কিডন্যাপ করার মুহূর্তেই ওদের চোখে দুটো কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়। আর নাকে একটা গোলাপী রুমাল ধরার সঙ্গে সঙ্গে ওদের আর কোন সেন্স ছিল না। তাই, কোন্ পথে এবং কতদূর এবং কোথায় ওদের নিয়ে এসেছে ওরা তা জানে না। কতক্ষণ ওরা সংজ্ঞাহারা অবস্থায় ছিল তা-ও মনে করতে পারছে না। তবে ওদের ঘরে পাওয়ারফুল লাইট জ্বলতে দেখে মনে হয় রাত হয়েছে। ঘরে কোন ফার্নিচার নেই। একটা পুরনো কার্পেটে ওরা শোওয়া। চোখ খোলা হলেও এই চার দেয়ালের ভেতর যা আছে এর চেয়ে বেশি দেখা সম্ভব নয়। কারণ ওদের দুজনের হাতই বাঁধা। নাইলনের দড়ি দিয়ে।
-ভাইয়া, আমরা কোথায়? আমাদের এখানে কেন আনল? মিলু ঘুম জড়ানো ভাবে কথাগুলো বলেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।
-মিলু! কাঁদিস না ভাইয়া, কেঁদে লাভ নেই। বরং মনে সাহস রাখ। আল্লাহ আল্লাহ কর- মামা নিশ্চয়ই এতক্ষণে আমাদের খোঁজে বের হয়ে গেছেন। পুলিশ নিয়ে আমাদের এখানে চলে আসবেন।
-কিন্তু আমাদের যদি ওরা মারে!
-মারবে না বোকা! আমরা হচ্ছি ওদের জিম্মী। আমাদের দিয়ে ওরা কিছু আদায় করতে চায়। আমাদের মারবে না। তবে ওরা খুব খারাপ লোক। ওদের সঙ্গে কোন খারাপ আচরণ করবি না। যা করতে বলবে- করবি।
-ভাইয়া, আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে।
-এখন খাবার পাবি কোথায় বোকা! ওরা যখন দেয় খাবি।
-ওরা কখন দেবে? মিলু কাঁদো কণ্ঠে বলল।
-তা কি করে জানবো? আল্লাহ আল্লাহ কর। মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়। লা ইলাহা ইল্লাআন্তা সোবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালিমীন। জানিস তো ইউনুস নবী মাছের পেট থেকে এই দোয়া পড়তে পড়তে মুক্তি পান।
এমন সময় ঘরের বাইরে দুতিন জন মানুষের ফিস ফিস কথা শোনা গেল। এরপর দরোজার তালা খোলার শব্দ ‘খুট্’। হ্যাজভোল্ট খোলার শব্দ এবং দরোজা খুলে গেল।
বিলু- মিলু একটু কাত হয়ে পা বরাবর দরোজার দিকে তাকাতে চেষ্টা করে।
দেখা গেল তিনজন লোক প্রবেশ করল। লম্বা যে দুটি লোক ওদের কিডন্যাপ করেছিল ওরা এবং সঙ্গে সেই জ্যোতিষী।
-জ্যোতিষী! ভাইয়া সেই ট্রেনের জ্যোতিষী! মিলু অস্ফুট শব্দে বলে উঠে।
তিনজন ওদের খুব কাছে এসে দাঁড়ায়। কালো জরুলওয়ালা লোকটি আঙ্গুল দিয়ে দেখিযে বলে – ‘দাদা, এই যে দুখান ময়না পাখি। আপনার খাঁচায় এহন বন্দী। হি- হি- হি —
-প্রবোধ, ওদের হাতের বান্দা খুলে দে! জোতিষী আদেশের স্বরে বলল।
-দেই – কত্তা দেই।
-তুই হা কইরে কী দেখস্ বিল্লি, ছোডটার খুইলে দে-
ঝটপট করে বিলু মিলুর বাঁধা হাতের দড়ি খুলে দিলো ওরা। প্রায় ঘণ্টা তিন/চার এই হাত বাঁধা ছিল। তাই, ব্যথা করতে থাকে দুজনের হাত। হাত খোলা পেয়ে উঠে বসে দুজন। জ্যোতিষী বসে একটা মোড়ায়।
-এই যে বাবারা! তোমাদের কোন ভয় নেই। আমি উদ্ধার করতে আইছি। আমি যখন আইসে গেছি কোন ভয় নেই। তবে, আজ রাতটা তোমাদের এখানেই কষ্ট কইরে কাটাতে হবে। কাল খুব বিয়ানে আমি তোমাদের লগে নিয়া পৌঁছাইয়া দিমু। তবে, এর আগে ম্যানেজার বাবুর লগে কথা বলুম।
-আমাদের এখানে এনেছেন কেন? মিলু বলল।
-ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমি তো আনি নাই- আনছে ওরা মানে রতনের দল। আমি মুক্ত করতে আইছি, তোমাদের বাবা আমার একবার মহা উপকার করছিলেন- আমি তাই প্রতিদান দিতে চাই। আমার ধর্মে এইটা বলে। কেউ উপকার করিলে তাহাকে অপকার করিও না।
-আপনি কি ছেলে ধরা? মিলু বলল।
-না – না- না বাবাজী! আমি ছেলে ধরা না। জ্যোতিষী- মানুষের ভাগ্য গণনা করি।
-আপনার ভাগ্যে কি আছে বলতে পারেন? মিলু আবারও কি বলতে যাচ্ছিল বিলু থামিয়ে দেয়।
-পারি। কিছুটা পারি- কিছুটা পারি না।
-তাহলে বলুন তো, কিছুক্ষণের মধ্যে আপনার ভাগ্যে কি ঘটবে?
