রাতে খাবার টেবিলে একটা আলাপ উঠলো, কার পেতে রাখা একটা খাঁচার ভেতর কিসের দুটো বাচ্চা ঢুকে আর বেরোতে পারেনি। পরে বাচ্চা দুটোর মা জেনেশুনে সে খাঁচায় ঢুকে পড়ে বাচ্চাদের টানে। মাকে দেখে এলাকার বয়স্ক মানুষ টের পেলো, ওটা খাটাশ। সবাই বলছে, পশু মা সন্তাানের প্রতি ভালবাসার একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলো, মানুষ এতটা পারে না।
বড়ির কর্তা জানতে চান, জন্তুটির নাম কি?’ কর্তা মোদাসসের চৌধুরীর চব্বিশ অতিক্রান্ত ছোট ছেলে আরমান চৌধুরী বললো, ফেসবুকে কেউ কেউ লিখেছে ওটার নাম খাটাশ। নিশিগন্ধা নামে আরো একটা নামও নাকি ওর আছে।

কর্তা মোদাসসের চৌধুরী বললেন, এটার গায়ে বেদম গন্ধ। তাই এটাকে খাটাস বলে। আমাদের ছোটবেলায় এগুলো অনেক ছিল। বহু বছর আর এ প্রাণী চোখে পড়ে না । এখন তো নামই ভুলে গেছি।
আরমান বললো, ‘এটা নাকি বিলুপ্ত প্রাণী। তাই পশু সংরক্ষণ অধিদপ্তর এটাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছে।’ ওবাড়ির দু’ভাইয়ের পর জন্মানো একমাত্র সদ্য বিবাহিতা মেয়ে কাজল বলে উঠলো, গায়ের গন্ধে, কাছে যাওয়া যায় না, অথচ দেখো, সেই তার মাতৃত্বৃ। আর তাতেই সে দেশজুড়ে খবরের শিরোনাম।’
পরিবারের সবার মুখে মাতৃত্ব নিয়ে এমন আলোচনা চলাতে, মাত্র মাসখানেক হয় বউ হয়ে আসা মুনমুনের গলায় খাবার আটকে গেছে। তার প্রচণ্ড জিদ উঠলো তার ননদ কাজলের কথায়। কাজলের কথার উত্তর দিতেই মুনমুন বললো, ‘তোমাদের বাড়িতেও একটা মহাখাটাশ আছে। তোমরা আজন্ম দেখেও তাকে চিনতে পারোনি! অথচ জঙ্গলের এক না দেখা পশুকে নিয়ে কী হৈচৈই না করছো সবাই মিলে!’
ছেলের কোথা থেকে একা বিয়ে করে আনা এই মেয়েটিকে বাড়ির কেউ এখনো বরদাস্ত করে উঠতে পারেনি। বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী ও নিজ নামে শহরে একটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোদাসসের চৌধুরী তো না-ই। তবে তিনি নীরব হয়ে আছেন, তার নিজের মেয়ে কাজলের মাত্র বিয়ে হয়েছে। পারিবারিক সংঘাতপূর্ণ বিষয়গুলো তিনি আপাতত কৌশলে ধামাচাপা দিয়ে রাখছেন। কিন্তু তিনি আসলে ওঁৎ পেতে আছেন। ছেলের শ্বশুরবাড়ির সবাইকে ডেকে দেখে নেবেন তাদের সাথে ওনার সব দিকে মেলে কি না। তারপর ফায়সালা। ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে দু’পক্ষ কার কি করণীয়। কার কি প্রাপ্র্য। সবদিক মিললে এ বিয়ে টিকবে। না যদি মেলে, গচ্ছা দিয়ে হলেও ও বউ তিনি বিদায় করে দেবেন বলে ভেবে রেখেছেন। ছেলে অমত করলে ছেলেকেও বলবেন, নিজের পথ দেখতে। ছোট ছেলে আরমানকেও এই সুযোগে টাইট দেবেন। যেন বাপের অমতে চলতে সেও না পারে।
প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে হলেও মেয়ে কাজলকে তিনি ভালই বিয়ে দিয়েছেন। কাজল লেখাপড়াতেও ভালো। সিলেট শাহজালাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে লেখাপড়ার সাথে সাথে সে বিসিএস দেয়ার জন্যও তৈরি হচ্ছে। ছেলের বউয়ের কথায় মোদাসসের চৌধুরী থতমত খেয়ে ধমকে উঠলেন বৌমার উদ্দেশে। বললেন, কাকে তুমি এত বড় কথাটা বললে? কে খাটাশ এই বাড়ির? বলো?
বাড়ির বড় গিন্নি, সালমানের মা, মানে মুনমুনের শাশুড়ি, যাকে উদ্দেশ্য করে মুনমুন কথাটা বলেছে, তিনি একটু দূরে ছিলেন। কারণ মুনমুন ও বাড়িতে আসা অবদি দেখেছে, তিনি তার স্বামীর থেকে সব সময় দূরেই থাকেন। ইচ্ছে করেই কাছাকাছি হন না। খাওয়াটাও তিনি আগেপরে অথবা নিজের ঘরে বসে সারেন। এই একমাসে কখনোই তাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনকে সে কথা বলতে দেখেনি। সেই তিনিও খাবার টেবিলের কাছে ছুটে এসে গর্জে উঠলেন। বললেন,‘বৌয়ের চোপা একেবারে আলগা! সবাইকে সব কথা মুখের উপর বলে দেয়। আচ্ছা, বলেছো যখন পরিষ্কার করে বলো দেখি, কেন, কাকে বলেছো?’
মুনমুনের রাগে শরীর জ্বলছে। সে খাবার রেখে উঠতেও পারছে না, আবার মুখেও তুলতে পারছে না। কিন্তু যার জন্য বলেছে, সেই তিনিও না বুঝে তার বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়ালেন! সে মনে মনে ভাবলো, এদের ভাইবোন তিনটির মাথা এত মোটা কেন! কাকে খাটাশ বলছে, এই কথাটা এদেও কেন মাথায় ঢুকছে না! তাহলে তো আর তাকে ভেঙে বলতে হয় না! তাদের মায়ের না হয় মন-মাথা দুটোই গেছে। আর বাপের তো বোঝার ক্ষমতাই থাকার কথা নয়। আরো একজন যে, সে তো কাঁটাশালই। সে কেন বুঝতে যাবে! কিন্তু মুনমুনের শেষ পযন্ত মনে হলো, সেই সেই কাঁটাশালই একমাত্র বুঝেছে।

কারণ, বাক-বিতণ্ডার এই অবসরে দূর থেকে সেই কাঁটাশালই হালকাস্বরে বলে উঠলো, আমি বুঝছি, কারে কইছুইন। কী বুজাইছইন…
গেঁয়ো, শক্তপোক্ত গড়নের চল্লিশ ছুঁইছুঁই সে রমণীর দিকে মোদাসসের চৌধুরী ঘাড় বেঁকিয়ে তেসরা চোখে তাকিয়ে ধমকে উঠলেন, ‘তুমি চুপ থাকো! তোমারও দেখছি বেহায়াপণা বেড়ে গেছে।’ মোদাসসের চৌধুরী নিজের রমণের জন্য বৈধ করে রাখা সে রমণী চুপ করার চেয়ে খিলখিলিয়ে একচোট হেসে উঠলো। কারণ সেই হয়ত সবচেয়ে বেশি জানে তার তিন পুরুষের প্রভু, আর এ কালের সোয়ামী মোদাসসের চৌধুরীর দৌড় কদ্দূর। গাট্টাগোট্টা এই রমণীর নাম জমিলা। জমিলার মা কাজ করত মোদাসসের চৌধুরীদের বাড়িতে। এই চৌধুরী পরিবারই জমিলাকে যেখানে বিয়ে দিয়েছিলো, বছর তিনেক গত হতে তারা যখন চিকিৎসা করে জানতে পারলো জমিলার সন্তাান হবার সম্ভাবনা কম। জমিলার স্বামী তার মা-বাবার মত মতো জমিলাকে তালাক দিয়ে পাঠিয়ে দিলো। আর মোদাসসের চৌধুরী তার প্রথম স্ত্রী’র আপত্তির তোয়াক্কা না করে জমিলাকে বিয়ে করে রেখে দিলেন একই বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে।
সালমানের মেরুদ- এখনো পবিারের ভেতর অত শক্ত হয়নি, যে তার স্ত্রী পরিবারের কাউকে ওই জঘন্য ‘খাটাশ’ শব্দটি বলে তা খোলসা না করে এমন অমিমাসীংত রেখে রেহাই পাবে। সালমান নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পাশে বসা মুনমুনের একপাশের কাঁধটা একহাতে একটু জোরেই চেপে বললো, ‘তুমি একটা কথা বলে সবাইকে ক্ষেপিয়ে চুপ করে থাকতে পারো না! কেন এমন একটা কথা বললে, তা স্পষ্ট করে তো বলবে?’
মুনমুন বুঝলো, সালমান তাকে যেভাবে ধরেছে এবং তার গলায় যে শ্লেষ, এটা তার গায়ে হাত তোলার সামিল। সে ইচ্ছে করে জুঠা হাতে সালমানের হাত ছুঁড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো, ‘খাটাশ তার বাচ্চাদের জন্য মানুষের বানানো খাঁচায় ঢুকে পড়ে মাতৃত্বের বিরল উদাহরণ স্থাপণ করলো। মানুষ তা পারেনি বলছ তোমরা। কেন, তোমরা তোমার মাকে দেখো না? তোমরা তিনটি ভাইবোন যখন বেশ বড়ই হয়ে উঠছো, তোমার বাবা আরেকটা বিয়ে, মানে বাড়িতে কাজ করা দাসীর মেয়ে তস্য দাসীকে বিয়ে করে সেই তস্যকে নিয়ে একই বাড়িতে পাশাপাশি রুমে থাকেন। মাসখানেক হলো আমি এই বাড়িতে এসেছি। প্রায়ই তোমার মায়ের জায়গায় আমি নিজেকে কল্পনা করি। রাতে আমার ঘুম আসে না। আমি ওঁৎ পেতে থাকি, কোনো একটা রাতে তোমার বাবা যদি হঠাৎ ভুল কওে হলেও তোমার মায়ের ঘরে ঢোকেন। অভিনয় করেও যদি দিনের বেলায়ও তার সাথে একটা কথা বলেন!
