মামার চিঠি পেয়ে বিলু ও মিলু আরো আবেগে তেতে ওঠে। কথায় বলে না- এমনিতে নাচুনি বুড়ি- তাতে পেয়েছে ঢোলের বাড়ি। বিলু-মিলুর আব্বু এবং আম্মুরাও কম যায় না। বেড়াতে নেই জড়তা। এই ভ্রমণ বিলাসী মনের আব্বু-আম্মুর সুবাদে বিলু-মিলুর ভাগ্যও বেড়ানোর। এই জীবনে কতো জায়গায় যাওয়া হলো! দেশে-বিদেশে। তবে বলে না- ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া একটি ঘাসের শীষের মাঝে একটি শিশির বিন্দু।’ মানে নিজের দেশের কতো সুন্দর সুন্দর জায়গা পরে আছে জানা হয়নি। দেখা হয়নি। বিলু-মিলুর আব্বুর প্রোগ্রাম তাই নিজ দেশকে দেখা। আর শ্যালক মীর্জা সগীর যখন আছে টি গার্ডেনের ম্যানেজার, এমন মহা সুযোগ হাতছাড়া কেউ করে? রেশমারও এক কথা। তাছাড়া ভাইটির প্রতি রয়েছে স্নেহ ভালবাসা। জঙ্গলে পড়ে থাকে একা। কে দেখে তাকে! কি খায় না খায়। এমন এক স্নেহকাতর মন রেশমাকে তাড়া করেই। তবে বেড়াতেও তার আগ্রহ কম না।
-এই যে শুনছো- টিকেট নিয়ে এলাম। বাইরে থেকে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন সাখাওয়াতউল্লাহ। বিলু-মিলুরা যে ঘরে বসে জল্পনা-কল্পনা করছিল ভ্রমণ নিয়ে সে ঘরে। এদিক ওদিক তাকায়। নাহ্ ধারে কাছে দেখা যাচ্ছে না।
-তোমাদের আম্মু কোথায়? জিজ্ঞেস করে জবাব শোনার অপেক্ষা না করেই যেভাবে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করেছিলেন, সেভাবেই বের হয়ে গেলেন।
বিলু বলল- আম্মু রান্না ঘরে পাকাচ্ছেন-। কিন্তু বাক্যটা তাঁর কান পর্যন্ত পৌঁছার আগেই চলে গেলেন বারান্দার অপর প্রান্তে। মানে যে দিকটায় কিচেন।
কিচেনে ঢুকেই পেয়ে গেলেন রেশমাকে। মুখোমুখি দু’জন। একজনের হাতে চূলা থেকে নামানো স্যুপের তপ্ত সসপেন, অন্যজনের হাতে অরণ্য দর্শনের গাড়ির টাট্কা টিকেট। দু’জনেই আঁৎকে ওঠে। সংঘর্ষ বাধার উপক্রম হয়েছিল, তাই।
-রান্নাঘরে কেন? এখুনি তো এক্সিডেন্ট ঘটতে যাচ্ছিল! রেশমা একটু বিরক্ত ভাব প্রকাশ করে বলল।
-তোমাদের টিকেট নিয়ে এলাম,
-তাই আর তর সইছিল না জানাতে কিচেন পর্যন্ত ধাওয়া-
-তোমাকে কি বলব, যা হেনস্থ করে টিকেট-
-চল যা বলার ঘরে গিয়ে বলবে-
-কেন, এটা কি ঘর না?
-ঘর, কিচেন, রান্না ঘর, পাক ঘর মানে এখানে খাদ্য প্রস্তুত করা হয়। রেশমা একটু হাসে।
রেশমা হাত থেকে সসপেনটা রেখে দেয় চুলার পাশে। ঢাকনা তুলে একটা টেবিল স্পুন দিয়ে খানিকটা তুলে চেখে দেখলো। মুখের ভাবভঙ্গিতে প্রকাশ পেলো, মজা।
-কিসের স্যুপ। সাখাওয়াত মুখ খোলে।
-দেখতেই পাচ্ছ কর্ণ স্যুপ- তোমার আহ্লাদের জিনিস! রেশমা একটু রসিকতা করে স্বামীর বিব্রত হওয়া থেকে উদ্ধার করতে চাইলো।
-চল্, ঘরে চলো- স্যুপ একটু পরে দিই!
-রেশমাসহ সাখাওয়াত একসঙ্গে বেড রুমে এলো। এখানে ভ্রমণে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে তার স্পষ্ট স্বাক্ষর বহন করছে বিছানায়। একটা স্যুটকেসে তোলা হচ্ছিল কাপড়-চোপড়। তার নমুনা পড়ে আছে।
-নাও, টিকেটগুলো রেখে দাও যতœ করে। সাখাওয়াত প্যান্টের ডান পকেটে হাত চালিয়ে টিকেট পুরা একটা সাদা খাম এগিয়ে দেয়।
-রেশমা হাত হতে টিকেট নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো। আগামীকাল সকালে ট্রেন। তার মানে আজ রাতেই সব গুছিয়ে নিতে হবে।
-টিকেট হস্তান্তর করে সাখাওয়াত এলো বিলু-মিলুদের ঘরে। বিলু-মিলুরা তখন ব্যস্ত গোছগাছ করতে। আব্বুকে ঘরে ঢুকতে দেখে দু’জনে হাতের কাজ রেখে তাকায়।
-টিকেট হয়ে গেছে আব্বু? সমস্বরে বলে।
-হ্যাঁ, ট্রেন সকালে। রাতের ট্রেনে জার্নি করলে শরীর খারাপ করে। তাছাড়া কিছু দেখাও যায় না।
-ঠিক বলেছ আব্বু, সকালেই ভাল- আমাদের গোছানো শেষ প্রায়।
-ভিডিও ক্যামেরাটা নেবো? বিলু জিজ্ঞেস করে।
-দরকার কি, একটা সগীরের কাছে আছে। তাছাড়া তোমার মামার বাগানের ফাটাগ্রাফারও আছে। গতবার দেখলে না- এসব ঝামেলা করার দরকার নেই।
-ঠিক আছে আব্বু, তাহলে আমরা এসব নিচ্ছি না।
-তোমাদের স্কুল ছুটি ক’দিনের?
-সে তো অনেক। বারো দিনের। মিলু বলল।
-তাহলে সঙ্গে দু’চারটা বই নেবে। বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে পড়বে।
-অবশ্যই আব্বু। আমাদের এ ছুটির পর পনের দিনের মধ্যে সেকেন্ড সেমিস্টার।
-রাতের খাবার টেবিলে তোমাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দু’চার কথা হবে। এখন যা যা বাকি আছে গুছিয়ে নাও।
-সাখাওয়াত পুনরায় বেড রুমে এলো।
-রেশমা ডাইনিং থেকে গলা ছেড়ে বলে- স্যূপ খাবে, তোমরা এসো।
-সাখাওয়াত বিছানা থেকে উঠে সেদিকে যায়।
-টেবিলে স্যুপ রাখা। বাটিতে বাটিতে।
-বিলু-মিলুও ডাক পেয়ে হাজির। স্যুপটা আরো আগেই খাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গোছানোর কাজে আটকে পড়ায় সন্ধ্যা উতরে গেছে।
-স্যুপ না হলেও চলতো আজ- একটা ঝামেলা যাচ্ছে না- । সাখাওয়াত বলল।