ব্যর্থতার কৈফিয়ত
(যারা আমার কবিতার ভেতর দেশে রহস্য খুঁজে পাননা তাদেরকে)

আমার ব্যর্থতাবোধের কৈফিয়ত আমি কাকে দেবো?
শত সহস্র সোনার দিনার হয়ে যে নক্ষত্রনিচয় দূরের
আকাশ প্রান্তরকে জ্বলজ্বল কওে রাখে
আজকাল আমি প্রায়শ সেদিকে তাকায়
আমার দানের হাতকে নিমেষেই গ্রাস করে ফেলে
শত সহস্র সেই তারার ফুল।
আজ আমি বুঝতে পারি কাজী নজরুল ইসলাম কেন
সব ছেড়ে ছুঁড়ে দয়িতার খোপায় ঝুলতে
চেয়েছিলেন এই জননন্দিত উপমা।
“খোপায় দেব তারার ফুল।”

আজও বৃষ্টির শব্দকে মনে হয় যৌবনের পার্কে বসে থাকা
প্রার্থীত নারীর দীপ্র পদধ্বনি।
এই উদভিন্ন যৌবনা পৃথিবীর জঠরে এখনও নির্দয়
ছিঁড়ে খুঁড়ে খায় হাঙর কামড়ে
তার স্বজাতিকে।
যৌনজ নদীও ফুলে ফেঁপে ওঠে বৃষ্টির বাতাসে।
কে নেয় হাঙর নদী বর্থ্যতার কৈফিয়ত?
আমি জানি পৃথিবীর অধিকাংশ গ্যালক্সিতে আজও
মানুষের কোন কোলাহল নেই।
আর আজস্রবার আকাশের বুকে ঝুলন্ত হারুত মারুতেরা
আবার কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
আদ্দো প্রান্ত কোলাহলের মধ্যে ডুবে লিখছি এই কবিতা।

যার প্রতিটি শব্দ উপমা এখনো রহস্যহীন।
বহু স্পর্শীয় জীবনানন্দ দাশের ভাষার মতন ব্যবহৃত হতে
হতে মুছে দিতে চাই আমার হৃদয়ের
দোল খাওয়া সমস্ত মাধুরিমা।
হায়! সন্দীপন। তোমার স্বাক্ষরতা কর্মসূচীতে
গেঁথে নাও আমার ব্যর্থতাবোধের
সমস্ত কৈফিয়ত।
…………………………………………..

দেয়াল

খোঁজা হলো তাকে তন্ন তন্ন করে
দেখা হলো কত আঁধারের কানা-গলি।
মিললো না তাকে আলোর ঝর্ণা ধারায়-
আঁধারের শেষ ঝড়ে
ঘারালো আমার পুরোনো শহরতলী।
হারালাম আমি তাকে-
আঁধারে বদল হলো আঁধারের পাড়।
ঝনকে উঠলো মন পরিচিত ডাকে-
কে আছো বাগানে? ধেয়ে আসে একরাশ আঁধারের ঢেউ
কেউতো দিল না সাড়া।

খোঁজা হলো তাকে আলোকিত পথ ধরে
মনে হলো সেতো স্বপ্নের স্রোতধারা
স্বপ্নেই সমাসীন।
এবং তাইতো উপায় বিহীন
মনের আঁধারে শেষাবধি তাকে মায়াবী তারায় গেঁথে
দেয়াল তোমার কাছেই দিলাম ক্ষতময় মাথা পেতে।
রেখেই বুঝেছি বলতেতো আজ আর কোন বাঁধা নেই
দেয়ালের কাছে মাথা নোয়ালেই
দেয়াল বলে না কথা-
দেয়াল জানেনা দান।
দেয়ালের নীরবতা
বন্দীরা বোঝে। দেয়ালেই গাঁথা থাকে
দেয়ালের নীল প্রাণ-
সিংহের মত গর্জায় আর হাঁকে।
…………………………………………..

