জানালার আর্শি বেয়ে বৃষ্টি বেয়ে পড়ছে। বৃষ্টির ধারায় জানালা হয়ে উঠেছে অস্বচ্ছ। এখন এই জানালা ভেদ করে বাইরের দৃশ্য তেমন দেখা যায় না। তাতে স্বাভাবিকভাবে বিলুর চোখ ট্রেনের কামরায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লো। বিলু আবার মানুষ দেখতেও মজা পায়। খুটে খুটে দেখা তার স্বভাব। আর এই দেখতে গিয়ে তার চোখে পড়ে অদ্ভুত অদ্ভুত দৃশ্য। বিলু সেভাবে দেখতে দেখতে সামনের এক সীট পরের সীটে বসা এক ভদ্রলোককে দেখে অবাক হয়। বয়স্ক ভদ্রলোক! খদ্দের পাঞ্জাবী পরা। মাথায় টাক। মুখে খোচা খোচা দাঁড়ি। চোখে চশমা। হাই পাওয়ারের। ফ্রেমখানা ক্ষয়াটে। চোয়াল ভাঙ্গা। কপালে বেশ গভীর ভাঁজ। নাকটা মুখের আন্দাজে বড় এবং সুচোঁলো। লোকটাকে বিলুর পরিচিত মনে হয়। হাতে একটা মোটাসোটা বই। ইংরেজি ভাষার বলে মনে হলো। কালো মলাটের যে সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল তা বাংলা হরফ নয় ইংরেজি। ভদ্রলোকের পাশেই একটা আট নয় বছরের ছেলে। ছেলেটি এমনভাবে বসে যে বোঝাই যাচ্ছে না সে কার সঙ্গে যাচ্ছে। বুড়ো ভদ্রলোকের সঙ্গে হবে মনে হয়। বসার ভাবে তাই মনে হয়।
বিলু এবার মিলুর কানে কানে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে দেখার জন্য বলে। মিলু দেখেই বলে- ওমা! সেই লোকটা!
-কোন লোকটা! বিলু চাপা স্বরে জানতে চায়।
-সেই যে এবারের বইমেলায় খুব একটা গণ্ডগোল হলো। বইয়ের স্টল নিয়ে। সেই লোকটাই তো!
বিলুর এবার মনে পড়ে। এবারের বই মেলা বেশ জমেছিল। বিলু-মিলুরা চারদিন যাবার সুযোগ পায়। শেষের দিকের একদিন একটা স্টলে হাঙ্গামা হয়েছিল। সেই স্টলের মালিক যে লোকটা ছিল সামনে বসা লোকটির মতো। তবে সেদিন ভদ্রলোককে আরো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং ধোপদুরস্ত মনে হয়েছিল। ভদ্রলোক একজন জ্যোতিষী এবং তিনি যে স্টলটি দিয়েছিলেন তার নাম ছিল ‘ভবিষ্যৎ জানুন’। তার স্টলে ছিল হস্তরেখা সম্পর্কিত এবং জ্যোতিষী শাস্ত্রের বই। এর মধ্যে একটি বইয়ের নাম ‘ভবিষ্যৎ জানুন’। মেলা কর্তৃপক্ষ কি ভেবে এই স্টলটি বরাদ্দ দিয়েছিল তা আল্লামালুম। তরুণ-তরুণীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে এই স্টলে। আর নানা আজে বাজে প্রশ্ন করে বিব্রত করে তোলে ভদ্রলোককে। এক পর্যায়ে কিছু লোক দাবি জানায় ঐ স্টল বন্ধ করে দিতে। বেশ হাঙ্গামা হয়। এমনকি উত্তেজিত কেউ বলে ওঠে- বেটা আল্লাহ হয়ে গেছে- ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে- তোতা পাখির মতো বলে দিচ্ছে সব, ভণ্ড কোথাকার! বেটাকে র্ধ র্মা- এমন আওয়াজ উঠতে থাকে। বিলু-মিলুর আব্বু সেদিন একটা ভাল কাজ করেছিল। লোকজনকে নিবৃত্ত করেছিল। যেহেতু বিলু-মিলুর আব্বু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পেয়েও যায় সেখানে তার কয়েকজন ছাত্র। তাদের সহায়তায় সেদিন হাঙ্গামা থামাতে বিরাট ভূমিকা পালন করে ওদের আব্বু।
