সিদ্ধা-গঙ্গা ফিরে এলো রাত সোয়া দশটায়। বনের ভেতর একটু রাত হলেই মনে হয় অনেক রাত। বিভিন্ন পোকা মাকড়ের ডাক। পাখির ডাক শোনা যায়। মাঝে মধ্যে চিতাবাঘের ডাকও। বেশির ভাগ শীতে। এখন অবশ্য শোনা যাচ্ছে না। গঙ্গাছড়ার বন এক গভীর অরণ্য। এমন অনেক স্থান আছে যা মানুষের অগম্য রয়ে গেছে। এর জন্যই এই বনে অপরাধীরা করে নিয়েছে আশ্রয। নিরাপদ আশ্রয় তাদের এই বন।
-হুজুর! খোঁজ পাইলাম উহাদের। সিদ্ধা বলল।
-কোথায় ওরা? সগীর উত্তেজনায় বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
-হুজুর উহারা এমুন জা গা মে হ্যায় কোন মানুষ খুঁজিয়া না পাইবে। হামারার সঙ্গে রতনের আলাপ হইছে। উহাদের সুব্হেমে পৌঁছাইয়া দিবে। রাইচরণ জ্যোতিষী খবর দিলে উহাদের কুন খারাপি করবে না- রতন হইল উহার গুরু- হামারও গুরু- কুন চিন্তা নাই- আপনি লি চিন্তে বাংলাতো যান হুজুর।
-শঙ্কর – গঙ্গা !
-জ্বে হুজুর! তাহলে চলেন হুজুর, হামরা ফিরিয়া যাই-
-সিদ্ধা !
-জ্বে হুজুর!
-জ্যোতিষীকে কিছু দিতে হবে?
-হুজুর আপনের খুশি। তবে রতন বলে, আপনার প্রজেটের কাম নাকি বন্দ করতে হবে- উহা তার দাবি
-প্রজেক্টের কাজ আমার কোম্পানির – আমার বন্ধ করার সাধ্য কি বলো !
-জ্বে হুজুর! সিদ্ধা জবাব দেয়।
-ঠিক আছে চল, গঙ্গা – শঙ্কর !
মীর্জা সগীর অন্ধকার রাতে বনের ভেতর দুজন বেতনভুক পাহারাদার নিয়ে রওনা দিলো। এভাবে গভীর রাতে বনের ভেতর আগে কখনো চলাফেরা করেনি। যদিও এরা তার খুব বিশ্বস্ত।
হুম্ ম ম ম…। এক বিকট বন কাঁপানো শব্দ শোনা গেল।
-হুজুর ! এই আওয়াজ চিতার … ফিস ফিস স্বরে বলল শঙ্কর।
-বন্দুক ঠিক আছে?
-জ্বে হুজুর, ঠিক আছে। হামার মনে হয় হামারার চলার রাস্তা একটু ঘোরাইতে হইবে। আওয়াজ যা মালুম হয় উত্তর টিলা হইতে আসিল।
-তাহলে পশ্চিম দিক দিয়ে আমরা যাই লাঠি ঢিল্লা দিয়ে। কি বল!
-জ্বে হুজুর! আমাদের ঘোরাইতে পথে যাইতে লাগবে।
হুম্ ম ম ম…. । আবারো বন কাঁপানো শব্দ। সগীরের বুক কেঁপে উঠে। জীবনে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সে পড়ে নি। এদিকে রেশমা আপু দুলাভাই কি করছে কে জানে। ওদের কথা ভেবে সগীরের নিজের জীবনের বিপন্ন হবার কথা ভুলে যায়। বিলু মিলুর কথাও বেশি মনে পড়ে। ছোট মানুষ রাতটি কিভাবে কাটাবে। তবে রতন গ্র“প যখন বলেছে ওদের কোন ক্ষতি হবে না।
-হুজুর! ব্যাটারি শ্যাষ হইয়া গেছে। শঙ্করের হাতে ছয় ব্যাটারির টর্চটা আলো দিচ্ছে টিম টিমে। তার মানে বাংলো পর্যন্ত এই চর্ট আলো দিতে পারবে না। এই ঘুট ঘুটে অন্ধকার টর্চ ছাড়া পথ চলা কি করে সম্ভব! সগীর ভেবে আরো ভয় পায়। কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করে না।
-রাস্তাঘাট তো চেনা- অসুবিধা নাই চল জোর কদমে।

ফিনলে কোম্পানির চা-বাগানের ম্যানেজার জাফরের বাংলোতে যখন সগীর তার দুজন পাহারাদারসহ ফিরে এলো তখন রাত সাড়ে বারোটা। জাফর ও তার গার্ডেনের দু’একজন পাহাদার কর্মচারীসহ সবাই উৎকণ্ঠা নিয়ে তার অপেক্ষা করছিল। রেশমা আপু ও দুলাভাইকে বলা হয়েছিল বিলু-মিলু নিরাপদেই আছে। চিন্তার কোন কারণ নেই। তাই কান্নাকাটি করা আপাতত বন্ধ করে নামাজের পাটিতে দোয়া দরূদ পাঠ করছিলেন তারা। সগীর জাফরের সঙ্গে কথা সেরে রেশমা আপু ও দুলাভাইয়ের ঘরে প্রবেশ করে।
-রেশমা আপু ! দুলাভাই !