রাস্তা
(কবি আবদুল মান্নান সৈয়দকে)

নিন্দা আর বিদ্রুপের ঝড়কে অতিক্রম করে লাখ লাখ রূপোলী ইলিশের মত আমিও বেরিয়ে পড়েছি রাস্তায়।
আর দেখছি এক একটি রাস্তা গম্বুজের মত আকাশ স্পর্শ করার জন্য ক্ষমতাধর
সম্রাটের মতন শাহী ফরমান জারী করছে।
রাস্তার এত তরঙ্গময় ঢেউ শুনে মাঝে মাঝে মনে হয় আমি সমুদ্রের ভেতর শুয়ে আছি। অথচ আমার ইহজীবনে বড় সড় সমুদ্র দেখার সৌভাগ্য এখনো হলো না।
তাহলে তোমার বলতে বাধা নেই বাল্মীকির সাথে আমার কোন কালেই সখ্যতা ছিলো না।
আমিও তাই ভাবি।
হয় তো রাম সমুদ্র দেখেই সমুদ্রের চেয়ে বড় হয়ে সীতাকেই উদ্ধারের জন্য হয়ে উঠেছিলেন আরেক আগ্রাসী রাম।
আজকাল অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাাসা করেন তোমার রাস্তা কোন দিকে?
হয় তো তারা আমার উত্তরে জেনে নিতে চায়-
আমার হৃদয়ের ভেতর দেশে বইছে কোন আদর্শের ঝড়? যে ঝড় বইলে
শরীক হওয়ার চেয়ে
উদাসী হওয়াটাই ঢের বুদ্ধিমান হবে।
রাস্তার কত রকম ফের। ঘরে থাকলে বোঝাই যেত না।
ডান বাম আর দক্ষিণের সমস্ত কাশবন পেরিয়ে একটিও শষ্যক্ষেত চোখে পড়লো না।
দৃষ্টির অগম্য মানুষ আর রাস্তার নদী আর নৌকোর মত
অবিচ্ছেদ্য ভেবে বেরিয়ে পড়েছি রাস্তায়।
…………………………………………..

লালনের পাখি

আকাশ ছিলো শান্ত সুনীল
সমুদ্র বেলার ঝড়ে,
ঘাসে ঘাসে আগুন ফোটে বিশ্ব চরাচরে,
ঘাসের জন্য সবুজ থাকে? নাকি সবুজ খুঁজে;
একটি পাখি জ্বালিয়ে আকাশ
একতারায় চোখ বুজে।

ভালোই যদি লাগতো আকাশ
লাগার মতো করে,
মর্জি মাফিক স্বপ্নগুলো বিশ্ব চরাচরে
আলোর ছবি তুলতে গিয়ে মন্দটাকে ভুলে
আরেক পাখি জ্বালায় আকাশ
অচিন খাঁচা খুলে।

তাতেই হৃদয় উঠলো দুলে
লালন গুরু সিরাজ সাঁইয়ের
হাসন রাজার ঘরে,
ঘর বাড়ি তার নাইরে ভালা বিশ্ব চরাচরে,
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগে যায় মায়ে ঝিয়ে জ্বলে,
সেই কথাট পারভীন আপা কতই ঢঙে বলে।
…………………………………………..

এসো ভুলে যাই

এই ধরিত্রী আকাশ আমি চেয়ে দেখি
তুমি হয়ে যাও প্রথাসিদ্ধা তরুণী,
এইখানে রাখ মহুয়া ফুল, গেরুয়া কৌপিন,
এসো ভুলে যাই শিল্পিত খুনোখুনি।

