময় সেই অর্থে মঞ্চের সামনে খুব একটা বেশি ভিড় ছিল না! তাই আমাদের সিট পেতে খুব একটা কষ্ট পেতেও হলো না! আমরা চারজন একসঙ্গে পাশাপাশি সিটে বসে গান শুনছিলাম! সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একের পর এক পুরনো গান গেয়ে চলেছেন! আর আমরা দর্শকরা তা শুনতে শুনতে অদ্ভুতভাবে নস্টালজিক হয়ে পড়ছি! চার-পাঁচটি গান হয়ে যাওয়ার পর আমার মাসিমা আমার দিকে ঝুকে আস্তে করে জানালেন মেয়ে দিপালী টয়লেটে যাবে! সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান ছেড়ে তিনি উঠবেন না, তাই আমাকেই তাকে নিয়ে যেতে হবে! ধীরে ধীরে উৎসব মাঠে ভিড় বাড়ছিল! অনুষ্ঠান মঞ্চের সমস্ত আসন ভরে যাচ্ছিল! আমি মাসিমাকে বললাম আসন ছেড়ে বেরিয়ে গেলে এই আসন আর ফাঁকা থাকবে না! টয়লেট থেকে ফিরে এসে আমাদের অন্যত্র দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান শুনতে হবে! তাই আপনারা দুজন অনুষ্ঠান শেষে সোজা আমার বাসাতে চলে আসবেন! আমরাও ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব!মাসিমা আমার কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন! অনুষ্ঠান মঞ্চের সামনে থেকে বেরিয়ে আমি দিপালী কে উৎসব অফিসের পাশে পাবলিক টয়লেটে নিয়ে যেতে চাইলাম! কিন্তু সে বলল বাসায় গিয়ে টয়লেট করবে! আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে গেলাম! বাসার ড্রইং রুমের সোফায় বসেছিলাম! দিপালী টয়লেট থেকে বেরিয়ে এসো কোন কথাবার্তা না বলে হঠাৎ করে আমাকে আবেগে গলা জড়িয়ে ধরল! আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না দিপালীর টয়লেট করার নাম করে বেরিয়ে আসাটা মা দাদার কাছ থেকে বেরিয়ে আসার একটা কৌশল! কিছুটা সময় আমার সঙ্গে সে নির্জনে কাটানোর সুযোগ খুঁজছিল! ড্রইংরুমে তখন নাইট বাল্ব জ্বলছিল! সবুজ মায়াবী আলোয় দিপালীর বাহুডোরে আমি ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠছিলাম! আর দিপালী আমার বুকের মধ্যে মুখ ঘষছিল! এক সময় আমিও দীপালীকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে লাগলাম! দিপালীর আচরণে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছিল আমাকে চির জীবনের জন্য কাছে পেতে সে তার সর্বস্ব উজাড় করে আমাকে দিতে চাইছে! আমি বিষয়টি অনুভব করে নিজেকে সংযত করলাম! দিপালী কে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে সোফায় পাশে বসালাম! গভীর মমতায় তার হাত দুটি ধরে রাখলাম! দিপালী কোন কথা বলছিল না! কেবল মুখ নিচু করে কেঁদে যাচ্ছিল! আমি যখন দিপালীর বাড়িতে অযাচিত রাতের অতিথি হয়েছিলাম, তার থেকে বছর পাঁচেক সময় গড়িয়ে গেছে! দিপালী এখন কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী! কিছুটা সময় পরে ধাতস্থ হয়ে দিপালী আবেগঘন হয়ে অনেক কথা বলে যাচ্ছিল! সেদিনের এক পলকে আমাকে দেখার পর থেকে আজ পর্যন্ত সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না! শুধু আমাকে একবার দেখার জন্য সে মাকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে এখান পর্যন্ত এসেছে! দিপালীর এই আবেগময় ভালোবাসার কথায় আমার হিদয় চাইছিল তার সঙ্গে সহমত হতে! কিন্তু বাস্তবে আমার আর্থিক স্থিরতা আমার পিছু টেনে ধরছিল! দীর্ঘ সময় ধরে আমরা পাশাপাশি ঘনিষ্ট হয়ে বসে ছিলাম! দিপালী একাই কথা বলে যাচ্ছিল আমি নিবিষ্ট মনে তা শুনে যাচ্ছিলাম! একসময় বুঝতে পারছিলাম অনুষ্ঠান শেষ হয়ে আসছে! এবার দিপালীর মাও দাদা বাসায় এসে পড়বে! তাই এবার আমাদের উৎসব মাঠের দিকে বেরোতে হবে! দিপালীর মত আমারও মন চাইছিল না এই রাতে