-কে সগীর ! কি খবর ভাই !
নামাজের পাটি থেকে দুজনে উঠে আসে। মুখে উদ্বেগের ছাপ।
-খবর ভালো। কাল খুব ভোরে বিলু-মিলুকে নিয়ে আসবে ওরা।
-ওরা মানে !
-ঐ যে জ্যোতিষী যার কথা বলেছিলেন – ওটা আসলে জোতিষী না ঘুঘু-মস্ত ঘুঘু-
-তোমার সঙ্গে নিয়ে আসতে পারলে না?
-না, বিলু-মিলু আমাদের নাগালের বাইরে ছিল। আর কোন সমস্যা হবে না। খুব ভোরে নিয়ে আসবে।
-আমার বিলু মিলু …। রেশমা চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠে।
রেশমার কান্না সাখাওয়াতের বুকেও এসে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়। এতক্ষণে যতোটুকু সামলে নিয়েছিল তা আর ধরে রাখতে পারল না। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল সাখাওয়াতও।
-আপু, দুলাভাই! তোমরা শান্ত হও- ধৈর্য ধরো। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। আল্লাহ চাহেত কাল সকালে বিলু-মিলু এসে যাচ্ছে।
সারারাত মীর্জা সগীর চোখের দু’পাতা এক করতে পারেনি। যদিও তার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়েছিল। বার বার মনে এই শঙ্কা জাগছিল যদি জ্যোতিষী শয়তানটা কোন বদ মতলব আঁটে। তবে রতন গ্র“পের সঙ্গে বেইমানী করার সাহস পাবে না সে। রতন গ্রুপ চায় না টি প্লান্টেশন আরও হোক। শেষ পর্যন্ত হয়তো এই প্রজেক্ট ব্যর্থ হবে। সে পারবে না ওদের সঙ্গে লড়াই করতে। কারণ অপরাধী চক্র বেশি শক্তিশালী। সে দুর্বল। তার নেই জনবল এবং অস্ত্রবল।

খুব ভোরে কাছে কোথাও পাহাড়ি ময়নার শীষ শোনা গেল। সগীর বাংলোর করিডোরে হাঁটছে। ভোরের কুয়াশা ঝরা আঁধার কেটে যাচ্ছে বনের উপর হতে। একটু একটু করে জেগে উঠছে সবুজ টিলা।
এমন সময় ভট্ ভট্ ভট্ শব্দ করে একটা লাল রঙের ট্রাক্টর এসে বাংলোর গাড়ি বারান্দায় এসে থামল। ট্রাক্টরের পেছনে একটা নেটিং করা ক্যারিয়ার। চা-পাতা বহনের ব্যবস্থা। সেখান থেকে নেমে এলো বিলু মিলু। সঙ্গে সেই জ্যোতিষী। আর একজন কালো মোটা লোক। মোছ ও দাঁড়ি মিলিয়ে এক বদসুরত তার।
-বিলু-মিলু ! সগীর চিৎকার করে ওঠে। বিলু-মিলু হাত উঁচিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যায় সগীর নীচে।
ওদিকে সেই জ্যোতিষী এবং মোটা কালো লোকটাসহ ট্রাক্টর চলতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। দ্রুত গতিতে। সগীরের ইচ্ছে হয় দৌড়ে ঐ শয়তানগুলোকে ধরে বন্দী করে রাখে। তারপর পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু এসব কিছুই তার করার সাধ্যে নেই। অপরাধীরা তার চেয়ে অনেক শক্তিধর। আর বনরক্ষীরা তো এদের সঙ্গে করে ফেলেছে গোপন আঁতাত।
মামা- আমরা এসে গেছি-
সগীর বিলু-মিলুকে জড়িয়ে ধরে।
পাহাড়ি ময়নার শীষ বেশ জোরে সোরে শোনা যায়।
-মামা, পাহাড়ি ময়না দেবে বলেছিলে এবার দেবে না?
অবশ্যই দেবো। একশবার দেবো। চল এবার আব্বু-আম্মুর কাছে।
পাহাড়ি ময়নার শীষ আরও কানে আসতে থাকে। তাহলে ময়নাটা কি খুব কাছেই্ কোথাও ডাকছে? সগীরের মনে সন্দেহ জাগে।
বিলু-মিলুকে নিয়ে বাংলোতে উঠে একটু এগিয়ে জাফরের ড্রয়িং রুম পেরিয়ে যেতেই চোখে পড়ে বন্দী ময়নাকে। বারান্দায় ঝুলানো খাঁচায় ময়না ওদের দেখে আবারও শীষ দিয়ে ওঠে।
বিলু-মিলু, এরকম ময়নাই চাই?
জ্বি মামা – এ রকম – ঠিক এরকম।
বিলুর মনে জেগে উঠে নিজেদের বিগত রাতে বন্দীদশার করুণ অবস্থা। তাহলে পাখিটারও নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট। থাক বন্দী ময়না তার দরকার নাই। পাখিরা মুক্ত থাকুক। আকাশ এবং বনে বনে ঘুরে ঘুরে মুক্তির স্বাদ পাক। যেভাবে এখন ওরা পাচ্ছে।