দিগন্ত টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে রেকর্ডিং করতে গিয়েছি পুরানা পল্টনে। টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে এল একটি সংবাদ : মতিউর রহমান মল্লিক আর নেই। বুকটা ধক করে উঠলো। মনে মনে পড়লাম, ‘ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্নাইলাইহে রাজিউন’। পরিচিত পৃথিবীর দিগন্ত থেকে যখন একে একে বন্ধুরা বিদায় নিয়ে চলে যায়, তখন মনের যে অবস্থাটি হয় তাকে অস্বীকার করা যায় না। মাত্র চার বছর আগে শিল্পী-গীতিকার-কবি মতিউর রহমান মল্লি­ক আমার জন্যে একটি সম্বর্ধনার আয়োজন করেন। তার পরিচালিত ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রে দীর্ঘক্ষণ আমার বিশ্বাস ও আকিদা সম্পর্কে বক্তব্য রাখি, মূলতঃ মতিউর রহমান মল্লি­কের আহ্বানে ও প্রেরণায়।

তাকে খুব কাছ থেকে দেখতে পাওয়ার সুযোগ পাই নি। মনে হয়েছে ইসলামের প্রতি তার ভালবাসা ও কমিটমেন্ট ছিল শতকরা একশ’ ভাগ। তার মৃত্যুর পর একটি বিরাট সভা আয়োজিত হয়, যার বক্তারা এক বাক্যে স্বীকার করেন যে বাংলাভাষা সাহিত্য ও সংগীতের ক্ষেত্রে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের ভাষা দিবসে পঞ্চাশ বছরের পূর্তি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন কবি আল মাহমুদ, আলোচক নাসির হেলাল, মুহম্মদ আশরাফুল ইসলাম, কবি আসাদ বিন হাফিজ, কবি মুকুল চৌধুরী ও জনাব শাহাবুদ্দিন আহমেদ। সভাটি উপস্থাপনা করেন শরীফ বায়জীদ মাহমুদ ও আহসান হাবিব। সম্বর্ধনার ইতিবৃত্ত ছাপা হয়েছে বটে, তবে এর পেছনে ছিলেন যে ব্যক্তিটি তার নাম ছাপা হয়নি, তিনি হলেন মতিউর রহমান মল্লিক।

তার লেখা গান বিভিন্ন শিল্পীরা যখন নিজেরা সুর দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতে থাকেন, তখন আমি অবাক হয়ে যাই, এইভেবে যে গানগুলো তেমন প্রচার পেল না। বৈরী রেডিও ও টেলিভিশন মল্লি­কের গানগুলো যদি প্রচার করত তা হলে এদেশ নজরুল ফররুখের পরে একজন সত্যিকারের সফল গীতিকারের দেখা পেত। তা সম্ভব হয়নি, কারণ রেডিও এবং টেলিভিশন তা প্রচার করে নি। ক্যাসেট ও সিডিতে তার গান অবশ্যই বিভিন্ন মাহফিলে স্থান করে নিয়েছে, কিন্তু বৃহত্তর সংগীত সমাজে তা প্রবেশের সুযোগ পায় নি। এতে মল্লিকের ক্ষতি হয়নি, হয়েছে দেশের। ফররুখ আহমেদের বহু গান এখন বিস্মৃত, কারণ আমরা এখন ইসলাম থেকে বহু দূরে সরে এসেছি। নজরুল ইসলামের ইসলামি গানুগলোও গাওয়া হয় না। নতুন প্রজন্ম জানতে পারে নি কিভাবে কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দিন সমগ্র অবিভক্ত বাংলায় এনেছিলেন নব জাগরণ এই গানগুলোর মাধ্যমে। প্রচার মাধ্যম ধীরে ধীরে এই গানগুলোকে গায়েব করে দেয়। এখনও হাজার হাজার শ্রোতা শুনতে চান : ‘দিকে দিকে পুনঃ জ্বলিয়া উঠিছে দ্বীনই ইসলামি লাল মশাল/ ওরে বেখবর তুইও ওঠ জেগে তুইও তোর প্রাণ প্রদীপ জ্বাল’। ও এরকম আরও সহস্র গান।

