খ্যাতিমান শিশু সাহিত্যিক সোহেল মল্লিক, আমার শ্রদ্ধেয় এবং খুব প্রিয় একজন স্যার। তিনি কি করে আমার স্যার হলেন? সে কথা জানতে হলে বর্তমান থেকে একটু পেছনের দিকে যেতে হবে। আমি যখন ধানমন্ডি ল’কলেজে ভর্তি হলাম তখন সোহেল মল্লিক স্যার ঐ কলেজে পড়াতেন। স্যার, আমাদের জুরিসপ্রুন্ডেনস ও লেবার ল’এই দুটি বিষয়ের ক্লাস নিতেন।প্রথম যেদিন স্যার ক্লাস নিতে আসলেন সেদিন ভেবেছিলাম খুব বয়স্ক একজন শিক্ষক হবেন কিন্তু তাঁকে এবং তাঁর পোশাক দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কারণ তাঁকে টিশার্ট আর জিন্স প্যান্টে দেখাচ্ছিল একজন ইয়াং, উচ্ছল ও প্রানবন্ত একজন মানুষ।

তারপরেও তাঁর প্রতি আমাদের যে সংশয় তা তখনো কাটেনি! কিন্তু স্যার, আমাদের সকল সংশয় চিৎপটাং করে দিল তাঁর হাসিমাখা মুখে সকলের কাছে প্রশ্ন করে, আমরা কেমন আছি তা জানতে চেয়ে। তারপর তিনি একে একে সবার পরিচয় ও নাম জানতে চাইলেন। স্যারকে আমরা একে একে আমাদের নাম এবং পরিচয় দিলাম। আমরা সবাই মিলে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলতে বললাম।

স্যার এক এক করে আমাদের সকলের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন।তিনি ধানমণ্ডি গভঃবয়েজ হাই স্কুল থেকে এসএসসি, নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি, ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রি নেন। পরবর্তীতে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে গ্রাজুয়েশন ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রি নেন।সবচেয়ে কম বয়সে হয়েছিল ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর(পি.পি.) এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় পাচার প্রতিরোধ কমিটির সদস্য।

আমরা আরও জানতে পারলাম, স্যারের লেখালেখি শুরু স্কুল জীবন থেকে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প “বেওয়ারিশ লাশ” প্রকাশিত হয়, অলি আহাদের সাপ্তাহিক ইত্তেহাদে ১০ এপ্রিল ১৯৮১ সালে। তাছাড়া তিনি ছাত্রাবস্থাতে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা করেছেন।তাঁর লেখা অনেক বইয়ের জন্য তিনি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। স্যারের বিভিন্ন বইয়ের নাম হয়তো অন্যান্যদের লেখায় পেয়ে যাব তাই আর লিখলাম না।

আবার ফিরে আসি আমাদের ল’কলেজে। একদিন স্যার যখন পড়া ধরছিলেন সবাইকে তখন একটি ছেলে বলল, স্যার আমি বলতে পারবোনা ফাহমিদা আপাকে বলতে বলেন এই বলে আমাকে দেখিয়ে দিল। স্যার বললেন, নাম কি ফাহমিদা? আমি বল্লাম, জি স্যার। তখন স্যার বললেন, খুব সুন্দর নাম। স্যার পড়াতেন খুব সুন্দর করে। যখনি কোন অধ্যায় পড়াতেন তখন তিনি সেই অধ্যায়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক সত্য ঘটনা তুলে ধরতেন তার ফলে আমরা খুব সহজেই যে কোন পড়া বুঝতে পারতাম। আমাদের কোন অসুবিধা হতো না। অনেক সময় স্যার তাঁর কাজের জন্য ঢাকার বাইরে যেতেন। তখন আমরা সবাই তাঁর ক্লাসে স্যারকে মিস করতাম! যদিও ক্লাস যথারীতি চলতো অন্য কোন স্যারকে দিয়ে কিন্তু আমাদের ভাল লাগত না। স্যার আমাদের যেমন শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তেমনি তাঁর বন্ধুসুলভ মনোভাবের জন্য সকলের বন্ধুও ছিলেন। আমরা সকলে তাঁর সাথে সব কথা শেয়ার করতাম।তিনি আমাদের ভালোমন্দ বুঝিয়ে দিতেন। পরবর্তীতে স্যার আমাদের সবাইকে তুমি করেই বলতেন। স্যার যে কঠোর ছিলেন না, তা বোলব না।কারণ কেউ কোন অন্যায় করলে তাঁর মুখ দেখেই বুঝা যেত।তখন তাঁর হাসিমাখা মুখটিতে রাজ্যের বিরক্ত দেখা যেত।কিন্তু তিনি মুখে কাউকে কিছু বলতেন না। অনেক সময় তাঁর পড়াটা তিনি ঠিকই আদায় করে নিতেন।

