স্টেশনে এসে যখন ওরা উপস্থিত হলো ট্রেন ছাড়ার তখন আরো আধা ঘণ্টা বাকি। খুব সকালেই ওরা ঘুম থেকে ওঠে। হাতে যথেষ্ট সময় রেখে রওনা দেয়। ভার্সিটির রিকুজিশন করা গাড়ি সময় মতো হাজির হয়ে যায়। আর সকালের ঢাকা শহর থাকে যানজট মুক্ত শান্ত সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন ভাব।
ট্রেনে উঠেই দুই জানালার পাশের সীট দখল করে নেয় বিলু-মিলু। রেশমা ও সাখাওয়াত বসে ওদের পাশে।
ঠিক সময় মতো মানে সাড়ে আটটায় ট্রেন ছেড়ে দেয়। ঢাকা শহরের ময়লা-আবর্জনা বস্তির এলাকা ছেড়ে ট্রেন যখন মুক্ত পরিবেশে গা এলিয়ে ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক .. ঝিক ঝিক করে চলছে তখন চোখে পড়ল বিলুর আকাশ। শরতের মেঘ ভরা আকাশ। ট্রেনের সঙ্গে খণ্ড খণ্ড শাদা মেঘ দৌড়াচ্ছে যেন। বিলু আবার প্রকৃতি প্রেমিক। সবুজ গাছ-গাছালি, নীল আকাশ, শাদা মেঘ আর বৃষ্টির ধারা দেখতে তার বেশ লাগে। আর মিলু হচ্ছে খেলা প্রেমিক। কোথায় কোন খেলা হচ্ছে। কার ক্যারিয়ার কেমন কবে কার সঙ্গে কোথায় খেলা সব খবর তার জানা। এসব নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয় আব্বুর সঙ্গেই বেশি।
-মিলু, গতকালের সিডনির ম্যাচের খবর কি! সাখাওয়াত জিজ্ঞেস করে।
-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে আব্বু- অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ৩২০ এর জবাবে ক্যারিবিয়রা ২৯৭ করেছে ৬ উইকেটে। লারার সেঞ্চুরি। মনে হচ্ছে এবারের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বেশ চাঙ্গা দল ।
-ঠিকই বলেছ, গত বিশ্বকাপের চেয়ে ওরা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। লারাও ফিরে পেয়েছে তার ফর্ম।
-লারা একটা জিনিয়াস- মনে হচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অতীত গৌরব ফিরিয়ে দেবে সে।
-সেই গ্যারী সোবার্স, ভিভ রিচার্ডসদের গৌরবময় ইতিহাস কি পারবে ফিরিয়ে আনতে লারা? সাখাওয়াত বলল।
-তবে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা বেশ ডেভলাপ করেছে আব্বু। অস্ট্রেলিয়ানরা একটা জাঁদরেল টীম। সেই যে নিরানব্বই থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে বসলো, আর তাদের প্রথম স্থানটি কেউ ছিনিয়ে নিতে পারল না। এর মধ্যে কতো কি হলো। স্টিভ ওয়াহ বাদ গেল। শ্যেন ওয়ার্ন থেকেও নেই। কিন্তু টীমের পারফরমেন্স একই রকম।
-ওরা আসলে প্রফেশনাল- খেলার ব্যাপারে কোন খাতির নেই- ভাল খেলবে তো টীমে স্থান হবে- খেলতে পারবে না- আউট।
-দেখ দেখ আব্বু। আকাশে এক ঝাঁক বক। বিলুর চোখ আকাশে ছিল বোঝা গেল।
-সবাই বিলুর দৃষ্টি আকর্ষণে আকাশের দিকে তাকালো। সত্যিই এক ঝাঁক বক দূর আকাশে উড়ে যাচ্ছিল।
-তোমরা কি এখনই খাবে? রেশমা জানতে চায়। সকালের নাস্তা তেমন ভালভাবে হয়নি কারও। টেনশনে। তাই রেশমা সঙ্গে আনা নাস্তা খাওয়ার জন্য তাগিদ দিলো।
-সাখাওয়াত বলল, আরো ঘণ্টা খানেক পরে দাও
-ট্রেন চলেছে পূর্ণ গতিতে। ঠাণ্ডা বাতাস জানালা দিয়ে হু হু করে প্রবেশ করছে। কোথাও বৃষ্টি পড়ছে বলে মনে হয়। বাতাস বেশ হিম।
-বিলু-মিলু জানালা লাগিয়ে দাও। ঠাণ্ডা বাতাস লেগে জ্বর আসবে। পরে বেড়াতে গিয়ে বিছানায় পড়ে থাকলে বেড়ানো মাটি। রেশমা বলল।
-আম্মু, ঠাণ্ডা লাগছে না! বিলু বলল।
-না- ঠাণ্ডা লাগছে না- টনসিল ফুলবে, জ্বর আসবে, কতো কি হবে তোমার- জানালা নামিয়ে দেখো- যতো পারো- কাঁচটা স্বচ্ছ- দেখা যাবে সবই-
বিলু-মিলুর আব্বু উঠে দু’টো জানালা ফেলে দিলেন।
বলতে বলতে বৃষ্টির হালকা ধারাও পড়তে শুরু করেছে। বিলু তাতে কিছুটা মনক্ষুণ্ন হলো। বাইরের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আগের মতো রইল না। মিলুর কোন ভাবান্তর নেই।