‘তার মানে আমি আর মানুষ নেই! পাখি হয়ে গেছি!’
সেদিন গ্রীষ্মের সকালে, অন্যদিনের মতো রোদ ততটা তাতানো নয়, এবং হালকা শীতল বাতাস বইছিল বলে আবহাওয়া খানিকটা সহনশীল, আফজাল সাহেব মানুষ থেকে পাখিতে রূপান্তরিত হলেন।
সহজে হজম করার মতো বিষয় তো নয় একেবারেই। ভাবলেন, দুঃস্বপ্ন নয় তো?
গতকাল বিকেলের হালকা ঝড়-বৃষ্টির পর রাতের আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক হয়ে ওঠে। তথাপি এসি চালিয়ে ঘুমিয়েছেন আফজাল সাহেব। খুব ভালো ঘুম হয়েছে বলে মনে হয়। স্বপ্নের স্মৃতি হাতড়ালেন খানিকক্ষণ। কিছুতেই মনে হলো না। তখন আবিষ্কার করলেন পাশে মেরিনা নেই। সামনের দেয়ালে ঝুলন্ত দেয়ালঘড়িটার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। কারুকার্যময় ঘড়িটায় একটা টিয়াপাখি এক মিনিট পর-পর ঠোকর মেরে চলেছে। সকাল আটটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট। তার মানে মেরিনা নিশ্চয়ই বাজারে বেরিয়ে গেছে। ফিরতে অন্তত সাড়ে দশটা-এগারটা বাজবে। ততক্ষণে আর একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যায়, যেহেতু আজ ছুটির দিন, অফিস যাওয়ার ঝক্কি নেই। পাশ ফিরে শুলেন তিনি। আর তখনই চোখ পড়ল পাশের ড্রেসিংটেবিলের আয়নায়। দেখলেন তার বিছানায় শুয়ে আছে একটা বড়-সড় সবুজ টিয়াপাখি। ভারি অবাক হলেন আফজাল সাহেব। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন বিছানাটা তাদেরই, যেখানে তিনি ও তার স্ত্রী প্রতিদিন শুয়ে থাকেন। কিন্তু তা কী করে হয়? এই মুহূর্তে তো স্বয়ং তিনিই বিছানায় শুয়ে আছেন। চমকে উঠলেন তিনি। তাই তো! বিছানায় তিনিই তো শুয়ে আছেন, কিন্তু ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় প্রতিফলিত বিছানায় তার কোনো চিহ্নই নেই, তার বদলে একটা বড়-সড় সবুজ টিয়াপাখি! তার বুকটা ধড়াক করে উঠল। তবে কি তিনি হাওয়া হয়ে গেলেন? সে কী করে হয়? আর পাখিটাই বা এলো কী করে! তা-ও একেবারে বিছানায়! ‘আমি তো রয়েছি, এই তো আমি, এসব তো আমিই দেখছি, নাকি? তাহলে আমি থাকব না কেন?’ এইসব ভাবলেন তিনি। এইবার আতঙ্কে জড়-সড় হয়ে গেলেন। তাকালেন নিজের দিকে। দেখলেন, সত্যিই তিনি নেই, তার জায়গায় শুয়ে আছে একটা বড়-সড় সবুজ টিয়াপাখি। নিজেকে ছুঁয়ে পরখ করতে গিয়ে দেখলেন তার হাত নেই, তার বদলে নড়ে উঠছে টিয়াপাখিটার পাখনা। তিনি এবার ভয়ে দিশেহারা হয়ে মেরিনার নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, আর আশ্চর্য হয়ে শুনলেন তার দরাজ কণ্ঠের বদলে ধ্বনিত হচ্ছে টিয়াপাখির তীক্ষ্ণ চীৎকার। ‘তার মানে আমি আর মানুষ নেই, টিয়া পাখি হয়ে গেছি!’ দমবন্ধ অবস্থা তার। সামনে ঘাড় বাঁকালেন- দেখলেন উঁচিয়ে থাকা বুকটা সবুজ রঙের নরম পালকে ঢাকা, পেট, ঘাড়, পিঠ সর্বত্র সবুজ নরম পালক। দুই পায়ের ওপর দাঁড়ালেন তিনি। ঘাড় ঘুরিয়ে, চোখ উল্টিয়ে, নিজেকে আগাপাশতলা দেখলেন, তারপর আবার তাকালেন আয়নাটার দিকে। হাত নাড়ালেন, পাখনা নড়ল। মেরিনাকে ডাকলেন, মানুষের কথার বদলে টিয়াপাখির ডাক বেরুল। এবার আর কোনো সন্দেহ রইল না যে দুঃস্বপ্ন নয়, তিনি সত্যিই পাখি হয়ে গেছেন। একটা সবুজ টিয়াপাখি।
এইভাবে, সেদিন গ্রীষ্মের সকালে, অন্যদিনের মতো রোদ ততটা তাতানো নয়, এবং হালকা শীতল বাতাস বইছে বলে আবহাওয়া খানিকটা সহনশীল, খাদ্য বিভাগের ডাকসাইটে কর্মকর্তা আফজাল সাহেব মানুষ থেকে পাখিতে রূপান্তরিত হলেন। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে থাকলেন বিছানায়। হঠাৎ তার মনে হলো, কৈশোরকালে একবার এক ওয়াজ মাহফিলে শুনেছিলেন, ছোট ছোট বাচ্চারা মারা গেলে, তারা নিষ্পাপ বলে, বেহেস্তে যাবে এবং সবুজ পাখি হয়ে উড়ে-খেলে বেড়াবে। তিনি যদিও-বা বাচ্চা নন, রীতিমতো প্রৌঢ় মানুষ, এ বছর ডিসেম্বরের তিন তারিখে তার বয়স পঞ্চান্ন পেরুবে, তথাপি এমন তো হতেও পারে যে তার মৃত্যুর পর তাকে বেহেস্তে পাখিদের সঙ্গে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেহেতু একটা শিশুসন্তানের তীব্র আকাক্সক্ষা তার বহুদিন যাবত অপূর্ণ থেকে গেছে, কেবলই, প্রায়শঃই, ঘুমাতে গেলেই তন্দ্রার ভেতর তিনি একটা শিশুর স্বপ্ন দেখেন। মেরিনা তাকে পঁচিশ বছরের বিবাহিত জীবনে পিতৃত্বের স্বাদ এনে দিতে পারেনি। মনের গহীনে আফসোস তো থেকেই গেছে।
