স্টেশন থেকে ট্রেন এখনও ছাড়েনিl তবে প্রতিটি বগি যাত্রীতে ভর্তি হয়ে হয়েগেছেl অনেকেই বসার সুযোগ পাইনিl বাধ্য হয়ে বগির ভিতর দাঁড়িয়ে আছেl যারা বসার সুযোগ পেয়েছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন হাবভাব দেখায় যে ট্রেনটা তাদের বাপেরl

সিঙ্গল সিটে বসে আছে রেহেনাl তার বিপরীতে বসে আছে তার ছয় বছরের ছেলেl নিজেকে এমন ভাবে সাজিয়ে রেখেছে যেন সে রাজরানীl তার রূপের জন্য বড়ই অহংকারl ভিড়ের কারনে তার শরীরে একটু স্পর্শ হলে জ্বলে উঠে তেলে বেগুনেl সেই বগিতে উঠেছেন ফারুক সাহেবl তিনি আসতে আসতে রেহেনার সিটের কাছে আসেনl কোন ক্রমে অজান্তে একটু স্পর্শ হয় তার পায়েl আর তাতেই রেহেনা যেন এক ডাইনীতে পরিণত হয়l ফারুক সাহেবকে তার ক্ষোভের আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে চাইl

ফারুক সাহেব পরস্থিতি বুজেই আগেই হাত জোড়া একসাথে করে তার দিকে তাকিয়ে বললেন- আমার ভুল হয়েছে মাl আমাকে ক্ষমা কর l
-আমাকে লাথি মেরে বলছেন ভুল হয়েছেl
-যদি তোমার রাগ না মেটে তাহলে আমাকে যতখুশি লাথি মারl আমার কোন দুঃখ থাকবে নাl
একথা বলার পরও রেহেনা থামতে চাইনাl যেন আসলেই লাথি মারতে চাইl

পাশের সিটে বসে থাকা একটি ছেলে এই সব দৃশ্য দেখছিলl অজান্তে একটু স্পর্শ করার জন্য বার বার ক্ষমা চাইলেও মেয়েটির রাগ না মেটায় ছেলেটির প্রতিবাদী মনকে আলোড়িত করেl বাধ্য হয়ে উঠে ফারুক সাহেবকে বলল- ‘আপনি আমার সিটে বসুন আমি দেখছি ব্যাপারটা’l
ফারুক সাহেব বসতে না চলেও জোর করে বসাল l আর সে রেহেনাকে বলল- দেখছি আপনার বিবেক বলে কিছু নেইl
রেহেনা তির্যক চোখে তাকিয়ে বলল- বিবেক দেখাচ্ছেl বি-বে-কl লাথি মারার সময় কোথায় ছিলেন?
-এখানেই ছিলামl আমি সব দেখেছিl
-আপনি ঘোড়ার ডিম দেখেছেনl
ছেলেটি চোখ লাল করে বলল- চুপ করেনl একটিও কথা বলবেন নাl এত অহংকার ভালো নাl এত যদি কষ্ট হয় তবে চার চাকায় যান অথবা উড়োজাহাজে যানl
অন্যান্য যাত্রীরা ছেটিকে সমর্থন করলl বাধ্য হয়ে রেহেনাকে মুখ বন্ধ করতে হলl কিন্তু প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে তার মনl

ফারুক সাহেব পুতুলের মত নির্জীব বস্তু হয়ে বসে আছেনl চোখের পলক পড়েনাl মনের ভেতর একটি প্রশ্ন বার বার নাড়া দিচ্ছেl অজান্তে একটু স্পর্শ করার জন্য এত বড় অপমানl ছেলেটি তার সামনে দঁড়িয়ে বলল- কাকু এদের কথায় কিছু মনে করবেন নাl এরা আসলে নিজেকে মনে করে এই গ্রহের মালিকl
ফারুক সাহেব ব্যাথাহত হয়ে ছেলেটির হাত ধরে বললেন- তুমি যে উপকার করলে বাবা তার ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব নাl
ছেলেটি মুচকি হেসে বলল- মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিতl তাছাড়া আপনি তো কোন ভুল করেননিl ভুল করেছে ওl