মনে হয় তোমার মা এ বাড়ির অপাঙক্তেয় এক বয়স্কা! যেন শুধুই দাস-দাসীদের সর্দার। অথচ তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে রঙ-তামাশা ঠিকই করছেন। তাকে নিয়ে বেড়াতে যান। হাসি-তামাশা করেন। একটার পর একটা গহনা ছাড়াও এটা ওটা কিনে তাকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন। তোমরা তিনটি ভাইবোন, তোমাদের টাকা-পয়সার প্রয়োজন, আর তা যেহতেু বাবার কাছে, তাই বাবাকেই সমঝে চলো। মায়ের অপমানের দিক, সংসারে তার মূল্য হারানো অসহ্য গ্লানিকর দিক নিয়ে একবারও তার কথা ভেবে দেখেছো? তোমার বাবা ওই নারীকে বিয়ে করলে, তোমার মাও তোমাদের নিয়ে তার বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলেন, তোমাদের তিন ভাইবোনেরই তো তা মনে থাকার কথা! কিন্তু তখন ক’দিন বাবার বাড়ি থেকে উনি যখন দেখলেন, তোমাদের পাতে ভাত বাড়তে তোমার নানার বাড়ির মানুষের হাত কাঁপছে, সেই অপমানের ভাত খাওয়ানোর থেকে তিনি নিজের কথা ভুলে স্বেচ্ছায় সেই দোজখের আগুনে এসে ঢোকেননি?
মাসখানেক না যেতেই তোমার নানা স্বয়ং তাঁর এই মেয়েকে ডেকে বলেছিলেন, ‘আমি আমার মেয়ের ভরণ- পোষণ করতে রাজি। আমি শত্রুর ছেলেমেয়েকে কেন নিজের গোলার ধান খাইয়ে মানুষ করবো? ওদেরকে ওদের বাবার কাছে পাঠিয়ে দাও!’ নিজের বাবার এই কথা শুনে তোমার মা তোমাদেরকে তোমাদের সেই আধিকারের জায়গায় এনে তুলেছেন যেখানে অন্তত তোমাদের খাওয়ার খোটা থাকবে না! কিন্তু তিনি নিজে তো জানেন তিনি এখানে একেবারেই অপংক্তেয়!
তিনি তো তোমাদেরকে একা পাঠিয়ে নিজে বাবার বাড়ি থেকে যাননি। যেখান থেকে তিনি অধিকার ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন, আবার সেখানেই তিনি ফিরে এলেন। দেখলেন বাড়ির বড় ঘরে তার শালকাঠের পালঙ্কের বিছানা অন্য নারীর দখলে। আর তা দখল করেছে, যে তার মায়ের সাথে একসাথে তারই দাসীগিরি করতো। আগে নিশ্চয় তার আত্মসম্মানবোধ ছিল। মানবিক শোধবোধও ছিল। না হলে তোমাদেরকে নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে যাবেন কেন? তাই ভেবে দেখো, তিনিও তখন ওই খাটাশের মতো পুরনো খাঁচায় ঢুকেছেন কি না! খাটাশ তো খাটাশ, কিন্তু তোমার মা’র মনুষ্যজন্মটাই খাটাসের চেয়ে অধম করে ফেলেছেন! না হলে একসময় একশো ভরি সোনা দিয়ে যাকে বিয়ে করে এনেছিলেন তোমার বাবা, মাত্র একতাল মাংসের টাটকা দলা দেখে সেই আসল নারীর ভূমিকা তার জীবন থেকে শেষ হয়ে গেল?
অথচ তার এখনো ঋতুস্রাব হয়। তিনটা চারটা পাঁচটা ছেলেমেয়ে হতে ক’বছর লাগে এক দম্পতির। তিনটে ছেলেমেয়ে হয়েই উনি পুরনো হয়ে গেলেন তোমার বাবার কাছে। আর তোমার বাবা ইচ্ছেমতো আরেকজন মেয়েমানুষ নিজের জন্য বৈধ করে ফেললেন? একবার তোমাদের মায়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে ভেবেছো, তোমরা তিনটি ভাইবোনের কেউ? তার বেদনাটা যে তোমরা বোঝো, এটা কখনো তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছ? একের পর এক ঘুমের বড়ি খেয়েও তার ঘুম আসে না। শীতের রাতেও তিনি ঠা-া পানিতে গা মোছেন। প্রায়ই বালতির পানিতে পা চুবিয়ে রাখেন, এটা কিসের আগুন বোঝো তোমরা?’
ঘরের ভেতর যে যেখানে ছিল, সে সেখানেই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো। মোদাসসের চৌধুরীও অযাচিত এই যুবতী নারীর কথা শুনতে শুনতে খাবার বুঝি একটু বেশিই গলাধকরণ করে ফেলেছেন। কিন্তু কী বলা যায় ভেবে ভেবে গলাটা কিছুই বলার জন্য শক্তি খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু তিনি বৌমার শেষ কথাতে চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘খামোশ’! মুনমুন মনে মনে ভাবলো, যা বলার বলে ফেলেছি। এখন আর ও ধমকে কী এসে যায়!
সকালে উঠে সবার মনে হলো, বাড়ির ওপর দিয়ে যেন কাল বৈশাখি ঝড় বয়ে গেছে। আর তার আঁচড় বাড়ির প্রতিটি প্রাণীর শরীরে মনে লেগে আছে। মুনমুনের শেল বর্ষণের মতো একটানা বক্তব্যে এমনি সবাই ক্লান্ত। কারণ আগে কখনো এ নিয়ে কথা ওঠেনি। তাই বিষয়টি সবার গাসওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু মোদাসসের চৌধুরী স্বপ্নেও ভাবেননি বৌমা তার প্রতিটি কথায়-কাজে যুক্তিতর্ক দিয়ে তার গলা চেপে ধরার হিম্মত রাখে। এতদিন তিনি খেয়াল করে দেখছেন, মেয়েটি সবার সাথে একটু বেশিই গায়ে পড়ে মিশতে চায়। তারও মন পাওয়ার জন্য কতরকমের খাবার আধুনিকভাবে রান্না করে হেসে হেসে তার পাতে তুলে দিয়েছে। তবু তিনি বলতে ছাড়েননি, আমাদের দেশে এমন নিয়ম নেই, কোনো ছেলে একা বিয়ে করে আনলে তার বাড়ির মানুষ সে বৌ বাড়িতে জায়গা দেয়। তুমি তোমার বাপ-চাচাদের খবর পাঠাও, তারা আসুক। তাদের সাথে কথাবার্তা বলি, দেখি আমাদের বনে নাকি!’ মুনমুন শ্বশুরের কথায় গা করেনি। সালমান তাকে ভালবেসে বিয়ে করেছে বলে উদ্ধার করেনি। সেটা সালমান জানলেই হলো। কিন্তু গত রাতের পরে সকাল গড়িয়ে আসন্ন দুপুরে মোদাসসের চৌধুরী আচমকাই মুনমুনকে হুঙ্কার দিয়ে বললেন, শোনো মেয়ে তুমি আর এ বাড়ি থাকতে পারবে না!
মুনমুন বললো, আমার অপরাধ?
:গতরাতের কথা ভুলে গেছ? তুমি একনাগাড়ে কত কি বলে গেছ?
:আপনারা আমাকে একনাগাড়ে বলতে দিলেন কেন? কেন থামিয়ে দিলেন না? তখন তো একটি মানুষও আপনারা কথা বলেননি?
:তোমার মতো বেয়াদব মেয়ের এ বাড়িতে জায়গা হবে না!
:আমার স্বামীর জায়গা হলে আমারও জায়গা হতে হবে!
:তুমি জানো না আমার ছেলে আমার ব্যাবসা দেখাশোনা করে! আমি যা করাবো, তাই তাকে করতে হবে। আমি তাকে খুলনা পাঠিয়ৈছিলাম, ইউনিভার্সিটিতে পড়তে। বিয়ে করে তোমাকে আনতে নয়।
:সে লেখাপড়া যখন জানে, বউয়ের জন্য তাহলে সে এখন অন্যের ব্যাবসা দেখাশোনা করবে! আর পিতা হিসাবে তাকে আপনার লেখাপড়া করানোই দায়িত্ব ছিলো। কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার স্বাধীনতা তার জন্মগত।
:তোমাদের বিয়ে হয়েছে কি না, না কি রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে আসছে, সেটাই আমার সন্দেহ!
:তা বলবেন তো! দরকার হলে সময় মতো কাবিননামা হাজির করবো।’
মোদাসসের চৌধুরী গজরাতে গজরাতে সেখান থেকে সেদিন চলে গেলেও, মুনমুনকে শুনিয়ে সালমানকে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করতে করতে বলেন, বাগেরহাটের মানুষ নাকি বাড়িতে কোনো ভালো ছেলে লজিং থাকতে এলেও ওঁত পেতে থাকে তার সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে। যদি সে ছেলে রাজি না থাকে, তাকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে দেয়।
আমাদের কলেজে ওদিকের একজন বয়স্ক প্রফেসার আছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি, ভাই, বাগেরহাটের মানুষ কেমন?