চারপাশে তাকালেন তিনি। সবকিছুই যে চেনা তার। দেওয়ালঘড়িটা, ড্রেসিংটেবিলটা, ওয়ালসেট আলমারি, মেঝের কার্পেট, ঘরের দেওয়ালের রং, বিছানা, স-ব। উত্তরের দেওয়ালে ঝুলছে তার ও মেরিনার যুগল ছবি, বর ও বধূর বেশে, বিয়ের আসরে তোলা। ছাদের সঙ্গে ঝুলছে চার-হাতি ইলেকট্রিক ফ্যান, নতুন এসিটা শীতল পরশ ছড়াচ্ছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, ভাবলেন আফজাল সাহেব, তিনি তার নিজের বেডরুমেই রয়েছেন, যদিও এখন একাকী, একটা পাখি হয়ে।
‘আমি আর মানুষ নেই, সত্যি-সত্যিই পাখি হয়ে গেছি! সুতরাং, ভেবে আর লাভ নেই, আমাকে এখন পাখি হয়েই বাঁচতে হবে।’ মনে মনে বললেন তিনি। সেক্ষেত্রে ঘরের মধ্যে এই বিছানা আর উপযুক্ত জায়গা নয় তার বসবাসের জন্য, তাকে সেখানেই যেতে হবে যেখানে পাখিরা বাস করে, কোনও বনে, বা গাছে। তার মন কেঁদে উঠল, ভয় লাগল তার, যদিও এর আগে এই বিছানা-ঘর-সরঞ্জামাদি এবং স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা অনেকবার ভেবেছেন তিনি। কোনও জরুরি কারণ ছিল না, কেবল একধরনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমি বন্দীত্বের বোধ ছাড়া। এখন, পাখি হয়ে যাওয়ার পর, তার আর না গিয়ে উপায় নেই। কারণ, সময়মতো চলে না গেলে তার স্ত্রীই হয়তো তাকে ঝাড়–নি দিয়ে পিটাবে, কিংবা কাজের বুয়ার সাহায্যে তাকে পাকড়াও করে খাঁচায় ভরে রাখবে, তিনি বোঝাতেই পারবেন না যে তিনি সেই মানুষটিই লোকেরা যাকে ‘আফজাল সাহেব’ বলে ডাকে, মেরিনা যাকে বিয়ের সাত-আট বছর পরেও গোপনে ‘ফাজিল’ বলে ডেকেছে। অর্থাৎ এখনই, মেরিনা বাড়ি ফেরার আগেই, তার এই ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। বিছানার ওপর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করলেন তিনি। হালকা লাগছে। তারপর পাখনা প্রসারিত করে দিয়ে দৌড়ালেন একটু। হ্যাঁ, আরো হালকা বোধ হচ্ছে। এবার পাখা ঝাপটে দেখলেন সত্যিকারের পাখির মতো উড়তেও পারছেন। সুতরাং উড়াল দিলেন তিনতলা অ্যাপার্টমেন্টের জানালা গলে। বাইরে এসে সানশেডের ওপর বসলেন। কী বিশাল আর উন্মুক্ত পৃথিবী! আগে কেন এমন মনে হয়নি? তিনি কি তাহলে এতদিন বন্দী ছিলেন? তা কেন হবে? তিনি প্রত্যেকদিন সকাল সাড়ে আটটায় অফিসে বেরিয়ে গেছেন, ছটার মধ্যে বাড়ি ফিরে এসেছেন। কোনো কোনো দিন বাজারে গিয়ে দেরি হয়েছে। ছুটির দিন দেরিতে উঠেছেন বটে, কিন্তু প্রায়ই বিকেলে মেরিনাকে নিয়ে বেরিয়েছেন কোথাও, ইদানীং যদিও সেটা কমে আসছিল। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, মানুষের বন্দীত্ব নানারকম, সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ালেও বন্দীত্বের শেকল দুর্বিষহ হতে পারে। এই যেমন এখন তার মনে হচ্ছে, এতদিন তিনি এমন মুক্ত ও স্বাধীন ছিলেন না, যেমনটি আজ অনুভব করছেন। এতদিন তিনি হেসেছেন যদিও অনেক সময় মন থেকে হাসতে ইচ্ছে হয়নি, অনেক কাজই করেছেন যা তার করতে আদৌ ইচ্ছে হয়নি, এমন অনেক কথা বলেছেন যা বলার ইচ্ছে তার ছিল না, বা এমন অনেক কিছুই করতে বা বলতে পারেননি যা করার বা বলার জন্য তার হৃদয় আকুপাকু করেছে। আজ সেসব বন্ধন থেকে তিনি মুক্ত। তেমনটিই তার আজ, এই ক্ষণে, মনে হচ্ছে, যদিও তার বোধ হচ্ছে এই জীবনও কুসুমাস্তীর্ণ হবে না। তবু তিনি এই মুহূর্তে স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করছেন।
কয়েকটা বাচ্চা ছেলে এই সাত-সকালেই মাঠে খেলতে নেমেছে। মাঠ মানে চারদিক থেকে ঘিরে ধরা টাওয়ারগুলোর মাঝখানের প্রাঙ্গণ, যেন কয়েকটা পাহাড়ের মাঝখানে এক চিলতে উপত্যকা। ওদের একজন, পাশের অ্যাপার্টমেন্টের রোকন সাহেবের মেয়ে, তার একটা চোখ ট্যারা, সে একবার তার দিকে তাকালো। সামনের অ্যাপার্টমেন্টের দোতলার কার্নিশে কয়েকটা কাক কী-একটা খাবার নিয়ে কোন্দল করছে। প্রথমে বিরক্তি বোধ হলো তার, কেননা হই-হট্টগোল, বিশেষ করে মারামারি-ঝগড়াঝাটি তার একদম পছন্দ নয়। রমজান মাসের রোজার দিনে কেউ যেচে-পড়ে ঝগড়া করতে এলে ‘আমি রোজা আছি’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার নিয়ম। আফজাল সাহেব সারাটা জীবনই সেটা পালন করে এসেছেন। কোনোদিন কারো সঙ্গে ঝগড়া হয়নি তার, হয়নি মানে করেননি, করলে হতো। সেজন্যে অনেকেই তাকে ভীতু, কাপুরুষ, বা এস্কেপিস্ট ঠাওরায়। মেরিনাকেও এদের দলে ফেলা যায়। সে যে-যার মতো করে ভাবুক, তার নিজের ভালো জানা আছে তিনি কী।
ভাবনাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারল না। একটা কাক খাবারের টুকরাটুকু অন্যদের থেকে কেড়ে নিয়ে উড়াল দিয়েছে। বাকিরা তার পশ্চাদ্ধাবন করছে। তাই দেখে হঠাৎ তার খিদে অনুভব হলো। আশ্চর্য হলেন তিনি। হওয়ার কথাই বটে। সারা জীবন তার সকালে খেতে ভালো লাগে না। অফিস যেতে হয় বলে বাধ্য হয়ে খান, কিন্তু সে সামান্যই। ছুটির দিন তো ঘুম থেকেই ওঠেন দশটার পর। অথচ আজ এই সাত-সকালেই খিদে অনুভূত হচ্ছে। সত্যিই যে তিনি আর মানুষ নেই, এটাও তার একটা প্রমাণ।
আকাশটা কী চমৎকার নীল। দূরে কোথাও কোথাও কাশফুলের মতো ছিটে-ফোঁটা শাদা মেঘ। বাতাস তবু অনেকটাই শীতল। এই তিনতলার কার্নিশে তার বেগ অনুভব করলেন আফজাল সাহেব। তার গায়ের পালকগুলি বাতাসে উড়ে-উড়ে যাচ্ছে। তার মনে হলো, এই বিশাল উন্মুক্ততা, আর মৃদু সমীরণই তার খিদের কারণ। বা পাখি জাতির এই-ই হয়তো বৈশিষ্ট্য- সারাদিন কেবল খাই-খাই।
পাখিরা কি এত কিছু ভাবে? খিদে লেগেছে তো খাও, কোথায় খাবার পাবে দেখ। সারাদিন তো এটাই কাজ। কিন্তু কোথায় খাবার খুঁজবেন তিনি! তার তো এ ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। প্রথমেই তার মনে পড়ল নিজেদের ডাইনিং টেবিলের কথা। মেরিনা নিশ্চয়ই বুয়াকে খাবার ঢাকা দিয়ে রাখতে বলে গেছে, এবং বুয়া সেই নির্দেশনা পালন করেছে। না করার কথা নয়, কারণ সেটাই দস্তুর। আবার ঘরের ভেতর ঢুকলেন আফজাল সাহেব। তারপর ডাইনিং টেবিলে। পায়ের ঝাপটায় কয়েকটা বাটির ঢাকনা খুলে ফেললেন। রুটি, সুজি, সব্জি, ফল। খেতে শুরু করলেন। ভেবে অবাক হলেন, সত্যিকারের পাখির মতোই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খাচ্ছেন তিনি, কোনো এটিকেটের কথা মনেই এলো না। প্লেট, বাটি, চামচ, ন্যাপকিন, টিস্যুপেপার, কোনো কিছুর প্রয়োজন হলো না। মেরিনা দেখলে দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে ফেলত। এক কলা খাওয়া নিয়েই কত কা- ঘটেছে এই জীবনে। খেতে বসে মেরিনার সঙ্গে যত বাদ-বিত-া হয়েছে (এটাকে ঝগড়া বলা চলে না, কেননা তিনি সেটা এড়িয়ে চলেন) তার বেশিরভাগই এই খাওয়া-দাওয়া নিয়ে। যেমন কলা খাওয়ার ব্যাপার। কলার পুরোটা খোসা একবারে ছিলে ফেলে দুই-তিন কামড়ে গাল ফুলিয়ে গলাধঃকরণ করতে তার ভালো লাগে, তৃপ্তি হয়। কিন্তু সেটা নাকি অসভ্যতা। মেরিনার মতে, অল্প-অল্প করে খোসা ছাড়াতে হবে, আর একটু-একটু করে খেতে হবে। ইংরেজরা নাকি শিখিয়েছে এটা। ভারি রাগ হয় আফজাল সাহেবের এই কথা শুনে। কলা খেতেও ইংরেজের বিধান মেনে চলতে হবে? যে-ইংরেজ এই সেদিনও রান্না করে খাওয়া জানত না, বালিশ ব্যবহার করা জানত না, ডাকাতি আর চুরি করে যারা সম্পদের পাহাড় গড়েছিল, তাদের কাছে আমাদেরকে কলা খাওয়া শিখতে হবে? কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া এড়াতে প্রায়শঃই, ব্যতিক্রম বাদে, তাকে ওই সাম্রাজ্যবাদীদের এটিকেটই মেনে চলতে হয়েছে।
আজ তার কোনো বালাই নেই। কলার খোসার ওপরেই ঠোকর বসালেন আফজাল সাহেব।
কিন্তু সুখ সইল না। কাজের মেয়েটা ঢাকনা নাড়াচাড়ার শব্দ পেয়ে এসে দেখে একটা টিয়াপাখি সব মিসমার করে ফেলছে। সে ‘হেই-হেই’ করতে-করতে তেড়ে এলো লাকড়ি হাতে। কষে একটা ধমক দিলেন বটে আফজাল সাহেব, সেটা সুতীক্ষ্ণ চীৎকার হয়ে প্রতিধ্বনিত হলো কেবল, হাত দিয়ে চড় দেখাতে গেলেন, তাতে পাখার ঝাপটা লেগে একটা বাটি উল্টে গেল। মেয়েটি প্রথমে থমকে গেলেও দ্রুত সামলে নিয়ে ছুটে এলো, লাকড়ির আঘাত হানল। এক ঝাপটায় মুহূর্তের মধ্যে সরে গেলেন আফজাল সাহেব, লাকড়িটা ডাইনিং টেবিলের ওপর ঠকাস শব্দ তুলে ভেঙ্গে গেল। দ্রুত পালাতে উড়াল দিলেন তিনি। ভাঙ্গা লাকড়ির টুকরা তুলে ছুঁড়ে মারল মেয়েটি, কিন্তু সেটা তার গায়ে লাগল না।