স্যার আমাকে সবসময় বলতো, ফাহমিদা তুমি ভালো করবে এই আইন বিষয়ে। কারণ ক্লাসে আমি আমার জানার আগ্রহ থেকে, স্যারকে অনেক প্রশ্ন করতাম। সেই কারণে একদিন আমি স্যারের কাছে জানতে চাইলাম যে, স্যার আমাদের দেশের আবহাওয়া তো খুব গরম তাহলে কেন আমাদের ল’য়ারদের কাল কোট পড়তে হয়?তখন স্যার আমাকে হাসিমুখে বললেন, ফাহমিদা তুমি যখন ল’য়ার হবে তখন আমরা আন্দোলন করে ব্রিটিশদের দেওয়া কাল কোট পালটিয়ে সাদা করে ফেলবো। আমিও মজা করেই বলেছি-অবশ্যই তাই হবে স্যার, যদি আমি ল’য়ার হই।কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার আর স্যারের সাথে কাজ করা হলনা। সংসার আর মেয়েকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

তারপর জীবন থেকে অনেকগুলো বছর প্রায় ১৩/১৪ বছর কেটে গেল।হঠাৎ করেই আমি সাহিত্য অঙ্গনে পদার্পন করলাম। যদিও আমি ১৯৮৬ সাল থেকেই লিখছি তবে প্রকাশ করেছি প্রায় তিন বছর হল। এর মাঝে আমাকে“শিশু সাহিত্য ফোরাম”এর একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন জানালেন শিশুসাহিত্যিক হুমায়ুন কবির ঢালী এবং শিশুসাহিত্যিক ও প্রকাশক মঈন মুরসালিন। আমি সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি অনেক স্বনামধন্য লেখক-লেখিকা বসে আছেন। তাঁদের পাশে গিয়ে বসলাম।হঠাৎ করে দেখলাম আমাদের ল’কলেজের সবার প্রিয় স্যার কয়েকজনের সাথে কথা বলছেন। আমি তাঁকে দেখে এতই আনন্দিত হলাম তা ভাষায় প্রকশ করা যাবে না। মনে হল বহু বছর পর স্যারকে দেখলাম! কিন্তু স্যার ঠিক আগের মতই আছেন, সেরকম উচ্ছল ও প্রাণবন্ত। আমি আস্তে আস্তে স্যারের কাছে গিয়ে বললাম, স্যার চিনতে পারছেন? স্যার আমাকে দেখেই অবাক হয়ে বললেন, ফাহমিদা!কী খবর? তুমি এখানে? আমি বল্লাম, আমি আমন্ত্রণ পেয়ে এসেছি। সে খুব খুশী হল জেনে যে, আমি লেখালেখির জগতে এসেছি। তারপর স্যার সবার সাথে এভাবে পরিচয় করিয়ে দিল যে, আমার খুব প্রিয় ছাত্রী এবং অনেক ভাল ছাত্রী ছিল। আমার খুব গর্ব হচ্ছিল আবার লজ্জাও পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে, আমি তো আমাকে নিয়ে স্যারের যে আশা ছিল তাতো পূরণ করতে পারিনি! তবে আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল এই ভেবে যে, সাহিত্য অঙ্গনে স্যারকে পেয়ে আমি আমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী পেলাম।

আজকে স্যারের জন্মদিনের জন্য লিখতে বসে অনেক অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে, তবে সব স্মৃতি লিখে শেষ করা যাবেনা। যদি সব লিখতে বসি তবে স্যারের জন্মমদিন উপলক্ষে সংকলনের পুরো একটি আমার জন্নই লাগবে, আর কেউ লিখার সুযোগই পাবেনা।তাই অল্প কিছু ঘটনা সবার সাথে শেয়ার করলাম।

স্যার, আপনি ১৪/১৫ বছর আগে যেমন চিরসবুজ ছিলেন এখনো তেমনি আছেন। তাই আমার আশা, আগামী বছরগুলোতেও আপনি তেমনি থাকবেন। আপনার জন্য জন্মদিনের অনেক অনেক শুভ কামনা ও শুভেচ্ছা রইল। আল্লাহ্ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন, আমিন।

রহমান ফাহমিদা
১৭/০৭/১৭ইং