সে তো হাসতে হাসতে পানের পিকে তার সাদা পাঞ্জাবি ভরে ফেলেছে। বলেছে, ভাই শোনেন, একবার এক লজিংমাস্টারকে এক বাড়ির মানুষের পছন্দ হয়ে গেলো। বেটাকে প্রস্তাব দিয়ে কাজ হয়নি। তার বাপ-মায়ের কাছে খবর পাঠিয়ে কাজ হয়নি। তারপর দুপুর থেকে মেয়েকে শিখিয়ে-পড়িয়ে সেই মাস্টারের ঘরের খাটের নিচে রেখে দিয়েছে মেয়ের মা-বাপ। শেষে মাঝরাতে মানে, সেকালে রাত দশটা মানেই তো মাঝরাত ছিলো। শেষে লজিংমাস্টার বাজারের দোকান থেকে আড্ডা-টাড্ডা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই খাটের নিচে লুকানো মেয়ে রে রে করে উঠলো। ডুকরে বলতে লাগলো, স্যার এইডা কি করলো রে…।’ তারপর বাড়ির অন্যান্য মানুষ ছুটে এসে সে মেয়েকে তখনি লজিং মাস্টারের সাথে কলমা পড়িয়ে দিলো। ব্যস্!
মুনমুন বললো, আমি কিন্তু খুলনা শহরের মেয়ে। আমার বাবা একজন আদর্শ শিক্ষক। আপনার মতো কলেজের ধাপ্পাবাজ প্রতিষ্ঠাতা নন…। আপনি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেটা আপনার বাবার থেকে পাওয়া সম্পত্তি এবং আপনি আপনার অন্যান্য ভাইবোনদের ঠকিয়ে নিয়েছেন, যা করতে আপনার যোগ্যতার দরকার হয়নি এবং সম্মানীত মানুষের তালিকায় আপনার নামটি লিখতে কলেজ করেছেন। কিন্তু আমার বাবাকে তাঁর পদটি র্অজন করতে হয়েছে!
:কলেজ করতেও যোগ্যতা এবং সৌভাগ্য লাগে। আর বাগেরহাট থেকে খুলনা আর কতদূরে। সব এক। আমাদের এদিকে দেখো? এসব ঘটনা খুঁজে পাবে না। একটা মেয়ে বিয়ে দিতে আমরা কত কিছু দেখি!
:আপনার সাথে মেয়ে বিয়ে দিতেও তো আমার শাশুড়ির বাবা নিশ্চয় কম যাচাই করেননি।’
মুনমুনকে মোদাসসের চৌধুরী থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমাকে ক্ষেপিয়ে তুমি আর থাকতে পারবে না এই বাড়িতে, এটাই আমার শেষ কথা।’
:মুনমুন অকম্প্র গলায় শাশুড়িকে মা! মা! বলে ডেকে উঠলো। সাড়া না পেয়ে লুৎফা বেগমকে তার বিছানা থেকে জবুথবু অবস্থায় টেনে বাইরে তার স্বামীর সামনে এনে বললো, আপনি বলেন, আমি এই বাড়িতে থাকতে পারব কি না?’
গতরাত থেকে যার পক্ষে মুনমুন অগ্নিঝরা কণ্ঠে এত সাফাই গাইলো, তার নিজের এমন চ্যালেঞ্জিং সময়ে সেই তিনি নিরুত্তর! মুনমুন ভাবছে, আসলে লুৎফা বেগমের মাথায় পুরো বিষয়টুকু ঢুকছে বলে মুনমুনের মনে হলো না। সে শাশুড়িকে ঝাঁকি দিয়ে বললো, ‘আমি এবাড়িতে থাকবো, না চলে যাবো আপনি বলেন?’
লুৎফা বেগম বললেন, ‘তুমি চলেই যাও…।’ কথাটা এখানেই থেমে গেলো কিনা, অক্ষমতার অপমানে মুনমুনের দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। কিছুটা দূরে মোদাসসের চৌধুরী তখনো দাঁড়ানো তার অটল সিদ্ধান্ত নিয়ে। মুনমুন তার শাশুড়ির দু’কাঁধ থেকে দু’হাত সরিয়ে নিলো। ততক্ষণে বাবার কথার ভয়ে সালমানও বাড়ি থেকে চলে গেছে। মুনমুনের মনে হচ্ছে ছিঁটকে বাড়িটি থেকে বেরিয়ে যেতে। এরই ভেতর লুৎফা বেগম বলে উঠলেন, ‘তোমরা অন্যখান গিয়ে সংসার করো। সালমানকে তার বাপের ছায়া থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। সবাই সব কিছু পারে না তাই করে না। কিন্তু যে যে পরিবেশে থাকে সেই পরিবেশের সবকিছু তার কাছে নিয়ম মনে হয়। এক সময় তারও তো হঠাৎ মনে হতে পারে, আমি যারে তারে যখন তখন ঘরে উঠাতে পারি। আসল মানুষকে পুরনো ফার্নিচারের মতো বাতিল করে দিতে পারি। তোমার কথা শুনে বুঝতে পারলাম এই একমাসে, তুমি আমার অনেক কিছু জানো। কিন্তু জানো না, আমি বিষও খেয়েছিলামৃ। আমার বাবা হাসপাতালে নেয়ায় বেঁচে গেছি। কিন্তু মরণের ঘর থেকে ফিরেও কি আমি পুরনো জীবন ফিরে পেয়েছি? আমি আমার খাবারে প্রায়ই অচেনা গন্ধ পাই। আমার মনে হয়, আমাকে আধমরা করে রাখার জন্য কেউ স্লো পয়জন খাওয়ায়। আমার বাঁচার ইচ্ছে নেই বলে জেনেশুনেও তা খাই। কিন্তু তুমি আগে থেকে শক্ত হও! প্রাচুর্যের দরকার নেই। আধপেট খেয়ে খেলাচ্ছলে বাঁচতে শেখো গিয়ে!’
শাশুড়ির কথায় জোর পায় মুনমুন। সে বললো, তাই হবে। তবে আপনাকে নিয়েই বেরিয়ে যাবো আমরা!’
মোদাসসের চৌধুরী মুনমুনের উদ্দেশে আবার হুঙ্কার দিয়ে বললেন, তুমি একাই যাও। আমার ছেলে বা তার মা কেউ গিয়ে আমার ইজ্জত হানী করতে পারবে না! সে সাহস তারা দেখালে দুনিয়া থেকে তাদের সরিয়ে দেবো!’
মুনমুন আস্তে করে বললো, সেটা যার যার বিষয় তার তার ওপর ছেড়ে দেন! এ নিয়ে আর আমি আপনার সাথে তর্ক করার আর দরকার মনে করি না!

০০০

নিকট অতিতের স্মৃতিগুলো মুনমুনের মাথায় ভিমরুলের মতো হুল ফোটাতে থাকে। তাকে তার এক ফুপাতো ভাই পছন্দ করতো। মুনমুনেরও অমত ছিল না তাতে। সেই ফুপাতো ভাই-ই তার বন্ধু সালমানকে নিয়ে তাদের বাসায় আসতো। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকা মাকে সেবা করতে ঘরে বন্দি থেকে যখন মুনমুন হাঁফিয়ে উঠেছিলো, সাজিদের আগমনটা তখন মুনমুনের কাছে একেকটা খোলা জানালার মতো মনে হতো। বড়ভাই লেখাপড়া করতে গিয়ে কানাডাতেই সেটেল হলো। বড় বোনের বিয়ে হয়ে সেও সংসার নিয়ে ব্যস্ততার কারণে বাবা-মা’র সংসার থেকে প্রায় ছিন্ন হয়ে গেলো। সংসারে রইলেন বাবা-মা আর তারা দুটো বোন। ছোটবোনটা নিজের লেখাপড়ার বাইরে আর কিছুই করতো না। হঠাৎ অসুস্ত হয়ে পড়া মা আর সংসারের দায়িত্ব আলগোছেই যেন তার কাঁধে এসে পড়লো। বাবা বলতে বাধ্য হতেন, ‘ বিদেশী বউ নিয়ে ছেলে আর বিদেশ থেকে ফিরবে বলে মনে হয় না। ছোট মেয়ে রিমঝিমকে বিয়ে দিয়ে আমরা কাছে রাখবো।’ মা বলতেন, তাই যদি ভেবে থাক, তো ছোটটাকে নয়। মুনমুনকে নিয়ে সেই ভাবনাটা ভেবো। কারণ ওর তো ডিগ্রীতে ভালো রেজাল্ট হওয়া সত্ত্বেও আর মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারলো না। অথচ রিমঝিম কোনো প্রতিকূলতাই গায়ে মাখে না। একদিনও সে অসুস্থ মায়ের বা সংসারের কোনো দায়িত্ব পালন করলো না। তোমার যা ভাবতে হয়, তাই আমার এই মেয়েটিকে নিয়ে ভাবো!’
বাবা বললেন, তুমি সুস্থ হলে মুনমুন আবার লেখাপড়া শুরু করবে!