কেন ভোর আসে?
আলোর প্লাবন, বিবর্ণ ঘাসে ঘাসে
জমে সবুজ আঁধার, সংসার বাঁশী শস্য খামার।
ভাত রুটি নয়, উন্মত্ত বাঘিনীর ডাকে তছনছ স্বপ্নের পাহাড়।
এই নাও জুঁই যুথিকা হৃদয়ের সমস্ত ধানি ঘাস-
ভেঙে চুরমার করি প্রতারক গলি
রক্তের নদী উষ্ণশ্বাস।
দুঃখ অগ্নি প্রেমে অপ্রেমে আজকে সারাদিন
এসো এই প্রেমের বোধিমূলে, ভুলে যাই কে খ্রিস্ট, কে সারাসিন,
বড় দরকার ফুল বেল লতা পাতার-
পাথুরে খোদায় অজন্তা গুহায়
স্নিগ্ধ কাকের মত ঐ যোনিদ্বার
এলেবেলে দিন, পুরোনো ডাক, কানামাছি ভোঁ
সভ্যতা এখন ইসরাফিলের ওঁ।

এই চোখ, নখ, হুঁশিয়ার মাখানো হৃদয়ের ধকধক
তুমি চেয়ে দেখ বারবার
এইখানে রাখো শান্তির রেফ্রিজারেটার
মায়াবী চুম্বনে তুমি হয়ে যাও সহজাত তরুণী,
আর আমি সবুজের করিডোরে দাঁড়িয়ে পাখিদের কলহাস্য শুনি।
…………………………………………..

সিঁড়ি

কোনখানে আজ কোন সিঁড়ি নেই। তবুও সিঁড়িতে
দেখি চলেছে আলাপ প্রলাপ-নরক গুলজার।
এরা জানে না কখন লাইলীরা বিয়ের পিড়িতে
বসে সৃজন করবে শেষ কবিতা-ভালবাসার।
এত জানাশোনা, মন দেয়া নেয়া, ঘাসের শরীর
ছুঁয়ে ছেনে ওরা কেড়ে নেয় হৃদয়ের শেষ নীল।
কখন বসন্ত আসে, শীষ ছুঁড়ে মাঘের কোকিল
উটজের শকুন্তলা জানে সীকৃতি কতটা মদির।

কিছুই বদলায়নি। দেখি আর ভাবি- এভাবেই
পৃথিবী কাটাবে তার দিন, হাসির ফোয়ারা তুলে
ফুল গুঁজে দেবে যুবক যুবতীর দীঘল চুলে
কিছু খুনসুটি মান অভিমান হবে, সিঁড়িতেই-
বসে, তবু জানি শকুন্তলা মালীনি নদীর কূলে-
তপোবনে দেখা পাবে প্রাণাধার দুষ্মন্তকেই।
…………………………………………..

অবগাহনের জন্য

তোমাকে পাবার আশাই আমি আজো বসে থাকি,
মনে নেই কবে কোথায়
স্পষ্ট করে-
মিনিবাসের মতন স্মৃতিভ্রষ্ট দিনগুলো গিয়েছে গড়িয়ে
হৃদয়ের রাস্তার উপরে।
আর তাই আমাদের উদ্যত দিনের সম্মুখে
সমস্ত দিনগুলো বৃথাই করেছি হাঁকাহাকি।
তোমাকে জেনে নিতে নিতে হারিয়ে যায় হারানো সুখে।

এই শহরতলীতে আমার এমন একটি দিবস রজনী নেই
তোমাকে ভাবনার অবকাশে কাটে না।
তোমাকে ভাবনার আগেই
তুমি হয়ে ওঠো ঘরের বিদ্যুৎ বাল্বের মতন চির চেনা,
আলোর মতন ঝরে পড়ে অভিমান
তোমার মনে নেই-থাকবে না-
জানতাম তাই। এসব জানবার আগে লক্ষ-কোটি
হৃদয়ের কিউসেক জল,
তোমার জন্যই রেখেছি সম্বল।

তোমকে দেখার আশায় আমি আজো তৃতীয় নয়ন খুলে
চেনা অজানার এই পৃথিবীতে
বসে থাকি
আমার আগ্রহময় ভালোবাসার ব্যগ্র বাহুপাশে
কারা যেন মবিলের গন্ধের মতন তোমার স্মৃতি নিয়ে উড়িয়ে নিয়ে আসে
এই শহরতলীতে,
আর আমি তাই অন্ধকারের শিশির তুলে
প্লাবনী বৃষ্টিকে অবগাহনের জন্য ডাকি।
…………………………………………..