রেহেনার স্বামী আরাফাতের পেট খারাপ হয় তাই সে গেছিল ট্রেনের পায়খানাতেl নিজের প্রয়োজনীয় কাজ সেরে তাদের কাছে আসেl তার ছেলেকে কোলে নিয়ে সিটে বসতে যাবে ঠিক সেই সময় ফারুক সাহেবকে দেখতে পাইl সে না বসে ফারুক সাহেবের কাছে গিয়ে বলল- ভালো আছেন স্যারl
ফারুক সাহেব তার দিকে তাকিয়ে বললেন- ভালো আছিl
একটু ভাবার পর বললেন- তোমাকে চিনতে পারলাম না বাবাl
-স্যার, আমি আরাফাতl
-ওহl তুমি তো অনেক পাল্টে গেছl
-স্যার সব তো আপনার জন্যl আপনি যদি আমাকে শিক্ষার আলো না দেখাতেন তাহলে তো হয়তো একটা মাফিয়া তৈরী হতামl আপনার জন্য মানুষ হতে পেরেছিl
-তুমি এখন কি করছ বাবা?
-স্যারl আমি জয়েন্ট বিডিওl কাজের সূত্রে বাইরে থাকিl বাড়ি গেলে আপনার প্রত্যেক বার খোঁজ করিl জানতে পারি আপনি গ্রামের বাড়ি চলে গেছেনl আপনাকে অনেক মিস করি স্যারl
-তুমি আমাকে মনে রেখেছ এটাই বিশাল প্রাপ্তিl তুমি আর বড় হওl
তাদের মধ্যে চলতে থাকে নানান কথাl আরাফাত যেন হাতের মুঠোয় আকাশের চাঁদ পেয়েছে যা এত দিন মনের ভেতর থেকে দেখছিলl

যখন আরাফাত ফারুক সাহেব এর সাথে কথা বলছিল তখন তাদের কথপকথনের ভাষা রেহেনাকে মনে করিয়ে দেয় পুরণ দিনের কথা যা আরাফাতের মুখে বার বার শুনেছেl আরাফাতের ছোট বেলার কাহিনীl তার বাবা মা দুজনেই চাকুরী করতl সে বাড়িতে একা থাকতে থাকতে এক সময় অনেক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলl তার বাবা মা অনেক চেষ্টা করেও ঠিক করতে পারেনিl তাকে নিয়ে তাদের অনেক চিন্তা ছিলl

অনেক হোম টিচার রাখে কিন্তু কেউ একদিনের বেশি আসেনিl কিন্তু ফারুক সাহেব তাকে পড়াতে গিয়ে মনে করেছিলেন যদি একটি খারাপ ছাত্র ভালো না করতে পারি তবে টিচার কিসেরl ফারুক সাহেব তার গুনগুলির প্রশংসা করতেন এবং ভুল গুলিকে স্বাভাবিক ঘটনা মনে করতেনl তাই আরাফাত তাকে অপনজন মনে করতl আর সেই সুযোগ নিয়ে আসতে আসতে তাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেনl আরাফাত কখন যে পরিবর্তন হয় সে নিজেও বুজতে পারে নিl

রেহেনার সব রাগ তাসের ঘরের মত এক নিমিষে ধ্বংস হয়ে যায়l লজ্জায় নিজেকে কোথায় লুকাবে তা বুজে উঠতে পারে নাl যে লোকটিকে অপমান করেছে সে লোকটি তার স্বামীর জীবনের পরম প্রিয়জনl যার জন্য তার স্বামী জীবন দিতেও পারেl বুজতে পারে নিজের অজান্তে কত বড় ভুল করেছেl যে ভুলের কোন ক্ষমা নেই অর্থাৎ ক্ষমাহীন অন্যায়l