মা বলেছিলেন, ছেড়ে দেয়া বিদ্যা কমই ধরা দেয়। মেট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে আমিও কি পেরেছিলাম আর কলেজে ভর্তি হতে! মুনমুনেরও বড়সড় একটা গ্যাপ হয়ে গেল না? ও যে নাচ শিখত, তোমার বারবার বদলির জন্য তা ব্যাহত হল। নাচলে ওকে বেশ লাগত। বাবা বললেন, ওকে বলো, আবার শুরু করুক!’ নাচ নয়, মুনমুন গানটাকেই জোরেশোরে ধরল। নিজে ওস্তাদের কাছে শিখতো এবং ছাত্রদেরকে আবার তাই শেখাতো। দুটোই ছিলো তার প্রাণের জরুরী বিষয়। অন্যকে বিদ্যা বিলানো তার একটা নেশা ছিলো। তাই হাইস্কুলে পড়া আশেপাশের সব ছেলেমেয়েতার কাছে প্রাইভেট পড়তে আসতো। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানোতে তার বেশ নাম হয়ে গেলো। অন্যকে লেখাপড়া শেখানোর এই গুণটি সে তার মা’র থেকে পেয়েছে। সালেহা বেগম নিজের সন্তানদের সাথে আরো অনেকের সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। মুনমুনের বিভিন্ন ব্যাচে ছেলেমেয়ে পড়ানো, গান শেখানো আরো কত কত পরিকল্পনাকে উসকে দিতে, সাহস ও সহযোগিতা করতে আসার জন্য সাজিদের সাথেও তার সর্ম্পকটা গাঢ় থেকে বিশেষ হয়ে ওঠে। কিন্তু সাজিদের পরিবার থেকে চাইল মুনমুনের চাচাতো বোন রুনুকে। রুনু দেখতে বেশি ভালো। মা-বাবার একমাত্র সন্তান। রুনু মুনমুনের থেকে কিছুটা বড়, সেই সূত্রে একদিন তাকে বাড়ি ডেকে নিয়ে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘সাজিদের সাথে তোর সম্পর্ক আসলে কদ্দূর?’ মুনমুন অট্টহাসিতে ফেটে বলেছিল, ও তো তোমার মতো আমারও কাজিন। আবার আমার ভাইয়ার স্কুল জীবন থেকে বন্ধুরও মতো। তা তো তুমিও জানো। ভাইয়া চলে গেলে আমাদেরকে লেখাপড়ায় সহযোগিতা করতে রেগুলার আসতো। তাই হয়ত একটু বেশি বেশি আসার অভ্যেসটা এখনো রয়ে গেছিলো। এ ছাড়া আর কিছু না।’
রুনু আর মুনমুন আপন চাচাতো বোন হলেও তারা ছোটবেলা থেকেই দুই এলাকাতে আলাদা আলাদা বাড়িতে থাকে। তাই একজনের সবকিছুই অন্যজনের কাছে স্বচ্ছ নয়। তাই রুনু মুনমুনকে জোর দিয়ে বলেছিলো, ঠিক তো? এর বাইরে আর কিছু নয় তো?
মুনমুন বলেছিল, হাজারবার ঠিক!
রুনু বলরো, দেখিস, পওে যেন অন্য কিছু না শুনি। তোরা অনেকগুলো ভাইবোন। আর আমি আমার মা-বাবার একা। তাই তাদের অনেক দাবি আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানতে হয়।’
রুনুর কাছে মুনমুনের বলা কথাটা সাজিদের কাছে পৌঁছে গেলো। সেও ভাবলো, মুনমুন যদি এরকম বলতেই পারে, তাহলে মা-বাবার বিরুদ্ধে আমি আর গো ধরি কার জন্য! সে রুনুর সাথে বিয়ের টোপরটা পরেই ফেললো। সাজিদ আর সালমান একসাথে খুলনা ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেছে। সে প্রায়ই সাজিদের বাড়িতে এসে সাজিদের মা-বাবার বাৎসল্য পেতো সহজেই। ওদের দু’জনের বন্ধুত্ব দেখে সাজিদের মা-বাবা বলতেন, সাজিদ-সালমান আমাদের দুটি ছেলে।
ওদের ইউনিভার্সিটি লাইফ শেষ হয়ে গেছে বছর খানেক আগে। সালমান গিয়ে তার বাবার ব্যাবসা দেখাশোনার ট্রেনিং নিচ্ছে। আর সাজিদ অন্য চাকরি ধরছে আর ছাড়ছে আরো ভালো কিছুর আশায়। তারওপর পিতার বিত্তের তো সেই একমাত্র উত্তরাধিকারী। তাই রুনুর মতো সুন্দরী শিক্ষিত সদ্বংশীয় তরুণীকে স্ত্রী হিসাবে পেতে কোনো বাঁধা এসে দাঁড়ায়নি।
সাজিদ-রুনুর বিয়ে হয়ে গেলে সালমানের কেন যেন মনে হলো, মুনমুনকে সাজিদ নয়, সে নিজেই ভালবাসতো। সাজিদের বাড়িতে এলে সে-ই তো বলেকয়ে নিয়ে আসতো মুনমুনদের বাড়ি। সালমানের মনে হতো তার সাজিদের সাথে বন্ধুত্ব গাঢ় হতে মুনমুনের একটা ভূমিকা আছে। কারণ মুনমুনদের বাড়ির প্রতি ওর একটা মুগ্ধতা ছিলো। ওদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মুখে একটা স্নিগ্ধভাব সে খুঁজে পেতো। নিজের পরিবারের ভেতর হরদম যার অভাব সে বোধ করতো।

মুনমুনের অসুস্থ মাও যে একজন বিদূষী মহিলা, তা তার অভিজ্ঞতা, পড়াশোনার ব্যাপ্তি দেখে বোঝা যায়। মুনমুনের বাবা প্রফেসার মানুষ। সন্তানদের সাথে নয়, যেন কথা বলছেন, বন্ধুদের সাথে। আর তাদের সাথে যখন কথা বলেছেন, মনে হতো একজন পিতা কথা বলছেন। এক সময় ইউনিভার্সিটিতে সালমান নিজেও তো তার ছাত্র ছিলো। এতোদিনের আসা-যাওয়ায় এদের বাড়ির একটি মানুষের আচরণও তার মুগ্ধতা ফিকে করার কারণ হয়নি।
কিন্তু সাজিদ যখন তাদের বাড়ির মানুষের চাপে রুনুকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়, দু’দিন পরই সালমান বিয়ের বরযাত্রী না হয়ে মুনমুনের কাছে চলে এসেছিলো। বলেছিলো, আমি একটি কাজ করতে চাই। তাতে তোমার সহযোগিতা চাই। জীবনে হয়ত আর এমন সুযোগ পাবো না!
মুনমুন বললো, কি চাও, তা তো বলবে?
:আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। তার আগে একটা সত্যি কথা বলে রাখি। তোমার ছোটবোন রিমঝিমের প্রতি আমার একটা দুর্বলতা ছিলো। কিন্তু তার কাছে আমি কখনো পাত্তা পাইনি। আজই মনে হলো তুমি কম কিসে এবং আজ মনে সব রকমের অনুভূতি এক হয়ে মন শুধু তোমকেই পেতে চাইছে।
:তুমি বরং রিমঝিকেই পটাতে থাকো। আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত নই বোঝো না কেন! তুমি বা কতটা চেনোই আমাকে, যে আমাকে সারাজীবনের জন্য চাও?
:কুঁড়িটিকে কি ফুল ভাবা যায় না? তোমার বাড়ির মানুষকে বললে তারা যাচাই-বাছাই করতে যে সময় নেবে, তাতে আমার মত পাল্টে যেতে পারে। আর আমার বাবা খুব একরোখা। বদরাগি। আমি আলাদা কোনো চাকরি করছি না। সিলেটে আমাদের চা বাগান আছে। বাবার নামে একটি কলেজ ছাড়াও দোকানপাট আছে। শহর ছাড়াও গ্রামে আমাদের প্রচুর কৃষি জমিও আছে। সব মিলিয়ে বাবার ব্যাবসা দেখার জন্য বাবা আমাকে টেনে রাখেন। আমি বাড়ির বড় ছেলে। তোমাকে পেতে আমার ঝুঁকি অনেক। তবু আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি মুনমুন।’
মুনমুন হেসে বললো, একরোখা ভালবাসা!

মুনমুন সালমানদের বাড়িতে ঢুকে টের পেল, সালমান তাদের বিত্ত- বৈভব নিয়ে সালমান যা বলেছে, তা বাড়িয়ে বলেনি কিছুই। তবে যা চেপে গেছে, তা সে ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলে সে সালমানকে কিছুতেই বিয়ে করতো না। তার বাবা বাড়ির দাসীকে বিয়ে করেছে। সম্পর্কের সমস্ত মধুরতার ভেতর ওই দাসীই কেবল তার জন্য দুধেপড়া মরাপঁচা মাছি।

সেদিন মুনমুন সালমানকে বলেছিলো, কখনো তোমার মনে হবে না, তুমি আমাকে দয়া করেছো?’
সালমান নাটক করতো একসময়। গল্প উপন্যাসের সিরিয়াস পাঠক সে। তাই নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো, দয়া তো করলামই কখনো মনে করিয়ে দিলে ক্ষতি কি? খোটা শুনেই নাহয় কাছে থেকো!
:তুমি আমার কতটুকু জানো?
:সাদাপাতার মতো সবটুকুই। শুধু জানি, একটি ছেলের সাথে ভালবাসাবাসির সম্পর্ক ছিল। পৃথিবীতে সব প্রেম সফল হয় না, তাই সাজিদ রুনুকে বিয়ে করলো। আর আমি বিয়ে করে প্রেম করব বলে সাজিদ যাকে চিনতে পারেনি, সেই তোমাকে বিয়ে করতে চাই!’