তার স্ত্রী, সরকারি কলেজে ইংরেজির সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার সুবাদে সকলের কাছে যিনি হয়ে উঠেছেন ‘মেরিনা ম্যাডাম’, একসময় আফজাল সাহেব যাকে লুকিয়ে-চুরিয়ে ‘রিনা, মাই রিনু’ বলে ডাকতেন, তিনি সেদিন সকাল সোয়া আটটার দিকে বাজারের উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন। ছুটির দিন তার স্বামী বেলা দশটার আগে বিছানা ছাড়েন না বলে তিনি সাপ্তাহিক বাজারের কাজটা সকালেই সেরে নেন। তার ফিরতে যদি কোনো কারণে একটু দেরিও হয়, তাতেও কোনো অসুবিধে হয় না। কারণ কাজের মেয়েটি বাড়িতে থাকে, সে সবকিছু জানে। মেরিনা ম্যাডাম আজ বাড়ি ফিরলেন বেলা এগারটা নাগাদ। বাজারে এই ভোরে-ভোরেই চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। একজন ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে রাজি হয়নি। সন্ত্রাসীরা তার দোকানে হামলা চালিয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট বন্ধ করে বেরিয়ে আসে। ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেলে পরে আবার বাজার খোলে। এতেই ঘণ্টাখানিক সময় নষ্ট হয়।
বাড়ি ফিরে বাজার সামলানোই তার প্রথম কাজ। সেটা করে মূলত কাজের মেয়ে, কিন্তু দেখ-ভালো করতে হয় তাকে। ডাইনিং-এর পাশে কমন ওয়াশরুমে ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকলেন মেরিনা ম্যাডাম। এখন এক কাপ চা খেয়ে লিভিংরুমে বসে একটু বিশ্রাম নেবেন খবরের কাগজ পড়তে-পড়তে, তারপর গোসল। ছুটির দিনের এই হচ্ছে তার সকালের রুটিন। অবশ্য খবরের কাগজ ততক্ষণে তার স্বামীর দখলেই থাকে। ঘরে আফজাল সাহেব নেই। অ্যাটাচ্ড ওয়াশরুম বাইরে থেকে ভেজানো। লিভিংরুমে এসে দেখলেন খবরের কাগজটা পড়ে রয়েছে টেবিলের ওপর। দুধের মতো ধবধবে নীলচে সাদা ডিভানটা ফাঁকা। এই ডিভানের ওপর শুয়ে-বসেই ছুটির দিনের সকালের বিশ্রামটা সারেন আফজাল সাহেব। কাজের মেয়ে জানালো, সে সাহেবকে দেখেনি। টিয়াপাখির উপদ্রবের পর আবার সে ডাইনিং টেবিলটা সাজিয়ে দিয়েছে, সেটা তেমনই আছে। নাস্তা খাননি সাহেব।
Ñসবচেয়ে বড় কথা ম্যাডাম, সাহেব চায়ের কথা বুলেন্নি। বুল্লে তো বুঝ্তু উইঠিছেন।
ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুম সেরে লিভিংরুমে একটু বসেন আফজাল সাহেব। চা বলেন। তার সাথে বিস্কুট। খবরের কাগজের হেডিং দেখেন। গোসল সারেন। ততক্ষণে নাস্তা তৈরি। ডাইনিংটেবিলে গিয়ে বসেন। নাস্তা সেরে আবার লিভিংরুম। ডিভান। খবরের কাগজ। বেলা বারটা নাগাদ আর এক কাপ চা। তার আগে দু-এক টুকরা ফল। দুপুরের লাঞ্চ দেড়টার দিকে।
চা বলেননি মানে তার ঘুম থেকে ওঠার কথা নয়। কিন্তু বিছানায় নেই তিনি। আসলে কোথাও নেই। গোটা বাড়ি খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না তাকে।
প্রথমে সত্যি-সত্যিই আফজাল সাহেবের অনুপস্থিতির ব্যাপারটা লক্ষ্য করেননি মেরিনা ম্যাডাম। বাজারের বিষয়টা তার মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলেছিল। তার খুব খারাপ লাগছিল। গোলমালের সময় একটা দোকানে প্রায় বন্দী হয়ে ছিলেন আধাঘণ্টা মতো। একবার তো অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল দমবন্ধ ভ্যাপসা গরমে। তার মাথা ঘুরছিল, ঘুম পাচ্ছিল। এখন স্বামীকে রোজকার মতো না পেয়ে তার খারাপ বোধটা আবার
ফিরে এলো।
লিভিংরুমে এসি চালু করে দিলো কাজের মেয়েটি। এক কাপ কফি করে আনল। ভোর-ভোর নাস্তা করার অভ্যাস ম্যাডামের, ছুটির দিনেও তার ব্যাত্যয় ঘটে না। আজও ঘটেনি। দুপুরের আগে আর কিছু খান না তিনি। তবু কয়েকটা বিস্কুট এনে রাখল মেয়েটি।
কয়েক চুমুক কফি পান করেই তার ভালো বোধ হতে লাগল। তখন মোবাইল ফোন বের করলেন। রিং হচ্ছে, কিন্তু ধরছেন না আফজাল সাহেব। কয়েকবার চেষ্টা করেও পাওয়া গেল না। আসলে মোবাইল ফোন নিয়ে যাননি তিনি, সেটা তার শয়নকক্ষেই পড়ে রয়েছে বিছানার পাশের সাইডটেবিলে, যথারীতি। সেটা কিছুক্ষণ পর ঘর গোছাতে গিয়ে কাজের মেয়েটি আবিষ্কার করলো।
‘তাহলে কোথাও বেরিয়েছে তাড়াহুড়ো করে’, ভাবলেন মেরিনা ম্যাডাম।
একটার দিকে লাঞ্চের টেবিল সাজাতে লাগলেন। নিজের হাতে সালাদ তৈরি করলেন শসা, বিট লবণ, গোলমরিচের গুঁড়ো আর টকদই দিয়ে। এই সালাদ খুব পছন্দ ‘ফাজিল’ লোকটার।
দু’টো বেজে গেল তবু ফিরলেন না আফজাল সাহেব। এবার উদ্বিগ্ন হলেন মেরিনা ম্যাডাম। এমন তো হয়নি কখনো! খোঁজ শুরু করলেন। একের পর এক টেলিফোন আর ফোন করতে লাগলেন ঘনিষ্ঠজনদের কাছে। তারপর স্বল্প পরিচিতদের কাছেও। অফিসের কলিগদের কাছে। তিনটা নাগাদ আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবরা আসতে শুরু করল।