মুসলমানরা জেগে গিয়ে যদি ঘুমিয়ে পড়ে তার দায়িত্ব নজরুলের নয়, আব্বাসউদ্দিনের নয়। তেমনি মল্লি­কের গানগুলো যে প্রচার পেল না তার দায়িত্ব মল্লি­কের নয়, সমগ্র জাতির। জাতি যা চাইবে তাই পরিবেশিত হবে। এখন চাইছে এমন সংগীত যার আবেদন শুধু দেহে, মনে নয়। যদি মনেও হয়ে থাকে, কখনও তা ইসলামি আকিদার বিপরীত। যখন গানের মহফিলে যাই ও দেখি যে কয়েক হাজার লোক সংগীতের জন্যে অপেক্ষমান, অথচ অপেক্ষমান নয় আল্লাহ্র আহ্বানের, মিনার থেকে ভেসে এল আসর মাগরিব এশা, একটি লোকও স্থান ত্যাগ করল না, মস্জিদে গেল না। এই সংগীত আমার পছন্দের সংগীত হতে পারে না, বরং তা আল্লাহ্ থেকে অনেক দূরে এবং সঙ্গত কারণেই বর্জনিয়। যে গান আল্লাহ্র স্মরণ মানুষকে দূরে রাখে, তা অবশ্যই শয়তানের বাঁশরি, শয়তানের সংগীত। মতিউর রহমান মল্লি­ক লিখেছিলেন :

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ/ নেই কেহ নেই আল্লাহ ছাড়া।।
পাখির গানে গানে হাওয়ার তানে তানে/ ঐ নামেরই পাই মহিমা হলে আপন হারা।।
ফুলের ঘ্রাণে ঘ্রাণে, অলীক গুঞ্জরণে/ ঐ নামেরই গান শুনে মন দেয় যে নীরব সারা।।
নদীর কলতানে, ঢেউয়ের ছলে ছলে/ ঐ নামেরই সুর শোনা যায় হলে আপন হারা।।
তারার চোখে চোখে, চাঁদের মুখে মুখে/ ঐ নামেরই নূর দেখা যায় হলে পাগল পারা।।
আকাশ নীলে নীলে, মুখর ঝিলে ঝিলে/ ঐ নামের ঝর্ণাধারা আকুল ব্যাকুল পারা।।

উপরোক্ত গানটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে তার মধ্যে যতখানি ছিল উদ্দীপনা ততখানি কাব্যসুষমা নয়। তাই প্রাগুক্ত অনুষ্ঠানে যখন তাকে নজরুল ও ফররুখের পঙক্তিভুক্ত করা হয় তখন উদ্দীপনার অংশটুকুই তাতে ধরা পড়ে, বাকিটা নয়। নজরুল চারহাজার গান লিখে বাংলার সংগীত ভূখন্ডকে অধিকার করেছিলেন, ইসলামি গান তার রাজত্বের একটি অংশ মাত্র।
মল্লি­কের অপর গানটি :

এই দু’টি চোখ দিয়েছ বলে/ দেখি যে কতই অপরূপ
নয়নাভিরাম ক্ষেত-খামারে/ জুড়ায় জ্বালা বিধুর ধুপ।।

ঐ নিসর্গের বাঁকে বাঁকে/ মনযে আমার পড়েই থাকে
তোমার কারুকাজের মেলায়/ আনন্দে মোর ভরে বুক।।

তোমার দেয়া চোখের শোকর/ জানাব তার ভাষা কই
যতই ভাবি ততই যেন/ পলক হারা চেয়ে রই।।

তোমার সৃষ্টি ওগো রহিম/ দিগ-দিগন্তে অশেষ অসীম
ফুল ফসলের অতুল শোভায়/ বাক হারা হই রইযে চুপ।।

গান দু’টি মতিউর রহমান মল্লি­ক স্মরণে একটি অডিও সিডিতে গাওয়ার জন্যে পাঠানো হয়েছে। খুশি হয়ে রাজি হয়েছি। একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই আশা করি গানগুলোর মাধ্যমে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারব।

১৩ ফেব্ররুয়ারি, ২০১১