-আব্বু, ঐ যে সেই লোকটা! বিলু বলল ফিস ফিস স্বরে কানে কানে।
সাখাওয়াত প্রথমে বুঝতে পারেনি। বিলুর ইঙ্গিতে সামনে তাকিয়ে দেখল একটা ভদ্রলোক মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। চেনা চেনা বেশ। স্মৃতির পাতায় হাতরিয়ে অবশেষে পেয়ে গেল। সেই জ্যোতিষী! গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েই চলেছে। সাখাওয়াত দু’একবার তাকিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো। কি দরকার কারু দিকে তাকিয়ে।
-তোমরা ওঁর দিকে বার বার তাকাচ্ছ কেন- কি ভাববে! সাখাওয়াত বলল।
বিলুর কেমন যেনো সন্দেহ হয় লোকটাকে। বই পড়ছে, না, পড়ার ভান করছে? পড়ার ভান করে সব সবকিছু পরখ করছে। বিলুর এমনটি মনে হবার কারণ অনেকক্ষণ ধরে সে দেখছে এক পাতায় তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। এক পাতা পড়তে এতক্ষণ লাগবে কেন! আর তার পাশের ছেলেটিই বা কার। বিলুর মনে হতে থাকে। ছেলেটির সঙ্গে বুড়োর তেমন কোন সম্পর্ক নেই। ছেলেটিও এমন হাবাগোবা টাইপের কোন ভাবান্তর নেই তার চোখে মুখে। না আনন্দ না বিষাদ কোন ভাব তার মুখে বোঝার উপায় নেই। গ্রামের ছেলে বলেই মনে হয়। কিছুটা পড়াশোনাও করে থাকে বোধ হয়। প্যান্ট-সার্ট দেখে মনে হয়।
ট্রেন চলছে তখন পূর্ণ গতিতে। বাতাস ও বৃষ্টি কেটে চলছে বলে শব্দটা একটু বিকট শোনাচ্ছে। বৃষ্টির ধারা খোলা জানালার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করছে। এতে ট্রেনের কামরাও শীতল হয়ে ওঠে। একটা হিম হিম ভাব ট্রেনের ভেতর। আরামের শীত। অনেকেই সেই আরামের হিমে কাত। মানে ঘুমের জগতে। বুড়োর পাশের ছেলেটিও জানালার দিকে কাত হয়ে ঘুমে। একমাত্র বুড়োটি ছাড়া বই পড়ুয়া কোন যাত্রী এই ট্রেনে নেই। বোঝাতে চাইছে সে খুব বই পোকা লোক। যাকে বলে ‘গ্রন্থকীট।’
-বিলু-মিলু, তোমরা খাবে? রেশমা বলল।
-দিতে পারো। মিলু বলল।
-হ্যাঁ, পেটে হারমোনিয়াম বাজছে- দিয়ে দাও।
রেশমা একটু হেসে খাবার ঝোলার পকেট থেকে টাইগার ফ্লাস্ক বের করলো। পানির বোতল। হটপট বের করল ঝোলা হতে। তারপর হাফ প্লেট এবং মগ জনপ্রতি বের হয়ে এলো ঐ ঝোলা হতেই। ঝোলাটাকে বিলু-মিলু নাম দিয়েছে ‘ফুড ভ্যান’। কোথাও জার্নি করলেই এই ফুড ভ্যানে পথের খাবার নেওয়া হয়। এবারও তার অন্যথা হয়নি।
রেশমা মগগুলোতে ফ্লাস্ক থেকে গরম স্যুপ ঢেলে হাতে হাতে তুলে দেয়। পিওর চিকেন স্যুপ। স্যুপ খেতে খেতে সবার কাছে পৌঁছে যায় হাফ প্লেটে খাসীর কলিজি ভূনা ও পরোটা। গরুর গোস্ত ভূনাও খানিকটা আছে তা রেশমার নিজের জন্য। পরোটার সঙ্গে গরুর গোস্ত ভূনা তার প্রিয় খাবার। অবশ্য প্রিয় খাবারের ফর্দ এখানেই শেষ নয়।
-কী ব্যাপার আমাদের সবার পাতে কলিজি আর তোমার পাতে গরুর গোস্ত ভূনা! সাখাওয়াত হেসে হেসে বলল।
-তুমি খাবে? তুমি তো আবার খেতে পারো না। এলার্জি।
-রাখো এলার্জি! পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু খাদ্য হলো বীফ-তা বাদ দিলে থাকে কি- দাও আমায় খানিকটা-