আশপাশের কেউ কিছু দেখেছে কিনা সেটাই প্রথমে অনুসন্ধান করে দেখা দরকার বলে সবার মনে হলো। না, কেউ তাকে দেখেনি আজ সকাল থেকে। মাঠে খেলছিল যে বাচ্চা ছেলেরা তারাও বলল একইকথা। কেবল রোকন সাহেবের ট্যারা মেয়েটা জানাল, সে একটা সবুজ টিয়াপাখিকে অনেকক্ষণ বসে থাকতে দেখেছে আফজাল সাহেবের জানালার কার্নিশে। তার কথা শুনে কাজের মেয়েটি টিয়াপাখির দুষ্কর্মের ঘটনার বিবরণ শোনাল। কিন্তু টিয়াপাখি নিয়ে ভাবার সময় কিংবা কোনো যুক্তি আছে বলে কারো মনে হলো না। কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনলই না সে কথা। আর যারা কিছু-কিছু শুনল হালকা মনে, তারা সেটাকে আমোদ হিসেবে উপভোগ করল।
আফজাল সাহেব তখন উড়ে চলেছেন। কোন দিকে চলেছেন সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। তিনি নিজেকে ছেড়ে দিয়েছেন বাতাসের গতির ওপর, তার পাখনা দুটির ওপর ভর করে। তিনি মুক্ত, বাঁধনহারা, দায়হীন, সুখী; তার মনে হচ্ছে যেন তিনি পঁচিশ বছরের যুবা হয়ে গেছেন, এতটাই সুস্থ, হালকা আর উচ্ছ্বল বোধ হচ্ছে। মেরিনা ম্যাডামের কথা একবারের জন্যও তার মনে হলো না। অন্য কারো কথাও নয়। কেবল উড়ে চলেছেন মনের সুখে। একটা বাস-স্টপ দেখে তার মনে হলো- ‘আমি কোথায় চলেছি?’ বিভ্রান্তি দেখা দিলো তার মধ্যে। একটা সাইনপোস্ট দেখে তার ওপর গিয়ে বসলেন তিনি। বাস-স্টপে শত শত গাড়ি, কোনোটা স্থির দাঁড়িয়ে, কোনোটা বেরিয়ে যাচ্ছে যাত্রী নিয়ে, কোনোটা এসে নামিয়ে দিচ্ছে যাত্রীদের। আর হাজার হাজার মানুষ, ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ, বোঁচকা-পোটলা-ব্যাগ নিয়ে হুড়োহুড়ি করছে। ওদের সবারই কোনো না কোনো গন্তব্য আছে। অথচ তিনি ভেবে পাচ্ছেন না কোথায় যাবেন। কেবলই উড়ে চলার কি কোনো মানে হয়? নাকি স্বাধীনতা মানেই অনির্দেশ্যতা?
দুটো পায়রা এসে বসল তার পাশে। অল্পবয়েসী, হয়তো খুব সম্প্রতি জোড় বেঁধেছে। তারা জীবিকা নির্বাহের সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে লাগল।
-এই শহরে আর বাস করা যাবে না।
-হ্যাঁ, গাছপালা, বন-জঙ্গল বলে আর কিছু থাকছে না।
-আর মানুষগুলোও কেমন কৃপণ স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে।
-কেউ যেন কারো নয় এখানে। দেখছ, কত মানুষ? অথচ কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না, থাকছে পাশাপাশি, হয়তো বা একই বাড়িতে, একই ঘরেও, অথচ কত আলাদা, নিঃসঙ্গ, একাকী!
-এ একটা রোগ বুঝলে? নৈঃসঙ্গ্য- সুখহীনতাবোধ। যার নেই তার তো নেই-ই, যার সব আছে, সে-ও অসুখি। তাকিয়ে দেখ ওদের মুখ-চোখের দিকে, সবাই কেমন ক্লান্ত, অবসন্ন।
-এটা একটা সংক্রামক রোগ। আমাদেরও কবে না আক্রমণ করে বসে! চলো, আর দেরি করা ঠিক হবে না।
উড়ে গেল পায়রা দম্পতি।
‘আমি তো প্রৌঢ়, বলতে গেলে বৃদ্ধই, আমার জীবন আর কয়দিন?’ বিব্রত বোধ করতে লাগলেন আফজাল সাহেব। তারপর ভাবলেন, ‘কী আর এমন বৃদ্ধ! জীবনটাকে উপভোগ করো, শেষবিন্দু পর্যন্ত।’ বলে উড়াল দিলেন ওই পায়রাগুলোর পথ ধরে। ওরা ততক্ষণে হারিয়ে গেছে দৃষ্টি সীমানার বাইরে। কোনদিকে গেল কে জানে!
বিকেল যখন চারটা বাজল, অথচ ফিরলেন না আফজাল সাহেব, কিংবা কেউ কোনো দূরতম সূত্রও সন্ধান করে পেল না তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সম্পর্কে, তখন পুলিশ ও র‌্যাবকে জানানোর কথা উঠল।
‘আজকাল গুম-খুন যেভাবে ঘটে চলেছে অবাধে…’
লোকটার কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন আরেকজন, ‘ঠিক বলেছেন। পুলিশ বা র‌্যাব গুম করল না তো?’
‘তা কেন করবে? উনি তো রাজনীতি করেননি কখনো।’ বললেন একজন।
‘এখনো করেন না। সেজন্যেই তো তার প্রোমোশন হয় না কোনো আমলেই।’ বললেন আফজাল সাহেবের এক সহকর্মী।
‘রাজনীতি না করলেও গুম-খুন হয়- চাঁদাবাজি, আটকবাণিজ্য… তাছাড়া শুধু পুলিশ-র‌্যাবের কথাই বা ভাবছেন কেন, কোনো চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী গ্রুপও তো তাকে অপহরণ করতে পারে! টাকার জন্যে?’
একজন বললেন, ‘আরে ভাই, উনি তো বাড়ি থেকে বেরই হননি, কেউ তাকে বের হতে দেখেনি। আর পুলিশ, র‌্যাব বা সন্ত্রাসীরা বাড়িতে ঢুকে অপহরণ করলে তো কাজের মেয়েটা, মাঠের ছেলেমেয়েরা, বা পাড়া-প্রতিবেশিরা দেখত বা জানতে পারত।’
‘তাহলে কি হাওয়া হয়ে গেল?’