ছাত্র জীবন থেকেই সালমানের চলাফেরাটা ছিলো রাজসিক। যেন চারপাশের মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের একটি দুর্দান্ত ক্ষমতা ওর আছে। সেই সালমানের এমন খামখেয়ালি প্রস্তাবে যে কোনো মেয়ে বর্তে যেতে পারে। কিন্তু মুনমুনের মনে হলো, হলেও ভালো না হলেও ক্ষতি নেই। তবে ভালো যেটা, সেটা সাজিদের একটা শিক্ষা হবে। সম্ভবত সে সাজিদকে সেই শিক্ষাটা দিতেই তেমনভাবে সে সালমানের প্রস্তাবটি তার মায়ের কাছে বলেছিলো। মা-বাবা দু’জনের কারোই অমত ছিলো না। কিন্তু তারা সালমানকে বলেছিলেন, তোমার বাবাকে গিয়ে বলো প্রস্তাব পাঠাতে। কিন্তু সালমান জানে, দুই পরিবারের কালচারে মিলবে না। তাই বাবা নিজের এলাকা ছেড়ে এ বিয়েতে রাজি হবেন না। কিন্তু অতটা খুলে সে মুনমুনকে বলতে পারলো না। সে একদিন বিকেলে এমনিই মুনমুনকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে একেবারে কাজী অফিসে নিয়ে তুললো। বললো, এ ছাড়া আর তোমাকে পাওয়ার আমার কোনো উপায় নেই। কারণ বাবা মত দেবেন না। আর এখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে আমার থাকাটাও ভালো দেখায় না।

০০০০

পরদিন ভোরেই দু’জন সিলেটে রওনা দিয়েছিলো। সিলেটে এসে সালমান প্রথমে উঠেছিলো মামার বাড়িতে। বাবার বিরোধিতা থিতিয়ে এলে পরে রয়েসয়ে বাড়িতে ঢুকেছিলো। তারপর কিছুদিন ভালই কাটছিল। ওই খাটাশটা কার পেতে রাখা খাঁচায় ধরা দিয়ে মুনমুনের জন্য যতো বিপত্তি টেনে আনলো। সে ওসব নিয়ে আর মুখ না খুললেও মোদাসসের চৌধুরী তার ছেলেকে চাপ দিতে লাগলেন। বললেন, ও মেয়েকে যেখান থেকে এনেছিস্, সেখানে রেখে আয়। সালমান কোনো প্রতিবাদ করে না। তার ভাবখানা, বাবা বলছেন, বলুন। বলতে বলতে ক্লান্ত হবেনই। কিন্তু মুনমুন এরি ভেতর ফুঁসে ওঠে সালমানের প্রতি। সে বলে, চলো আমরা অন্যত্র চলে যাই। মা তাই বলেছেন। চলো মাকে নিয়ে যাই।’ সালমান তার কথায় জোরালো প্রতিবাদ না করলেও, বাড়ি এবং বাবার ছত্রচ্ছায়া ছাড়তে না চাওয়াতে মুনমুন বুঝলো বাবার সামন্তবাদী বিষয়টি বাবার একা নয়, ওদের সবারই গা সওয়া হয়ে গেছে এবং বাবার সম্পত্তি হারানোর ভয়ও তাদের আছে। মুনমুন ভেতরে ভেতরে শক্ত হয়ে ওঠে। আর এর ভেতর শাশুড়িকে সে জোর করে নিয়ে এখানে ওখানে ঘুরতে যায়। নদীর কূলে বসে থাকতে থাকতে মুনমুন শাশুড়িকে বলে, আগে কখনো এসব জায়গায় এসেছেন?
লুৎফা বেগম কথা বলেন না। মনে হয় তিনি সব চেপে রাখতে চান। তবু মুনমুন সাধারণ মানুষের মতো বেরিয়ে পড়ে যখন যেখানে ভাললাগে শাশুড়িকে নিয়ে কথা বলে চলে। মুনমুন সালমানের সাথে তাদের দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে ভাবছে না। ভাবছে, একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর মুক্তির পথটি এঁকে দেখাতে। কারণ সালমানের সাথে যে সে আর বেশিদূর যেতে পারবে না, শ্বশুরের সাথে বিবাদ বাঁধিয়ে সে তা বুঝে গেছে। কিন্তু যে নারীর চোখের পর্দায়, মনের পর্দায় টান মেরেছে তাকে তো সে এভাবে মাঝ পথে ফেলে যেতে পারে না। ছেলেমেয়েরা বড় হতে হতে সরে গেছে তার কাছ থেকে। সেবাযত্ন চালিয়ে গেলেও তিনি কেমন আছেন, কোনোদিনই কেউ আন্তরিকভাবে কাছে এসে সহানুভূতি নিয়ে জানতে চায়নি।
বউ-শ্বাশুড়ি দু’জনের একাকীক্ষণে লুৎফা বেগম বলে উঠলেন, ‘আত্মীয়-স্বজন সবাই এসে বলে, মোদাসসের চৌধুরী যা করার করুক। বাজা বেটি বিয়ে করছে, সে আর কতটা সম্পত্তি নেবে? সবই তো তোমার ছেলেমেয়ের!’ বলো তো, আমার ছেলেমেয়েকে তাদের বাপের সম্পত্তি পাইয়ে দিতে তবু আমাকে জীবন্তাবস্থায় চিতার ভেতর বসে থাকতে হবে! অথচ তোমার শ্বশুরের সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল, আমাদের দু’জনের পছন্দে।’
:ওমা, তাই?
:আমি তখন কলেজে উঠছি মাত্র!
:আপনি কলেজে পড়তেন?
:ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই সালমান পেটে এসে গেল। আর পারিনাই।’
:দুই বাড়ির কেউ আপত্তি করেনি?
:করেছিলো। সমান ঘর, শিক্ষাদীক্ষায় সমান হলেও এদের পরিবারে কিছু পুরনো বদনাম আছে। ভাবছিলাম, এই সময়ে এসে সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ ভুলে যাবে পুরনো কথা! কিন্তু কস্মিনকালেও ভাবিনি আমার বেলাতেও এসে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে।
:আপনি তো রাজকন্যার মতো দেখতে ছিলেন। আচ্ছা, আপনার ইচ্ছে করে না, আপনার স্বামী আপনার সাথে যা করেছেন, তার প্রতিশোধ নিতে?
:মাঝে মাঝে ইচ্ছে করছে বিষ খাইয়ে মারি।’
:ধুর মা! তাই কি হয় নাকি? আপনার ফাঁসি হবে না?
:তোমার মনে হয়, ফাঁসিকে আমি ভয় পাই!
:না মনে হয় না। কারণ পৃথিবীটা আপনার কাছে খুব অসুন্দর-কুৎসিত হয়ে গেছে। জীবন যাদের কাছে সুন্দর, কেবল তারাই মরতে ভয় পায়। বিপন্ন হতে ভয় পায়।
:তোমার শ্বশুর এই অপকর্ম করার পর সবাই মিলে বাড়িটা আমার নামে লিখে দিতে বাধ্য করছে। কিন্তু কি হবে এই বাড়ি দিয়ে বলো? আমার শ্বশুরেরও চার বিয়ে ছিল। এর ভেতর দুটোই ছিল বাড়ির বান্দি। যত আত্মীয়-স্বজন আসে, এরা সব কত কিসিমের রক্তের, তা ভাবলে তোমার মাথা নষ্ট হয়ে যাবে।
মুনমুন টের পায়, তার নিজের পায়ের নিচের মাটি আলগা ঠেকছে। তার প্রতি সালমানের উচ্ছ্বাস কমে আসছে। বুদ্ধিমতী মেয়ে সে। সে বোঝে তার কাছে যে সালমানের বাড়ির এইসব গড়মিলে কাজগুলো দারুণ প্রহসন ঠেকছে, অথচ এর একটিরও উত্তর নেই তার কাছে। মুনমুন পালানোর পথ খোঁজে। পালানো মানে বলেকয়ে চলে যাওয়া। সেটা খুব কঠিন কাজ হবে না, এটাও সে বোঝে। কিন্তু মা-বাবাকে কি বলবে সে! ফোনে প্রায় প্রতিদিন যোগাযোগ হলেও খুলনাতে যাওয়ার নাম করেনি এই ছয়মাসে। শাশুড়ির মানসিক ও শারীরীক সেবাযত্ন করে কেমন নেশাগ্রস্ত একটা সময় যাচ্ছে। লুৎফা বেগমও একসময় তার শাশুড়ি থাকবে না, এটাও সে সুনিশ্চিত। তবু মনে হচ্ছে তাকে সুস্থ করে মেরুদ-টা সোজা করে দিয়ে যাই।
সালমানের মা পরিবারের ভেতর নিগৃহীত হয়ে জীবন নিয়ে মরণের মতো ধুকছে। কিন্তু মুনমুন সেই রাত থেকে, যে রাতে তার সাথে সবার মনোমালিন্যের সূত্রপাত, ঠিক সেই ক্ষণ থেকে নিবিষ্ট হয়ে খেয়াল করছে, বাবার প্রতি সালমানের কোনোই ক্ষেদ নেই। মায়ের প্র্রতও নেই বিশেষ কোনো ভালবাসা। যে মা তাদের জন্য ফিরে এসেছেন পরিত্যক্ত ঘেন্নার সংসারে। মুনমুন ভাবে, পিতার এই বিষয়টিতে যদি তার ভেতর কোনো ক্ষোভ সঞ্চার না-ই করে, তাহলে সেও যদি তার বাবার মতো ওরকম কিছু করে ফেলে! বাবাকে সে ত্যাজ্য করতে বলে না। কিন্তু নীরবে হলেও তার মন্দ কাজগুলোকে নিন্দা করতে শিখুক।
বছর খানেক পার হতে সে টের পেল, কোথায় স্বামী-সংসারের প্রতি তার টান বাড়বে। সন্তাান জন্মদানের প্রস্তুতি নেবে, কিন্তু ক্রমেই তার মনে হতে থাকে, তার পায়ের নিচে চোরাবালি। তার যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, তা দিয়ে হুট করে একটি চাকরি সে পাবে না। কিন্তু গান নিয়ে সে যে স্বপ্ন দেখতো, স্বপ্ন দেখতো সে বাচ্চাদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে। সাথে বয়স্কদের জন্য সেলাই ও কাপড় কাটার স্কুল। যাকে বলে দর্জিবিজ্ঞান চর্চা। মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সেবা-যত্ন করতে যে সে লেখাপড়ায় পিছিয়ে গেলো, বিনিময়ে মা-ই তাকে এইসব বিষয় ধারণা দিয়েছেন। মা বলেছেন, ‘আমি যদি বেঁচে থাকি, আবার উঠে দাঁড়াতে পারলে তোমাকে এসব বিষয়ে আমি সহযোগিতা করবো।’
মা এখন ভালো হয়ে উঠছেন। রিমঝিমই মাকে এখন দেখাশোনা করছে। মুনমুন ভাবছে, মা’কে গিয়ে বলবো, মা আমি তোমার স্বপ্নের কাছে ফিরে এলাম।’ যদিও আরো একটা দ্বিধা আছে। সাজিদ আর রুনু আপা কী ভাববেন?