-নাও, এনেছিতো- সগীরও খুব পছন্দ করে। রেশমা হটপট থেকে চামচ দিয়ে তুলে দেয় খানিকটা।
-তাহলে সগীরের কথা মনে করেই-
-বাহ্ মনে করবো না, একা একা বাগানে পড়ে থাকে ভাইটি, কি খায় না খায়-
-তোমার ভাই কি খায় না খায়! তুমি জান ওর বাবুর্চিটা কে? সুর্মা। ঢাকার বিখ্যাত বাবুর্চি ছিল এক সময়। মোটা অংকের বেতন দিয়ে বাবুর্চি রেখেছে। সগীর যা খায় তা খেতে পাও তোমরা? চোখেও দেখো না।
-মামাকে বলতে হবে খোরগোশের রোস্ট করতে। বিলু বলল।
-তুমি তো আবার মামাদের মতো ভোজন রসিক- খালি খাবারের চিন্তা-
-আর তুমি! তুমি তো জমিদারের যোগ্য উত্তরসূরি- রায়বাহাদুর সাখাওয়াতউল্লাহ চৌধুরী- একদম জাঁদরেল জমিনদার-
-নামের সামনের অংশটুকু বাদ দিতে পারো। ওটা আমার নয়- দাদার খেতাব ছিল- রায়বাহাদুর হাবিবুল্লাহ চৌধুরী- অবশ্যই তিনি একজন জাঁদরেল জমিদার ছিলেন-
-তাঁর নাতীর কম কি সে? মেজাজ তো নয় যেনো তাতোনো ইস্পাত- রেশমা একটু শ্লেষ দিয়ে বলল।
-খেতে খেতে বিলুর চোখ আবার বুড়োর দিকে গেল। বুড়োও কাত। মানে ঘুমে। কিন্তু ঘুমন্ত মুখ দেখেও কেন যেনো বিলুর অবিশ্বাস হচ্ছিল আসলে ঘুমিয়ে না ঘুমের ভান করছে। আসলে লোকটাকে সে যখনি দেখেছে তখন থেকেই সন্দেহ দানা বাঁধে মনে। সেই বইমেলার কাণ্ড থেকে এ পর্যন্ত সবকিছুই রহস্যময়। সব কুয়াশা ঢাকা। এ ধরনের লোক অনেক অপকর্ম করতে ওস্তাদ। বিলুর ধারণা তাই। ক’দিন আগে একটা বই পড়েছিল। একটা দাগী আসামীর চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায় এর চেহারা। ভাবসাব। সবকিছু। তাহলে কি এই ব্যাটাও পাকা ঘুঘু। চোখে চোখে রাখতে হবে। বিলুর মনে পড়ে গল্পের ঐ বুড়োটা এ রকমই ছিল। তবে পার্থক্যটা হচ্ছে ঐ বুড়োটা ছিল ভৌতিক সব গল্পের লেখক। বাংলা বাজারের এক অখ্যাত প্রকাশক তার বই বের করতো। যতো আজগুবি গাঁজাখুরি গল্প লিখে এবং ভয় পাইয়ে দেবার মতো বিদঘুটে বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকে বাজারে বই ছাড়তো। তার দাবি ছিল গল্পের ঘটনাগুলি নাকি সত্য। তার চাক্ষুষ দেখা। একবার একটি পত্রিকাও সেই বুড়োকে নিয়ে স্টোরী ফেঁদে বসল। হেডিং দিলো- গল্পও যে সত্যি হতে পারে তার দাবীদার মি: হ.হ. হালদার। সেই পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বুড়ো লেখক দাবি করে তার লেখা ভৌতিক সব গল্পগুলো জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। পরে দেখা গেল হ.হ. হালদার একটা মস্ত ঘুঘু। আন্ডার গ্রাউন্ড অপরাধ চক্রের ইনফর্মার। লেখক হিসেবে তার ছিল সর্বত্র অবাধ যাতায়াত। আমলা-পুলিশ সর্বস্থানে। আর সেই পরিচয়ে সে করতো লেনদেন। আন্ডার গ্রাউন্ডের পাচারকারীদের সঙ্গে নানা স্থানে। পরে অবশ্য ধরা পড়ে যায়। পত্রিকায় নিউজ-‘ভৌতিক গল্পের লেখক হালদার মাদক পাচারকারী হিসেবে ধৃত’।
বিলুরও এই ব্যাটাকে সেরকম সন্দেহ হতে থাকে। দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়।