‘অবিশ্বাস্য হলেও আপাতত সেরকমই মনে হচ্ছে।’
এরপর আর কথা চলে না।
লোকজন যাচ্ছে আর আসছে।
সন্ধ্যার দিকে পুলিশ এবং র‌্যাব জানাল এরকম কোনো লোককে আটক করার অভিযান চালায়নি তারা।
‘প্রশ্নটা আটকের নয়, অপহরণের। গুমের।’
টাকা দিতে চেয়েও পুলিশ এবং র‌্যাব অপহরণ বা গুমের লাইনে কথা বলতে সম্মত
হলো না।
পথিমধ্যে বিশাল সিনেমার পোস্টার দেখে পাশের একটা কমার্শিয়াল বিল্ডিং-এর কার্নিশে বসলেন আফজাল সাহেব। তার মনে হলো, কতদিন সিনেমাহলে বসে সিনেমা দেখা হয়নি। অনেকদিন বলেছেন মেরিনাকে, রাজি করাতে পারেননি।
‘কোনো ভদ্রলোক এখন আর সিনেমাহলে যায় না। ওটা রিকশাওয়ালা মুটে-মজুর পকেটমার-ছিনতাইকারীদের জন্যে। আর আজকালকার সিনেমাও যত্তসব রদ্দিমার্কা- সেক্স আর ভায়োলেন্সে ভরা।’
মেরিনার এই কথা ফেলে দেওয়ার নয়, মেনে নিতে হয় তাকে, তার নস্টালজিয়ার আবেগ চেপে যান তিনি। ভদ্রলোক হওয়ার চেষ্টা করেন।
পোস্টার দেখে স্টারদের কাউকে চিনতে পারলেন না আফজাল সাহেব। ওদের কোনো স্মৃতি নেই তার মনে, ওরা দাগ কাটতে পারল না তার হৃদয়ে। তাছাড়া ম্যাটিনি শো শুরু হয়ে গেছে। ইভনিং শোর অনেক দেরি। তারপর নিজের রূপান্তরের কথা মনে হতে হেসে উঠলেন তিনি। -‘একটা টিয়াপাখিকে কে সিনেমা দেখতে দিবে? বরং পাকড়াও করে খাঁচায় পোরার জোগাড় করবে।’ সুতরাং বাদ দিলেন সিনেমা নিয়ে চিন্তা করা।
তাহলে কোথায় যাওয়া যায়? তিনি এখন কোনদিকে এসেছেন বুঝতে পারছেন না। শূন্যে ভেসে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা তো এই প্রথম। ওপর থেকে দুনিয়াটাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে, চিনতে অসুবিধে হচ্ছে। এই শহরে তার প্রায় চল্লিশ বছরের বসবাস। অথচ মাত্র ষোল বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ছোট্ট জনপদের অধিকাংশ জায়গাই তার অচেনা। অফিস থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে অফিস, আর কখনো-কখনো বাজার-হাট, ভাবতে কী অবাক লাগে এই ছিল তার পৃথিবীর পরিধি। এই ছোট্ট শহরটাই ভালো করে দেখা হয়নি এতদিনেও!
বিকেল গড়াচ্ছে। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। সেটা দেখে সে দিক নির্ণয় করতে পারে। এতক্ষণ সে উত্তরমুখো চলেছিল। এবার তাহলে দক্ষিণমুখো ঘোরা যাক। পদ্মার ধারে বাবলাবন তার কত প্রিয়। অথচ কতকাল সেখানে যাওয়া হয় না। কতদিন ভেবেছেন, মেরিনাকেও বলেছেন, যখন নিজেদের জন্যে বাড়ি করবেন, তখন করবেন ওইদিকেই, বা তার আশপাশে। জমি কিনে বাড়ি করার সামর্থ্য তো নেই, একটা অ্যাপার্টমেন্ট কিনবেন। কিছু টাকা জমেছে, বাকিটুকু ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে করা যায়। ইদানীং ভাবছিলেন সে কথা। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। এখন যখন তিনি পাখি হয়ে গেছেন তখন বাড়ি করার প্রশ্ন আর উঠছে না, বাবলাবনই তার জন্যে উপযুক্ত জায়গা বলে প্রতীয়মাণ
হতে পারে।
অনেকদিন ভেবেছেন স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়েই বাবলাবনে বেড়াতে যাবেন, তিনি যেহেতু যেতে চান না, কারণ ‘ছাগল-পাগল’ আর ‘বখাটে’দের ভিড় লেগে থাকে ওখানে। সেটাও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। আজ যখন সুযোগ পাওয়া গেছে তখন সেটা হাতছাড়া করতে চান না আফজাল সাহেব।
বিকেল ফুরিয়ে আসছে। টাওয়ার প্রাঙ্গণে ছায়ার আঁধার ঘনাচ্ছে। ছেলেপিলেরা খেলতে নেমেছে।
আত্মীয়-স্বজন-প্রতিবেশিদের আসা-যাওয়া চলছেই। কাজের মেয়েটা চা-বিস্কুট দিতে-দিতে পেরেশান। সে-ই এক সময় বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আপনেরা এখিনে বইসি গল্প করার চায়ে ইট্টুক ঘুরেন গা না বাহিরে যায়্যা।’
‘কোথায় খুঁজব বলো তো? কোনো সূত্র-সন্ধানই যে মিলছে না।’
মেরিনা ম্যাডামের প্রাক্তন এক ছাত্র এখন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বড় ডাক্তার। তিনি লোক লাগিয়ে শহরের প্রায় সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে খোঁজ নিয়ে জানালেন, পাওয়া যাচ্ছে না, এ রকম কোনো লোক কোনো ক্লিনিক বা হাসপাতালে যায়নি। অসুস্থ বা আহত হিসেবেও নয়, লাশ হিসেবেও নয়।
‘কিছু মনে কোরো না, ঝগড়া-ঝাটি হয়নি তো?’ বেশ সঙ্কোচ নিয়ে প্রশ্নটা করলেন দূর সম্পর্কের এক মামাশ্বশুর।
‘না, মামা।’
সত্যিই তেমন কোনো ঝগড়া বা মনোমালিন্য হয়নি। তবে অনেকদিন থেকেই মনে হচ্ছিল তাদের জীবনটা একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। কোনো সমস্যা নেই, তবু কিসের যেন অভাববোধ, কিসের যেন অন্তঃসারশূন্যতা, কিসের যেন অতৃপ্তি, কিসের যেন বিষাদ- কেমন এক বন্দিত্ববোধ অনুভূত হচ্ছিল। তারা যেন ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলেন। তার কোনো দৃশ্যমান বা বোধগম্য কারণ ছিল না। কিন্তু তার জন্যে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। বিশেষতঃ, অত্যন্ত দায়িত্বসচেতন নিয়ম-মানা মানুষ আফজাল সাহেব। তাহলে কি অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক-টম্পর্কের ব্যাপার হতে পারে? কথাটা এক ঘনিষ্ঠ সহকর্মীকে বললেন মেরিনা ম্যাডাম। উল্টো তিনিই আবার প্রশ্ন করলেন, ‘সে রকম কোনো সন্দেহ কি হয় তোমার? কোনো আকার-ইঙ্গিত?’
