কেমন যেন একটা গা শিরশির করা শব্দ। অরণ্যের সৌন্দর্য দেখতে আসা তিন অশ্বারোহী সচকিত হয়ে উঠলেন। এদিক ওদিক তাকাতেই দেখলেন, সামনেই পাহাড়ের একটা টিলা। আর সেই টিলার ওপর থেকে কালো পুরু পিচ যেন সব ঝোপঝাড় ঢেকে নীচের দিকে গড়িয়ে নেমে আসছে।
জঙ্গলের এদিকটায় ওঁরা বহু বার এসেছেন। কিন্তু এ রকম কখনও দেখেননি।
হঠাৎ লক্ষ করলেন, ওটা তাঁদের দিকেই ধেয়ে আসছে।
আর কালবিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গে ওঁরা সামনে যে গাছটা পেলেন, সেই গাছের উপরেই উঠে বসলেন। নীচে একটা গাছের কাণ্ডের সঙ্গে বাঁধা রইল তাঁদের তিন-তিনটে ঘোড়া।
দেখতে দেখতে সেই কালো ঢলের তোড় যেন ঘোড়াগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। ঘোড়াগুলোর বুক বিদীর্ণ করা কয়েকটা ডাক কেবল ছড়িয়ে পড়ল চার দিকে। তখনও সেই ঢলের শেষাংশ টিলার উপরে।
যখন সেই কালো পিচের ঢল গাছের গুঁড়ি পেরিয়ে গেল, তখন ভাল করে আশপাশ দেখে নিয়ে তাঁরা আস্তে আস্তে গাছ থেকে নেমে দেখলেন, ঘোড়াগুলো নেই।
যে দিকে ঢলটা গেছে সে দিকে একটু এগোতেই তাঁরা চমকে উঠলেন। দেখলেন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে বেশ কিছু হাড়। বুঝতে অসুবিধা হল না, হাড়গুলো আসলে ওই তিনটে ঘোড়ারই।
ওটা কি কোনও লাভা, নাকি অজানা কোনও দুর্যোগ, নাকি ভিনরাজ্যের কোনও কিম্ভুত-কিমাকার প্রাণী?
এতক্ষণ একটা টুঁ শব্দও কেউ করেননি। সবারই চোখে-মুখে আতঙ্ক। কারও মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
এরই মধ্যে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওঁদের ভেতর থেকেই একজন বলে উঠলেন- লিজিনারি অ্যান্টস।

এটা একটা বিখ্যাত ইংরেজি ছায়াছবির দৃশ্য হলেও, এ রকম ঘটনা হরদমই ঘটে থাকে গহন অরণ্যে।
ছায়াছবির ওই লোকটা ছিলেন সম্ভবত আমেরিকার ক্রান্তীয় অঞ্চলের অধিবাসী। তাই ওই নামটা বলতে পেরেছিলেন।
নাম যাই হোক না কেন, আসলে ওরা পিপীলিকা। গোদা বাংলায়- পিঁপড়ে। আফ্রিকার লোকেরা ওদের নাম দিয়েছেন লিজনারি অ্যান্টস বা ড্রাইভার অ্যান্টস। অর্থাৎ চালক-পিঁপড়ে। ওরা একসঙ্গে দল বেঁধে থাকে। চোখে দেখা যায় না এমন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পিঁপড়ে। এক-একটা দলে কত পিঁপড়ে যে থাকে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। গায়ে গা লাগিয়ে, একটার উপরে আরেকটা চড়ে, খানিকটা দলা পাকিয়ে ওরা এগোয়। মাটি থেকে চার-ছয়, এমনকী আট-দশ ইঞ্চিও পুরু হয়ে ওঠে ওদের স্তর। কতটা জায়গা জুড়ে সেই দল এগোয়, তা নির্ভর করে সেই দলের সদস্য সংখ্যার ওপর। একশো-দেড়শো হাত জায়গা জুড়ে এগোনো দল তো হামেশাই চোখে পড়ে।
আফ্রিকার এই পিঁপড়েরা ভীষণ সাহসী। এদের সামনে থাকে একটা লুঠেরা বাহিনী। তাদের বলা হয় স্কাউট অ্যান্টস। এরা চলার পথে সামনে যা পায় লুঠপাট করে, ভাঙচুর করে। তা সে যতই ছোট হোক কিংবা বড়। ছোটখাটো পোকামাকড় থেকে শুরু করে ডাঙার বাঘ, দলের কুমির কাউকেই বাদ দেয় না। নিমেষে খেয়ে ফেলে।