-এই চুপ্ উনি জ্যোতিষী- সব জানেন। বিলু আবার থামিয়ে দেয় মিলুকে।
-তেমন কিছু ঘটবে না – হাঃ হাঃ হাঃ …. জ্যোতিষী উচ্চ স্বরে হাসতে থাকে।
-আমি বলছি শুনুন, আমার মামা একজন ভয়ংকর লোক স্পোর্টসম্যান ছিলেন- তিনি আমাদের খুঁজে বের করবেন। আপনাকে ধরে পুলিশে দেবেন, হুম্ তখন টের পাবেন।
হাঃ হাঃ হাঃ … জ্যোতিষী আবারো হাসতে থাকে।
-তা পারবে না। আমরা বনের এমুন জাযগায় আছি পুলিশ শালারা কুনদিন খুইজে পাবে না-
-আচ্ছা শুনুন জ্যোতিষী। আমাদের খিদে পেয়েছে খেতে দেবেন না? মিলু রেগে বলল।
-অবশ্যই দিবো বাবা, বিল্লি, যা তো খাবার নিয়া আয়- জলদি!
বিল্লি বের হয়ে গেল। বোঝা গেল খাবার আনতে সে গেল। বিলু মিলুর পেটে খুব খিদে। কিন্তু আব্বু আম্মুর কথা ভেবে মনটা খুব খারাপ লাগে। তখন খিদে টের পাওয়া যায় না।
-বাবারা, তোমাদের কুন চিন্তা নাই- তোমাদের কুন ক্ষতি করতে আমি দিবো না- তোমরা শুধু তোমার আব্বুকে বলবা- জ্যোতিষী কাকু আমাদের উদ্ধার করছেন- তাইলেই আমি তোমাদের পৌঁছাইয়া দেবার ব্যবস্থা করতে পারি-
-ঠিক আছে বলব- আমরা আব্বু আম্মু থেকে কত দূর আছি-
-বেশি দূর নয়, মাত্র তিন কিলোমিটার- এটা গঙ্গাছড়ার বনের ভেতরই-
টক্ টক্ টক্ …. টক্ .. টক্ .. টক্…
দরোজায় আঘাত করার শব্দ। প্রবোধ দরোজা খুলতে এগোয়। জডুলওয়ালা দাঁড়িয়ে থাকে। স্ট্যচুর মতো। যেভাবে ছিল সেভাবে।
-তোমাদের খাবার আইসা গেছে- শাহী খাবার পাম্কই- কষ্ট হইবো তোমাদের- জ্যোতিষী হাসতে হাসতে বলল।
বিল্লি হাতে একটা বড়সড় টিফিন ক্যারিয়ার হাতে প্রবেশ করে। সঙ্গে আরেক ষণ্ডামার্কা লোক। তার হাতে গ্লাস পানির জগ এবং প্লেট দুটো। বিলু-মিলুর সামনে রেখে সরে দাঁড়ায়।
-তোমরা যাও। যার যার কাজে যাও। শুধু বিল্লি থাক।
-জডুলওয়ালা, প্রবোধ এবং ষণ্ডামার্কা লোকটিসহ সবাই নীরবে কেটে পড়ল।
-নাও বাবারা, খাও- বন মোরগের ভূনা, মাশকালাইয়ের ডাল আর মাগুর মাছের ঝোল, বিরুইন চালের ভাত – খাও- খাইতে মজাই পাইবা- একেবারে দেশি জিনিষ সব।
বিলু মিলু উভয়ের তখন অনেকটা ভয় কেটে গেছে। তাছাড়া পেটে হারমোনিয়াম তবলা বাজছে অনেকক্ষণ ধরে। এখন খাওয়াটাই বড় কথা। তাই বিল্লির সাজিয়ে রাখা টিফিনক্যারিয়ার বাটির ভেতর হতে ভাত এবং তরকারি তুলে নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে লাগে। রান্নাও বেশ মজার। প্রথমে মাগুর মাছ দিয়ে পরে বন মোরগের ভূনা এবং অবশেষে ডাল দিয়ে বেশ পেট পুরেই খেল।
খাওযা শেষ হলে জ্যোতিষী উঠে দাঁড়াল। তোমাগো খাওয়ানোর জন্যি আমি ছিলাম। এখন চলি। বিল্লি, ওদের মশারী টাঙ্গাইয়া দিবি। রাইত হেগোর কি লাগে দেখবি। চলি বাবারা। ভাল থাইকো – কাল ভোরে তোমাগো নিয়া যামু।
জ্যোতিষী বের হয়ে গেল।
-আপনার নাম বিল্লি? মিলু বলল।
-না, কত্তা আমারে বিল্লি কয়। আমার নাম সুন্দর আলী।
-বিল্লি কয় কেন? মিলু হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে।
-আমার স্বভাব নাহি বিড়ালের- হি হি হি হি… মিলু এবার জোরে হেসে দেয়।
-আপনারা অহন ঘুমান- আমি মশারী টাঙ্গাইয়া দেই- কোন চিন্তা নাই। আমি পাহারাদার, আপনাগো – রাইত কিছু লাগলে কইয়েন।
বিলু- মিলুর এখন ভয় পুরোটাই কেটে গেছে। জ্যোতিষী যখন বলেছে ওদের ভোরে পৌছে দেবে তখন নিশ্চয়ই তা করবে। কারণ ঐ জ্যোতিষীর ছদ্মাবরণে এই ব্যাটা যে ওদের লিডার তা বোঝাই গেল।
-লাইট নিভিয়ে দিন। বিলু বলল।
-জ্বে দিচ্ছি- আমি পাশের ঘরে আছি কুন চিন্তা নাই।
বিল্লি বের হয়ে গেলে বিলু উঠে গিয়ে দরোজা লাগিয়ে দেয়।