রোমান্টিক মায়াময় পরিবেশ ছেড়ে উঠতে! রুম থেকে বেরিয়ে যতক্ষণ উৎসবের মাঠে ঘুরে বেরিয়েছি সারাক্ষণ দিপালী আমার হাত টাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল! অদ্ভুত এক ভালোলাগা আমার মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছিল! আর দিপালীর জন্য হৃদয়ের গভীরে মায়াময় টান অনুভব করছিলাম! রাতে খাওয়া দাওয়ার পর দেবাশীষ ও আমি একটি রুমে ঘুমিয়ে ছিলাম! আর দিপালী ঘুমিয়ে ছিল মায়ের সঙ্গে! দিপালীর কথা ভাবতে ভাবতে আমার ঘুম আসছিল না! ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! মাসিমার ডাকে ঘুম ভাঙলো! সকালে টিফিন রেডি করে তিনি তারা দিচ্ছেন ফ্রেশ হওয়ার জন্য! মাসিমা সবকিছু গুছিয়ে রেডি হয়ে বসেছিলেন টিফিন খেয়ে বেরিয়ে পড়বেন বলে! আমি চাইছিলাম মাসিমারা আরেকটি দিন থাকুন! কিন্তু মাসিমা পরের দিন দিপালীর কলেজ কামাই এর দোহাই দিয়ে আর থাকতে চাইলেন না! আমি বুঝতে পারছিলাম মায়েদের মন সবকিছু ঠিকই অনুভব করতে পারে!মাসিমার মুখ দেখে অবশ্য কোন কিছু বোঝার উপায় ছিল না!যাওয়ার সময় আবারও বাড়িতে যাওয়ার আন্তরিক আহ্বান জানালেন! টাউনশিপ এ ফেরিঘাটে দিপালী দের লঞ্চে তুলে দিয়ে আমি পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম! একসময় লঞ্চ জল ভেঙে এগিয়ে চলল! আমি দুর থেকেও দেখতে পাচ্ছিলাম দিপালী শত চেষ্টা করেও চোখের জল লুকোতে পারছে না! নিজের অজান্তে আমার দুচোখ জলে ভরে উঠছিল! সেদিন বাসায় ফিরে এসেছিলাম অব্যক্ত এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে! তারপর থেকে আর কোনদিনই দীপালির সঙ্গে আমার দেখা হয়নি! অদ্ভুত এক হীনম্মন্যতাবোধের কারণে আমি আর কোনদিন দিপালীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি!কালের নিয়মে সময় গড়িয়ে গেছে! কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে নিজস্ব নির্জনতায় কখনো কখনো দিপালীর মুখটা আমার মনের পর্দাই পুরনো দিনের সাদা কালো ছবির মত ভেসে ওঠে! তখন ভাবতে চেষ্টা করি দিপালী এখন কোথায় আছে, কেমন আছে! সে কি এখনো আমার কথা ভাবে!
মাঝখানে আড়াই দশকেরও বেশি সময় জীবন খাতা থেকে খসে পড়েছে! সেদিনের তরতাজা যুবক এখন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে গিয়েছে!বকখালিতে সাহিত্য আড্ডার মাঝখানে একফাকে দেবুদার কাছে ভগবতপুর কুমির প্রকল্প দেখতে যাওয়ার কথাটা পাড়লাম! দেবুদা এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন! দেবুদা বর্তমানে কাকদ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও, তার পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি পড়ে রয়েছে মেদিনীপুরের মাটিতে! জীবিকার সন্ধানে এক সময় তার বাবা সাগরদ্বীপের বাদাবনের জঙ্গলে এসে নাড়া বেঁধেছিলেন! পূর্বপুরুষের শিকড়হীন হওয়ার যন্ত্রণা দেবুদার রক্তের ভিতরে খেলা করে! উদ্বাস্তু হওয়ার বিপন্নতা তাকে অস্থির করে তোলে! তাই পেশায় শিক্ষক এই কবি মানুষটি কাজের ফাঁকে ফুরসত পেলেই বেরিয়ে পড়েন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত দ্বীপভূমিতে! বোহেমিয়ান ভাবে ঘুরে বেড়ান কবিতার রসদ খুঁজতে! এখন পাথরপ্রতিমার সঙ্গে সেতু সংযোগ হয়ে যাওয়ায় জলপথে শুধু নয় স্থলপথে ও সরাসরি বাসে করে ভগবতপুর কুমির প্রকল্প দেখতে যাওয়া যায়! দেবুদা চাইছিলেন স্থলপথে যেতে ! কিন্তু আমি কুমির প্রকল্প আবার দেখতে চাইছি পুরনো স্মৃতিকে জাগ্রত করতে! আমার মনের কথা দেবুদার জানা সম্ভব ছিল না! তাই জলপথে ভুটভুটি নৌকা করেই যেতে চাইলাম! বকখালি থেকে বাসে করে এপারে নামখানা তে নেমে ফেরিঘাটে