এইটুকু একটা প্রাণীর পক্ষে অত বড় বড় জীবজন্তু খাওয়া কি সম্ভব? ধন্দ লেগে যাবার কথা। লেগেছিল অনেকেরই। পরে লক্ষ্য করে দেখা গেছে, এরা যেতে যেতেই মুখের সামনে যে অংশ পায়, তাতেই কামড় বসায়। তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে মুহূর্তে কেটে তুলে নেয় মাংস। তার পর সেটা খেতে খেতেই এগোয়। কেটে নেওয়া মাংসের পরিমাণ যত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মই হোক না কেন, অতগুলো পিঁপড়ের মুখে এক-একটা কণা যেতে যেতেই চোখের পলকে শেষ হয়ে যায় বিশালাকায় এক-একটা আস্ত জন্তু।
পৃথিবীতে এমন একটাও দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে পিঁপড়ে নেই। প্রায় সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি প্রজাতির পিঁপড়ে রয়েছে। তারা সাধারণত কলোনি তৈরি করেই বাস করে। একই কলোনিতে বসবাসকারী পিঁপড়ে একে অন্যকে চিনে নেয় তাদের দেহ-নিঃসৃত গন্ধ থেকে। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে জীবনধারার যথেষ্ট পার্থক্য আছে। পার্থক্য আছে দেহগত আকারেও। কেউ অত্যন্ত ক্ষুদ্র, কেউ আবার বেশ বড়। এখন পর্যন্ত ১.৫ মিলিমিটার থেকে ৫০ মিলিমিটারেরও বড় পিঁপড়ের সন্ধান পাওয়া গেছে।
মানুষের মধ্যে যেমন চোর-ডাকাত আছে, তেমন পিঁপড়েদের মধ্যেও আছে। বড় মাপের পিঁপড়েদের যে কোনও একটা কলোনির চাঙড় সরালেই দেখা যাবে, কলোনির মূল সুড়ঙ্গের পাশ দিয়ে চলে গেছে আর একটি সরু সুড়ঙ্গ। সেটা দিয়ে একেবারে খুদে-খুদে পিঁপড়েরা ঢুকে বড় মাপের পিঁপড়েদের খাবার চুরি করে নিয়ে পালায়। এই হলুদ রঙের পিঁপড়েরা এতই ছোট আর এত দ্রুত ছুটতে পারে যে, বড় পিঁপড়েরা তাদের পিছুও নিতে পারে না। ধরে মেরে ফেলা বা শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা।
শুধু চোর-জোচ্চোরই নয়, পিঁপড়েদের মধ্যে দাসপ্রথাও আছে। উত্তর আমেরিকায় এক ধরনের বড় বড় লাল পিঁপড়ে দেখতে পাওয়া যায়, ওরা ছোট ছোট কালো পিঁপড়েদের বাসায় হানা দিয়ে তাদের বাচ্চাকাচ্চাদের তুলে নিয়ে যায়। পরে তাদের দিয়েই যাবতীয় কাজকর্ম করার। কোনও কোনও কলোনিতে দেখা গেছে ওই লাল প্রভু-পিঁপড়েদের তুলনায় ছোট ছোট কালো দাস-পিঁপড়েরা সংখ্যায় প্রায় দু’-তিন গুণ। ইচ্ছে করলেই তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও কলোনিতে বিদ্রোহ হয়েছে কি না, তার কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি।
আজগুবি গল্পের মতো শোনালেও এ কথা সত্যি যে, পিঁপড়েদের মধ্যে একটা শ্রেণি আছে— গরু পিঁপড়ে। সাধারণ পিঁপড়েরা তাদের পোষে। যত্নআত্তি করে। খাওয়ায়-দাওয়ায়। চরাতে নিয়ে যায়। এই গরু পিঁপড়েদের একটা লম্বা চোষক নালি থাকে। এরা তা দিয়ে গাছের রস চুষে নেয়। খাবার পরে বাড়তি রস পেটের মধ্যে ভরে রাখে। সেই রসই দুধের মতো পান করে পালক পিঁপড়েরা।
পিঁপড়েরা নিজের চেয়ে দলের কথা বেশি ভাবে। ভবিষ্যতের জন্য খাবার সঞ্চয় করে রাখে। শস্য সংগ্রহকারী পিঁপড়েরা মুখে করে শস্যের কণা নিয়ে গিয়ে তাদের কলোনিতে জমা করে। জমা করার আগে খোসাগুলো ছাড়িয়ে বাইরে ফেলে দেয়, যাতে ভেতরটা নোংরা না হয় এবং জায়গা কম লাগে। যে কোনও পিঁপড়েই নিজের ওজনের প্রায় তিরিশ গুণ বেশি ওজন অনায়াসেই বইতে পারে।