মুনমুন শোয়া থেকে উঠে মুখে পানির ঝাপটা দিতে দিতে ভাবে, ‘ভাবুক যার যা খুশি! সাজিদ রুনু আপাকে বিয়ে করার আগে একবারও কি আমাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কঠিনস্বরে জানতে চেয়েছে, ‘বল্, আমি কি তোর এতটুকুও সুখ নই?’

মুনমুন লুৎফা বেগমকে সাথে নিয়ে আজ নিজের টাকায় অনেকগুলো আধুনিক শাড়ি আর কসমেটিক কিনেছে। যা দেখে কাজলও উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। সেও সেখান থেকে বলেকয়ে কিছু তস্রুফ করে ফেলে। আর সেটাও ভারী ভাললাগে মুনমুনের। মুনমুনের শুধু ওদের একটি বিষয়ই খারাপ লাগে মায়ের প্রতি কারো আলাদা মূল্যায়ণ না থাকা। আর বাবার প্রতি বিতশ্রদ্ধ না হওয়া। ওদের সবার এই জীবন যাপনকে তার এককথায় বমি ভক্ষণের মতো মনে হয়। আর এই ব্যবহারে সে নিজে অভ্যস্ত হওয়ার আগেই পালাতে চায়। তাতে ধীরে ধীরে সবাই হয়ত জানবে, সে সবার অমতে সালমানের কোনো কিছু না জেনে তাকে একাই বিয়ে করে পথে নেমেছে। তারপর বছর না যেতে তার সাথে এডজাস্ট না করতে পেরে আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু তার ভেতরে আরেকটি সত্তা মাথা তুলে বলে, সব ত্রুটি-স্খলন একদিন নিজের কীর্তি দিয়ে মানুষকে ভুলিয়ে দিতে হবে। কে কি বলবে, তা ভেবে সে এই ধরণের মানসিকতার মানুষদের সাথে জীবন কাটাতে পারবে না!
মানুষের সাথে মেশার এক অদ্ভূত ক্ষমতা আছে মুনমুনের। অচেনা আরেকটি শহরে গিয়েও যেখানে যায়, সবার সাথে নিজের মতো পরিচিত হয়ে যায় সে। দু’চার জায়গায় স্টেজে গানও গেয়েছে সে। শাশুড়ি-ননদ- দেবর, বর প্রথম সারিতে বসে তার গান শুনছেন, এটাও তার অনুপ্রেরণা। আর এজন্যও লুৎফা বেগমের গুমোট ভাবটা কাটতে থাকে।
মুনমুন এক গভীর রাতে সালমানকে বললো, আমি খুলনা যেতে চাই!
:হঠাৎ?
:হঠাৎ হবে কেন? যাওয়া কি দরকার না?
:কই, তোমাদের বাড়ি থেকে কেউ তো এতদিনে খোঁজ নিতে এলেন না?
:আসতে তো চায়ই। আমি ঠেকিয়ে রাখি।
:কেন?
সালমানের শেষ প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে পাশ ফিরে শোয় মুনমুন।
এরপর সে মনস্থির করে, সে চলেই যাবে। একেবারে যেতে চায়, নাকি ফিরে আসার জন্য যেতে চায়, তা কাউকে সে খুলে বলে না। বাড়িতে মোদাসসের চৌধুরী ছাড়া আর সবার মনে তার একটা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে। ননদ কাজল। দেবর আরমান। ড্রাইভার, রাঁধুনী থেকে বাড়ির জনাচারেক কাজের লোক সবাই যেন আলাদা প্রাণ পেয়েছে মুনমুনের জন্য। এমন কি যাকে নিয়ে মুনমুনের এত বিপত্তি মোদাসসের চৌধুরীর দ্বিতীয় স্ত্রী সেই জামিলাও। জামিলা তাকে বৌমা ডাকতে শুরু করলে, মুনমুন বললো, আপনি আমাকে আম্মা ডাকবেন, বউমা নয়। ওই ডাক আমার শাশুড়ি একাই ডাকবেন।!’ জামিলা সেই থেকে তাকে তাই আম্মাই ডাকে তাকে। কিন্তু সে নিজে জামিলাকে কিছু ডাকে না। এটাই তার পক্ষ থেকে এতটুকু প্রতিবাদ। কাজল একদিন এর হেতু জানতে চাইলে সে বলেই ফেললো, ওনার বৌমা ডাকের উত্তর দেয়া মানে ওনাকে আমি স্বীকার করছি!’
কাজল বললো, তুমি, আমি স্বীকার করা না করার কে?
: কে মানে? আমরা প্রতিবাদ তো করতে পারি! আর তা সরবে না হলেও নীরবে।
:অত গোড়াতে কি তোমার, আমার প্রতিবাদ পৌঁছাবে ভাবি?
:যতদূর পৌঁছাবে!
:শোনো ভাবি, আমার দাদা যখন বিয়ে করে আনেন। স্ত্রী’র সাথে চিরকালের জন্য একজন দাসী দিয়েছিল স্ত্রী’র বাপের বাড়ি থেকে।
:দাসপ্রথা তো আরো আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে কবে!
:শোনো আগে। মানে সে দাসীকে বাড়ির চাকরের সাথে বিয়ে দিয়ে বাড়িতে রাখলে তাদের যে ছেলেমেয়ে হয়, তারাও বংশ পরম্পরায় বাড়ির মালিকের ছেলেমেয়ের বাড়িতে কাজ করতো। সেই নিয়মে তাদের বাড়ির মেয়ে বিয়ে দিলে, সেই একেকটি মেয়ের সাথে একেকটি দাসী দেয়া হতো।
:ও!
:শোনো ভাবি, তুমি একথা বাইরে কাউকে বলো না। আমার দাদা বাঁদিসহ বিয়ে করে এনেছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রীকে। তো আমার দাদা যাকে বিয়ে করেছিলেন, তাদের দু’বোনের একসাথে একইদিনে বিয়ে হয়েছিলো। দুবোনের সাথে তাদের বাড়িতে জন্ম নেয়া কোনো চাকরের দুই মেয়েকে বাঁদী হিসাবে দেয়ার জন্য তৈরি করা ছিলো। তো আমার দাদার যিনি আসল স্ত্রী ছিলেন…।
:দাদার আসল স্ত্রী মানে তোমার দাদি না?
:বলছি, শোনো। তো দাদার সেই আসল স্ত্রী তার শ্বশুরবাড়ি আসার সময় দুবোনের ভেতর, যেটা দেখতে বেশি খারাপ তাকে এনেছিলেন। তার মা তাকে তার ছোটবেলায় বারান্দায় রেখে কাজ করার সময় গিরগিটি তার ঠোঁটের কোনা কামড়ে খুবলে নিয়ে গিয়েছিলো। তাই সে দেখতে এমনিতে কালো ছিল। তারওপর ঠোঁটের কোনা না থাকায় আরো কুৎসিত ছিলো। তো দাদার স্ত্রী’র যখন ছেলেমেয়ে হচ্ছিল না, তখন দাদা সেই ঠোঁটকাটা নারীকেই আবার বিয়ে করেন। আর সেই আসল স্ত্রী যখন দিনের পর দিন দেখলেন, যারা বংশ পরম্পরায় তাদের বাড়ি কাজ করতো। তিনি যাকে বাঁদি হিসাবে বাবার বাড়ি থেকে সাথে করে নিয়ে আসছেন, সে আর তিনি একই গহনা পরেন। একই রঙের শাড়ি পরেন। তাঁর বিছানা খালি করে তার স্বামী সেই সে তার কুৎসিত দাসীর কাছে পড়ে থাকে…।
:তারপর?
:তারপর তুমি কল্পনা করে নাও। আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করে নিই। তখন দাদার সেই স্ত্রী’র আঁচটা কিছুটা টের পাই। তা ছাড়া গল্প বলো, নাটক সিনেমা, আঁকা ছবি কিছুতেই নারীর এই নীরব যন্ত্রণা তুলে ধরা কারো পক্ষে সম্ভব নয়!
:তুমি এসব ভাবো, কাজল?
:রীতিমত ভয়ও পাই! তুমি চিন্তা করে দেখো, বাড়ির চারিদিকে পরিখা কাটা। পরিখার এপাশে বেতের ঘন ঝোপ। গেটের কাছে চব্বিশ ঘন্টার দারোয়ান এবং পুরুষদের বিনোদনের নাচঘরও ছিল বাড়ির সেই গেটের কাছে। তাই সেই মহিলা পালানোরও পথ পায়নি। আর আগে তো এসব ঘটনার পর বাড়ি থেকে সমব্যথী হয়ে কেউ নিতেও আসতো না। এটা ছিল স্বাভাবিক ঘটনা! তবু এন ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে অন্দর মহলে নারীদের নিজেদের পোষা আগুন নিশ্চয় আরো দাউ দাউ করে উঠতো। তাদের বিগত জীবনের ঝিমিয়ে আসা আগুন আবার টগবগ করে জ্বলে উঠতো বাড়ির কোনো মেয়ের জীবনে আবার তাদের মতো একই ঘটনা ঘটলে। তাই দেরিতে হলেও সেই মহিলা স্বাভাবিকভাবে নাইওর গেলে আর ফিরে আসতে চায়নি। কিন্তু দেখো, তাদের তো বিনোদনের কোনো বিষয়ই ছিলো না। অপমানে পুড়ে স্বামীর বাড়ি থেকে সেই পুরনো বাপের বাড়িতে ওঠা আর কতটুকু মুক্তি দিতে পারে?
