খরা প্রহর

ভোর না হতেই পাখি পাড়ায় তুমুল বিবাদ
জল সংকটের আভাস পেল কি?
কিংবা শুনেছে হয়তো বৃক্ষ শিকড়ের আর্তনাদ
লু হাওয়া আর অগ্নিধুলোর ধোঁয়াশায় ছটফট করছে নীড়ের ডিম।
আমিও শুনতে পাই মাটি ফাটার শব্দ,
শোক বিনিময় করতে করতে নাড়ী ছিন্ন করে গাছ,
সবচেয়ে দুর্গম অন্ধকার নেমে আসে আলপথ থেকে রাজপথে।
তবু বুক কাঁপে না, ঠান্ডা হয়ে আসে না রক্ত কেন?
কেন এখনো আমি স্বাভাবিক?
দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকারে ঝরে যাচ্ছে না খরা প্রহর?
এখনো শান্ত হয়ে পুজোয় বসছি!
পাঠ করছি ধর্মগ্রন্থ!
ভাত রাঁধছি, সেলাই পারছি!
আমার কি মৃত্যু কাম্য ছিল না হে ধরিত্রী
তোমার আদেশে…
…………………………………………..

সাঁঝবাতি

কখনো সন্ধ্যাও সরে যায় ছায়ার পালক থেকে,
তুলসি পাতার গন্ধ নিয়ে চুপটি করে বসে থাকে দীপের পাশে।
আভ্যন্তরীন ঝোড় পোকারা স্ব ইচ্ছায় মরণ খায়,
এ মরণে আগুনের কোনো দায় নেই।
সাঁঝের নৈঃশব্দ্য নিয়ে আমিও সাজাই জোনাক ঘর,
বাঁশ পোকার দহন খুলে আলোর দিকে বাড়িয়ে দিই প্রাণ,
তখন মন ভালো করা মুহূর্তরা আড়াল করে অতীত কুয়াশা,
শাঁখের আওয়াজ বয়ে আনে আগমনী,
লক্ষ্মীর পাঁচালির ভেতর ডুবে যায় ভরা গেরস্থ, পৌষ…
…………………………………………..

আরো একমাঠ কুয়াশা

ভুল করাটা যখন অভ্যাসে এসে যায়
প্রাসাদ চোখে ধাক্কা খায় তুলসীগাছ।
অথচ ভুলের ভেতরেও দীপ ছিল ধূপ ছিল
আলো ওম সুর গান,আর ছিল শ্রীবৃক্ষের ছায়া।
দুরন্ত হাওয়ার মতো এক বালিকা অষ্টপ্রহর জাগিয়ে রাখতো
ঝোড়ু জেঠুর পালাগান,লক্ষ্মীর পাঁচালি
অতীতের সেই বড়ামতলা, সিঁদুরলেপা শিলা ঘিরে অপূর্ব নৈঃশব্দ্য,
আরো ছিল পীরের দরগা,বুড়ি শীতলার ঘাট
সোম শুক্রের হাট,রামনবমী গাজনমেলা
বেড়া কীর্তন পৌঢ়াঅষ্টমী কোজাগর, আরো কত কি জেগেছিল
সবুজ থৈ থৈ ধান মাঠের মতো।
ফাতনা নড়লে এতো ভুল ধরো তুমি
ভেঙে যায় যোগ
বাজপড়া শিমুল গাছের দিকে তাকিয়ে এখন শুধু
এক ত্রিপল ধান মেলে দিই
চোখ ভর্তি ভাতঘুমের আশায়,
…………………………………………..

শীত রোয়া রাত

শীত রোয়া রাতেও অংকুরের স্বপ্ন চলকে পড়ে চোখে,
নতুন খড়ের গন্ধ নিয়ে কেউ দাঁড়িয়েছে উঠোনে
অক্ষর আপ্যায়নে তার সেবা করছি
পা ধুইয়ে দিচ্ছি আদর অশ্রুতে।
চাঁদফোটা রাত বা ঝুলকালো অন্ধকার খেয়াল না করে
নিজস্ব ক্ষমতায় ভরিয়ে দিচ্ছি ঘর
সফল চিমনির আলোয়, অতঃপর
ভোরের আজান শোনা গেলে
নড়ে ওঠে ডোবার জল,ছড়া ঝাঁটের শব্দ,
শাঁখের ধ্বনিতে ঢুকে পড়ে সকাল।
পুরোনো কোনো চাদরের মতো ঝুলে থাকে অক্ষর,
কাপড়মেলা দড়িতে, নতুনের আবাহনে…
…………………………………………..

আলগা গেরো

বুকের ভেতর দৃঢ় করে বেঁধে রাখলে ভালোবাসাও পচে যায়, তাই,
মাঝে মাঝে ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়।
দেখে আসুক অবনী দাদুর সূর্যমুখী খেত,পানের বরজ
দুখু বুড়োর অতসী ফুলের বাগান,টেঙর ফুলের চোখ
সেউনি দিয়ে ভিজিয়ে আসুক বীজতলা–
বিস্ময়ে দেখুক সবজি বাড়ি,বীট গাজরের ফুল
ছিপ ফেলে চোখ রাখুক ফাতনার দিকে
যোগ শিখুক, শিখুক বিয়োগ।

পাঁজরের ভেতর এতো অন্ধকার, ধোঁয়া আগুন শ্বাসকষ্ট
বুঝতেই পারিনি, অনেকদিন থেকে সে
ছাতিমের ডালে একটি পাখি হতে চায়
প্রাণে যার অথৈ যমুনা
আর বাঁশীর আবেগ দুচোখের তারায় তারায়…
…………………………………………..