সাধারণ পিঁপড়ের চেয়ে আকারে বড় এক শ্রেণির পিঁপড়ে আবার রাত্রিবেলায় দাঁত দিয়ে গাছের পাতা কাটে। তার পর মাথায় করে বয়ে নিয়ে যায় বাড়িতে। পরে ওই পাতায় ফাঙ্গাস হলে সেটাকে ওরা খাবার হিসেবে ব্যবহার করে।
যাদের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই সৈনিক পিঁপড়েরা জ্যান্ত পোকামাকড়, ইঁদুর, আরশোলা, টিকটিকি, এমনকী ছোটখাটো প্রাণীও খেয়ে একেবারে সাফসুতরো করে দেয়। দল বেঁধে ওরা এগোতে থাকে। ওদের দেখেই ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ জন পালায়। কেউ যদি ঘরে ঘুমিয়ে থাকে, হাজার হাজার পিঁপড়ে তার পুরো দেহটা ঘিরে ধরে নিমেষের মধ্যে শেষ করে দেয়। পড়ে থাকে শুধু হাড়গোড়-কঙ্কাল।
আফ্রিকায় ওদের নিয়ে একটা জনশ্রুতি আছে। কোথাও কোনও খাবারের সন্ধান পেলে যতক্ষণ না সেটা ছেঁকে ধরছে, ততক্ষণ নিঃসাড়ে পা টিপে টিপে ওরা এগোয়। তার পর সময় হলে সবাই মিলে একসঙ্গে কামড় বসায়। তুলে নিতে থাকে শরীরের এক-একটা কণা। খাওয়া শেষ হলে উদ্বৃত্ত টুকরোগুলো বাসায় নিয়ে যায়। কারণ, ওদের কলোনিতে প্রচুর খাদ্যের দরকার হয়। সাধারণত এক-একটা কলোনিতে থাকে আশি হাজারের মতো প্রাপ্তবয়স্ক এবং তিরিশ হাজারের মতো লার্ভা, মানে শিশু পিঁপড়ে।
ওরা এক নাগাড়ে সতেরো দিন ধরে এগিয়ে চলে আর প্রতি রাতে অস্থায়ী আস্তানা গেড়ে সেখানে বিশ্রাম নেয়। সতেরো দিন পরে একটা সুরক্ষিত জায়গায় ওরা গুচ্ছ বেঁধে জড়ো হয়। সেই গুচ্ছের মধ্যে রানি পিঁপড়ে হাজার হাজার ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বাচ্চা ফোটাতে এবং তাদের প্রতিপালন করতে মোটামুটি দিন কুড়ি সময় লাগে। তার পর আবার শুরু হয় ওদের অভিযান।
আফ্রিকা-আমেরিকার এই সব পিঁপড়েদের অনেকের চোখ নেই। বেশ কিছু পিঁপড়ে আবার চোখে ভাল দেখে না। তবু তাদের খুব একটা অসুবিধা হয় না। দলের অন্যান্য সদস্যদের সহায়তায় সেই প্রতিবন্ধকতা তারা অনায়াসে কাটিয়ে ওঠে। স্বাদ, ঘ্রাণ আর স্পর্শ- এই তিনটির অনুভূতিই পিঁপড়েদের মধ্যে খুব বেশি। এগুলোই ওদের পরিচালিত করে।
শুধু সৈনিক পিঁপড়েরাই নয়, যুদ্ধ করে সব পিঁপড়েরাই। একটা দলের সঙ্গে আরেকটা দল। ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে তো বটেই, একই প্রজাতির এক কলোনির পিঁপড়েদের সঙ্গে অন্য কলোনির পিঁপড়েদেরও যুদ্ধ হয়। হাজার হাজার পিঁপড়ে সেই যুদ্ধে অংশ নেয়।
প্রত্যেক প্রজাতির মধ্যেই থাকে একটা লড়াকু দল। তারা যুদ্ধের সময় মাঝে মাঝেই শরীরের পেছন দিক থেকে এক ধরনের ঝাঁঝালো গ্যাস ছোড়ে। সৈন্য-সামন্তরা শুঁড় উঁচিয়ে পুচ্ছদেশ উপরে তুলে শত্রুর দিকে ছুটে যায়। উত্তেজনায় ছটফট করে। তারই মধ্যে এক-একটা পিঁপড়ে দলের অন্য পিঁপড়েদের একটা শুঁড়ে শুঁড় ঠেকিয়ে কমান্ডারের আদেশ রিলে করে।
নির্দেশ পাওয়া মাত্র তৎক্ষণাৎ সে ছুটে যায় কলোনির ভিতরে। সেখান থেকে নিয়ে আসে আরও ফোর্স। কামড়াকামড়ি করতে থাকে একটা দল অন্য দলের সঙ্গে।
যুদ্ধ শেষ হলে দেখা যায়, গোটা জায়গা ছেয়ে আছে অসংখ্য পিঁপড়ের ধড় আর মুণ্ডুতে। মরে পড়ে আছে হাজার হাজার পিঁপড়ে।