‘না।’
‘তবে মানুষ চেনা খুব মুশকিল, বুঝলে? মানুষের চেয়ে রহস্যময় আর-কিছু নেই পৃথিবীতে।’
আলোচনা চলতেই থাকে, যার মনে যা আসে তাই নিয়েই মতামত ব্যক্ত করতে থাকে সবাই।
বাবলাবন মানে শুধু বাবলা গাছের জঙ্গল নয়, অন্যগাছও আছে নানারকম। পদ্মার ভাঙ্গন থেকে শহরকে রক্ষা করতে, আসলে ডিসি-এসপি-জজদের বাড়ি আর সরকারি অফিস বাঁচাতে, এই বনের সৃষ্টি। এটা এখন এই শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র। বিকেল থেকে সন্ধ্যার কিছু পর পর্যন্ত এখানে দর্শনার্থীদের জটলা লেগে থাকে। ভিড় করে বাদামওয়ালা, কাটা ফল বিক্রেতা, পান-সিগারেটের হকার, কে নয়? রীতিমতো মেলা বসে যায়। মানুষরূপী কপোত-কপোতীর ঘনিষ্ঠতা জমে বসে গাছের ফাঁকে ফাঁকে। আর ছায়াময় শীতল বাতাসে মমতার আবেশ ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়।
একটা বাবলা গাছের ডালে গিয়ে বসলেন আফজাল সাহেব। তার নিচে একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা।
‘আর কদ্দিন চলবে এভাবে?’
বোঝা যাচ্ছে ওদের প্রেম বেশ পুরনো। সেজন্যে আবেগ কম। বেশি ঘেঁষাঘেষি দেখা যাচ্ছে না।
‘আর ভালো লাগে না।’
ছেলেটির বয়স হবে প্রায় চল্লিশ, আর মেয়েটির হয়তো তিরিশ-বত্রিশ।
‘কী ব্যাপার, কথা বলছ না কেন? আর কদ্দিন চলবে এভাবে?- পার্কে, বাজারে, কিংবা বাবলাবনে?’
তবুও নিরুত্তর ছেলেটি।
‘ঘর-সংসার হবে? বাপ-মাকে আর কী বলে বোঝাবো? বলো?’
ছেলেটি বাদাম চিবাচ্ছে। মেয়েটি হঠাৎ বাদামের ঠোঙ্গাটা হাতের এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলে দিলো। তবু নির্বিকার ছেলেটি। কিন্তু আফজাল সাহেব নির্বিকার থাকতে পারলেন না। সারাদিন তেমন খাওয়া-দাওয়া জোটেনি। তিনি দ্রুত ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে নামলেন। বাদাম খুঁটে খেতে লাগলেন। সেটা নজরে পড়ল ছেলেটির। -‘আরে… দেখ, দেখ, কী সুন্দর টিয়াপাখি!’
মেয়েটি রাগ ভুলে তাকালো টিয়াপাখির দিকে। -‘সত্যিই তো! ভারি সুন্দর!’
‘এত বড় টিয়াপাখি সচরাচর দেখা যায় না। আজকাল পাখিরা তো সব শেষ
হয়ে যাচ্ছে।’
ওদের দৃষ্টির সামনে বিব্রতবোধ হতে লাগল আফজাল সাহেবের। তিনি যেন ভুলেই গেলেন যে তিনি মানুষ নন, একটা পাখি মাত্র। কিন্তু বেশিক্ষণ ভুলে থাকতে পারলেন না। মুহূর্তের মধ্যেই আরো অনেকগুলো পাখি এসে জুটল। হুড়োহুড়ি, কাড়াকাড়ি, মারামারি শুরু হয়ে গেল। সরে দাঁড়ালেন তিনি।
গোটা বাবলাবন ঘুরে-ঘুরে দেখলেন আফজাল সাহেব। গাছে-গাছে অনেক পাখি। অনেকেই বাসা বেঁধেছে। কোনো-কোনো বাসায় ডিমে তা দিচ্ছে কেউ-কেউ। কোথাও সদ্যোজাত বাচ্চার কিচির-মিচির। কিন্তু কোনো টিয়াপাখি দেখতে পেলেন না। বরং তাকে দেখে উৎসুক সবাই, কোনো অচেনা আগন্তুককে দেখলে যেমন হয়। কোনো কোনো দুষ্টু পাখি তার পেছনেও লাগছিল।
বনে সন্ধ্যা নামে সূর্য ডোবার আগেই। বাবলাবন সে রকম ঘন বন না হলেও আলো কমে আসছে দ্রুত। তিনি নদীর কিনারে গিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে-ওঠা একটা বাবলা গাছের ডালে গিয়ে বসলেন। নদীটা শুকনো। টিলার মতো উঁচু বিস্তৃত বালুচরে ঢাকা তার উদোম বুক। তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সরু খালের মতো একটা ¯্রােতধারা ঝিকমিক করছে। চরের দিক থেকে উড়ে এসে এক শালিক দম্পতি বসল তার নিচের একটা ডালে।
‘বেলা পড়ে এলো, চলো যাওয়া যাক।’ পুরুষটি বলল।
‘আজকের দিনটা এমন খারাপ যাবে ভাবিনি।’ মেয়েটি উত্তর দিলো।
‘রোজ কি একরকম যায়? দিন খুঁটে দিন খাওয়া ভাগ্য আমাদের। এ রকম তো হবেই। ও নিয়ে ভাবলে চলবে না। চলো বাসায় যাই। বড্ড ক্লান্তি লাগছে।’
‘হ্যাঁ, চলো। খাই না-খাই বাসায় গিয়ে আরাম্সে ঘুমাবো সারা রাত। ওইটুকুই শান্তি!’