স্বীকারোক্তি : সাম্প্রতিক
(কবি শহীদ কাদরীকে)

আজকাল মাঝে মাঝে মতিষ্কের কোটরে কি যে হয়, বলতে পারি না।
এমন অব্যক্ত ধারণা ক্রমশ উজান পাড়ার মহিলা কবিরাজ
নেহার জটালীর মত নির্দ্বিধায় জট পাকিয়ে বসে।
আমার কবিতা পাঠে এক গ্রাম কেন্দ্রিক গল্প লেখক আমাকে
চোখ মটকে ডাকে, এই যে নাগরিক কবি!
এটা সত্যি যে এই নগরেই আমার জন্ম, তবু সে নগর আমার শৈশবে
সবুজাভ শাল্মলী আর এদিক সেদিক হাজার
পুকুরে ছিল ছড়ানো ছিটানো।
না আমার কবিতা কোন গ্রামের ভেতর দিয়ে যায়নি,
না আমার কবিতা দেখেনি কোন বাঁশঝাড়ের পাশে
দাঁড়ানো স্বামীর প্রতীক্ষায় বৈকালিক গ্রাম্য গৃহবধুকে।
একটি দীঘির টলমলে জল আজও আমার
শৈশব ফিরিয়ে আনে।
আমার শৈশবে সোনাদীঘি ছিল যেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের
আরেক ঠাকুর মার ঝুলি, স্বচ্ছ আরশীর মতন
অঢেল টলমলে পানি ঢেউয়ের সমান দাঁড়িয়ে
এনে হতো এ পানির নিচেই আছে নির্ঘাত পাতালপুরি।
যদিও এ দীঘির আয়তন এখন ক্রমশ কমতির দিকে,
এখনো দাঁড়ালে মনে পড়ে অজিৎ দত্তের সুবিখ্যাত
“পাতাল কন্যা”র কবিতার পংক্তিনিচয়-
“হীরার কুসুম ফলে যে দেশের সোনার কাননে,”
না কোন সোনার কানন আমার বসবাসের নগরে নেই।
তবু এই শহরেই আছি, শতাব্দীর শব ব্যবচ্ছেদের মতন
হীরার কুসুম ফাটিয়ে গ্রামীণ সৌরভে নয়,
গ্রামীণ ফোন আর
কলিং বেলের ধাক্কায় আজকাল বারবার জেগে উঠি।
…………………………………………..

পুরুষ প্রলাপ
(বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পী নির্ঝর আহমদ প্লাবন-কে দিলাম)

অস্থিটা ফিরিয়ে দিলে নারী থাকে না কিছুই আর।
অভেদ্য শরীর ভেদ করে ওঠে নিষিদ্ধ আভাসে-
কি করে থামাবে তাকে গন্ধবহ পুষ্পের মাসে-
আদম হারালো মাটি, হাওয়ারো ছিলো হাহাকার।
স্বর্গের পুঁথি পাঠেই বুঝি প্রচলিত পুণ্য-পাপ।
রূপালি রোদ্রের গিরি পথে থমকে দাঁড়ালো মন,
ভাবি যাবো সেই পথে যে পথে তোমার আমন্ত্রণ,
অস্থিটা ফিরিয়ে-দাও, কুটিল রাত্রির অভিশাপ।

অথচ চাঁদের দেশে বুনেছে প্রিয় ফুলের বীজ
আদি পিতা আদমের নামে আমার প্রিয় স্বজন।
ফুলের চেয়ে এ মন খুঁজে আরো অমৃত খনিজ-
হায় প্রভু! হৃদয়ের ঘাসে জ¦লছে দীপ্র ক্ষরণ।
অদৃশ্য মৌচাকে নারী সিক্ত মধুময় তোমার সেমিজ,
হারানো অস্থিটা নিয়ে হোক আমার সমীকরণ।