গতরাতে হালকা বৃষ্টি হয়েছিল। সকালের ভেজা উঠোন দেখে সগীর বুঝতে পারে। খুব সকালে ওঠা তার স্বভাব। বিশেষ করে সকালে উঠে একবার নতুন টি প্লান্টেশন প্রজেক্ট দেখে আসা তার প্রতিদিনের রুটিন। হাঁটতে হাঁটতে সে চলে আসে প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার দূরত্বে নিউ প্লান্টেশন প্রজেক্টে। প্রচুর বৃষ্টির প্রয়োজন পড়ে এই প্রজেক্টের জন্য। এবার তেমন বৃষ্টিই পড়েনি। গতরাতের হালকা বৃষ্টি খানিকটা উপকার করবে।
হাফপ্যান্ট হেড মাথায় ও হাতে স্টিক নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে প্লান্টেশনের কাজ। চারটি উঁচু টিলা এই প্রজেক্টের আন্ডারে। আগে এসব টিলায় আনারস এবং লেবুর চাষ হতো। কিন্তু সাহেব মালিকদের ইচ্ছে চা-উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিশ্ব বাজারে চায়ের চাহিদা বেশি। বিশেষ করে বাংলাদেশের চায়ের টেস্ট এবং ফ্লেভার সাহেবরা পছন্দ করেন। তাই বিগত বছর হতে এই প্রজেক্ট চলছে। এখানে আরেকটা পরীক্ষা করা হচ্ছে তা হলো সমতল ভূমিতে চায়ের গাছ লাগানো। এর আগেও এটা করা হয়েছিল কিন্তু তেমন ভাল ফল পাওয়া যায়নি। সগীর যে কোর্স করে এসেছে তাতে সে নতুন কিছু পদ্ধতি জেনেছে। তা এখানে প্রয়োগ করবে।
হাঁটতে হাঁটতে সগীর চলে এলো ছোট বাবুর বাসার কাছে। উদ্দেশ্য রেশমা আপুদের দুপুরে আসার ব্যাপারে কিছু নির্দেশ দেওয়া।
সগীরকে ছোট বাবু দূর থেকেই দেখে ফেলে। তাই, গুটিসুটি বড় বাবুর দিকে এগিয়ে আসে। খুব কাছে এসে বলে- নমস্কার বাবু। নাম নিত্যানন্দ সমদ্দার। নাম শুনলেই হাসি পায়। ‘নিত্যানন্দ’ মানে সব সময় আনন্দিত। আসলেই তাই। চেহারাটা আরো হাসির। বেঁটে খাটো দেহের গড়ন। মোটা শরীর। ভুড়িটা দশাসই। মাথায় টাক এবং টিকি। সামনে এসে দাঁড়ালেই সগীরের মনে মনে হাসি পায়। লোকটা দারুণ কাজের এবং অকাজেরও। দুনিয়ার সব কাজ সে পারে। মানে ‘হরফুন মাওলা’- সকল কাজের কাজী।
-বড় বাবু কিতার লাগি এদিক। বিনয়ের সঙ্গে দুই হাত উপরে তুলে স্যারেন্ডার করার ভঙ্গিতে সমদ্দার বাবু জিজ্ঞেস করে।
-সমদ্দার বাবু, আজ আমার বোন-ভাগ্নেরা আসছে। আপনাকে একটু দুপুরে কৃষ্ণকে নিয়ে শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশনে যেতে হবে।
-জ্বী আজ্ঞে।
-আর শুনুন- ফটিক বাবুকে একটু খবর দেবেন তো- আমার সঙ্গে দশটার মধ্যে দেখা করতে।
-খোরগোশর লাগি নি বাবু? সমদ্দার মিট মিট হাসে।
-লোকটা পেটের কথা পড়ার আগেই বুঝে ফেলে। ভীষণ ধূর্ত এবং চালাক। অবশ্য এতে সুবিধেও আছে। কাজ উদ্ধার হয়। এবং দ্রত।
-হ্যাঁ, আমার ভাগ্নে চিঠিতে লিখেছে খরগোশের রোস্ট খাবে- এক জোড়া খরগোশ তাই আজকালের মধ্যে দরকার।
-ঠিক আছে বাবু, আমি ম্যানেজ করবাম- ফটিকরে আমিই কইবাম। কাল বিয়ান্যা বেলা পাঠাইয়া দিবাম বাবু!
-সমদ্দার বাবুর বাড়ি বৃহত্তর ময়মনসিংহের গাড়ো পাহাড়ের নিকট। সুখে ময়মনসিং এবং সিলেটের মিশেল ভাষা থাকে।
-সমদ্দার বাবু, প্লান্টেশনের কাজ আগাচ্ছে কিরকম!
-আজ্ঞে বাবু খুব ভালা। বৃষ্টি অওনেতে কাজটা একটু আগাইয়া যাইবো আইজ বাবু!
-ঠিক আছে চলি সমদ্দার বাবু!
-নমস্কার বাবু, নমস্কার-।
-বড় বাবুকে খানিকটা এগিয়ে দেবার জন্য পিছু পিছু হাঁটে।
-কয়েক পা হাঁটতেই সগীর বাধা দেয়- লাগবে না আপনি আসুন। আমার প্রজেক্টটা দেখবেন।
সগীরের সঙ্গে যাওয়া চাপরাশি কনরকে নিয়ে বাংলোতে ফিরে আসে। এসে বারান্দায় পাতা ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে গোসল করবে সে। গোসল করবে টিউবওয়েল থেকে তোলা পানিতে। সেই পানি আনা হবে এখন। অর্থাৎ সদ্য তোলা পানিতে গোসল করা তার রুটিন। এতে শীত কম লাগে। সদ্য তোলা টিউবওয়েলের পানিতে একটা উম থাকে। গোসল সেরে নাস্তা। তারপর ম্যানেজারের কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা। বাংলো থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে অফিস। ল্যান্ড রোভার রেডি।