বাঁশী

কত রাত পাতা ছেঁড়া মাদুরের মতো জীবনে জীবনে,
ভাঙা কলসির পাশে তুলসী গাছ বহন করছে পুর্বজদের কান্না; যেতে যেতে থেমেছি–
শবগন্ধ রোদ ঢুকে পড়েছে লুকোনো শান্তির ভেতর।
খিঁচুনি ওঠা পারুল দিদির মতো গাছগুলো,
ফুল ফোটানোর কোনো আয়োজন নেই,
শীতের গান শুনছে শিকড় ।
পৃথিবীর কান্না একদিকে রেখে আজ না হয় বাঁশী শুনব তোর,
কেমন ঝিম মেরে গেছে প্রাণের সঙ্গীত
লাঙ্গলের
কর্ষন আর আর ফসল কাটার কান্না শুনতে শুনতে,মাটিও ক্লান্ত।
একটা সুর প্রবাহিত হোক ধূলি জীবনের একতারায়,,
…………………………………………..

কালো ছায়ার দিকে

শবের চলা ফেরায় কেউ টের পাচ্ছে না
খুন হয়ে গেছি হঠাৎ।

রোজের মতো স্নান সেরে পুজোয় বসেছি
দীপ ধূপ চন্দনে সাজিয়েছি পসরা
শুধু আজ ভেজে ওঠেনি চোখ
কোথাও কোনো আকুলতা নেই,নেই নিরাময় নিবেদন–
ফুল ছুঁড়ছি, ছুঁড়ছি দীপের আলো
ঈশ্বর হতবাক।
জোড় করে রাখা হাতের আঙুলে আজ কোনো প্রার্থনা নেই।অতঃপর উঠে গেলাম
কালো ছায়ার মতো আরেকদিকে।
আগুনভরা রান্নাঘর
পাঁচফোঁড়নের মতো ছড়িয়ে আছে ধোঁয়ায়, সেদ্ধ ডালে
টগবগ ভাতের চোখে।
কী দারুন আমি নির্বিকার
অশ্রু নেই বিষাদ নেই,
রুদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে
আগুন পুড়িয়ে চলেছি খড়ের ঠোঁটে–
…………………………………………..

কেঠোঘাস

সূর্য থেকে আগুন ঝরছে টপটপ,
কেঠোঘাস শুয়ে আছে রোগা আলপথের গায়ে
শ্বাস দিয়ে চেপে ধরছে আর্তনাদ আর নিজস্ব পথের আয়ু।
মেঠো ইঁদুরের ঠোঁটে অসংখ্য গুহামুখ
হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে ভাঙনের দিকে।
কিছু সুখ, কিছু মাতাল চঞ্চলতা এমনই
টিকে থাকে নিজস্ব খেয়ালে।
ঘাসটি খুব জানে
একদিন জঙ্গী উপদ্রব আল ভেঙে ঢুকে পড়বে রাজপথে,
তছনছ করে দেবে সব
জেনেও সৈনিক নারীর মতো রক্তপাতের ভেতর বাঁচিয়ে চলেছে,
নিজস্ব শিকড়, পৃথিবীর আয়ু
…………………………………………..

বাঁশী ও কান্না

নিঝুম অন্ধকারের ভেতর ডুকরে কাঁদছে কেউ
অশ্রু রঙের জোসনা তখন বাঁশ পাতার গাল গড়িয়ে
নেমে আসছে নিঃসীম ভাঙনের দিকে।
কোনো কথা হয়নি কারুর নীরবতার সঙ্গে
কখন কে যে চুরমার হয় কার ভেতর—
ঝড়ের গুমোটে কে লিখে রাখে কী—

বাঁশীরও কান্না আছে
সুর সুর আনন্দে যতই দেখি পরস্পরের চোখ
আসলে অপূর্ব এক মৃত্যু শুয়ে, অন্তহীন গভীর
…………………………………………..

মই

আষাঢ়ের ঠোঁটে নতুন বাঁশকোঁড়ার গন্ধ,
ঝুরো মাটি দিয়ে সাজিয়ে দিচ্ছে তার ললাট ঠাকুমা।
আমি তখন লাল ফ্রক
আমি তখন বকবকানি,
ঝাঁকড়া চুলে তেল মাখতে মাখতে প্রথম চোখের রোদ ছিটকে আসছে আমার চোখে,
উড়ন্ত সারস খোলা আকাশ তুমুল বেগে ঢুকে পড়ছে
দৃঢ় বিশ্বাসের ভেতর।
মাটি থেকে শূন্যতার দূরত্ব বোঝাতে পুরোনো বাঁশে
মই বানাচ্ছে বাবা,
একের পর এক উঠে যাচ্ছি আমরা ভবিষ্যতের ওপর দিয়ে,
নক্ষত্র মন্ডলের দিকে…