:তারপর কী হলো?
:তারপর প্রায় বছর পাঁচেক পর আমার দাদার পুরনো স্ত্রী’র কথা মনে করে একজনের সাথে আলাপ করতেছিলেন। এর ভেতর সেই দাসীর ঘরেও তিন ছেলেমেয়ে হয়ে গেছে। যার কাছে পুরনো স্ত্রী’র গল্প জুড়ছিলেন, সেই তিনি তখন সাহস দিলেন। বললেন, ‘তোমাদের ছাড়াছাড়ি তো হয়নি। তুমি যে কোনো সময় যেতে পারো শ্বশুরবাড়িতে।’ তারপর দাদা সত্যিই তাঁর শ্বশুরবাড়ি গেলেন। সেই দীর্ঘদিন পর তার স্বামীর সেই একরাতের আগমনে তিনি গর্ভবতী হলেন। আসগর আলী চাচার এই জন্মটা যদি আগেই হতো, তাহলে হয়ত দাদা সুন্দরী, বিদূষী স্ত্রী’র কুৎসিত দাসীকে বিয়ে করতেন না। তবে ওই চাচাকে জন্ম দিতে গিয়ে দাদার সে স্ত্রী মরে বেঁচেছেন!
:আজগর আলী চাচা তো তোমাদের সৎচাচা? তাহলে তোমাদের দাদি কে?
:আমাদের দাদি, ওই যে দাদার স্ত্রী’র সাথে আনা গিরগিটির কামড়ে ঠোঁটখাওয়া সেই বাঁদী! আমাদের অন্যান্য চাচারা আমার বাবার প্রজার মতো কেন, জানো?’
কাজলের শেষের প্রশ্ন মুনমুনের মাথায় ঢোকে না। কাজল তবু বলে যায়, বাবা তো দাদার প্রথম বয়সের সন্তান। আগে আগে লেখাপড়া শেষ করেছেন। আর দাদা একটু আগেই অথর্ব হয়ে পড়েছিলেন। বাবাকে তিনি বিশ্বাস করতেন। আর বাবা সেই সুযোগের পুরোই সদ্ব্যবহার করেছেন। মায়ের পক্ষ হয়ে তুমি যে প্রতিবাদ করতে বলো, ক’টা অন্যায়ের প্রতিবাদ তুমি করবে? কোনখান থেকে শুরু করবে বলো?
কাজল আর মুনমুনের এ কথপোকথন বেশ রাত পর্যন্ত চলে। সালমান ঘরে ঢুকলে কাজলের যখন ওঠা উচিৎ ভাইবোনোর মৃদু আলাপ শেষ করে কাজল সালমান-মুনমুনের ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
সালমানকে তার বাবা চা বাগানের ম্যানেজার করে দিচ্ছেন। সাথে কলেজের মিটিংগুলোতেও তাকে রাখেন। মুনমুন মনে করে ছেলেকে কঠিনভাবে কর্তব্যে বাঁধতেই বাবার এই প্রচেষ্টা। কারণ শ্বশুরের সাথে মুনমুনের বিবাদ লাগার আগে মুনমুনের জন্য অঢেল সময় ছিল সালমানের। এখন একটার পর একটা কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখা। বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে হলে মুনমুনেরই তাতে ভাল লাগতো।
সালমান যে ঘরে ঢুকেছে, তার সৌজন্যে কিছু করতে না হলেও কিছুক্ষণ যে চুপচাপ বসে থাকবে, সে বোধও মুনমুনের হারিয়ে গেছে। সে আলমারির ওপর থেকে টান দিয়ে সুটকেসটা নিচে ফেলে তার কাপড়-চোপড় গোছাতে লাগলো। সালমানও তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে ফেললো, কি করছো?
:দেখতেই পাচ্ছো কি করছি। আমি কালই খুলনা চলে যাচ্ছি!
:কি এমন হলো যে তোমাকে কালই যেতে হবে?
:কিচ্ছু হয়নি। এমনিই যাবো।
:একাই যাবে নাকি?
:এই সময়ে একটি গ্রাজুয়েট মেয়ে একা সিলেট থেকে খুলনা যাবে সে আর এমন কি?
:এভাবে একা গেলে বুঝতেই পারছো, পরিণতি কী হবে?
:ওসব নিয়ে ভাবছি না!
:তুমি অযথাই পরিবেশটা ঘোলা করছো। বাবা কিন্তু চুপ হয়ে গেছেন। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি বরং তোমার বাবাকে আসতে বলতে পারতে!
:তোমার বাবা চুপ না হলে অবস্থাটা কি হতো, তা জানার জন্য আমি আর সময় ক্ষেপণ করতে পারছি না। কারণ তোমার নিয়তি তোমার বাবার হাতে বাঁধা!
:আমি আমার বাবার বৈধ উত্তরসূরী। অযথা তার সাথে বিরোধ তৈরি করে লাভ কি? যা নিয়ে বিরোধ করবো, সেটা যখন দরকার ছিলো, তখন তো আমরা অসহায় শিশু। এখন সব যখন সয়ে গেছে, খুঁচিয়ে ঘা বাড়ানোর দরকার কি?’
মুনমুন খুব শান্তস্বরে জবাব দিলো, তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু আমার এই এভাবে চলে যাওয়া পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অকথ্য কিছু কার্যকলাপের পরোক্ষ প্রতিবাদ হিসেবে থাক। আমি চলে গেলে তোমার জীবনে আবার যে আসবে, আমার এই যাওয়াতে যদি তুমি এতটুকুও বেদনা পাও, সেই বেদনার লাবণ্যে তাকে সম্মান দিয়ে ভালবেসো! সব সময় মনে রেখো, তোমার রাত্রিদিন, সুখ-দুঃখ, ভালমন্দ, তোমার সবকিছুতে কেবল তারই অধিকার। তাকে বঞ্চিত করা, তাকে ঠকানো মানে, পৃথিবীটা তোমার ভোগের জন্য অবাধ থাকবে, কিন্তু তুমি হারাবে পবিত্র কোনো হৃদয়ের একান্ত ভালবাসা! একখানা নৌকা যেমন একটি নোঙরের ওপর নির্ভর করে চলে, স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কটা তেমন হলে আশেপাশের সবার জীবনও শান্তির হয়। পরবর্তী প্রজন্ম গ্লানিমুক্ত একেকটি আত্মবিশ্বাসী জীবন পায়।’
মুনমুনকে থামিয়ে দিয়ে সালমান বলে ওঠে, আচ্ছা, তুমি ভয় পাচ্ছো, আমিও বাবার মতো করি কিনা।’ শুধু বাবার মতো? তোমার দাদার মতো বিষয়টাও তো আমার মাথার ভেতর রিপ্লে হচ্ছে। তুমি আমাকে যেতে বাঁধা দিও না প্লিজ! মনে করো বেড়াতেই যাচ্ছিৃ।’
বিষয়টা রাতেই মোদাসসের চৌধুরীর পরিবারের ভেতর রটে গেল, মুনমুন সকালে একাই তার বাবার বাড়ি চলে যাচ্ছে। শ্বশুর এতে খুশি হলেন। এজন্যে যে বৌমা একা যেতে চাইলেও তার ছেলে বাবার অবাধ্য হতে সাহস করেনি। সে এগিয়ে দিয়ে আসতে চায়নি। কিন্তু বাড়ি কুরুক্ষেত্র করে তুললেন, লুৎফা বেগম। তিনি মুনমুনকে কিছুতেই যেতে দিতে চান না। খাবার টেবিলে আরমান অবশ্য বলেছে, ভাবি একা কেন যাবে, আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো অথবা গাড়ি নিয়ে যাক। আবার গাড়িতে করে চলে আসবে।’ আরমানের কথা শেষ হতেই মোদসসের চৌধুরী বললেন, ‘তোমার কাজ আছে। গাড়িরও কাজ আছে।’ বাবার কথার ওপর এখনো সালমানই কথা বলা শেখেনি, আর থাক তো আরমান। তাই ওখানেই বিষয়টা শেষ হয়ে গেলো। কিন্তু স্বামীগৃহ থেকে ক’দিনের জন্য বেড়াতে আসা কাজলকে আজ ডেকে খাবার টেবিলে আনা যায়নি। তার নাকি মাথা ধরেছে। পরে একা খাবে অথবা সে তার মায়ের সাথে খাবে। কিন্তু অনীহা নিয়ে খেতে খেতে মুনমুন বুঝতে পারলো, কাজল তার পূর্বপুরুষের কৃতির কথা বলে ফেলে তাকে যে বিষিয়ে দিয়েছে, তার এই মাথাধরা সেই অনুতাপেরই ফল। কিন্তু কাজল তার চোখের পর্দা ছিঁড়ে যে বহুদূর দেখতে সাহায্য করেছে, এজন্য কাজলের প্রতি সে কৃতজ্ঞ হয়।
লুৎফা বেগম মুনমুনকে তার রুমে ঢোকার আগে কড়াস্বরে ডাক দিলেন। মুনমুন ভড়কে গিয়ে শাশুড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। লুৎফা বেগম প্রায় চেঁচিয়ে বললেন, তুমি যাচ্ছো, তুমি আমাকে কার কাছে রেখে যাচ্ছ?
:আপনি আগে কার কাছে ছিলেন?
:আগে আমি জীবিত ছিলাম না। মরে ছিলাম। তুমি জানো না, আমাকে প্রতিদিন আফিম খাওয়ানো হতো।
:তাই নাকি? শোনেন মা, জীবিত মানুষ যখন বোঝে সে জীবিত, তার তখন একাই থাকতে পারার কথা!
:তুমি এইখানে তোমার অনিচ্ছায় থাকো, তা আমি চাই না। তবে যেখানে যাও, আমাকে সাথে নাও।
:আমি তো আপাতত আমার বাবার বাড়ি যাবো। আপনি যাবেন সেখানে?