ওরা চলে গেল। তখন আফজাল সাহেবের মনে হলো, ‘আমিও বড্ড ক্লান্ত।’ এখন কোথায় যাব আমি? আমার তো বাসা নেই! আমি একা। নিঃসঙ্গ।’
অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হলো, কিন্তু মোদ্দা কথা দাঁড়ালো এই যে, আফজাল সাহেব নিখোঁজ, তার কোনো সন্ধান মিলছে না। এতটুকু সূত্র-সংবাদও কেউ দিতে পারছে না। ভাবতে লাগলেন মেরিনা ম্যাডাম। তার মনে হলো, সত্যিই তিনি একা হয়ে পড়েছেন। ইদানীং তাদের মধ্যেকার সম্পর্কটা যান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল। কিসের এক ক্লান্তি যেন অসাড় করে তুলেছিল তাদের। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে এই নৈঃসঙ্গ্যের মধ্যেও সঙ্গবোধ ছিল। তা নাহলে এখন এমন শূন্যবোধ হচ্ছে কেন? শেষে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন তিনি। -‘ঠিক আছে, যাক; যে চলে গেছে, সে যাক। কাউকে দিয়ে জোর করে ভালোবাসানো যায় না। তার যদি আমার সঙ্গে থাকতে আর ভালো না লাগে তো সে চলে গিয়ে ভালোই করেছে।’
‘আরে না, কী বলছ তুমি বোকার মতো! আফজাল সাহেব সেরকম লোকই নন। হয়তো কোনো জরুরি কাজে বাইরে গেছেন, ফিরতে দেরি হচ্ছে।’
‘তাহলে একটা ফোন তো করতে পারত!’
‘মোবাইল রেখে গেছেন না? তাছাড়া ফোন করার মতো অবস্থায় হয়তো নেই। ভাবছেন এই তো যাচ্ছি, এই করতে-করতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
তার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন সহকর্মীটি। তিনি রাতটা থাকতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না, ভাবলেন মেরিনা ম্যাডাম। তারও তো ঘর-সংসার আছে। তার মনে হলো, সহকর্মীটির দাম্পত্য জীবনের কথা। তার স্বামী লোকটি, ডাকসাইটে সরকারি আমলা একজন, রাগী মানুষ। তাকে স্বৈরাচারীও বলা চলে। সহকর্মীটিও কম যায় না। তবু তারা সংসার করছে! হাসছে, খেলছে, মার্কেটিং-এ যাচ্ছে, পার্টি-ফাংশান কিছুই বাদ যাচ্ছে না। ওদের কি কখনো ক্লান্তিবোধ হয় না? ওরা কি কখনো কাউকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবে?
‘সাহেব হয়তো ভাববেন। তোমার যাওয়াই উচিত হবে। তাছাড়া আমার কোনো অসুবিধা হবে না। তুমি যাও।’
সহকর্মীটি মানলেন তার কথা।
পরের দিন তত্ত্ব-তালাশ নেওয়ার কথা বলে একে-একে বিদায় নিলেন অন্যরাও।
আফজাল সাহেব সোজা পথ ধরলেন। পদ্মা গার্ডেনের সামনে কনসার্ট বসেছে। শত-শত তরুণ-তরুণীর উচ্ছাসে ফেটে পড়ছে পদ্মার পাড়। একটুক্ষণ শুনলেন তিনিও। রাজশাহী কলেজের মাঠে ফুটবল খেলায় সাঙ্গ দিয়ে হোস্টেলে ফিরছে ছাত্ররা। সাহেববাজার আলোয় অলোয় ঝলকাচ্ছে। রাস্তাভর্তি গিজগিজ করছে মানুষ। ভদ্রা মোড়ে পৌঁছার আগেই মাগরিবের আজান শুরু হলো চারদিকে। তার মনে হলো ক্লান্তিতে শরীর নুয়ে পড়ছে। তিনি আর উড়তে পারছেন না। দুলতে-দুলতে, একবার ওপরে একবার নিচে করতে-করতে টাওয়ার প্রাঙ্গণে এসে ধপ করে যেন পড়েই গেলেন। সাদা, লাল, নীল আলোয় ধোঁয়াটে রহস্যাবৃত হয়ে আছে প্রাঙ্গণটা। কেউ দেখল না তাকে। মাটি-জমাট ঘাসের ওপর শুয়ে থাকতে ভারি আরাম বোধ হতে লাগল।
মেরিনা ম্যাডাম লিভিংরুমে তাদের ছবির অ্যালবাম খুলে বসেছেন। এই মুহূর্তে তার সামনে তাদের বিয়ের সময়কার একটা ছবি। কী তীক্ষ্ণ আর দুষ্টুমিতে-ভরা চোখ দুটি আফজালের! -‘সত্যিকারের ফাজিল একটা!’ আপন মনেই বললেন মেরিনা ম্যাডাম। তখন ধীরপায়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন আফজাল সাহেব। তাকে দেখে মেরিনা ম্যাডাম চেঁচিয়ে উঠলেন- ‘ফাজিল!’
আফজাল সাহেব উল্লসিত ও উত্তেজিত স্ত্রীর দিকে একবারও না তাকিয়ে সোজা শোবার ঘরের দিকে এগুলেন।
‘কোথায় ছিলে সারাদিন? কিছু না জানিয়ে কোথায় ছিলে এতক্ষণ?’
‘আমি বড্ড ক্লান্ত। চলো বাসায় যাই।’
‘ক্লান্ত? বাসায়?’
লোকটা যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছে। ‘হ্যাঁ…’
রীতিমতো দুলছেন তিনি।
অ্যালবাম ফেলে রেখে ছুটে গিয়ে স্বামীকে ধরলেন মেরিনা। সত্যিই বড় ক্লান্ত আফজাল সাহেব, পা ফেলছেন তো তুলতে পারছেন না। গোটা শরীর ঘামে ভেজা। দ্রুত বিছানা ঝেড়ে তাকে তার ওপর বসালেন তিনি। এসি চালু করে দিলেন।
আফজাল সাহেব গায়ের চাদর টেনে নিয়ে পেছন ঘুরে শুয়ে পড়লেন। আর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেলেন সঙ্গে-সঙ্গে। ঘুমন্ত স্বামীর বিষণ্ন ম্লান ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন মেরিনা। সারাদিনের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা যেন একসঙ্গে ক্লান্তি হয়ে চেপে ধরলো তাকেও।