ভুটভুটি নৌকায় চেপে বসলাম! সেদিনের মতো আজও রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেল! স্থলপথে বাসে করে যাওয়ার সুবিধা হওয়ায় এখন আর জলপথে ভুটভুটি নৌকায় তেমন একটা ভিড় হয় না! এদিন অবশ্য ভুটভুটি নৌকায় মানুষজন ভর্তি ছিল! আমি নৌকার পাটাতনের উপর না বসে বিটের উপরে আগের বারের মতো বসে যাচ্ছিলাম! দেবুদা একটু দূরে বসে পরিচিত একজন মানুষের সঙ্গে গল্প করে যাচ্ছিল! ভুটভুটি নৌকা চালু হওয়ার কিছুক্ষণ পরে দেখলাম জিন্স ও কুর্তি পরিহিত এবং চোখে সানগ্লাস লাগানো একজন তরুণী আমার পাশে এসে বসলো! তার হাতের গোলাপি ছাতাটা মাথার উপর খুলে ধরে রোদ আড়াল করার চেষ্টা করলো! মেয়েটির ছাতার আড়ালে আমিও ছায়া পেতে থাকলাম!এই ভুটভুটি নৌকায় এরকম স্মার্ট মেয়েকে দেখে মনে মনে একটু অবাক হলাম ! এক সময় মেয়েটি আমার সঙ্গে যেচে আলাপ করা শুরু করল! জানতে চাইলো আমি কোথায় যাব! আমি তাকে আমার গন্তব্যের কথা বললাম! শুনে মেয়েটি খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো! মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম সে কলকাতার একটি কলেজে পড়াশোনা করে! কলেজ ছুটিতে বাড়িতে এসেছে! ইচ্ছে করলেই সে স্থলপথে বাঁশি করে সোজা বাড়িতে পৌঁছে যেতে পারত! কিন্তু জলপথে ভুটভুটি চেপে বাড়ি যেতে তার অদ্ভুত ভালো লাগে! আমি মেয়েটির কথায় মনে মনে চমকিত হলাম!ভুটভুটি নৌকা থেকে নেমে দ্বীপ ভূমিতে পা দিয়ে বুঝতে পারলাম উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে গেছে এই দ্বীপ! আমার পুরনো স্মৃতির সঙ্গে মিল খাওয়ানো খুব কঠিন! আমি দূর থেকে কুমির প্রকল্পের গেটের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম! এখন ফেরিঘাটের পাশে কুমির প্রকল্প দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য রাত্রিবাসের জন্য আবাস নির্মিত হয়েছে! ফেরিঘাটের ভুল বদলে গেছে! আগে ফেরিঘাটে একটিমাত্র দোকান দেখেছিলাম! এখন সেখানে অনেকগুলি দোকান! হেরি থেকে নামা মানুষজনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অটো এবং টোটো দাঁড়িয়ে রয়েছে! ভুটভুটি নৌকায় পাশে বসা মেয়েটি হঠাৎ করে আমার কাছে এসে মিষ্টি করে হেসে বলল রাত্রিবাসের সমস্যা হলে আমার বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারেন! মেয়েটির কথায় বছর পাঁচেক আগের স্মৃতি সজীব হয়ে উঠলো! মেয়েটির কথায় আমি হেসে বললাম অচেনা অজানা লোককে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে তাতে তো তোমাদের বিপদ হতে পারে!তারপরে মেয়েটি যেটা বলল সেটা শুনে আমি মানসিকভাবে বেশ বড়সড় ধাক্কা খেলাম! সে জানালো তার মা বলেছে, বিকেলে কুমির প্রকল্প দেখতে এসে কোন মানুষ যদি রাত্রিবাসের সমস্যায় পরে তাকে বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানাতে! আমি মেয়েটির কথায় স্তম্ভিত হয়ে তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়েছিলাম! মেয়েটি আবারও তার বাড়িতে যাওয়ার কথা স্মরণ করে দিয়ে একটি টোটো গাড়ির পিছনে বসে ঢালাই রাস্তা ধরে রহস্যময় হাসি হাসতে হাসতে একসময় আমার দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে গেল! আমি মেয়েটির মুখের সঙ্গে আরেকটি মুখের মিল খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম মনে মনে! কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না!মনের মধ্যে অদ্ভুত এক অপরাধ বোধ জেগে উঠল! নিজের অজান্তেই চোখটা অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে উঠছিল! জানিনা আমার এই অশ্রু বিসর্জন কে কুম্ভীরাশ্রু বলে কিনা!