:তুমি যেখানে যাও, আমি সেখানেই যাবো!
:কিন্তু আপনার নিজের তিনটি ছেলেমেয়ে, ভরা সংসার…!
:আমার ভরা সংসার, একথা তুমি বলছো?
:কেন নয়! আপনি এখন কোন কারো শাখা বা প্রশাখা নন। আপনি নিজেকে এখন থেকে বৃক্ষ ভাবতে শিখুন। আপনার ছায়া আপনার ছেলেমেলের দরকার!

০০০

সকালে মুনমুনকে যখন ড্রাইভার বশির দিয়ে আসতে যাবে, মুনমুন গাড়িতে ঢুকতেই আরেক দরজা দিয়ে লুৎফা বেগম আরেকটি সুটকেস নিয়ে উঠে পড়লেন সে গাড়িতে। বাড়ির প্রতিটি সদস্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও তার সে সহযাত্রা ঠেকাতে পারল না।
সিলেট থেকে প্রথমে ঢাকা যাওয়ার ট্রেনের ফার্স্টক্লাসের দুটো টিকেট পেতে বেগ পেতে হলো না। ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত ড্রাইভারও ওদের সাথেই ছিল। দুজনের মাঝারি সুটকেস দুটি ওপরে বাংকে রেখে মুনমুন জড়সড় হয়ে বসলেও, লুৎফা বেগম নিজের সবটুকু ভার ছেড়ে দিলেন মুনমুনের ওপর। কোনো কথা বললে শব্দে শোনা যাবে না বলেই দু’জন অনেকক্ষণ কোনো কথা বলেনি। তারপর ট্রেন কোথাও থামলে কিছুটা শব্দহীন সময় পেলো মুনমুন, তখনি সে একটু রেগে বললো, কেন মা আপনি আমার সাথে এলেন? নিজের ঘর-সংসার, সন্তান ছেড়ে এমন অনিশ্চিত যাত্রায় যে পা বাড়ায়, সে সুস্থ মানুষ তা আমি ভাবি কী করে?
:আমি ঠিকই সুস্থ। আর অনিশ্চিত যাত্রা হবে কেন? তুমি আছো না? কিন্তু তুমি তো সুস্থ নও। আজ আমি আমার জন্য আসিনি।
:তবে?
:তোমার জন্য
:কেন?
: এতদিন পর একটা মেয়ে এভাবে বাপের বাড়ি একা গেলে সে সত্যমিথ্যে দিয়ে মা-বাবাকে যা-ই বোঝাক না কেন, কিন্তু মা-বাবা সমাজের মানুষের কাছে কি উত্তর দেবেন? আর শোনো, আমরা ঢাকাতে দু’দিন কোনো হোটেলে থেকে যাই। নাহলে জার্নিটা দীর্ঘ একটানা হয়ে যাবে।
:মা, আমি কিচ্ছু ভাবতে পারছি না। আমার আপন চাচা আছেন ঢাকাতে। তাঁকে ফোন করেছি আসার আগে। তিনি একটি মন্ত্রণালয়ের সচিব। আমার জন্য গাড়ি পাঠাবেন স্টেশনে। কিন্তু আপনি আমার মতো একটি ক্ষুদ্র মানুষের কারণে এতবড় পদক্ষেপ নিতে পারলেন?
:তোমার শ^শুরবাড়িতে আবার ফিরে আসাটাও যেন অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে, তার জন্যও…।
:তাহলে তো ভালই হয়, ফিরতে না হলে!
:সে তোমার হয়। কিন্তু আরেকজন?
:আরেকজনটা আবার কে?
:তুমি খেতে গেলে খেতে পারো না। প্রায়ই বমির শব্দ পাই। যা না জানে গাঁয়, তা জানে মায়…। একজন মা কি শুধু পেটেধরা সন্তানেরই মা হয়?’
:মুনমুন ডুকরে কেঁদে ফেলে। বলে, কিন্তু এই বাচ্চা আমি রাখবো না মা। এভাবে আমি এজন্যই সময় থাকতে ছিঁটকে বেরিয়ে এলাম। সম্মানজনকভাবে বাঁচার জন্য, জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ের জন্য আমাকে প্রস্তুত হতে হবে। আমার বাবার তো আপনাদের মতো প্রাচুর্য নেই!’
:এটা কোনো দায়িত্বশীল মানুষের কথা হলো? যে আসছে, তাকে নিয়েই লড়াই করবে। তাতেই লড়াইটা মজবুত হবে!
:কিন্তু আমাকে তো আরো লেখাপড়া শিখতে হবে। মাথায় যা পরিকল্পনা আছে, তার জন্য আমাকে অনেক ধকলের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। আমি একটি শিশুকে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভেতর টেনে আনতে পারবো না।
:ধকল সওয়ার পরিণতি থেকে তো আমি তোমাকে রেহাই দিতে পারবো না। সে তোমাকে তোমার মতো সইতেই হবে। তবে আমার চেষ্টা তোমার জীবনের মোড়টা ঘুরিয়ে দেয়া। তুমি আমার জীবনের মোড় যেভাবে ঘুরিয়েছ, অতটা পারবো না যদিও।’
মুনমুন মনে মনে রাগই হচ্ছে। লুৎফা বেগমকে এখন তার ফাঁসির দড়ি মনে হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন একা অসুস্থ মায়ের সেবা করেছে। আবার বছরখানেক সময় নিজেকে নিয়ে বিয়ের নামে যা ঘটলো, তা তার কাছে প্রহসনই মনে হচ্ছিলো। তাই তো তার এভাবে ছিঁটকে বেরিয়ে আসা। তার খুব কান্না আসে। কারণ সালমানের সাথে যখন এই পথে সে সিলেট গিয়েছিলো, মনে হচ্ছিলো পৃথিবীটা আনন্দধাম। ট্রেনকে মনে হচ্ছিলো আনন্দরথ। কিন্তু আজ! তারওপর আবার শাশুড়ি যেভাবে আটঘাট বেঁধে তার সাথে যাচ্ছে, তাতে তো সে নিজের মতো সব সিদ্ধান্তও নিতে ও তা কার্যকর করতে পারবে না!
লুৎফা বেগমের কি মনে হলো, যে তিনি এতক্ষণ মুনমুনের ওপর নিজের ভর ছেড়ে বসেছিলেন, সেই তিনি সোজা হয়ে বসে মুনমুনকে টেনে নিলেন নিজের দিকে। বললেন, আমি আমার একশো ভরির সোনার গহনা তোমার জন্য নিয়ে আসছি। বাড়ির দলিলও। আর ওইযে চা বাগান, সালমান যেটার ম্যানেজার হলো, ওই বাগানও তোমার শ্বশুর খাজনা বেশি দেওয়ার ভয়ে আমার নামে কিনেছিলো। আমি সব কাগজপত্র নিয়ে এসেছি!
:কিন্তু আমি আপনাদের জিনিস কেন নেবো?’ মুনমুন অক্ষম আক্রোশে ফেটে পড়ে।
:তুমি নিচ্ছ কই? যাদের জিনিস তাদের উত্তরসূরীরর কাছেই যাবে। শুধু ক্ষমতার ধরণটা বদলে যাবে। তবে এগুলো ব্যবহার ও পরিচালনার ক্ষমতা তোমার থাকবে। তুমি যাদের উত্তরসূরী পেটে ধারণ করেছো, তার সবকিছু কেবল তোমারই। অর্থনৈতিক ক্ষমতা অবলম্বনের মাধ্যমেই কেবল নারী নিজের ক্ষমতা ফেরাতে পারবে। আর সেই চালিকাশক্তিই আমি তোমাকে দিয়ে যাবো। যা মানুষ হিসাবে তুমি অর্জন করে নিলে। এ আমার কোনো করুণার দান নয়।
মুনমুন কিছুই বলে না শাশুড়ির একটানা কথার উত্তরে। তার চোখ-মুখে ফোটা কোনো অভিব্যক্তির অনুবাদ করতে পাছেন না লুৎফা বেগম। কিন্তু তবু তিনি দমেন না। কারণ তিনি মনে মনে রচনা করে চলেছেন এক সোনার মন্দির। আর তাতে দেবীর মতো অধিষ্ঠিত করবেন, এই মেয়েটিকে, যে তাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে। যে তার বেদনা ও অপমানের ভাগ নিেেছ। একে কেন্দ্র করেই সব আবার নিজের দিকে টানবেন। হয়ত তার জন্য সময় লাগবে। কিন্তু এখন তিনি অতদিন বাঁচতে প্রস্তুত। তিনি এলোমেলোভাবে ভুলো সুরে তাই গাইতে থাকেন, ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব বিষম ঝড়ের বায়ে/ আমার এই ভাঙা নায়ে।।/ মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে ছেঁড়া পালে বুক ফুলিয়ে/ তোমার ওই পারেতেই যাবে তরি ছায়াবটের ছায়ে।।/ পথ আমারে সেই দেখাবে যে আমারে চায়-/ আমি অভয় মনে ছাড়ব তরী, এই শুধু মোর দায়।/ দিন ফুরালে, জানি জানি, পৌঁছে ঘাটে দেব আনি/ আমার দুঃখ দিনের রক্তকমল তোমার করুণ পায়ে।।’
বেসুরো হোক তবু আশ্চর্য হয়ে শাশুড়ির পুরো গানটি শুনলো মুনমুন। তারপর শাশুড়ির গলা ধরে এবার হু হু করে কাঁদতে শুরু করলো সে। বললো, সব বিপর্যয় ও ধংসস্তূপ ঠেলেফুঁড়ে জীবন আবার উঠে দাঁড়াতে পারে, এই বিশ্বাস আপনি আমাকে এনে দিলেন মা! থ্যাঙ্কস্ গড…